প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Sunday, April 26, 2026

ভোটবাবু | গৌতম কুমার গুপ্ত

বাতায়ন/আতঙ্ক/অন্য চোখে/৪র্থ বর্ষ/২য় সংখ্যা/১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | অন্য চোখে
গৌতম কুমার গুপ্ত
 
ভোটবাবু

"আমরা সব গালভরা নাম পেয়েছি- আধিকারিক। কিন্তু কাজ যাইই হোক পরিবেশ-পরিস্থিতেতে লেবারেরও অধম।"

 
অফিসে বসে কাজ করছিলাম। হঠাৎ খবর এল ভোটের নিয়োগপত্র এসেছে। ভোটের কাজে যেতে হবে। অবশ্য খবরটা আগের থেকেই চাওর ছিল যাওয়ার। ছুটলাম কর্মীবর্গ দফতরে। দু-চারজন সহকর্মী আগের থেকেই ভিড় করেছেন। আমারটা সেকেন্ড পোলিং অফিসারের ডিউটি এসে্ছে। ফার্স্ট ট্রেনিং হবে দুর্গাপুর এনআইটি কলেজে। অফিস থেকে বাড়ি ফিরলাম। গর্বভরে স্ত্রীকে ফাইলে নিয়োগপত্রটি রাখতে বললাম যত্ন করে। স্ত্রীর মুখে আতঙ্ক মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল। বললাম কোন চিন্তা নেই। কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকবে। লাইফ তো সরলরেখায় চলে না। ঝুঁকি নিতেই হয়। যথারীতি প্রথম ট্রেনিংয়ের দিন মোটর সাইকেলে গেলাম। ঢুকতেই বাধা পেলাম কলেজ গেটে। সিকিউরিটি অন্য গেট দিয়ে ঢুকতে বলল। মোটর বাইক কোনরকমে রেখে ঢুকলাম যেখানে ট্রেনিং রুমের নির্দেশিকা আছে। ছ নাম্বার রুম। সেকেন্ড ফ্লোর। হেল্প ডেস্কে গেলাম। তারা বলে দিলেন বটে কিন্তু খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হল। কক্ষগুলি পরপর ভাবে নেই। যাক অন্য ভোটকর্মীদের সাহায্যে খুঁজে পেলাম। লোকজনে গমগম করছে হল। মাইকের আওয়াজে এত ভাইব্রেশন হচ্ছে কথা বোঝা যাচ্ছে না। গলদঘর্ম হয়ে হাজিরা খাতায় সইসাবুদ সেরে আইডেনটিটি কার্ডে সিলমোহর দিয়ে বেশ গুছিয়ে বসতে চাইলাম। কিন্তু ফ্যানের নীচে জায়গাগুলি অলরেডি রিজার্ভ। ফ্যানের হাওয়ার পেরিফেরিতে বসতে বাধ্য হলাম। শুরু হল ট্রেনিং। পুরোটাই মৌখিক। সঙ্গে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেনটেশন।
দ্বিতীয় পোলিংঅফিসারের কাজকর্মের ব্যাপারটা আসতেই একজন সহকর্মী উঠে বলল- স্যর। সব কাজই কি সেকেন্ড পোলিংয়ের? এটা কেন হবে? ভোট স্লিপ লেখ, রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ কর, সাইন করাও, কালি দাও। সম্ভব?’ ট্রেনার আমল  দিলেন না। বললেন এটা নির্বাচন কমিশন ঠিক করেছেন। আমাদের কিছু করার নেই। কিছু শুনতে পেলাম কিছু পেলাম না। এখানের রুমগুলি এত ঘনঘন সন্নিবিষ্ট যে অন্য ঘর থেকে আওয়াজ মিশিয়ে একটা গোলমাল তৈরি হচ্ছে। যাইই হোক ট্রেনিং শেষ করে বাড়ি ফিরলাম। মেয়াদের একঘন্টা আগেই। দিনদশেক পেরিয়ে দ্বিতীয় ট্রেনিংয়ের চিঠি পেলাম। একই জায়গায়। এনআইটি-তে। ইভিএম শেখানো হল। কীভাবে মেশিন সিল করতে হবে। ট্যাগ করতে হবে। গালা দিয়ে সিল করতে হবে। সুয়োগসুবিধা জানতে চাইলাম। অর্থের পরিমা কী দেওয়া হবে, খাবার জল ইত্যাদি। ট্রেনার বললেন- তাঁর খুব একটা জানা নেই। যেটুকু কানে শুনেছেন বললেন। কোনো স্বয়ংম্বর গোষ্ঠী নাকি হেল্প করবে। যাইহোক দ্বিতীয ট্রেনিং করে বাড়ি ফিরলাম। লু-য়ে আক্রান্ত হয়ে।
 
