বাতায়ন/কালো কাল/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৩৫তম সংখ্যা/৭ই পৌষ, ১৪৩২
কালো
কাল | ছোটগল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
বুধোস্থান
"জাতে মুসলিম হলেও খাসি আর চিকেন ছাড়া অন্য মাংস বিক্রি করতাম না, সব ড্রাইভার খালাসিদের খদ্দের হিসেবে পাওয়ার জন্য। রান্নাঘরে রেওয়াজি খাসির বড় বড় কোমর সমেত ঠ্যাং পড়ে থাকত। হঠাৎ একদিন"
(ঋণ স্বীকার - স্বনামধন্য কবি সুকুমার রায়)
এ আই, আমরা একটু কথা বলি। এখানে তো আমরা সবাই ভাই ভাই। তাছাড়া
লড়াই করতে গেলে সবচেয়ে আগে যেটা দরকার,
সেটা হল
শরীর। আমাদের তো সেটাই নেই। আমরা হলাম আত্মা বা নফস। ঈশ্বর, আল্লাহ, জিশু, যিহোবা, কামি প্রমুখ সবাই মিলে পরলোকে এই যন্ত্রণাবেদনাহীন
শান্তিস্থান সৃষ্টি করেছেন। ধর্মযুদ্ধের অস্বেচ্ছার শহীদদের জন্য।
এ এক অচিন্তনীয় পরিবেশ। ধরুন
নাম বুধোস্থান। স্বর্গের মতো পারিজাত ফুলের অপূর্ব উদ্যান বা নরকের মতো বিশালাকার
কড়াইয়ে গরম তেল ফুটছে, কুৎসিত কদাকার আবহ
সেরকম কিছু নেই, শুধু মৃদু তরঙ্গায়িত
কমনীয় সমভূমির মাঝে বৈকাল হ্রদের মতো প্রশান্ত জলাশয়ের মাঝে-মাঝে নিম, মহানিম, বট, অশ্বথ, অশোক ইত্যাদি বৃক্ষের
সুশীতল ছায়ার বিস্তার। সব ধর্মের প্রভুরা তাদের মহামহিম ধর্মের ভয়াবহ
সাম্রাজ্যবিস্তারে যারা অকারণে অস্বেচ্ছায় শহীদ হয়েছে বা হবে তাদের জ্বলন্ত আত্মার
ক্রোধ নিবারণের জন্য এই আন্দামান তৈরি করেছেন।
প্রবেশদ্বারটিও স্থাপত্যবিদ্যার
কোন দার্শনিক মনীষীর অবদান মনে হয়। দেখলেই বুদ্ধের মন্ত্র জেগে ওঠে মনে।
প্রবেশদ্বার থেকে কতদূর বিস্তৃত তা শুধু ইতিহাস বলতে পারে, তবে আপাতত সাম্প্রতিকতম ব্যক্তি দীপু দাস নিরাসক্ত
নির্বিকার হয়ে একটু একটু করে বুধোস্থানের ভিতরে ঢুকছেন। স্বাগত বা অস্বাগত জানানোর
জন্য প্রবেশদ্বারে কেউ ছিল না। আশেপাশে আবছা কিছু প্রতিমূর্তি দেখা গেলেও প্রায়
বছরখানেক দূরত্বে গিয়ে দীপু প্রথম কন্ঠস্বর শুনতে পেল। এখানে বলা দরকার বুধোস্থানে
দূরত্ব মাপা হয় সময়ের একক দিয়ে।
-আরে শোনো, শোনো, তুমি কখন কোথা থেকে উদয় হলে বাবাজীবন, একা থেকে থেকে আমার শুধুই মনে হয়, সবই তো ভাল, কেবল একটা মন খুলে
কথা বলার লোক পেলেই হয়। তোমার কী নাম গো?
দীপুর মনে হচ্ছে কীরকম একটা
স্বপ্নের মধ্যে সে আছে। নিজেকে চিমটি কেটে বুঝতে চাইছে, কিন্তু হাত শরীর কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না। এই লোকটার ডাকে
একটু স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে মনে হল। কিন্তু ঘোর কাটে না।
-কী গো এতক্ষণ ধরে ডাকছি,
সাড়া
দাও না কেন? তুমি কি বোবা, কিন্তু এখানে তো বোবাদেরও কথা ফোটে, সবার সব খামতি পূরণ হয়ে যায়। অ বুঝেছি, প্রথমটা আমারও এমন হয়েছিল, মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি, একটু পরেই স্বপ্ন
ভেঙে আবার পরিবারের সাথে থাকব। না গো,
সে আর
হওয়ার নয়, তবে এ দুঃখ তোমার এখনই চলে
যাবে। এখানে দুঃখ, আনন্দ, অনুভূতি কিছুই নাই,
শুধু কী আর আমি আজ
পর্যন্ত বলতে পারি নাই।
বেশ কিছুক্ষণ ভেবে অবশেষে,
-আমার নাম দীপু
-তোমার?
-সে বলছি, আগে তোমার কথাটা একটু
শুনে নিই। তুমি কোন দেশ থেকে আসছ গো?
-আমি?
