বাতায়ন/আতঙ্ক/হলদে খাম/৪র্থ বর্ষ/২য়
সংখ্যা/১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | হলদে
খাম
পাপড়ি চ্যাটার্জি
আবিরকে তটিনী
"আমি তার নাগাল পাইনি কোনোকালেই। তাই আগের চিঠিগুলিতে করা আপনার যাবতীয় সহৃদয় দাবিগুলো অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পূর্ণ করতে পারিনি এযাবৎ। এর জন্য লজ্জাবোধ যে একবারেই নেই তা অবশ্য ভাববেন না যেন।"
আবির,
মধ্যযাম অতিক্রান্ত হয়নি
এখনো। বোধকরি, রাতের অনেকখানিই বাকি। লিখতে
বসলাম আপনাকে। চারদিকের এই রাত্রিকালীন নৈঃশব্দ্য আমায় আমার অন্তরের কাছে অবশেষে
মনোযোগী হতে সাহায্য করে - তাই এই সময়ে লিখতে বসা। বাইরের বেলিফুলের গাছটায় এই
বৈশাখে ফুলে ফুলে ভরে গেছে জানেন... সেই মনোরম সুবাস আমায় ঘিরে রেখেছে এখন। আর
আমি সেই সুবাসিত তরঙ্গের আবেশ জড়িয়ে আপনার সাথে আলাপচারিতায় মগ্ন হচ্ছি... অনতিদূরেই
বারান্দায় ঝোলানো বাতাস ঘন্টা (wind
chime) থেকে জলতরঙ্গের মতো শব্দ ভেসে আসছে।
লিখতে বসে বুঝলাম ইতিমধ্যে
অনেকখানি সময় বয়ে গেছে, কিন্তু কত কথাই না
বাকি রয়ে গেল, বলা হলো না আর আমার। কারণটা হল 'সময়' যা মধ্যে মধ্যে বড়ই
বেইমানি করে। অন্তত আমি তার নাগাল পাইনি কোনোকালেই। তাই আগের চিঠিগুলিতে করা আপনার
যাবতীয় সহৃদয় দাবিগুলো অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পূর্ণ করতে পারিনি এযাবৎ। এর জন্য
লজ্জাবোধ যে একবারেই নেই তা অবশ্য ভাববেন না যেন।
আমার এই প্রাত্যহিক নিশিযাপন
নিয়ে আপনি ইতিমধ্যে অনেক কৌতূহল ও কৌতুক নির্দেশক প্রশ্ন করেছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমার
কাজের কথা জানালেও কখনো সে কথা বিশ্বাস করেছেন বলে আমার মনে তো হয় না। আপনার
ঠাট্টার জবাবে অনেকবার বলেছি আমার চূড়ান্ত দায়িত্বপূর্ণ জীবন কিংবা অপরিসীম কাজের কথা... সম্পূর্ণটা উপলব্ধি
করেছেন বলে তো মনে হয় না। তাই আজ ভাবলাম আপনাকে আমার এই রাত্রিকালীন যাপনের
একটুকরো অভিজ্ঞতার কথা জানাই... জেনে অন্তত এইটুকু বুঝবেন আমার কতখানি চাপ থাকলে
এই ঘটনার পরেও আমি নিশিযাপন করে যাই। শত ইচ্ছা থাকলেও যে কেবলমাত্র কাজের বোঝার
জন্যই অবিরাম কাজ করে যাই এবং তাই আমি আপনার সকল পত্রের উত্তর দিতে পারি না, সেটুকু অন্তত বুঝবেন।
আমাদের এই বাড়িটা- 'সবুজ বাসা', উত্তর কলকাতার পুরোনো
পাড়ায় হলেও খুব ঘিঞ্জি নয়। নামের সঙ্গে মিল রেখে বাড়ির চারপাশে বেশ খানিকটা
জায়গা ছড়ানো রয়েছে যেখানে গাছে এবং আগাছায় মিলেমিশে সারা বছরই হরেকরকমের সবুজ
হয়ে থাকে। সেখানে অনেক রকমের জানা-অজানা গাছ রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে অনেক ফুলের
গাছ। বছরের বিভিন্ন সময়ে তারা তাদের সুবাসে আমাদের বাড়ির বাসিন্দাদের আমোদিত করে
আসছে দীর্ঘকাল। যেমন এইমাত্র জানিয়েছি বেলিফুল গাছের কথা। তেমনই রয়েছে
