বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
ঈষিকা
সূত্রধর
নিভৃত
হাহাকার
"শিউলি কোথায় নিরুদ্দেশ হলো কে জানে! শুধু কক্ষকোণে সেই তৈলচিত্রটা পড়ে রইল, আর তার ধুলোমাখা ফ্রেমে আটকে রইল এক অপার্থিব ত্রাস। শিউলির সেই আর্তনাদ কোনোদিন লোকচক্ষুর সামনে এল না; রয়ে গেল কেবল এক মহাসমুদ্রের মতো অতল আর অসমাপ্ত দীর্ঘশ্বাস।"
রাত এখন গভীর। জানালার বাইরে
অরণ্য-প্রকৃতি এক নিবিড় অন্ধকারে যেন ধ্যানমগ্ন। হঠাৎ সেই নিঝুম নিস্তব্ধতা চিরে
একটা অস্ফুট কান্নার সুর ভেসে এলো। সেটা কি কোনো রাতজাগা পাখির ডাক, নাকি অন্ধকারের কোনো গূঢ় সংকেত? যখন পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেমে যায়, তখন এই নিস্তব্ধতাই যেন এক ভীষণ রূপ ধরে কথা বলে ওঠে। নগরের
বড়ো বড়ো অট্টালিকাগুলো আজ যেন এক-একটি পাষাণ-কারাগার।
ভয় আজ সমস্ত যুক্তি আর শাসনের দেয়াল ভেদ করে মনের গহিনে ঢুকে
পড়ছে; তাকে কোনো বাধা দিয়েই আর
আটকানো যাচ্ছে না।
শিউলি আজ বিছানার এক কোণে
কুঁকড়ে বসে আছে। তার চোখের কোণে আজ এক সমুদ্র অভিমান আর জমাটবদ্ধ আতঙ্ক। বাইরের
বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে সে যেন তার ফেলে আসা পুরনো দিনগুলোর পদধ্বনি শুনতে পায়। যাকে
সে সারাজীবন নিজের সবটুকু মমতা দিয়ে আগলে রেখেছিল, আজ এই চরম সংকটের দিনে সে-ই সবচেয়ে বড়ো পর। মানুষের সবচেয়ে বড়ো আতঙ্ক তো বাইরের কোনো রূপ ধরে আসে না, তা আসে অতি আপনজনের অবহেলায় আর বিশ্বাসের অপমৃত্যুতে। ঘরের
কোণে রাখা ধুলোমাখা তৈলচিত্রটার দিকে তাকাতেও আজ শিউলির বুক কেঁপে উঠছে; মনে হচ্ছে, এই নিথর ঘরখানা যেন
একটা ক্ষুধার্ত রাক্ষসের মতো হাঁ করে তাকে গ্রাস করতে আসছে।
ভয়ের কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই, অথচ তার অশরীরী উপস্থিতি আজ শিউলির রক্তকণিকায় প্রলয়-নাচন
ধরিয়ে দিয়েছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে,
অথচ এই
ঘোর বিপদে ডাকার মতো আপনজন কেউ নেই। সমাজ,
সংসার
আর দীর্ঘদিনের সখ্য— সবই আজ মরীচিকার মতো ধূসর বালুচর। হঠাৎ বন্ধ দরজার ওপাশে একটা
ধীর অথচ ভারী করাঘাত শোনা গেল। শিউলি শিউরে উঠল। সে কি দ্বার খুলবে? নাকি এই রুদ্ধ দ্বারের অন্ধকারেই নিজেকে বিলীন করে দেবে?
পরদিন সকালে সূর্য উঠল ঠিকই, কিন্তু শিউলির সেই জীর্ণ ঘরের দরজা আর খুলল না। পাড়ার লোকে
বলাবলি করতে লাগল— শিউলি কোথায় নিরুদ্দেশ হলো কে জানে! শুধু কক্ষকোণে সেই
তৈলচিত্রটা পড়ে রইল, আর তার ধুলোমাখা
ফ্রেমে আটকে রইল এক অপার্থিব ত্রাস। শিউলির সেই আর্তনাদ কোনোদিন লোকচক্ষুর সামনে
এল না; রয়ে গেল কেবল এক মহাসমুদ্রের
মতো অতল আর অসমাপ্ত দীর্ঘশ্বাস। যে গল্প শেষ হয়েও আসলে কোনোদিন শেষ হয় না।
~~000~~
No comments:
Post a Comment