বাতায়ন/নবান্ন/মূল্যায়ন/৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন | মূল্যায়ন
পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে | স্থানিক সময়সংকটের অনিবার্য ভাষা দলিল
যে কোনও সার্থক সাহিত্যকে সাধারণত আমরা আসলে সমসাময়িকতার একটি ভাষাদলিল হিসেবে চিহ্নিত করতেই অভ্যস্ত। তবে তার সঙ্গে অনিবার্যভাবেই জড়িয়ে থাকে পাঠক হিসেবে আমাদের অন্তর্লীন বয়স্ক অভিজ্ঞতা। অবশ্য সেক্ষেত্রে পাঠকের নিজস্ব দীক্ষা ও ঋক অনুযায়ী কিছু কূটাভাস মেঘাচ্ছন্ন থেকে গেলে, অবচেতনে ভেসে আসতেই পারে একের পর এক অমূলতরু দৃশ্যকল্প যেগুলো হয়তো রচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়। চেতনার মধ্যে ধ্বনিত হতে পারে অপরিচিত অতিচেতনার কন্ঠস্বর। কিন্তু যিনি অনায়াসে একটি সাহিত্যকর্ম পড়ছেন, তাঁর চেতন অংশে সেগুলিকে একটা গ্রন্থিতে আবিষ্কার বা প্রতিস্থাপন করাই পাঠক হিসেবে তাঁর পঠনশৈলীর নিজস্বতা। অবশ্যই তখন লেখক অনুপস্থিত। তাই কোনও বই, বিশেষত আখ্যাননির্ভর গদ্য পড়তে গেলে বিনির্মাণের জানলাগুলো সম্পূর্ণ খোলা রেখে এগুনোই লেখক ও পাঠক, উভয়ের পক্ষেই বাঞ্ছনীয়। এই কথাগুলি আমার মনে এলো অতি সম্প্রতি শাশ্বত বোসের লেখা 'পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে' গল্পগ্রন্থটি পড়তে পড়তে। বইটির প্রকাশক অনিমিখ প্রকাশন।
তাঁর এই লেখাগুলির ডিসকোর্স
বেশ খানিকটা অন্যরকম। বর্তমান সময়সারণিতে দাঁড়িয়ে এটিকে শুধুমাত্র একটি
গল্পগ্রন্থ হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ এই বইটিতে আখ্যানের বা ন্যারেটিভের ওপরে
মেঘের মতো ছেয়ে আছে লেখকের ভিন্ন ভিন্ন স্তরীয় বা লেয়ারড
সাব-অল্টার্ন যাপন অভিজ্ঞতা। যার সঙ্গে আদ্যন্ত নাগরিক আমার অন্তত সরাসরি কোনও
অভিজ্ঞতা-যোগ নেই বা কখনো ছিল না। অন্যভাবে দেখলে, এটি কোনও একটি একক ঘরানার বই নয়, বরং এটি মূলত চিহ্নিত করছে কয়েকটি বা কিছু প্রান্তিক জীবনের
ঘটনাপরিসর বা ভাষ্যকে, যেখানে ন্যারেটিভ, কবিতা, স্মৃতি ও সমাজদর্শন মিলেমিশে
নির্মাণ করেছে এক বহুস্বরীয় আখ্যান। বইটির নামের মধ্যেই যে রূপকধর্মী ইশারা অর্থাৎ
—“মোহনা”—নিশ্চিতভাবেই তা কেবল নদী ও সমুদ্রের ভৌগোলিক মিলনবিন্দু নয়, বরং জীবনের বহু বিপরীত প্রবাহের সংঘাত ও সহাবস্থানের
প্রতীক। বহতা স্রোতের মতোই এখানে এসে মিশেছে শহর ও জঙ্গল, মার্ক্স ও বনবিবি,
বিপ্লব
ও লোককথা, কামনা ও ক্ষুধা, ঈশ্বর ও মানুষের জটিল নিঃসঙ্গতা। এই মোহনাতেই তো জন্ম হয়
‘পাখি’দের— শাশ্বতের লেখায় যারা স্বাধীনতার,
প্রশ্নের, প্রতিবাদের, আবার কখনো বা হয়তো
নিঃশব্দ বিলুপ্তির প্রতীক।
শাশ্বত’র লেখার প্রধান শক্তি
তাঁর ভাষা। যে ভাষা এই আখ্যানগুলিতে শহুরে শিক্ষিত বুদ্ধিবৃত্তিপ্রবণ এলিট পাঠকের
সঙ্গে আদিবাসী জীবনের, তাঁদের লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় আচার ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অনন্য ও গভীর সংলাপ
তৈরি করেছে। সেই সংলাপ বিশ্বাসযোগ্য এবং অবশ্যই পরিসর নির্ভর। এবং শাশ্বত’র লেখার
প্রধান দুর্বলতাও তাঁর ভাষা। কারণ যে ভাষা গদ্যের মরুভূমিকে সহজেই কবিতার বৃষ্টিতে
সিঞ্চিত করে ভাবনায় লজিকাল ক্র্যাক তৈরি করে,
সে