রজনীগন্ধা, আকাশমনি, গন্ধরাজ, স্থল পদ্ম, জুঁই প্রভৃতি। আমাদের বাড়ির সামনে একটা ছোট লন। তার দুপাশে
ছোট ছোট গুল্মজাতীয় গাছ আর সামনের প্রধান লোহার ফটকের দুপাশে মাধবীলতার ঘন ঝাড়।
আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এই মাধবীলতার গাছ ওখানে ছিল না। তার বদলে ছিল একটা নাম না
জানা ফুলের গাছ। সেই গাছে সারা বছরই ফুটে থাকত নীল রং-এর তারার মতো দেখতে থোকা থোকা ফুল। আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে
বাড়িটি ক্রয় করেছিলেন আমার ঠাকুরদা। শুনেছিলাম ওই নীল ফুল গাছটি সামনের বাড়ির
নীলিমা-জেঠি তার বাপের বাড়ির বাগান থেকে এনে লাগিয়েছিলেন।
আমাদের বাড়ির উল্টো দিকে একটা পুরনো বাড়িতে নীলিমা-জেঠিমারা
থাকতেন। মায়ের সঙ্গে খুব ভাব ছিল তাঁর। যদিও পাড়ায় তিনি আর কারোর সঙ্গে মিশতেন
না বিশেষ। কারণটা ঠিক ছোট বেলায় না বুঝলেও বড় হয়ে বুঝেছিলাম। জেঠি ছিলেন আসলে
জনমদুখিনী। বাপের বাড়িতে মা-মরা একমাত্র মেয়ে ছিলেন তিনি। গরিব বাবার ঘরে ছোট থেকেই কঠোর পরিশ্রম করেছেন। মেয়েকে দেখার কেউ নেই দেখে
নিরূপায় বাবা তড়িঘড়ি ব্যাঙ্কে কর্মরত রায়বাড়ির বড় ছেলে
রথীন রায়ের সাথে সম্বন্ধ করে বিয়ে দেন। সুন্দরী নীলিমা-জেঠির
কপালখানা তাঁর রূপের সাথে মানানসই ছিল না মোটেই। তাঁর স্বামী, পাড়ার রথীন-কাকা এমনিতেই ছিলেন নেশাখোর। তার ওপর ছিল
তাঁর অন্য মহিলায় আসক্তি। নিঃসন্তান জেঠিকে প্রায় প্রতি
রাতেই নেশায় চূড় হয়ে এসে অত্যাচার করতেন রথীন-কাকা। তাঁর
মারধোরের চিৎকার আর জেঠির কান্না এবং দিনের বেলায় রথীন-কাকার
মায়ের, জেঠির কাজে পান থেকে চুন খসলেই অবিশ্রাম গালমন্দর
শব্দে পাড়ার লোকেরা দুঃখ পেলেও একসময় প্রায় অভ্যস্ত হয়ে গেছিল। তবে জেঠির
জীবনে আর কিছু না থাকলেও, একটা খুব সুন্দর শখ
ছিল -তা হল গাছের। তাঁর কাছের মানুষগুলো সত্যিকারের কাছের না হলেও তিনি সময় পেলেই
তাঁদের বাড়ির বাগানে গাছ লাগাতেন। এতটুকু সময় পেলেই সেই গাছগুলোর সেবা করতেন, যত্ন করতেন নানা ভাবে। আর এই সূত্রেই আমার মায়ের সাথে তাঁর
সখ্যতা, ঘনিষ্ঠতা। এমনিতে জেঠি খুবই
মুখচোরা। মনেহয় তাঁর জীবনযন্ত্রনার অন্ধকার দিকটির জন্যেও বোধহয় ভারি লজ্জাবোধ
ছিল তাঁর। তাই একটু এড়িয়ে যেতেন সকলকে। কেবল আমার মায়ের সাথে কেমন করে জানি -
বোধকরি এই বৃক্ষ প্রেমের সুবাদেই, তাঁর বেশ আপনজন সুলভ
ঘনিষ্ঠতা জন্মেছিল। এভাবেই কোনমতে কেটে যাচ্ছিল বছরগুলো। আমাদের পাড়া-প্রতিবেশীদের
ঘরের ছেলেমেয়েরা শিশু থেকে কিশোর,
কিশোর
থেকে তরুণ হয়ে গেল। তাদের মধ্যে অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেল। এরকম সময়ে ঘটল একদিন
সেই ভয়ংকর ঘটনা।
সেদিন রাত প্রায় আড়াইটে।
আমি সদ্য শিক্ষিকা পদে বর্তমান বিদ্যালয়ে যোগদান করেছি। বিদ্যালয়ে চলছে বাৎসরিক
পরীক্ষা, সামনেই রেজাল্ট। তাই রাত
