প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নবান্ন | আমরা ভাল, ওরা খারাপ

  বাতায়ন/নবান্ন/ সম্পাদকীয় /৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ ,   ১৪৩২ নবান্ন | সম্পাদকীয়   আমরা ভাল, ওরা খারাপ "স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বাংলা ...

Thursday, January 1, 2026

পিন ভ্যালির গল্প | ডঃ শেষাদ্রি শেখর ভট্টাচার্য

বাতায়ন/নবান্ন/ভ্রমণ/৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন | ভ্রমণ
ডঃ শেষাদ্রি শেখর ভট্টাচার্য
 
পিন ভ্যালির গল্প

"প্রথমে রুমি তার পরিবারের কথা জানতে চাইলে সে বলেতার সঙ্গে থাকেন বাবা-মাদাদা-বৌদি ও তাদের দুই ছেলেমেয়ে। সে নিজে তখনও পর্যন্ত বিয়ে করেনি।"

 
আজও বেশ ঘটনাবহুল দিন। সকালে কাজা থেকে বেরিয়ে প্রথমে দেখেছিলাম স্পিতি ভ্যালির বৃহত্তম মঠ, কি মনাস্ট্রি। সেখানে অনেকটা সময় কাটিয়ে, দুপুরবেলায় গিয়েছিলাম এশিয়ার উচ্চতম (১৩,৫৯৬ ফুট) সেতু, চিচাম ব্রিজ। তারপর, লাঞ্চ সেরে চলেছি স্বপ্নের পিন ভ্যালি।

রুক্ষ, শুষ্ক, ক্ষয়প্রাপ্ত পর্বত, পিন ভ্যালি
 
স্পিতি ভ্যালির রুক্ষ পাহাড়ের এক আকর্ষণীয় সৌন্দর্য আছে। দুপুর ৩টের পরে লিডাং ব্রিজ পার হলাম। এবার রাস্তা সরু এবং খারাপ। অসাধারণ পথের দৃশ্য- এক পাশে পাহাড় যার নীচে সবুজের ছোঁয়া, মাঝে স্পিতি নদী এবং অন্য পাশে নদীতীরে হাল্কা জঙ্গল। আরও মিনিট দশ পরে এনএইচ-৫০৫ থেকে বাঁ দিকের রাস্তায় এসে ‘আত্তারগো সেতু’-তে পৌঁছলাম। এই সেতু পার হতেই আমরা প্রবেশ করলাম পিন ভ্যালি-তে। ঘড়িতে তখন দুপুর সোয়া ৩টে।
 
পিন নদী, পিন ভ্যালি

এই আত্তারগো সেতু স্পিতি ভ্যালিতে অবস্থিত একটা সাসপেনশন ব্রিজ যা পিন ভ্যালিকে যুক্ত করেছে স্পিতি ভ্যালির সঙ্গে। অতীতের ‘সাসপেনশন ব্রিজ’ আজ আধুনিক ‘বেইলে ব্রিজ’-এ রূপান্তরিত হয়েছে। পিন ভ্যালিতে যেতে হলে পর্যটকদের কাছে ওই ব্রিজ এক গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র। ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই ব্রিজের মাধ্যমেই ভঙ্গুর পথে ব্রিটিশরা কুলু ও পিন ভ্যালিতে যেতে পারত এবং সেটা স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য ব্যবসা ও পরিবহনের সুবিধে করে দিয়েছিল। তাই ‘আত্তারগো সেতু’ এক ঐতিহাসিক পরিচয়ের প্রতীক যা দুই ভ্যালির ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে এক যোগসূত্র।
পিন নদীর তীরে গাছপালা ও ঘরবাড়ি
 
পিন ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক একটি জাতীয় উদ্যান যা হিমাচল প্রদেশে লাহুল ও স্পিতি জেলার স্পিতি ভ্যালি এবং কিন্নৌর জেলার ভাবা ভ্যালিতে অবস্থিত। এই ভ্যালি হিমালয়ের শীতল মরুভূমি (বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ)-র অংশ। ধনকর মনাস্ট্রির দক্ষিণে, তিব্বত সীমান্তের কাছ থেকে কিন্নৌর জেলার ভাবা ভ্যালি পর্যন্ত বিস্তৃত এই জাতীয় উদ্যান পূর্বের বিচ্ছিন্ন তিন জেলা লাহুল, স্পিতি এবং কিন্নৌরের মধ্যে সীমা নির্দেশ করে। এই পার্কের উচ্চতা ‘কা ডোগরি’-র কাছে ৩৫০০ মিটার (১১,৫০০ ফুট) থেকে উচ্চতম স্থানে ৬০০০ মিটারের (২০,০০০ ফুট) বেশি পর্যন্ত। বরফে ঢাকা উঁচু জায়গা ও ঢালু জমি সহ ওই পার্ক তুষার চিতা, সাইবেরিয়ান আইবেক্স, হিমালয়ান নীল মেষ, লাল শিয়াল সহ বেশ কিছু বিপন্ন প্রাণীর স্বাভাবিক বাসস্থান।
পিন ভ্যালির প্রবেশ দ্বার
 
