নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | হলদে খাম
সুজিত চক্রবর্তী
বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয় রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...
দুহাজার কিলোমিটার দূরে বসে, রাত তিনটের সময়ে খবর পেলাম তুমি আর নেই। সেই থেকে জেগে আছি
মা, চোখের সামনে বায়োস্কোপের
পর্দায় কতরকমের ছবি যে দৌড়ে চলেছে। ছোটবেলাটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। জ্ঞানত তোমার আদরে বাহুল্য
দেখিনি, কঠিন শাসনে ঘেরা ছিল আমার
মেয়েবেলা। এখন বুঝতে পারি, মেয়ে মানুষ করে তোলা
চাট্টিখানি কথা নয় আর আমি তো ছিলাম ভয়ংকর দুষ্টু।
প্রথমেই তোমাকে অনেক অনেক
ভালবাসা জানাই। মা ও বাপিকে আমার প্রণাম জানিও। আমার আদরের ফুলকলি শিউলি ভাল আছে
নিশ্চয়ই। যতদিনে তুমি এই চিঠি পাবে, ততদিনে বোধহয় ওর
স্কুলে পুজোর ছুটি পড়ে যাবে। আর, আমার শালাবাবু অনি
কবে কলেজ-হোস্টেল থেকে ফিরবে? গত বার ও জয়ন্তী বলে
একটি মেয়ের কথা বলেছিল। ব্যাপারটা কোন দিকে এগোচ্ছে জেনো এবং আমাকে জানিও।
আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি।
প্রিয় সখী আমার— এত তাড়াতাড়ি তোমার চিঠি পেয়ে খুবই যে ভাল লেগেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না, তার ওপরে চিঠির ভিতরে যেন থরে-থরে ঐশ্বর্যরাশি। আচ্ছা মুনিয়া, এত রত্ন তুমি পাও কী করে! সত্যিই আমি ভাগ্যবান।
হাসালে মুনিয়া, সত্যিই হাসালে তুমি। তোমার কী মনে হয়, ভালবাসা শুধুই শরীর নির্ভর! সেখানে মনের কোনও ভুমিকাই নেই! আশ্চর্য! হ্যাঁ, শরীরের ভুমিকা নিশ্চয়ই আছে তবে মন-বিনা প্রেম নয়। তবে আর বারবধূর সঙ্গে তফাৎ কোথায়!
কলম ধরলাম এক বিকেলের নরম
আলোয় বসে। জানালার পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে হালকা হাওয়া, যেন কোনও পুরনো দিনের স্মৃতিকে সঙ্গে করে নিয়ে
যাচ্ছে। এই নিস্তরঙ্গ দুপুরে হঠাৎই তোমার কথা মনে পড়ল, আর ভেবে দেখলাম— তোমার সঙ্গে কিছু না বললে যেন এই বিকেলটা
অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
আচ্ছা, মুনিয়া পাখিকে কখনও পোষ মানাতে দেখেছ? বোধহয় কেউ পারেনি। দানা ছড়িয়ে রাখো, উড়ে আসবে, দানা খাবে আবার উড়ে চলে যাবে। এটাই পাখির ধর্ম। তার জন্য আছে মস্ত আকাশ— ক্ষুদ্র, তুচ্ছ দাঁড়ের পরোয়া করতে তার বয়েই গেছে। নইলে তোমার মেয়ের নাম বর্না রেখেই মহান ব্রতপালন করতে না! এ যেন কোমায় বাঁচিয়ে রাখা, অনেকটা জিন্দা লাশ।
ভাল আছ তো? তোমার মনে আছে তো আমাকে? নাকি জীবন থেকে বাদ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন থেকেও মুছে ফেলেছ?
তোমার দেরি দেখে ভেবেছিলাম এটাই বুঝি জীবন, এই-ই বুঝি মানুষের ধর্ম! বুঝি-বা এবার সত্যি-সত্যিই মুক্তি নিলে! আমার মতো ক্যাবলা ভ্যাগাবন্ডকে এ জগতে কার আর প্রয়োজন বলো? নইলে কে আর এভাবে জীবন কাটায়!
নদীর ওপার থেকে মাঝে মাঝেই
চিঠি পোড়ার গন্ধ পাচ্ছি। একেক চিঠি পোড়ার গন্ধ এক-একরকম। তুমি চিঠিগুলো না পোড়ালে বুঝতেই
পারতাম না; প্রতিটি চিঠি বৈশিষ্ট্যে
অনন্য। প্রতিটি চিঠি স্বাদে-গন্ধে-অনুভূতিতে অতুলনীয়। স্বতন্ত্র। তাই এক-এক
জ্বলন্ত চিঠি থেকে এক-একরকমের গন্ধ বাতাসে মেশে। বাতাস সযতনে আমার ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে
পৌঁছে দিয়ে অপেক্ষা করে আমার কী প্রত্যুত্তর আছে তোমাকে দেবার। বাতাস কী বেআক্কেলে
বলো। আমি বাতাসকে জানাবো কেন—আমার দহন জ্বালা।
আজ একটা অন্য প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করব ভাবছি। তুমি সেদিন কবিদের কথা বলছিলে, আমি কবিতার কিছু বুঝি না। কখনো-সখনো লাইনের শেষে মিল রেখে বা না রেখে কিছু লিখেছি বটে তবে সেগুলোকে কবিতা না বলাই ভালো। বরং রাজনৈতিক কিছু একটা বললেও বলতে পার। বুঝতেই পারছি তুমি এখনও যথেষ্ট চর্চার মধ্যেই আছ, তাই তোমাকেই
রক্তকরবীতে নন্দিনীর ভূমিকায় তোমার অভিনয় ভোলার নয়। তোমার গানের কথা তো বলাই বাহুল্য। যেন কোকিলকণ্ঠী আহা! অন্তরের অন্তঃস্থলে যেন গুণগুণ করে। কিন্তু তোমার যে এত ভালো লেখার হাত জানতাম না। অক্লেশে স্বীকার করি আমি রীতিমতো তোমার ফ্যান হয়ে গেছি।
আপনার স্নেহাশিস লাভ
করে অন্তর পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। আজকালকার বাংলাদেশের নবীণ লেখকদের সবচেয়ে বড়
সৌভাগ্য এই যে, তারা তাদের মাথার
উপরে স্পষ্ট সূর্যালোকের মতো আধুনিক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীকে পেয়েছে। এত বড় দানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে যতখানি গভীর
নিষ্ঠার দরকার তা দেবতা পূজারীকে দিতে কখনও কুন্ঠিত হননি। কিন্তু দানকে ধারণ করতে
হলে যে শক্তির প্রয়োজন তার কিঞ্চিৎ অভাব অনুভব করছি। অক্ষম হলেও শক্তির পূজা করা
এবং শক্তির আশীর্বাদ ভিক্ষা করা দুই-ই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাধনা। আর আমার
জীবনের তুচ্ছ সেই আরাধ্য শক্তির সাথে কল্যাণময়ের শক্তির উৎসের যোগাযোগ রক্ষা করাই
আমার জীবনের লক্ষ্য। আশা করি এর থেকে আমি বঞ্চিত হব না।
তোমাকে চিনি আমি অনেকদিন… আলাপ হলো সেদিন, মনে হয় বুঝি জন্মান্তরের চেনা। যেমন তুমিও চিনতে আমায়। ভাগ্যিস ঠিকানাটা দেওয়া-নেওয়া হয়েছিল নইলে মনের কথাগুলো মনেই থেকে যেত।