জেগে খাতা দেখছি। আমার পড়ার ঘরের জানলা দিয়ে বাইরে দেখা যাচ্ছে শীতের ঘন কুয়াশা
ভরা রাত। একবার যেন মনে হলো জানলার বাইরে একটা খসখস শব্দ। মন দিয়ে খাতা দেখছি, মুখ তুললাম না। আবার হলো শব্দ। মাথা না তুলেই বুঝলাম জানলার
গরাদের ওপাশে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। মাথা তুলতেই চমকে উঠলাম, নীলিমা-জেঠি। পরনে সাদাসিধে করে পরা একটা নীল ফুল
তোলা চওড়া পাড়ের সাদা শাড়ি। মাথায় অন্য সময়ের মতোই ঘোমটা। জেঠির সুন্দর শ্বেত
গোলাপের মতো মুখখানা বেশ ফোলা। মুখের ওপর অনেক জায়গায়
কালশিটের দাগ। বুঝতে বাকি রইল না কিছুই। তবু জিজ্ঞাসা করলাম
জেঠি কী হয়েছে গো, এত রাতে? এবার নজরে পড়ল জেঠির গা-হাতের
জায়গায় জায়গায় মারের চিহ্ন। জেঠির চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল, ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু চোখদুটো অস্বাভাবিক
জ্বলজ্বল করছে কিছু একটা বলে ওঠার তাগিদে। কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। বুঝলাম মাকে
হয়তো কিছু বলতে পারেন, যা আমার সামনে উনি
বলতে পারছেন না। তাঁর পারিবারিক পরিস্থিতি আমি জানতাম। এবার উঠে দাঁড়ালাম আমি।
বললাম দাঁড়াও জেঠি মাকে ডাকছি। মাকে ডেকে নিয়ে পাশের ঘর থেকে এলাম। জানলায় দেখি
কেউ নেই। মা চিন্তিত মুখে বলল "দেখব কাল সকালে খবর নিয়ে, কী জানি এত রাতে কেন এসেছিল নীলিমা। হয়তো আজকে রাতে খেতেও
দেয়নি মানুষটাকে। মানুষ এত পিশাচও হতে পারে।" কোনো কোনো দিন এমনও হতো যে
কপালে মারধর জুটলেও রাতের খাবার দেওয়া হতো না জেঠিকে। মা লুকিয়ে লুকিয়ে অনেক
সময় ডেকে এনে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে খাওয়াত জেঠিকে। আমাদের মন ভারাক্রান্ত
হয়ে গেল। সেদিন অনেক রাত হয়ে গেল আমার শুতে শুতে। পরের দিনটা ছিল রবিবার।
ভেবেছিলাম যেহেতু অনেক রাত হয়ে গেল,
সকালে
একটু দেরি করেই না হয় উঠব। কিন্তু ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে গেল মায়ের ডাকে, "ওঠ মামন,
তাড়াতাড়ি
ওঠ। দেখ তো কী হয়েছে।" নীলিমা-জেঠিদের বাড়ির ভিতর থেকে
ভেসে আসছে কারোর কান্নামিশ্রিত মৃদু গলায় কথোপকথনের আওয়াজ। তাড়াতাড়ি চাদর
গায়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। সেখানে কয়েকজন পাড়া-প্রতিবেশী জড়ো হয়েছেন। সকলের
চোখে এক অব্যক্ত চাপা কষ্ট। এগিয়ে গেলাম আরো ভিতরে। নীলিমা-জেঠির ঘরের মধ্যেটা ফাঁকা। তার পাশে ঘরের দরজায় সামান্য ভিড়, সেখানে ঢুকতেই দেখি
সিলিং থেকে ঝুলছে আলতা পরা দুখানি পা নিয়ে আমাদের জনমদুখিনী নীলিমা-জেঠি। পরনে
সেই নীল পাড় সাদা শাড়ি, মাথায় ঠিক তেমনই অল্প টানা
ঘোমটা। ধবধবে ফর্সা মুখখানায় মারধোরের চিহ্ন, যা আগের দিন মাঝরাতে আমার জানলার ধারে আমার চোখে পড়েছিল। শুধু
জিভটা বেরিয়ে রয়েছে অনেকখানি। ছুটে বেরিয়ে এলাম বাইরে।