ভোট পর্ব
 
আস্তে আস্তে সেই দিনটা চলে এল। ফাইনাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা হাতে পেয়েছিলাম আগেই, দ্বিতীয় ট্রেনিংয়ের প্রাক্কালে। ওই সময়েই পরিচয়পর্ব সম্পন্ন হয়ে গেছিল প্রিসাইডিং অফিসার রথীনবাবু, প্রথম পোলিং এবং তৃতীয় পোলিং আধিকরিকের সঙ্গে। আমরা সব গালভরা নাম পেয়েছি- আধিকারিক। কিন্তু কাজ যাইই হোক পরিবেশ-পরিস্থিতেতে লেবারেরও অধম।
এই কাজে অফিসারসুলভ যোগ্যতার বা বয়সের কোন নিদ্দির্ষ্ট সীমারখা নেই। নির্বাচন কমিশনের মর্জিমতো।
ভে্াটের তারিখ পড়েছে ১১ এপ্রিল। দুর্গাপুর পূর্ব বিধানসভায়। হাতে প্রাণ ফিরে এলাম। যাক অন্তত সামনে পড়েছে। কেন-না দুর্গাপুরেই থাকি। যাবার আগের থেকেই প্ল্যান করে নিতে হয়েছিল কী কী ব্যাগে ভরতে হবে। নিজের পরনের পোশাক ছাড়া একসেট পাজামা-পাজ্ঞাবি, টুথপেষ্ট ব্রাশ, সাবান, গামছা, চাদর, লুঙ্গি ইত্যাদি। স্ত্রীর তৈরি একখানা বালস বেলার বালিশ। রাতে ভাল ঘুম হয়নি। সকাল প্রাতর্ভ্রমণে যাওয়া অভ্যাস। যাইনি সেদিন। দুর্গাপুরবাসী এক সহকর্মীর সঙ্গে মোটর বাইকে যাওয়ার প্রোগ্রাম হয়েছিল। সকালে উঠেই মোবাইলে মেসেজ পেলাম নির্দ্দিষ্ট বুথের নম্বর। এক ভোট-সহকর্মী ফোনে জানালেন বুথের ঠিকানাটাও। সকাল সাতটা বাজতেই প্রিসাইডিং অফিসার জানালেন আমি বাদ দিয়ে সবাই পৌঁছে গেছেন। আমি দশটার সময় পৌঁছে যাব জানালাম। যদিও আমি আগেই ওনাকে জানিয়েছিলাম চারটি ঝোলভাত খেয়েই যাব। দশটার মধ্যেই।
রবিবাসরীয় পড়ছিলাম। আবার ঘন্টাখানেক পরে ফোন। তাড়াতাড়ি আসুন। মাল তুলতে হবে। প্রমাদ গুনলাম। ভদ্রলোক টেনশন নিতে শুরু করেছেন। মোটর বাইকে যাওয়া বাতিল করে দিলাম। সহকর্মী মিলনবাবুকে জানিয়ে দিলাম। আধপেটা খেয়ে মাথায় দু মগ জল ঢেলে বেরিয়ে পড়লাম দুগ্গা দুগ্গা বলে। একটা বড় ব্যাগ কাঁধে নিয়ে টোটোতে করে প্রান্তিকা পৌঁছাতেই এক বাস খালাসি আমাকে আসুন আসুন বলে এগিয়ে এল। ঠিক দশটায় পৌঁছে গেলাম। আমাকে দেখে তাঁরা আত্মস্থ হলেন। কারণ এর আগে আরো দুবার রথীনবাবু ফোন করে তাড়া দিয়েছেন।
সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ভোটের মাল তুলতে গেলাম। তার আগে ওনারা ব্যর্থ হয়েছেন। কেন-না মাইক্রো অবজার্ভার পৌঁছাননি। কাউন্টারে দুজন ব্যাজার মুখে বসে আছেন। বললেন, একটু পরে দেওয়া হবে। তৃতীয় বার চেষ্টা করার পর বেলা সাড়ে এগারোটায় ভোটের মাল তুলে তালিকার সঙ্গে মেলানো হল। দু-একটা অমিল হল বটে। মেশিনের ঢাকনাও খুলছে না। ছুটে গেলেন রথীনবাবু আর সত্যবাবু। লু বইতে শুরু করেছে। লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম সবাই। হঠাৎ দুজন পুলিশ জলকামান দিয়ে ধুলোর ওপর জল ছেটাতে শুরু করলেন। ছিটকে সবাই ধুলো থেকে বাঁচবার জন্য দৌড় শুরু করল। ওদিকে জলের পাউচ নেবার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ড্রামের ভিতর কেউ কেউ। ভিড়ের ভিতর মাথা গুঁজে কোনরকমে দুটো জলের পাউচ খামচে ধরলাম। দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে গলায় ঢেলে নিলাম। মেশিন নিয়ে ততক্ষণে ফেরত এসেছেন ওনারা।
এবার বুথের পথে যাত্রা শুরু। দুদফায় যাত্রা শুরু হল। শাটল যাত্রায় হেমশীলা স্কু্ল। তখনো সবাই পৌঁছয়নি। যানবাহনের আসা-যাওয়া, গরম হাওয়ায় ব্যাপক ধুলো উড়ছে। চোখদুটি বাদ দিয়ে সব ঢাকা। ভিতরে কুলকুল ঘাম। তারপর সেখান থেকে সাড়ে-চারটার সময় ছটা পোলিং পার্টি একসঙ্গে বাসে ওঠে জমায়েত হলে বুথের দিকে যাত্রা শুরু হল।
 
