বাতায়ন/নবান্ন/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন | ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
উত্সবের
ছায়া
"সুচিত্রা সেনের মতো বড় হাতা ব্লাউজ আর ঘাড়টা একটু কাত করে ছবি তোলা মেয়ে নবান্নের আগে থেকে সবার সাথে মিলে গোটা বাড়ি, দালান, গোয়াল পরিষ্কার করে নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতি করেছেন!"
জুতোটা পায়ে গলিয়ে বাবাইকে
টাটা করে দেয় রিমলি, ঠিক বেরোবার সময়
বাবাই একবার মনে করিয়ে দেয়,
-যদি বেশি রাত
হয়ে যায় কলকাতা থেকে ফিরতে তাহলে আমাকে একটা ফোন করে দিও আমি উত্তরপাড়া স্টেশনে
চলে আসব, শীতের রাতে একা ফিরতে
যেও না।
মিষ্টি হেসে রিমলি হাত নেড়ে
বেরিয়ে পরে স্টেশনের দিকে।
এখন আর রিমলিকে এস-ইলেভন, নাকতলা মিনি, হরিনাভি মিনি এই জাতীয় বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না, পাতাল রেলে উঠে উত্তম কুমার স্টেশনে নামলেই হবে। সেখান থেকে কিছুটা হাঁটা। আজ মকর
সংক্রান্তি, জাতীয় ছুটি। এসপ্লানেডে
মেট্রোটা একবার বদলে নিতে হল, বহু বছর পর রিমলি সেই
দেহাতি মানুষগুলোকে দেখল ধর্মতলায়, যারা বিহার, উত্তর প্রদেশ
কী আরো দূর দূর থেকে গঙ্গা সাগরে আসেন। যখন
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে মকর সংক্রান্তির আগে বা পরে এই দেহাতি মানুষগুলোর সাথে
ওর দেখা হতো বাস কী মেট্রোতে, ওনাদের সাজ, গায়ে সরষের তেলের
গন্ধ কখনও রিমলিকে বা রিমলির বন্ধুদের বিরক্তি কী হাসির কারণ
হতো। পরবর্তী সময়ে জীবন-যুদ্ধে যখন নেমে গেছে, এই মানুষদের যখন শীতের কলকাতায় কালীঘাটে, চিড়িয়াখানায় বা অন্য কোথাও দেখছে সমানে ভেবে গেছে
মানুষগুলো কতটা কষ্টসহিষ্ণু ও ভ্রমণে উত্সাহী! এতটা পথ পাড়ি দিয়েছে সারাবছর ধরে যা
রোজগার করে সেই সামান্য পুঁজি সম্বল করে অচেনা দেশ দেখতে চলে আসেন এই মানুষগুলো। না-চেনা জায়গা,
অজানা
ভাষা তাই হয়তো ওনারা এইভাবে দলবদ্ধ ভাবে
ঘোরেন যাতে হারিয়ে না যান। আজও একবার মায়া ও প্রশংসার চোখে দেখল রিমলি এই মানুষদের।
রিমলি আজ যাবে টালিগঞ্জে তাঁর
বন্ধু রিয়ার বাড়িতে, সুমিতা কাকিমা ওকে নেমন্তন্ন
করেছেন কিছু পিঠে করবেন বলে, বিকালে বাড়ি ফেরার
সময় জামাইয়ের জন্য নিয়ে যেতে বলেছেন,
তবে
রিমলি জানে শুধু পিঠে খাওয়ার জন্য থোড়াই ও যাচ্ছে টালিগঞ্জে ও তো আসছে কাকিমার
কাছে সেই পুরোনো গল্পগুলো শুনতে।
ঘোষ পাড়ায় রিয়াদের দোতলা
বাগান দেওয়া বাড়ি, নার্সারি স্কুলের
বন্ধু, নিয়মিত দেখা না হলেও
যোগাযোগটা রয়ে গেছে, আসলে কিছু সুতোকে ছিঁড়তে নেই বরং
যত্ন করতে হয় রিমলি সেটা জানে,
তাহলে
ওর জীবনের বিশাল একটা অংশ কোথায় হারিয়ে যাবে,
রিমলি
চাইলেও ফেরাতে পারবে না। ওদের গলিতে বাড়িগুলো এমন ভাবে তৈরি যে সহজে কোনও আবাসন গড়ে
তোলা যাবে না। তবে গলির সামনে শীতলা মন্দির আর শিব মন্দিরটা পেরিয়ে কবে যে আবাসনটা
গড়ে উঠেছে, তখন বোধহয় রিমলি
মাধ্যমিকও দেয়নি।
আহ! ওম, রিয়ার ছেলের গলা আসছে ওপর থেকে। বেচারা ওম না ভালবাসে পিঠে
খেতে না ভালবাসে নিরামিষ খেতে, ক্লাস ফাইভে পড়ে ছাদে
চলে গেছে মামপিদির ছেলেমেয়েদের সাথে। রিয়াদের ছাদটা বিশাল কিছু বড় না, ওই ছাদেই রুমাল চোর খেলা থেকে শুরু করে প্রথম ভাল লাগার গল্প
হয়ে বিয়ের পরের আনন্দ-জটিলতা সব কিছুই আনাচেকানাচে রয়ে গেছে। কাকিমা যতটা পেরেছেন
ঠাকুর ঘরে আলপনা দিয়েছেন, মা লক্ষ্মীর হাঁড়িতে
একটা প্রণাম করে রিমলি, গৃহ লক্ষ্মীর আসনের