ভাষায় সার্থক এবং নিরপেক্ষ রাজনৈতিক ন্যারেটিভ নির্মাণ সম্ভব নয়। এবং একজন আধুনিক
ও মনস্ক পাঠক হিসেবে আমি গভীর বিশ্বাস করি,
যে
গদ্যে বা ন্যারেটিভে কোনও না কোনও ভাবে রাজনৈতিক অ্যাসিমিলেশন নেই, সেই রচনার পক্ষে সার্থক হওয়া খুব শক্ত। যাই হোক, কিছু কিছু সিদ্ধান্তের ভার সচেতন ভাবেই 'কালে'র ওপরে ছেড়ে দেওয়াই
ভাল।
তাঁর বাক্যগঠনের সিনট্যাক্স
অনেক সময় দীর্ঘ, স্তরীয় এবং প্রলম্বিত, কিন্তু সেটিকে কেবল তাঁর একটি আলংকারিক চরিত্র বলতে আমার
দ্বিধা আছে। বরং আমার মনে হয়েছে, এই দীর্ঘসূত্রিতা
লেখকের সচেতন ভাবনা থেকে নির্মিত, তাঁর অভিপ্রেত
দর্শনেরই অংশ। পাঠককে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে দেবেন না, বরং অনুরোধ করবেন ভাবনার অশরীরী চার্বাকে হাঁটতে, মৃত্যুর আগেও, এমনকি মৃত্যুর পরেও।
তাই তাঁর বাক্যেরাও এই আখ্যানগুলিতে হাঁটে,
চলে, থামে, আবার ঘুরে দাঁড়ায়—ঠিক
প্রান্তিক মানুষের জীবনের মতোই। এবং অবশ্যই এই দীর্ঘসূত্রিতা লেখকের আলস্যনির্মিত
নয়, বরং এটি তাঁর শিল্পবোধের একটি
সচেতন স্টাইলাইজেশন।
তাঁর এই আখ্যানগুলিতে বারবার
ফিরে আসে প্রান্তিক মানুষ—আদিবাসী নারী,
শ্রমজীবী
পুরুষ, শহরের অনুচ্চারিত নিঃসঙ্গতা, রাজনৈতিক হিংসা,
ধর্ম ও
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। আসে জামবনির মাওবাদ থেকে সুন্দরবনের খাল-বিল সমৃদ্ধ কোস্টাল
স্পেকট্রামের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট। এই বিপুল ও জটিল পরিসরগুলিতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে
কোথাও আমার রোমান্টিক অথবা ভয়ারিস্টিক লাগেনি, আবার নিষ্ঠুর বাস্তবতাতেও তিনি কোথাও সংবেদনশীলতা হারাননি। প্রেম, শরীর, খিদে, যৌনতা কিংবা হিংস্রতা—সবকিছুই তাঁর এই আখ্যানগুলিতে এসেছে
একটি নির্মোহ অথচ গভীর সহানুভূতির সঙ্গে।
বইটির প্রথম গল্প “বিপ্লব
একটি পাখির নাম” গল্পে বিপ্লব কোনও রোমান্টিক স্লোগান নয়, বরং স্মৃতি, ক্ষুধা ও
শ্রেণীচেতনার সহবাসে গড়ে ওঠা এক বিষণ্ণ উপলব্ধি। একটি অ্যাবস্ট্রাক্ট অথচ মানবিক
স্বপ্ন। এখানে বিপ্লব দুহাতে ছিঁড়তে চায় বৈদিক জ্যোৎস্নার শূন্যতাকে, আবার পাখিজন্মে সেই মলত্যাগ করে যায় শহুরে আলোর ওপরে—এই
দ্বৈততা বা ডুয়ালিটিই লেখকের সাহস, চেতনা ও মননের নিজস্ব
রাজনৈতিক প্রকল্পনা। একইভাবে “হিমজ্যোৎস্নায় বনবিবি” বা “নষ্টভূমি ও ঈশ্বরী
বনজ্যোৎস্না”-য় লোকবিশ্বাস ও বাস্তবতার সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে। দেবী
এখানে ধর্মীয় আইকন নন, বরং জীবনে টিকে থাকার
প্রতীক হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন প্রান্তিকতার আশ্রয়, ভরসা, আর বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।
চিরাচরিত ক্ষমতার হাতিয়ার থেকে ধর্ম এখানে রূপান্তরিত হয় ভয় আর বিশ্বাসের মাঝখানে
দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের একান্ত প্রার্থনায়।
আমাকে স্বীকার করতেই হবে, এই আখ্যানগুলিতে শাশ্বতের গদ্য প্রায়ই কবিতার সীমান্ত ছুঁয়ে
ছুঁয়ে গেছে। অতিক্রম করেছে কাঁটাতার। কখনো তা পাঠকপ্রিয় হয়েছে, আবার কখনো মনে হয়েছে অপ্রয়োজনীয় লিরিক্যাল। তবে আকাঁড়া 'র' প্রকৃতির পরিসরে, বিশেষ করে জঙ্গল,
রাত, চাঁদ, আগুন, নদী—এই ধরণের অনুষঙ্গে তাঁর ভাষা মুখরতার পরিবর্তে তৈরি
