বাতায়ন/নবান্ন/হলদে খাম/৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন
| হলদে খাম
অদিতি চ্যাটার্জি
অবন্তীকে অদিতি
"দ্যাখ চিঠি লিখতে লিখতে আকাশের রং গোলাপি হয়ে গেল, বুঝলি একবার বারুইপাড়াতে যেতে হবে শীতের কুয়াশা মাখা ভোরে। ফুলকপির গায়ে জমে থাকা শিশিরের ফোঁটা আর জেঠির সেই দুধপুলিটা আবারও খেতে ইচ্ছে করছে।"
প্রিয় অবন্তী,
আজ ফোন করতে ইচ্ছা করল না মনে
হল কাগজ-কলমটা নিয়ে একটা চিঠি লিখি, হেমন্তের পড়ন্ত
দুপুরটা বড় মায়াবী, আর তুই তো জানিস আমার বাড়ির কাছেই রেল স্টেশন। চারপাশ একটু শান্ত থাকলে হর্নের আওয়াজ কানে আসে, তো এই সবগুলোই মগজে ক্রিয়া করে আমাকে বছর সাতেক আগের
বারুইপাড়ায় নিয়ে গেল। মনে আছে তুই আর আমি যখন পৌষ সংক্রান্তির দিন বড় জেঠুদের
বাড়িতে গিয়েছিলাম! ইটভাঁটার সামনে নেমে এক রাশ সর্ষে ফুল আর ফুলকপির হাসি হাসি মুখ
আমাদের স্বাগত জানিয়েছিল। রাস্তার ধারে গাছে কচি বেগুনের চকচকে গা, আঙুল দিলে মনে হবে পিছলে যাবে।
গৃহলক্ষ্মীর
হাঁড়িটা এখনো চোখে ভাসছে, তার মধ্যে থেকে জেঠি
চাল নিয়ে ভাত করেছিল আর মলমলের কাপড়ের পুঁটুলিতে বড়ি, নতুন সবজি সিদ্ধ দিয়ে গরম গরম ভাতে ঘি মেখে খাওয়া!
বারুইপাড়ার হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, তার সাথে গরম ভাত, তুই খেতে পারছিলি না বলে বৌদি তোকে একটা বেগুন ভেজে দিল!
বৌদি কী ভাল আলপনা দেয় না! সেই চালের গুঁড়ো দিয়ে
আলপনা দিয়েছিল, তারপর তো তুই খড়িমাটি দিয়ে
আবারও লক্ষ্মীর পা আঁকলি।
জেঠির পুলিপিঠে মুখে লেগে আছে, এখানেও গতবছর মিঠু বৌদি খাইয়েছিল কড়াইশুঁটির কচুরি, আলুরদম, আর পাটিসাপটা! এখনো
মুখে লেগে আছে, এইবারও নেমন্তন্ন চেয়ে
নিয়েছি। এখানে মানে রানাঘাটে আমরা সংক্রান্তির আগের দিন তুলসী মন্দিরের সামনে জল না দিয়ে চাল, ধান দিয়ে আলপনা দিই, আর প্রদীপ জ্বালাই সন্ধ্যায়, আর ঘরের আনাচেকানাচে খড় দিয়ে আমার শাশুড়ি মা বিড়ে বেঁধে দেন, সেটাই রেখে তার মধ্যে চালের গুঁড়ো দিই। বেশ অন্যরকম
লাগে রে। এখানেও "খাদ্য মেলা" হয়, সেখানেও যাই নতুন গুড়ের ঘন পায়েসের জন্য কিন্তু মা-র কথাই মনে আসে!
তালতলার মাঠে পিঠেপুলি খেতে
কি এইবারও যাচ্ছিস? তবে আমি তো ভাল পিঠে
বানাতে পারি না, তুই তো বেশ যত্ন করেই
পাটিসাপটা আর রসবড়াটা করতে পারিস, তোর চ্যানেলের জন্য
এইবার পিঠে বানিয়ে শেয়ার করতে পারিস, তালতলার মাঠের ভিডিও
তো গত বছর দেখলামই।
দ্যাখ চিঠি লিখতে লিখতে
আকাশের রং গোলাপি হয়ে গেল, বুঝলি একবার
বারুইপাড়াতে যেতে হবে শীতের কুয়াশা মাখা ভোরে। ফুলকপির গায়ে জমে থাকা শিশিরের
ফোঁটা আর জেঠির সেই দুধপুলিটা আবারও খেতে ইচ্ছে করছে।
একরাশ ইচ্ছে নিয়েই চিঠিটা
এখানে শেষ করলাম, অনেক ভালবাসা নিস।
ইতি—
অদিতি
No comments:
Post a Comment