অনেকক্ষণ মাথা চুলকানোর পর
বলে,
-অ, মনে পড়েছে, বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আমি থাকতাম। একটা পোশাকের কারখানায়
কাজের জন্য আমি গ্রাম থেকে দূরে কারখানার কাছে ভাড়া থাকতাম। আমার রুপসী বৌ ও তিন
বছরের ছেলে গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে থাকত। সপ্তাহ শেষে বাড়ি গেলে
ছেলের যে কী নাচ, কী আনন্দ তা তুমি যদি দেখতে। আরে ছেলের জন্য যে নতুন জামাপ্যান্ট আর ছড়াছবির বই
কিনেছিলাম, সেগুলো কোথায় গেল? এই তো, এই সপ্তাহেই বাড়ি যাব
বলে সব কিনে রেখেছিলাম ! ও ভাই তুমি দেখেছ কিনা বল না। তুমি বুঝি ইয়ার্কি করে
লুকিয়ে রেখেছ?
-না ভাই, সব কিছু নিয়ে তো
ইয়ার্কি হয় না। তুমি একটু সামলাও ভাই। তবে এ আর কতক্ষণ? কিছুক্ষণ পরেই তুমি বুধোস্থানের অঙ্গ হয়ে যাবে। আর তোমার
দুঃখ থাকবে না।
-কী বলছ তুমি? টুকাইকে আমি আর দেখতে
পাব না? আর রুপালী, আমার আদুরে বৌ, সে তো আমাকে ছাড়া কেঁদে-কেঁদেই মরে যাবে।
সাবিরের একটা অসহায়
দীর্ঘশ্বাস বেরোনোর থাকলেও আজ অনেকদিন সে বুধোস্থানের সদস্য, নির্বিকার, নিরাসক্ত মানুষ।
-তা তুমি, মরলে কী করে?
-আর বলো না, একসাথে আমরা পাঁচজন
কাজ করতাম। খুব ভাব-ভালবাসা ছিল। আমি যে হিন্দু ওরা মুসলমান এ ভাবনা কোনদিন আসেনি।
ভাব, ইয়ার্কি, ঝগড়া সব চলত, তবু কেউ না থাকলেই অন্যদের
এত ফাঁকা লাগত, তা বলার নয়। একে অপরকে কাটা, গোটা সব বললেও মনের মিল ছিল খুব। তা সেদিন ধম্মো নিয়ে খুব
তর্ক চলছিল, ওরা কৃষ্ণের নামে লম্পট
চরিত্রহীন, অনেককিছু বলছিল, তো আমারও মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, তোদের উনি বুঝি ধোয়া তুলসীপাতা। ওমনি চারজনে কী রেগে গিয়ে
বলল, 'চোপরাও বেয়াদব কাফের, আর একটা কিছু উচ্চারণ করলে তোমার জিভ টেনে ছিড়ে দেবো। আর
তখনই চারজনে কাজ ছেড়ে চলে গেল। আমি একাই ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরলাম। ঠান্ডায়
তাড়াতাড়ি খেয়ে সবে শুতে যাব, এমন সময় কী ভয়ংকর
চিৎকার করতে করতে শয়ে শয়ে লোক আমার ঘর ঘিরে ফেলেছে, দরজা ভেঙে আমাকে ওরা টানতে টানতে নিয়ে গেল সামনের মাঠে, উফ্! কী বীভৎস মারছে আমাকে, তারপর আর কিছু জানি না।
-তা তোমার নাম কী ভাই? এটা কোথায় এসেছি?
-এর নাম বুধোস্থান। ধর্মযুদ্ধের অস্বেচ্ছার শহীদদের পরলোক, আমার নাম
সাবির হোসেন। তোমার মতোই আমিও এক ভয়ংকর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার শিকার। আমার বাড়ি
ভারতের হরিয়ানায়। বড় রাস্তার ধারে একটা বড় ধাবা ছিল আমার। জাতে মুসলিম হলেও খাসি
আর চিকেন ছাড়া অন্য মাংস বিক্রি করতাম না, সব ড্রাইভার খালাসিদের খদ্দের হিসেবে পাওয়ার জন্য। রান্নাঘরে রেওয়াজি খাসির বড়
বড় কোমর সমেত ঠ্যাং পড়ে থাকত। হঠাৎ একদিন বিরাট গুজব ছড়িয়ে গেল আমি নাকি বিফ
খাওয়াচ্ছি হিন্দুদের। শয়ে শয়ে গোরক্ষক দলের সদস্যরা আমাকে তাড়া করল, অনেক ছুটেছিলাম কিন্তু শেষপর্যন্ত আমার অবস্থা তোমার মতোই
হল। কে জানে আমার চার বছরের ফুটফুটে আয়েশা মা এখন কেমন আছে?
উপসংহারঃ—
পরলোকে ঈশ্বর, আল্লাহ, জিশু, যিহোবা, কামি প্রমুখেরা এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসেছেন।
বুধোস্থানের প্রভূত সম্প্রসারণের প্রয়োজন। স্বর্গ-নরক সংকুচিত করে বিশালাকার
বুধোস্থান গড়ে তুলতে হবে। পৃথিবীর বড় দুর্দিন, এক অঘোষিত ছদ্মবেশী ধর্মযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যার শিকার হবে অগণিত নিরীহ
স্বল্পবুদ্ধির মানুষ।
ভালো লাগল পড়ে ।
ReplyDeleteঅনেক অনেক ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন
Delete