বাতায়ন/ধারাবাহিক
গল্প/৩য় বর্ষ/৩৭তম সংখ্যা/২৫শে পৌষ, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
রুবি
রায়
[২য় পর্ব]
"এই ঘটনায় তিনি কিছু আশ্চর্য হননি কারণ তিনি বিয়ের পরই বুঝতে পেরেছিলেন যে তার স্বামী একজন চরিত্রহীন বর্বর, তাই বিয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায় ডিভোর্স নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয় তাকে।"
পূর্বানুবৃত্তি অতনুর মনোজগতের
রুবি রায়ের মুখে দোলের দিন আবির মাখাতেই সে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। অতনুও নিজের মুখ বাড়িয়ে
দিল আবির মাখার আকাঙ্ক্ষায়। তারপর…
চিঠিটা পেয়ে
খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল অতনুর, একবার ভাবল যাবে না দিল্লিতে, কলকাতা ইউনিভার্সিটিতেই পড়বে, সেইমতো চিঠিও দিল কিন্তু উত্তর এলো,
‘জীবনে
সুযোগ বারবার আসে না,
আমার জন্য এই সুযোগ ছেড়ে দিলে, আমি নিজেকে নিজেই ক্ষমা করতে পারব না।
আপনার উন্নতি আমার পাথেয় হয়ে থাকবে।’
এরপর আর
যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না, ভেবেছিল মাস্টার্সটা ওখান থেকে করে এসে, পিএইচডি
যাদবপুর থেকে করবে, যা স্টাইপেন্ড পাবে তাই দিয়েই রুবি রায়কে নিয়ে সংসার আরম্ভ করবে। এরপর তার মাস্টার্সের ফাইনাল ইয়ারে এসে সে জানতে পারে তার বিয়ে হয়ে গেছে। ও নাকি
অনেক চেষ্টা করেছিল,
বাবাকে বলেও ছিল যে,
‘বাবা আমার রেজাল্ট তো বেশ ভাল হয়েছে, কলেজের প্রফেসররা বলছেন, এখনি বিয়ে
কেন! এমএ পড়বে না?’ কিন্তু তার
বাবা বলেছিলেন, ‘মা, আমারও তো
ইচ্ছে ছিল যে তোমাকে আরও পড়াই, পড়াতামও যদি আমার আর তোমার মায়ের শরীর ভাল থাকত, আমরা দুজনেই
হার্টের পেসেন্ট, তাছাড়া
রিটায়ারমেন্টেরও সময় হয়ে এসেছে তাই আর রিস্ক নিতে পারছি না, আমার কিছু
হয়ে গেলে তো তোমার মা অসুস্থ শরীর নিয়ে সবদিক সামাল দিতে পারবে না। তাছাড়া তোমার
যেখানে বিয়ে দিচ্ছি তারা আমায় কথা দিয়েছে যে তোমাকে পড়াবে, আর ওরা না পড়ালেও আমি কথা দিচ্ছি আমি তোমায় পড়িয়ে যাব।’ এরপর আর সে
কিছু বলতে পারেনি।
বিয়ের দিন
টুটুকে জড়িয়ে ধরে ভীষণ কেঁদেছিল, আর বলেছিল, তাকে বলে
দিস, তার
রুবি রায় কতটা অক্ষম,
কিন্তু কোনদিনই সে আমার মন থেকে মুছে যাবে না, আমার প্রথম ভালবাসার ফুলটা যা অসময়ে
ঝরে গেল, সেই
ঝরা ফুলের পাপড়িগুলো আমি চিরকাল বুকে আঁকড়ে রেখে দেব।
অতনু আর
তারপর কলকাতায় ফিরে আসেনি,
পিএইচডি কমপ্লিট করে জেএনইউয়ের প্রফেসর হয়েছে। অনেকদিন পর কলকাতায় এসে শুনেছিল
ওর বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। বাবা-মাও মেয়ের সাথে এই
প্রবঞ্চনা মেনে নিতে না পেরে এক বছরের মধ্যে দুজনেই মারা যান হার্ট অ্যাটাকে। ওর
স্বামী নাকি খুবই দুশ্চরিত্র ছিল, ও বেরিয়ে
এসে পৈতৃক বাড়ি বিক্রি করে স্বাধীন ভাবে একটা স্কুলে কাজ নিয়ে আছে আর লেখালিখি করে
গানও গায়। টুটুর সাথে দেখা হবার পর ম্লান হেসে বলেছিল বেশ আছি এখন সেও প্রায় ১৮/১৯
বছর আগে। তারপর তার আর কোন খবর জানেনি।
আজ এই
পুরানো গাছতলাটায় এসে অতনুর চোখে জল এসে গেল, কোথায় আছে সে, কেমন আছে!
সে কি জানে আমিও ঘরভাঙা এক পথিক হয়ে আছি, হয়তো আমার মনে তুমি আছ বলেই আর কাউকে
মন দিতে পারিনি, ঘর
বেঁধেও ঘরটা তাই ভেঙে গেছে।
পাড়ায় ঢুকতে
টুটুর সাথে দেখা, টুটু
তার চিরাচরিত স্বভাবের উল্লসিত হয়ে উঠল,
-অতনুদা
তুমি!
-হ্যাঁ রে এ
পাড়ায় একটা কাজে এসেছিলাম।
-জানি কাজ
ছাড়া তো তুমি এখানে আসবে না।
-দূর পাগলি, তুই এখনও
একইরকম আছিস।
-তারপর তোর কী খবর বল? তুই তো
ডাক্তার হয়েছিস এখন।
-হ্যাঁ গো, আমার আর কী খবর হবে,
এই ছেলে নিয়ে এখানেই থাকি।
-মানে! তোরও
কি…
-না অতনুদা
আমার বর খুব ভাল ছিলেন,
তাই বোধহয় কপালে সইল না। একদিন হঠাৎ বুকে ব্যথা বলতে বলতে
আমার কোলের ওপরই ঢলে পড়ল, কিছু সুযোগ দিল না আমাকে।
-কতদিন হল?
-প্রায় দশ
বছর কেটে গেল দেখতে দেখতে।
অতনু কিছু
বলতে পারল না, কেউ
সুখ পায় না, কেউ
সুখী হয়েও হারিয়ে ফেলে ভালবাসার মানুষটাকে।
-আচ্ছা অতনুদা আজ খবরের কাগজে একটা খবর বেরিয়েছে, তুমি দেখেছ
নাকি?
-কী বলতো?
-পরিচারিকাকে
রেপ করার জন্য শহরের নামকরা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের দশ
বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
-হ্যাঁ
পড়েছিলাম।
-আবার সেই খবরে এইকথাও লেখা ছিল যে, তার প্রাক্তন স্ত্রী শ্রীমতী অনুমিতা
মুখার্জি কোর্টে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন যে, এই ঘটনায়
তিনি কিছু আশ্চর্য হননি কারণ তিনি বিয়ের পরই বুঝতে পেরেছিলেন যে তার স্বামী একজন
চরিত্রহীন বর্বর,
তাই বিয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায় ডিভোর্স নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয় তাকে।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment