বাতায়ন/আতঙ্ক/অন্য চোখে/৪র্থ বর্ষ/২য়
সংখ্যা/১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | অন্য চোখে
গৌতম কুমার গুপ্ত
ভোটবাবু
আতঙ্ক | অন্য চোখে
গৌতম কুমার গুপ্ত
"আমরা সব গালভরা নাম পেয়েছি- আধিকারিক। কিন্তু কাজ যাইই হোক পরিবেশ-পরিস্থিতেতে লেবারেরও অধম।"
দ্বিতীয় পোলিংঅফিসারের কাজকর্মের ব্যাপারটা আসতেই একজন সহকর্মী উঠে বলল- ‘স্যর। সব কাজই কি সেকেন্ড পোলিংয়ের? এটা কেন হবে? ভোট স্লিপ লেখ, রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ কর, সাইন করাও, কালি দাও। সম্ভব?’ ট্রেনার আমল দিলেন না। বললেন এটা নির্বাচন কমিশন ঠিক করেছেন। আমাদের কিছু করার নেই। কিছু শুনতে পেলাম কিছু পেলাম না। এখানের রুমগুলি এত ঘনঘন সন্নিবিষ্ট যে অন্য ঘর থেকে আওয়াজ মিশিয়ে একটা গোলমাল তৈরি হচ্ছে। যাইই হোক ট্রেনিং শেষ করে বাড়ি ফিরলাম। মেয়াদের একঘন্টা আগেই। দিনদশেক পেরিয়ে দ্বিতীয় ট্রেনিংয়ের চিঠি পেলাম। একই জায়গায়। এনআইটি-তে। ইভিএম শেখানো হল। কীভাবে মেশিন সিল করতে হবে। ট্যাগ করতে হবে। গালা দিয়ে সিল করতে হবে। সুয়োগসুবিধা জানতে চাইলাম। অর্থের পরিমাণ কী দেওয়া হবে, খাবার জল ইত্যাদি। ট্রেনার বললেন- তাঁর খুব একটা জানা নেই। যেটুকু কানে শুনেছেন বললেন। কোনো স্বয়ংম্বর গোষ্ঠী নাকি হেল্প করবে। যাইহোক দ্বিতীয ট্রেনিং করে বাড়ি ফিরলাম। লু-য়ে আক্রান্ত হয়ে।
এই কাজে অফিসারসুলভ যোগ্যতার বা বয়সের কোন নিদ্দির্ষ্ট সীমারখা নেই। নির্বাচন কমিশনের মর্জিমতো।
ভে্াটের তারিখ পড়েছে ১১ই এপ্রিল। দুর্গাপুর পূর্ব বিধানসভায়। হাতে প্রাণ ফিরে এলাম। যাক অন্তত সামনে পড়েছে। কেন-না দুর্গাপুরেই থাকি। যাবার আগের থেকেই প্ল্যান করে নিতে হয়েছিল কী কী ব্যাগে ভরতে হবে। নিজের পরনের পোশাক ছাড়া একসেট পাজামা-পাজ্ঞাবি, টুথপেষ্ট ব্রাশ, সাবান, গামছা, চাদর, লুঙ্গি ইত্যাদি। স্ত্রীর তৈরি একখানা বালস বেলার বালিশ। রাতে ভাল ঘুম হয়নি। সকাল প্রাতর্ভ্রমণে যাওয়া অভ্যাস। যাইনি সেদিন। দুর্গাপুরবাসী এক সহকর্মীর সঙ্গে মোটর বাইকে যাওয়ার প্রোগ্রাম হয়েছিল। সকালে উঠেই মোবাইলে মেসেজ পেলাম নির্দ্দিষ্ট বুথের নম্বর। এক ভোট-সহকর্মী ফোনে জানালেন বুথের ঠিকানাটাও। সকাল সাতটা বাজতেই প্রিসাইডিং অফিসার জানালেন আমি বাদ দিয়ে সবাই পৌঁছে গেছেন। আমি দশটার সময় পৌঁছে যাব জানালাম। যদিও আমি আগেই ওনাকে জানিয়েছিলাম চারটি ঝোলভাত খেয়েই যাব। দশটার মধ্যেই।
