বাতায়ন/ধারাবাহিক
উপন্যাস/৩য় বর্ষ/৩৭তম সংখ্যা/২৫শে পৌষ, ১৪৩২
ধারাবাহিক উপন্যাস
অজয় দেবনাথ
মউ
[১৬তম পর্ব]
"এখুনি আত্মহত্যা করবে লেকের জলে ঝাঁপ দিয়ে, অথবা বাড়ি ফিরে ছুরি দিয়ে হাতের শিরা কেটে। কী করবে কিছুই যেন ঠিক করে বুঝে উঠতে পারে না। নিষ্ফল ক্রোধে আত্মহারা শুভ্রা উদ্ভ্রান্তের মতো মিলিয়ে গেল সন্ধ্যা-রাত্রের কলকাতার রাস্তায়।"
পূর্বানুবৃত্তি মউয়ের গানে সুযোগ পাওয়ার খবরে
নাটকের মেয়ে হাত ছাড়া হবে ভেবে সুখ গম্ভীর হয়ে যায়। মউ ভাবে সুখ নিশ্চয়ই মনে মনে তার
প্রেমে পড়েছে। তারপর…
চুমু বোধহয় ছোঁয়াচে ভাইরাস, বৈজ্ঞানিকেরা এ বিষয়ে নজর দেননি নিশ্চয়ই। নইলে সংসারের
ঝঞ্ঝাটহীন তিন বছরের অলিখিত খাঁটি বাঙালি দম্পতি অমন সকলের সামনে গভীরভাবে চুমু
খেতে যাবেই-বা কেন! যাইহোক, প্রকৃতির সঙ্গে
পাল্লা দিয়ে তারা হাওয়ায় হাওয়ায় মিশে গেল।
গাছের ছায়ায় কোনও কোনও জায়গায় সোনা
রোদের টুকরো ঝিলিক, তার সঙ্গে মনকেমন করা
হাওয়ায় কেউই কাউকে ছাড়তে পারছিল না সেদিন। ধীরে ধীরে সূর্য ঢলে পড়ল পশ্চিমে তার
অস্তরাগের মায়ায় রাঙিয়ে দিতে। শুভ্রা তখন সুখের কাঁধে মাথা রেখে সুখের বুকের
পুরুষালি পশমে সোহাগে বিলি কাটতে কাটতে বলল,
-আজ, আমি তোমাকে একটা
দারুণ মিষ্টি খবর দেব।
-কী এমন মিষ্টি খবর যার জন্য শুভ্রাদেবী কলেজ থেকে ভূমিকা
করছেন!
-আন্দাজ করো।
-আন্দাজ তো আমি করি না।
শুভ্রা চোখ বড় বড় করে মিচকে
মিচকে হাসতে হাসতে জানতে চাইল,
-একদম প্রথমে তোমাকে কলেজে লাল টুকটুকে একটা গোলাপ দিয়ে কী
বলেছিলাম মনে আছে?
-হ্যাঁ… রোজ-ডের অগ্রিম শুভেচ্ছা। কিন্তু এতদিনে তো অনেক
বসন্ত পার হয়ে গেছে।
শুভ্রা ফিশফিশ করে বলল,
-অনেক বসন্ত পার হয়ে গেলেও তুমি কি কিছু পাওনি?
সুখও মিচকে মিচকে হাসতে হাসতে
তার বাঁহাত শুভ্রার পিঠে রেখে আর ডানহাত দিয়ে তার থুতনি ধরে বলল,
-হুঁ… তা পেয়েছি। কিন্তু তার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক!
শুভ্রা সুখের নাকটা টিপে আদর
করে বলল,
-আগামী ভ্যালেন্টাইন্স-ডে চোদ্দোই ফেব্রুয়ারি আমার বিয়ে।
-তাই! কার সঙ্গে!
-আছে একজন, তার সঙ্গে। কিন্তু
তোমাকে বলা যাবে না।
-তা এত দেরি কেন! শিগগির শিগগির করে নেওয়াই ভাল। শুভস্য
শীঘ্রম!
-অ্যাই… তুমি তোমার মাকে জানিয়েছ?
-জানাব, এত তাড়া কীসের! সবে
তো এমএ ফার্স্ট-ইয়ার। আগে এমএ কমপ্লিট হোক,
তারপর
পিএইচডি, কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে একটা
চাকরি, তারপর তো বিয়ে। এক্ষুনি বিয়ে
করলে ফুটুর ডুম।
শুভ্রা হাওয়া বেরোনো বেলুনের
মতো চুপসে গেল, মন ভেঙে গেল তার। তবুও জেদ
করে, ছিঁচকাঁদুনে বাচ্চাদের মতো
আবদারের সুরে বলল,
-নাআআআ… আমি বাড়িতে কথা বলেছি।
-কথা বলেছ তো কী হয়েছে! সে তো ভালই, বরং নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এখন দুজনেই আগে নিজের নিজের পায়ে
দাঁড়িয়ে তারপর এসব ভাবা যাবে। তাছাড়া বিয়ে করলে যা পাওয়া যাবে, তার কিছু এখনও বাকি আছে নাকি! সবই তো বেশ চলছে।
-আমি আর দেরি করতে পারব না, করব না দেরি। আমারও ইচ্ছার একটা মূল্য থাকা উচিত।
-তোমার কোন্ ইচ্ছার মূল্য দেওয়া হয় না!
-আমি অতশত জানি না,
তুমি
বাড়িতে মায়ের সঙ্গে কথা বলবে, তোমার মাকে আমার
বাবা-মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে ব্যস।
সুখ দেখল আর কথা বাড়িয়ে লাভ
নেই এখন, তার থেকে বরং ওঠা যাক।
শুভ্রার কাছে জানতে চাইল,
-তুমি কি বাড়ি যাবে এখন? তবে ওঠা যেতে পারে।
-আমি বাড়ি যাব না।
-কোথায় যাবে তবে!
শুভ্রা রাগ করে জেদের সঙ্গে
এক নিঃশ্বাসে বলল,
-আমি এখন ক্লাবে যাব,
পার্টি
করব, ডান্স করব, হুল্লোড় করব, কারোর কোনো আপত্তি
আছে?
সুখ শান্ত ভাবে বলল,
-না আপত্তি থাকবে কেন! তবে আমাকে এখন হস্টেলে যেতে হবে পড়া
আছে। তোমাকে কি পৌঁছে দেব?
-আপাতত দরকার নেই। আমি একলাই যেতে পারি। বরং ভাল ছেলে তার
হস্টেলে যাক, পড়ার ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
অমন রোমান্টিক পরিবেশ
মুহূর্তেই বদলে বিস্বাদ হয়ে গেল। মন পাগল করা পাগল হাওয়া বিষের মতো মনে হতে লাগল
শুভ্রার। তার মনে হতে লাগল এখুনি আত্মহত্যা করবে লেকের জলে ঝাঁপ দিয়ে, অথবা বাড়ি ফিরে ছুরি দিয়ে হাতের শিরা কেটে। কী করবে কিছুই
যেন ঠিক করে বুঝে উঠতে পারে না। নিষ্ফল ক্রোধে আত্মহারা শুভ্রা উদ্ভ্রান্তের মতো
মিলিয়ে গেল সন্ধ্যা-রাত্রের কলকাতার রাস্তায়।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment