বাতায়ন/নবান্ন/ছোটগল্প/৩য়
বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন
| ছোটগল্প
বীথিকা ঘোষ
নবান্ন
"তুই তো আরও সুন্দর আলপনা দিয়েছিস লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, ধানের ছড়া খুব সুন্দর হয়েছে। আমার এত ভাল হয় না। বউমা পুষ্পপত্র, নৈবেদ্য, সবকিছু সাজিয়ে রেখেছে। ভোগের ঘরে পুজোর ভোগ রান্না বসে গেছে, অন্নের চালটা খুব ভাল, সুগন্ধে বাড়ির বাতাস ভরে উঠেছে।"
শরতের পরে আসে হেমন্ত, সেই হেমন্তের রূপ যেন শরতেরই পরিণত চেহারা। চারদিকে তখন
শস্যের প্রাচুর্য পাকাধানের সোনালি আভায় হেমন্ত-লক্ষ্মীর মুখখানা যেন উজ্জ্বল
হয়ে ওঠে। ভোরের দিকে প্রকৃতির পরিবেশ কুয়াশার আবরণে ঢাকা
থাকলেও তীব্র শীতের জড়তা নেই। তখনই বাংলার পল্লিতে হয় ‘নবান্ন-উৎসব’, বাতাসে পাকা ধানের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এই গন্ধটা সব
চাষির মনে আনন্দের জোয়ার এনে দেয়। প্রতিমাদেবী স্বামীর দিকে চা এগিয়ে দিতে দিতে
বলে উঠলেন,
-ধান কাটা, মারাই তো হয়ে গেছে। ধান গোলায় তোলার আগে নবান্ন পূজোর
উপলক্ষে কতটা ধান ভাঙাতে দেবে সেটা ঠিক করে নিও। আর পিঠের জন্য যে চালটা পাঠাবে
সেটা যেন ভাল হয়, আগেই গুঁড়ো করে
রৌদ্রে দিয়ে ঠিক করে রাখতে হবে। হাতে সময় বেশি নেই, শশিকে বলে দিয়েছি আজই নতুন গুড় দিয়ে যাবে।
-বালাই ষাট আমাদের গুষ্টি তো কম বড় নয়। পুজো উপলক্ষে
আত্মীয়স্বজনরা সবাই আসবে। আসেজন বসেজনও আছে, সেই বুঝে সব জিনিসপত্রের আয়োজন করতে হবে। তোমায় চিন্তা করতে
হবে না সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। প্রতি বছরই হচ্ছে এত এত রান্না, পিঠে পায়েস সবই করতে হবে, ধলির মা-রে ডেকে নিও, আগে থেকে পিঠের চাল গুঁড়ো করে রেখ, আমি দোকানে যাচ্ছি। কাল শশিকে দিয়ে পুজোর সমস্ত
সামগ্রী কিনে পাঠিয়ে দেব।
তারপর হেসে বললেন,
-এবার মনের
আনন্দে পুজোর ব্যবস্থায় লেগে পর। তোমার আনন্দে সামিল হতে
সবাই আসছে। প্রতিমাদেবীও খুশি
হয়ে বলেন,
-আশা তো করি সবাই আসবে!
-ও--মা, আমরা এসে গেছি।
গলা শুনে বুঝতে অসুবিধে হল না
বড় মেয়ে তাপসী সঙ্গে জামাই আর ওদের ছেলে বিশু এসেছে। হাত মুছতে মুছতে প্রতিমাদেবী
বেরিয়ে এসে বলেন,
-ভাল করেছিস
আজই চলে এসে।
তারপরই এদিক-ওদিক দেখে
জানতে চান,
-বিশু কোথায়?
-বাপরে তুমি যে কী বলো না মা? মামাবাড়িতে এসে সে চুপ করে বসে থাকবে? গাড়ি থেকে নেমেই দৌড় দাদুর দোকানে। এখন দেখো না, বাবাকে বিরক্ত করে কীরকম? বাবা এলে জানতে পারবে বকবক করে মাথা খাবে। কত গল্প জমে আছে দাদুনকে বলবে বলে।
প্রতিমাদেবী হেসে বলেন,
-সত্যি ঈশ্বরের কেমন সৃষ্টি অসমবয়সি দুজন বাচ্চা-বুড়োর বন্ধুত্ব দেখলেও অবাক হতে হয়।
দাদুকে বিরক্ত করার সুযোগ
বিশু পায়নি, দোকানে গিয়ে শোনে, দাদু মার্কেটে গেছেন, সেখান থেকে আসতে দেরি হবে। খুব বিরক্ত হয়েছে বিশু, দোকান থেকে একটা ক্যাডবেরি চেয়ে নিয়ে খেতে খেতে বাড়ি ফিরে
আসে এবং দিদানকে নালিশ করে,
-দাদুন জানে আমরা আসবো তবুও দাদুন কোথায় যেন গেছে।
-আরে ভাবিস না
বিশু, যেখানেই যাক তোমার জন্য
নিশ্চয়ই কিছু আনবে।
-আমি কিছু
চেয়েছি নাকি, দাদুর পাশে বসে দোকানে লোকের আসা-যাওয়া, টাকা গুনে গুনে ক্যাশবাক্সে তুলে রাখা দেখতে আমার খুব ভাল লাগে, সেটা তো হল না।
প্রতিমাদেবী নাতির গাল ধরে
আদর করতে করতে বলেন,
-যেই শুনবে
বিশু এসে গেছে, অমনি বাড়ির দিকে চলে
আসবে, তুমি বরং বাবার সঙ্গে বসে
খাবার খেয়ে নাও। কাল দাদানের সঙ্গে দোকানে যেও।
তাপসী বাইরের পোশাক ছেড়ে
হাত-পা ধুয়ে মাকে লুচি বানাতে সাহায্য করছিল। ছেলেকে বলে,
-তুমি তাড়াতাড়ি
হাত-পা ধুয়ে এসে খেয়ে নাও। বিকেলে দাদুর সাথে দোকানে যেও।
তাপসী বেশ জোরে জোরে বলে
স্বামীর উদ্দেশ্যে,
-তোমার চা খাওয়া হয়ে গেছে তাহলে খানিকক্ষন বাদে দূজনেই
স্নান করে নিও। আমি তোমাদের পোশাক বের করে রেখেছি, বাইরে থেকে সবাই এসে পড়লে অসুবিধেয় পড়বে। ও মা দাদা-বৌদি তো আজই
আসবে? নাকি একেবারে পূজোর দিন আসবে? ছোট বোন খুশি আজই আসবে তাই বলেছিল আমায়।
প্রতিমাদেবী বলেন,
-হ্যাঁ কালই আসবে সবাই, তুই মা তাড়াতাড়ি স্নান করে নে ধলির মা তার লোকজন নিয়ে এসে পড়বে পিঠের চাল গুঁড়ো করে দেবে, ওরা এলে ধান দুর্বা সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে
ঢেঁকি বরণ করে নিস, তারপর ওরা চালে হাত দেবে জানিসই তো মা।
খুশি কোলকাতায় হোস্টেলে থেকে
ডাক্তারি পড়ে। খুশি, দাদা-বৌদি, বাচ্চারা, পিসিরা সবাই এসে পড়লে পরদিনই। আনন্দ-উৎসবে বাড়ি সেজে উঠল, সবাই হইচই করে কথা বলছে, এর সঙ্গে সে
তার সঙ্গে এ। সবারই
অনেক অনেক গল্প জমে আছে বাড়িঘর গমগম করতে লাগল। এদের কোলাহল শুনে ওদের বাবা বললেন,
-আজ আর বেশি
রাত করে না, সকাল থেকেই পুজোর কাজকর্মে
লেগে পড়তে হবে, সাজানো গোছানো করতেও
সময় লাগবে, কম কাজ তো নয়।
ইতিমধ্যে লোকজন এসে বাড়ির চার
পাশে লাইট লাগিয়ে দিয়ে গেল।
সত্যিই তাই, কাকভোরে উঠে স্নান করে সবাই মিলে কাজে লেগে পড়ল। তাপসী আলপনা দিতে
ভালবাসে তাই ও আলপনা দিতে লেগে পড়ল, প্রথমে ঠাকুর ঘরে পরে উঠোন, তুলসীতলা, বারান্দা সব জায়গায় দেওয়ার পর
মাকে ডেকে বলল,
-মা দেখে যাও
তো আর কোথাও দিতে হবে?