পাশেই কাকিমা এই হাঁড়িটা পেতেছেন। কাকিমা ছিলেন যদিও ছোট বউমা, তবুও শাশুড়ির কাছ থেকে এই লক্ষ্মীর হাঁড়িটি পেয়েছিলেন, কারণ রিয়ার যে দুজন জেঠি ছিলেন তাঁরা এত ঝামেলায় উত্সাহী নয়।
পৌষ শেষ হচ্ছে, আজ বেশ ঝলমলে রোদ উঠেছে, ঠান্ডাটাও জব্বর পড়েছে। রাতে কি থেকে যাবে রিমলি? সবাই খুব করে ধরেছে,
দেখা
যাক! আপাতত খাওয়ায় মন দেয় রিমলি। কাকিমাদের দেশের বাড়ি সুভাষ গ্রামে, এখনো কিছু জমিজিরেত অবশিষ্ট আছে। কিছুটা নতুন সবজি যেমন নতুন আলু, মটরশুটি, সিম আর ফুলকপি, কাঁচা লঙ্কা, বেগুন এবং গোবিন্দভোগ
চাল বাজার থেকে কেনা সব একসাথে সিদ্ধ করা হয়েছে। এইবার তাতে ঢালা হবে ঘি। তারপর
সেই ভাত গরম গরম খেয়ে ফেলতে হবে, একটুও ফেলা চলবে না।
ওমদের কাছে এই খাওয়াটা শাস্তি স্বরূপ,
ওরা
চিকেন খাবে। কাকিমা রিমলি আর রিয়ার কাছে জানতে চাইলেন ওরা কী একটু চিকেন
খাবে নাকি খুকুদিকে বলবে বেগুন ভেজে দিতে? ওরা দুজনেই সজোরে হেসে ওঠে, ছোটবেলা কেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে
পড়ার সময় মকর সংক্রান্তির দিন রিমলির নেমন্তন্ন থাকত, কাকিমা যত্ন সহকারে বেগুন ভেজে দিতেন, কাকু টিভি দেখতে দেখতে বলতেন, ‘একটুও
ফেলা চলবে না প্রসাদ কিন্তু!’ এইগুলো কত তাড়াতাড়ি গল্প কথা
হয়ে গেল! ভাবে রিমলি। খাওয়া শেষে ছাদে ওঠে রিমলিরা, এক-একটা কমলা লেবু হাতে করে। একটু পরে কাকিমাও চলে আসেন, চেয়ার দেওয়া হয় কাকিমাকে, ‘কাকিমা
পুরোনো গল্প কিছু বলো-না! তোমার শাশুড়ির কথা।’ প্রায় আবদারই করে রিমলি।
রোদের রং এখন একদম ঘন
হলুদ, ছাদ থেকে দেখা যাচ্ছে শিব
মন্দিরের চুড়োটা, সেই দিকেই চোখ
কাকিমার। একটু হেসে বলেন, ‘এই বাড়িতে আমার খুব
কম করে বছর বিয়াল্লিশ হয়ে গেল। আমার শাশুড়ি খুব আধুনিক মানুষ ছিলেন, উত্তর কলকাতার মেয়ে বিয়ের পর গেছিলেন সুভাষ গ্রামে ধর ওই পঞ্চাশের দশক নাগাদ। তখন ওখানে ওই নবান্নের আগে
নতুন সবজি, ধান সব গোলায় উঠত, সেইগুলোকে মা লক্ষ্মী রূপে দেখতে শিখিয়েছিলেন আমার দিদিশাশুড়ি, গোটা বাড়ি আলপনা দিতেন আমার
জেঠিশাশুড়ি। নতুন গুড়ের চুষির পায়েস,
পিঠে
বানাতেন নিজের ননদের সাথে রিয়ার ঠাকুমা,
সব মা
লক্ষ্মীকে ভোগ দেওয়া হতো। ভাব তোরা সুচিত্রা সেনের মতো বড় হাতা ব্লাউজ আর ঘাড়টা
একটু কাত করে ছবি তোলা মেয়ে নবান্নের আগে থেকে সবার সাথে মিলে গোটা বাড়ি, দালান, গোয়াল পরিষ্কার করে
নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতি করেছেন!’ কাকিমা একটু চুপ করেন, একটা নিশ্বাস নিয়ে বলেন, ‘এটাই তো আনন্দ, তাই এটাই উৎসব। আমি নিচে
গেলাম, আজ খুকু পাটিসাপটা করেছে, রসবড়া খাবি তো বটেই আর নতুন গুড়ের চুষির পায়েসটা না
খেলে নিয়ে যাবি বাড়ির জন্য। আর হাত-বড়ি করেছিলাম, সামান্যই তুলে রেখেছিলাম নিয়ে যাস। কাকিমা একটু হেসে নিচে
নেমে গেলেন। কে জানে চুষির পায়েস আর বড়ির গল্পে রিমলির মা-ও কী উঁকি দিল
কাকিমার মনে? বুঝতে পারল না রিমলি।
এই রিলের পৃথিবী, উৎসব-মেলার কলকাতাকে একটু মুছে দিয়ে, কাকিমা এইসব নানা বুনোটের নকশা এঁকে দিয়ে নিচে নেমে গেলেন।
এটাই কি তবে উত্তরাধিকার! যা সুভাষ গ্রাম থেকে শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে না তা
কেন, তারও আগে থেকে এবং
এই দুহাজার পঁচিশ কী ছাব্বিশের ঘোষ পাড়ার দে বাড়ির ঠাকুর ঘরে
আজও তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
কে জানে কী! পাটে
যাওয়ার আগে সূর্যদেব বুঝি ইশারায় জানিয়ে গেলেন এইবার তোমরা এই সম্পদের
উত্তরাধিকারী... তোমাদের জন্যই সব রাখা থাকল।
~~০০~~

No comments:
Post a Comment