ভোটবাবুর প্রত্যাবর্তন
 
ঝামেলার আর দুর্দশার শেষ নেই। পানীয় জল নেই। ধুলোঝড়ের মধ্যে যাত্রা শুরু হল বুথের দিকে। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে বাইরে শাটল ভেহিকলের ব্যবস্থা আছে। হেমশীলা স্কুলে প্রথমে যাবে, তারপর সেখান থেকে বড় বাসে করে নির্দ্দিষ্ট বুথের ঠিকানায়। এই ব্যবস্থা কেন বোধগম্য হল না। একে নিজেদের কফিন তার উপর ভোটের জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে যাওয়া সঙ্গে ৪৫-৪৬ ডিগ্রি তাপে লু-য়ের গরম হাওয়া ও ধুলোঝড়। হেমশীলায় তো পৌঁছানো গেল তারপর বাসের নম্বর খুঁজে চড়ে বসা। বাসগুলি এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে পেরিয়ে গেল পাক্কা দুটি ঘন্টা। ঠায় রোদে বাসের ভেতর সেঁদিয়ে আছি চারটি পোলিং পার্টি। শুকনো ঘামে নুন জমে গেছে। চোখ জ্বালা করছে। রুক্ষ্ম ত্বকে প্রকৃতির দহন অবিরাম। শেষ পোলিং পার্টি যখন এল তখন ঘড়িতে চারটে দশ। প্রথমে তো ভুল ঠিকানায় পৌঁছালাম। একই নামের দুটি স্কুল। শেষে বাইশ কিলোমিটার ঘুরে পৌঁছালাম বুথে। কোথায় পুলিশের এসকর্ট, কোথায় আমরা। শেষে দু কিলোমিটার আগে হদিস পাওয়া গেল। একটি সুন্দর বাতানুকূল এসইউভি-তে চড়ে আমাদের পৌঁছে দিলেন। বুথে পৌঁছালাম বটে কিন্তু চেয়ার টেবিল অকুলান। সেটাই কুলিয়ে গুছিয়ে ভোটকক্ষ সাজানো হল।
 
পার্টির লোকজন এসে খবর নিয়ে গেলেন, অবশ্যই অনুরোধ রাখলেন তাদেরকে যেন দেখা হয়। নিদ্রাহীন রাত কাটল। মেঝের উপর চাদর বিছিয়ে। ভোর চারটেয় উঠে চড়ুইপাখির স্নান সেরে মুড়ি ছাতু খেয়ে বসে পড়লাম নিজের ডিউটি সারতে। একটানা ভোট চলল বেলা চারটে পর্যন্ত। পাক্কা ছটার সময় ভোটকাজের সমাপ্তি হল। তারপরেও রগড় চলল ইভিএম সিলিং স্টাটুটরি প্যাকেট নন-স্টাটুটরি প্যাকেটের কাজ ইত্যাদি। তারপর জমা দেওয়ার জন্য আবার ডিসিআরসি-তে ফেরত এ্রলাম ঘনঘন রাস্তার জ্যাম উপেক্ষা করে। আসতে তো হবেই।
জমা দেওয়ার সময় আবার লাইন দাও। মনঃপূত না হলে আবার ফেরত। আমাদের সব কিছু জমা দিতে রাত একটা বেজে গেল। জমা দিয়েই গাড়ির জন্য ছুট লাগালাম। এখন আর কোনো ঘোষণা নেই। বুঝলাম নিজের চেষ্টাতেই বাড়ি ফিরতে হবে। তবু একবার চেষ্টা করে গাড়ির খবর জানতে চাইলাম। উল্টে মিলল বাজে ব্যবহার আর গমকের ধমক। প্রমাদ গুনলাম। আর কি কেউ পুছবে? ভোট তো শেষ। কাজের সময় কাজী কাজ ফুরালে পাজি এটাই তো নিয়ম। পকেটের মোটা রেস্ত খরচ করে যখন বাড়ির দরজায় পৌঁছালাম তখন কারো দেয়াল ঘড়িতে রাত তিনটের ঘন্টা বাজছেনিজেকে যুদ্ধক্লান্ত হতমান সৈনিকের মতো মনে হচ্ছিল।
 
[রচনাটির বক্তব্য লেখকের নিজস্ব]

~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)