শুনলাম সকলে বলাবলি করছে আগের দিন রাতে রথীন-কাকা মারধর একটু
বেশিই করেন। এমনকি যা তিনি করেন না সেটাও করেন - মারধর করে বেরিয়ে চলে যান সে
রাতেই, হয়তো এমন কিছু বলেন জেঠিকে
যেটা ভাগ্যের হাতে মার খেতে খেতে প্রায় মৃত জেঠিকে এমন মৃত্যুর দিকে সম্পূর্ণ
ঠেলে দেয়। ডিসেম্বর মাসের কুয়াশা মাখা আবছা শীতের ভোরের সেই নিদারুণ যন্ত্রণাময়
দৃশ্য আমি বহুদিন ভুলতে পারিনি। কিন্তু,
আসল যে
কথাটা বলতে আজ আমি লিখতে বসেছি সেটা তখনো বুঝিনি। জেঠিমার আত্মহত্যার কয়েকদিন পর
তাঁর মরদেহটির ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলো। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী জেঠির মৃত্যু
হয়েছে রাত সাড়ে এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে। এই সংবাদ পুলিশ মাধ্যমে পাড়ায়
জানাজানি হওয়ার পর থেকেই আমি আর মা যারপরনাই বিস্মিত ও ভীষণ ভীত হয়ে পড়ি। আমি তো স্পষ্ট দেখেছি নীল শাড়ি পরা জেঠিকে, মাকেও রাতেই বলেছিলাম সেকথা। কীভাবে এটা ঘটে? তবে কি আমি ঘুম চোখে পুরো ভুল দেখলাম? এরপর থেকে সত্যি বলতে কী রাত জেগে একা পড়াশোনা বা
অন্যান্য কাজ করতে আমার ভীষণ ভয় লাগত। অনেক দিন একা একা বসে
আর পড়তাম না অত রাত পর্যন্ত। কিছুদিন পর, কাজের চাপ আরও বাড়তে থাকল। সময়ের স্রোতে ভুলতে বসেছি যা কিছু ঘটেছে। পরের
দিন খাতা জমার শেষ তারিখ। বসে খাতা দেখছি একমনে। হঠাৎ সামনের জানলায় সেদিনের মতো খসখস
আওয়াজ। আচমকা ভীষণ ভয়ে শিরদাঁড়া বেয়ে হিমশীতল প্রবাহ।
কাঠের মতো বসে আছি। মুখ তুলতে পারছি না ভয়ে। কেন জানি বেশ
বুঝতে পারছি মুখ তুললেই দেখব নীলিমা-জেঠিকে। এমন স্থানুবত
কতক্ষন ছিলাম জানি না। মা এসে ডাকতে খেয়াল হয়, উঠে পড়ি তাড়াতাড়ি। পরে আমি আর মা দুজনেই উপলব্ধি করি
জেঠি আসতেন ওঁর ধারেকাছে একমাত্র ভরসা,
একমাত্র
ভালবাসা পাওয়ার জায়গায়। জীবনে যে মানুষটি ভালবাসা তো দূরের কথা, সাধারণ ভদ্র মানুষের মতো আচরণটুকু কারোর কাছ থেকে পাননি, তাঁর সেই নূন্যতম ভালবাসা, সমানুভূতি, সহানুভূতি পাবার অপরিতৃপ্ত
ক্ষুধাটুকু তাঁকে বারবার এনে দাঁড় করাত আমাদের বাড়ির দরজায়, দু-একবার অমন খসখস আওয়াজ আমার মা রান্নাঘরের সামনেও শুনেছেন।
যদিও মা আমার মতো ভয় পাননি। বরং বোনের মতো ভালবেসে যাকে
কাছে টেনেছিলেন, তার জন্য তিনি কেঁদে
ফেলতেন বারবার। আমিও আমার ভয়-ভাবনা তাড়িয়ে আস্তে আস্তে আবার নিশিযাপনে অভ্যস্ত
হয়ে উঠি কাজের চাপে।
যাইহোক, অনেক তো হল আমার গল্প। তটিনী তার বয়ে চলা জীবনের কথকতা
শোনাল আজ। আপনিও কিন্তু কথা দিয়েছিলেন,
আপনার
অভিজ্ঞতার গল্প শোনাবেন। সেই অপেক্ষাতেই রইলাম।
—তটিনী
পুনশ্চঃ একটা কথা বলতে ভুলে
গেছি। জেঠি মারা যাবার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ওই নীল তারা ফুলের গাছটিও মারা যায়।
কী জানি গাছেদেরও শোক হয় কিনা।
No comments:
Post a Comment