করেছে এক গভীর নৈঃশব্দ্য। যে নৈঃশব্দ্যের ভেতরে কান পাতলে মরমি পাঠক অবশ্যই শুনতে
পাবেন প্রান্তিক মানুষের আত্মজৈবনিক
উচ্চারণ—যা মূলধারার ইতিহাসে সাধারণত অনুপস্থিত।
'পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে' পাঠকের কাছে কোনও একটি আরামদায়ক পাঠ নয়। এই বই এলিট নাগরিক পাঠককে একটি
অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আমাদের শহর, আমাদের রাজনীতি, আমাদের সভ্যতা ঠিক
কাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে? এই বই পড়া মানে নিজের
ভেতরের সেই নিশ্চিন্ততার সমাজ, রাজনীতি এবং নিজের
অবস্থানের ওপর ফিক্স করা ডিটোনেটরের বোতামটি নিজের হাতে টিপে দেওয়া। সমকালীন বাংলা
সাহিত্যে এই গ্রন্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চারণ। এটি দেখিয়ে দেয়, প্রান্তিকতা এখনও নিঃশব্দ নয়, বরং তা উলঙ্গ দিগন্তের সামনে সভ্যতার দিকবদলের এক অনিবার্য হাওয়ামোরগ। একজন
কবি এখনও সে ভাষা খুঁজে পেতে পারেন এবং পাঠককে সরাসরি দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন
বিনোদনের বদলে তাঁর নিজস্ব বিবেকের মুখোমুখি।
কামনা করি বইটি পাঠকপ্রিয়
হোক।
নবান্ন | মূল্যায়ন
যে কোনও সার্থক সাহিত্যকে সাধারণত আমরা আসলে সমসাময়িকতার একটি ভাষাদলিল হিসেবে চিহ্নিত করতেই অভ্যস্ত। তবে তার সঙ্গে অনিবার্যভাবেই জড়িয়ে থাকে পাঠক হিসেবে আমাদের অন্তর্লীন বয়স্ক অভিজ্ঞতা। অবশ্য সেক্ষেত্রে পাঠকের নিজস্ব দীক্ষা ও ঋক অনুযায়ী কিছু কূটাভাস মেঘাচ্ছন্ন থেকে গেলে, অবচেতনে ভেসে আসতেই পারে একের পর এক অমূলতরু দৃশ্যকল্প যেগুলো হয়তো রচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়। চেতনার মধ্যে ধ্বনিত হতে পারে অপরিচিত অতিচেতনার কন্ঠস্বর। কিন্তু যিনি অনায়াসে একটি সাহিত্যকর্ম পড়ছেন, তাঁর চেতন অংশে সেগুলিকে একটা গ্রন্থিতে আবিষ্কার বা প্রতিস্থাপন করাই পাঠক হিসেবে তাঁর পঠনশৈলীর নিজস্বতা। অবশ্যই তখন লেখক অনুপস্থিত। তাই কোনও বই, বিশেষত আখ্যাননির্ভর গদ্য পড়তে গেলে বিনির্মাণের জানলাগুলো সম্পূর্ণ খোলা রেখে এগুনোই লেখক ও পাঠক, উভয়ের পক্ষেই বাঞ্ছনীয়। এই কথাগুলি আমার মনে এলো অতি সম্প্রতি শাশ্বত বোসের লেখা 'পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে' গল্পগ্রন্থটি পড়তে পড়তে। বইটির প্রকাশক অনিমিখ প্রকাশন।
পাখি জন্ম মোহনার বাঁকে
শাশ্বত বোস
অনিমিখ প্রকাশন
বিনিময়ঃ ৪০০ টাকা
অমিত সরকার
পেশায় ধাতুবিদ্যা বিষয়ক
প্রযুক্তিবিদ। জন্ম ষাটের দশকের শুরুতে হাওড়া শিবপুরে। মূলত আটের দশক থেকে সিরিয়াস
কবিতা লেখার শুরু। মাঝখানে অন্য কোনও নেশায় দীর্ঘ পনেরো বছর লেখালিখির সঙ্গে
সম্পর্ক ত্যাগ। আবার ফিরে আসা, নতুন অভিজ্ঞতায় জারিত
হয়ে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের অসংখ্য বড় ও ছোট পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে ও হয়ে
চলেছে তাঁর কবিতা। এছাড়া লেখেন গল্প ও প্রবন্ধ। “দেশ” বা “আরম্ভ” সহ বিভিন্ন
বিশিষ্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনেক গল্প। নিজে সম্পাদনা করেন পশ্চিমবঙ্গের
বিশিষ্ট একটি কবিতাপত্রিকা “চর্যাপদ”।



No comments:
Post a Comment