কয়েক মিনিট পরেই পিন ভ্যালির বিরাট প্রবেশদ্বারে আমাদের জন্য স্বাগত বার্তা ‘ওয়েলকাম টু পিন ভ্যালি’ চোখে পড়ল। ভঙ্গুর পথের বাঁ পাশে বয়ে যাচ্ছে পিন নদী, আর ডান পাশে সুউচ্চ, রুক্ষ হিমালয়। স্পিতি ভ্যালিতে আসার পর থেকেই ইচ্ছে ছিল ওই অনুপম ‘পিন ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক’ দেখার – কিছুক্ষণ আগেই সেই ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছে। আমাদের ট্রাভেলার ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। পথের বাঁ পাশে দেখছি এক ক্ষয়প্রাপ্ত রুক্ষ পাহাড় যার সূচাকৃতি চূড়া মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। তার পাশেই স্পিতির উপনদী, পিন নদী যেন কথা বলতে বলতে বয়ে চলেছে। পরিষ্কার, নীল আকাশের নীচে নদীর দু’পাশেই রুক্ষ, বাদামি পাহাড়ের ঢাল নেমে এসেছে। নদী এবার আরও চওড়া হয়েছে। কয়েকটি সবুজ গাছ দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে–- কয়েকটা একতলা, ঘরবাড়িও রয়েছে সেখানে। আমাদের গাড়ি আরও কিছুটা এগিয়ে থেমে গেল এক হোর্ডিং-এর পাশে। ডিএফও, ওয়াইল্ড লাইফ স্পিতি-র সতর্ক বার্তা, পিন ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কে ‘কী করা উচিত, কী অনুচিত’ সম্পর্কে।
পাহাড়ের নীচে, পিন নদীর উপর সেতু
 
পিন ভ্যালির রূপে আমরা মোহিত হয়ে গিয়েছি। পিন নদী আরও কিছুটা বয়ে এসে আত্তারগো ব্রিজের কাছে স্পিতি নদীতে গিয়ে মিশেছে। আমাদের গাড়ি আরও একটু এগিয়ে একটা ব্রিজের কাছে এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে আমরা ব্রিজ পেরিয়ে নদীর অন্য পাড়ে গেলাম। ফিরে আসার পথে ব্রিজ থেকে পিন নদী ও দু’পাশে পাহাড়ের দৃশ্য দেখে একবারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলাম। ওই ব্রিজের পাশেই এক ছোট দোকান। সেখানে বসে আমরা কফির অর্ডার দিলাম। আর আমি পাশে বসে দোকানের মালিক পদমা-র বলে যাওয়া গল্প শুনতে লাগলাম।
অপরূপ পিন ভ্যালি
 
প্রথমে রুমি তার পরিবারের কথা জানতে চাইলে সে বলে, তার সঙ্গে থাকেন বাবা-মা, দাদা-বৌদি ও তাদের দুই ছেলেমেয়ে। সে নিজে তখনও পর্যন্ত বিয়ে করেনি। এবার সুমি তাকে জিজ্ঞাসা করে গ্রামবাসীদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে। উত্তরে পদ্মা জানায়, গ্রামের ৮০ শতাংশ কর্মক্ষম অধিবাসী সরকারি কাজে যুক্ত। সেই সরকারি কাজ প্রধানত সড়ক নির্মাণ এবং বন-সৃজন। বাকি ২০ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজে যুক্ত। গ্রামের ক্ষেতে প্রধানত মটর, আলু ও শাক চাষ করা হয়। প্রায় সব ঘরেই গবাদি পশু আছে। শেষে পারমিতা গ্রামের অধিবাসীদের ধর্ম সম্বন্ধে জানতে চাইলে সে বলে, গ্রামের সকলেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। পদ্মা এবার নিজে থেকেই জানায়, গ্রামে আছে দুটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। কফি পানের পর আমাদের দেওায়া হল স্থানীয় খাবার গরম ‘আলুফালি’ যা খেতে সিঙারার মতো, আর দেখতে চন্দ্রপুলির মতো। এরপর আমাদের সঙ্গে বাইরে এসে পদ্মা দেখায়, পাহাড়ের ঢালে তৃণভূমিতে গ্রামের গবাদি পশুগুলো কেমন চড়ে বেড়াচ্ছে।
 
আমরা ফিরে এলাম গাড়িতে। অপরূপ পিন ভ্যালিকে বিদায় জানিয়ে আমরা ফিরে চললাম কাজায়। ফেরার পথে দেখছিলাম, ‘প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা’-র মাধ্যমে রাস্তা তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। আগামী দিনে যারা বেড়াতে আসবে পিন ভ্যালিতে, তারা অপেক্ষাকৃত ভাল রাস্তা পাবে। আমরা কাজার হোটেলে ফিরে এলাম সন্ধে সাড়ে ৬টায়।
 
~~০০~~

No comments:

Post a Comment

২০২৬-এর নতুন সূর্য


Popular Top 10 (Last 7 days)