রবিবাসরীয় পড়ছিলাম। আবার ঘন্টাখানেক পরে ফোন। তাড়াতাড়ি আসুন। মাল তুলতে হবে। প্রমাদ গুনলাম। ভদ্রলোক টেনশন নিতে শুরু করেছেন। মোটর বাইকে যাওয়া বাতিল করে দিলাম। সহকর্মী মিলনবাবুকে জানিয়ে দিলাম। আধপেটা খেয়ে মাথায় দু মগ জল ঢেলে বেরিয়ে পড়লাম দুগ্গা দুগ্গা বলে। একটা বড় ব্যাগ কাঁধে নিয়ে টোটোতে করে প্রান্তিকা পৌঁছাতেই এক বাস খালাসি আমাকে আসুন আসুন বলে এগিয়ে এল। ঠিক দশটায় পৌঁছে গেলাম। আমাকে দেখে তাঁরা আত্মস্থ হলেন। কারণ এর আগে আরো দুবার রথীনবাবু ফোন করে তাড়া দিয়েছেন।
সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ভোটের মাল তুলতে গেলাম। তার আগে ওনারা ব্যর্থ হয়েছেন। কেন-না মাইক্রো অবজার্ভার পৌঁছাননি। কাউন্টারে দুজন ব্যাজার মুখে বসে আছেন। বললেন, একটু পরে দেওয়া হবে। তৃতীয় বার চেষ্টা করার পর বেলা সাড়ে এগারোটায় ভোটের মাল তুলে তালিকার সঙ্গে মেলানো হল। দু-একটা অমিল হল বটে। মেশিনের ঢাকনাও খুলছে না। ছুটে গেলেন রথীনবাবু আর সত্যবাবু। লু বইতে শুরু করেছে। লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম সবাই। হঠাৎ দুজন পুলিশ জলকামান দিয়ে ধুলোর ওপর জল ছেটাতে শুরু করলেন। ছিটকে সবাই ধুলো থেকে বাঁচবার জন্য দৌড় শুরু করল। ওদিকে জলের পাউচ নেবার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ড্রামের ভিতর কেউ কেউ। ভিড়ের ভিতর মাথা গুঁজে কোনরকমে দুটো জলের পাউচ খামচে ধরলাম। দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে গলায় ঢেলে নিলাম। মেশিন নিয়ে ততক্ষণে ফেরত এসেছেন ওনারা।
এবার বুথের পথে যাত্রা শুরু। দুদফায় যাত্রা শুরু হল। শাটল যাত্রায় হেমশীলা স্কু্ল। তখনো সবাই পৌঁছয়নি। যানবাহনের আসা-যাওয়া, গরম হাওয়ায় ব্যাপক ধুলো উড়ছে। চোখদুটি বাদ দিয়ে সব ঢাকা। ভিতরে কুলকুল ঘাম। তারপর সেখান থেকে সাড়ে-চারটার সময় ছটা পোলিং পার্টি একসঙ্গে বাসে ওঠে জমায়েত হলে বুথের দিকে যাত্রা শুরু হল।
জমা দেওয়ার সময় আবার লাইন দাও। মনঃপূত না হলে আবার ফেরত। আমাদের সব কিছু জমা দিতে রাত একটা বেজে গেল। জমা দিয়েই গাড়ির জন্য ছুট লাগালাম। এখন আর কোনো ঘোষণা নেই। বুঝলাম নিজের চেষ্টাতেই বাড়ি ফিরতে হবে। তবু একবার চেষ্টা করে গাড়ির খবর জানতে চাইলাম। উল্টে মিলল বাজে ব্যবহার আর গমকের ধমক। প্রমাদ গুনলাম। আর কি কেউ পুছবে? ভোট তো শেষ। কাজের সময় কাজী কাজ ফুরালে পাজি এটাই তো নিয়ম। পকেটের মোটা রেস্ত খরচ করে যখন বাড়ির দরজায় পৌঁছালাম তখন কারো দেয়াল ঘড়িতে রাত তিনটের ঘন্টা বাজছে। নিজেকে যুদ্ধক্লান্ত হতমান সৈনিকের মতো মনে হচ্ছিল।
~~000~~

No comments:
Post a Comment