মা বেরিয়ে এসে বলেন ওমা তুই
তো আরও সুন্দর আলপনা দিয়েছিস লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ,
ধানের
ছড়া খুব সুন্দর হয়েছে। আমার এত ভাল হয় না। বউমা পুষ্পপত্র, নৈবেদ্য, সবকিছু সাজিয়ে
রেখেছে। ভোগের ঘরে পুজোর ভোগ রান্না বসে গেছে, অন্নের চালটা খুব ভাল,
সুগন্ধে
বাড়ির বাতাস ভরে উঠেছে। ওদিকের ঘরে নাড়ু,
পিঠে, পুলি, পায়েস তৈরি হচ্ছে।
রান্নার ঠাকুররাও বিরাট বড় উঁচু উনানে বিশাল কড়াই বসিয়ে এত্ত বড় খুন্তি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
বিভিন্ন রান্না করে ফেলছে নিমেষে। পুরোহিতও এসে পড়বে ঘন্টা খানেকের মধ্যে, সবাই তাড়াহুড়ো করছে পুজোর কাজ শেষ করতে হবে।
এর মধ্যেই বাচ্চাদের কলরব
শোনা গেল বাইরে থেকে, পুরোহিত দাদু এসে
গেছে। চেয়ার পাতাই ছিল, সেখানে বাড়ির লোকজন
আশেপাশের প্রতিবেশীরা বসে মজলিস করছিলেন, মজলিস জমেও উঠেছিল তখনই বাচ্চাদের সিগনাল। পুরোহিত-মশাই একটি
চেয়ার টেনে তাতে বসে গামছা দিয়ে চোখ-মুখের ঘাম মুছে নিতে
নিতে বলেন,
-কী গো মা জননীরা পূজার কাজ শেষ হইছে?
আমি কিন্তু আয়া পড়সি।
ছেলেপুলেদের হট্টগোল ছাপিয়ে
শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি শোনা গেল। প্রায়
ঘন্টা খানেক পুরোহিতের মন্ত্র, ঘন্টা না-না লক্ষ্মী পুজোতে ঘন্টা
লাগে না, বউমা জোরে জোরে পাঁচালি পড়ছিল। পুজো শেষ করে ঠাকুরমশাই বেরিয়ে এসে যেখানে সবাই বসে মশগুল করছিলেন সেখানে
চেয়ার টেনে বসলেন। বললেন,
-এ বছর ফসল
কেমন হইছে কর্তামশাই?
শিবতোষবাবু বলেন,
-তা মন্দ হয় নাই দাদা,
এক
বস্তা চাল বরাবরের মতো আপনার বাড়িতে পাঠিয়ে দেব।
ঠিক তখনই প্রতিবেশী এয়োদের
নিয়ে বাড়ির মেয়ে-বউরা সবাই মাটির সরার ওপর কলাপাতায় বিভিন্ন ভোগ সাজিয়ে বাড়ির
চারদিক পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ দিকে
শঙ্খধ্বনি উলুধ্বনি দিতে দিতে মা-অন্নপূর্নার উদ্দেশ্যে ভোগ
নিবেদন করে এলো, 'এটা এই বাড়ির নিয়ম।' সরায় করে জমিতে দিয়ে এলো যাতে পশুপাখি সবাই মিলে
খুঁটে খুঁটে খেতে পারে! ততক্ষণে দরদালানের বারান্দায় বাচ্চাদের উল্লাসপূর্ণ
চেঁচামেচি শোনা গেল, তার মানে ওখানে পাত
পড়ে গেছে! সব নিমন্ত্রিতরা একে একে আসতে লাগল। শিবতোষবাবু তার জমিতে যে কৃষকরা কাজ
করে, তাদের ও তাদের পরিবার-সহ সবাইকে ভোগ
খাবার জন্য নিমন্ত্রণ করেন। তারাও উৎসাহিত হয়ে এ বাড়ির পুজোতে যোগদান করে।
~~০০~~

No comments:
Post a Comment