বাতায়ন/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/সৈয়দ
হাসমত জালাল সংখ্যা/২১শে বৈশাখ, ১৪৩১
ছোটোগল্প
রুচিরা সাহা
আমার স্বপন কাকু
একসময়ে পরিপূর্ণ সংসার ছিল স্বপন
ঘোষের। বাবা, স্ত্রী, আর একটি মেয়ে। উনিশশো একাত্তর সালের মুক্তি যুদ্ধে আধা-সামরিক
সেনার গুলিতে তার বাবা নিহত হন। প্রতিবেশিদের সাথে প্রাণের ভয়ে স্ত্রী আর কন্যাকে
নিয়ে পালাতে বাধ্য হয়। মালপত্র তার হাতে আর সাথে অন্য মহিলাদের সাথে ছিল স্ত্রী আর
কন্যা। পর পর গুলির শব্দ। কাছে যেতেই দেখে ফুটফুটে কন্যাটির হাত
ধরে তার স্ত্রীও
মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। দুজনেরই প্রাণ শেষ। অন্যদিক থেকে কয়েকজন তাকে তাড়া করে
কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। সে প্রাণপণে ছুটতে ছুটতে ট্রেনে উঠে পরে। কিন্তু
প্রাণটা কাঁদছিল ছোট্ট কন্যাটির জন্য। সে কোনো জায়গার নাম ঠিকানা তখন জানত না।
ট্রেন থেকে নেমে একটি ট্রেনে উঠে পড়ে। ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়। দুদিন অভুক্ত অবস্থায়
থেকে অন্ধকারে জঙ্গল দিয়ে হাঁটতে থাকে। শরীর ক্লান্ত হয়ে যাওয়ায় রাস্তায় বসে পড়ে।
পকেটে ছিল মাত্র পঁচাত্তর টাকা। সব কিছুই শেষ তার। কাজ খুঁজতে থাকে। তামিজ মিঞা
নামে একজনের বাড়ি বাইরের দাওয়াতেই রাত কাটে কয়েকদিন। একদিন খুব জ্বর উঠতে পারেনি।
তামিজ মিঞা তাকে চিনতও না কিছু খাবার দেয়। শীত পড়তে শুরু করেছে। এক খানি চাদরও দেয়।
তামিজ মিঞা রিক্সা ভাড়া দিত। তার কাছ থেকে একটা রিক্সা ভাড়া নিয়ে চালাতে লাগল। সেই
সময় কতই বা ভাড়া পঞ্চাশ পয়সা বা পঁচাত্তর পয়সা। কিন্তু তামিজ মিঞাকে রোজ তিনটাকা
দিয়ে দিতে হতো। হাতে কোনোদিন পয়সা থাকত আবার কোনোদিন থাকত না। এইসময় ও আমার বাবাকে
রোজ স্কুলে নিয়ে যেত। মাসে একবারে টাকা নিত। পরে আমাকে কলেজে নিয়ে যেত। খুব সাহসী
আর সৎ ছিল। আমাকে মণিমালা বলে ডাকত। আমি রেগে বলতাম ওটা তো আমার নাম না। হাসত। ভাল
পুতুল, পেন আমাকে এনে দিত। পরীক্ষার সময় ডাবের জল, চকলেট নিয়ে হাজির হতো। কলেজ
ছুটির পরে ভাবতাম একটু বন্ধুদের সাথে গল্প করব, ছুটির আগেই গিয়ে হাজির হতো বাধ্য
হয়ে উঠে পড়তাম রিক্সায়, নইলে তো বাড়িতে বকুনি খেতে হবে। আমার বাড়ির সবাই ওকে খুব
বিশ্বাস করত। আমার আবছা মনে আছে ও যখন নিজের নতুন রিক্সা কিনেছিল আমাকে ঘুরিয়ে
নিয়ে এসেছিল। একটা বাজ পাখি ধরেছিল পুষত আর আমি খুব ভয় পেতাম। আমাকে ওর নিজের মেয়ে
মণিমালার চোখেই দেখত। তখন বুঝতাম না এখন অনুভব করি সন্তানহারা পিতৃ হৃদয়ের স্নেহটা
আমার উপর ছিল। অনেক সময় আমার বাবাকে ও ব্যাংক থেকে টাকাও তুলে এনে দিত এতটাই
বিশ্বস্ত ছিল। মহানন্দা নদের পারে বস্তিতে একটা কুঁড়ে ঘরে থাকত। পড়াশোনা জানত
কিন্তু কাগজপত্র কিছুই ছিল না। অন্য কাজের ব্যবস্থা করতে পারেনি। আমার বাবা মারা
যাওয়ার সময় ও আমাকে শ্মশানে যাওয়ার সময় যাবতীয় খেয়াল রেখেছিল। একদিন কোনো ভদ্রলোক
ওর রিক্সায় মানিব্যাগ ফেলে গিয়েছিল ভুলে। টাকা ভর্তি ব্যাগটি গিয়ে থানায় জমা দিয়ে
আসে। ব্যাগটি পেয়ে তিনি কিছু টাকা দিতে চাইলে নেয়নি। এতটাই নির্লোভ ছিল। এখন বয়স
হয়েছে শরীর বেশ দুর্বল হয়ে গেছে। তাই শুধু রবিবার দিন রিক্সা চালায়। যদি আমাকে
দেখে আমি রিক্সা বা টোটোর জন্য দাঁড়িয়ে আছি ঠিক এসে দাঁড়াবে না উঠলে বকুনি খাই
এখনো। টাকা নিতে চায় না তবুও আমি জোর করেই দিই। বলে "বড় হয়ে গেছিস তুই
এখন।" আমি সময় করে ওর কুঁড়ে ঘরটিতে যাই দেখে আসি কিছু নিয়ে গেলে বলে "কী
হবে এগুলো দিয়ে।" তবে ওর মতো বিশ্বস্ত লোক পাওয়া দায়। সুন্দর ভাবে আপন করে
নিয়েছে সকলকে। পাড়াতে ও স্বপন কাকু নামেই পরিচিত আর আমাকে এখনো ওই মণিমালা বলেই
ডাকে। খুব ভয় হয় আমার স্বপন কাকু হারিয়ে যাবে না তো কোনো ভিড়ে?
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment