বাতায়ন/আতঙ্ক/গল্পাণু/৪র্থ বর্ষ/২য়
সংখ্যা/১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | গল্পাণু
ছন্দা দাম
বসন্তের
রূপ
"ওরা কেউ নেই রে, একটা কামানের গোলা এসে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে সব! জ্যাঠা কঁকিয়ে কেঁদে উঠলেন। এদিক-ওদিকে সৈন্য, সেচ্ছাসেবক, মেডিকেলের লোকেরা আসা-যাওয়া করছে।"
প্রায় ছ মাস পর বাড়ি ফিরছে
জয়ন্ত। দু দেশের মাঝখানের কাঁটাতারে মাঝে অনেকটা সবুজ জমি, সরকারের হিসেবে নোম্যানস ল্যান্ড এখানেই ওর ছোট গাঁও বাউলগঞ্জ।
দুদেশের মধ্যে কিছুদিন আগে যুদ্ধ হয়ে গেছে।
এখন শান্ত। এ গাঁয়ে কয়েক
মাস ধরে বিদ্যুৎ, টেলিফোন কোন যোগাযোগ
নেই।
বহুদিন ধরে জয়ন্ত ছটফট করছিল
বাড়ির জন্য, মা বাবার জন্য, কুকুরছানার জন্য,
বাসন্তী
গাইয়ের জন্য। কতটা জানি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এটাই ভাবছিল। কিন্তু এদিকের সব রাস্তা
বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বাইরের লোকজনের জন্য।
দুয়েকদিন হলো খুলেছে। ওর
বুকের ভেতর একজন বাসা বেঁধেছিল গেল বসন্ত থেকে। কোন পাসপোর্ট ছাড়াই তার অবাধ
যাতায়াত। তার চোখ, তার ঠোঁটের তিল,
তার
পায়ের নূপুর সব ঘোরে রাখে ওকে।
গাঁয়ে পা দিয়ে আকাশ থেকে
পড়ল জয়ন্ত। যেন বিশাল ভূমিকম্প হয়ে গেছে। মাটির ঘর, ইটকাঠের ঘর সব যেন মাটির সাথে মিশে গেছে! মুখে কোন কথা
বেরোল না ওর। শুধু... মা, বলে বসে পড়ল মাটিতে।
কাছাকাছি এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়েছিলেন একটা কুঁড়েঘরের সামনে, ছুটে এলেন, ধরা গলায় বললেন,
-জয়ন্ত, দেখছ বাবা কী অবস্থা! তোমার বাবা-মায়ের
অবস্থাও ভাল নেই বাবা, ওই পোড়া বাড়িতে
গাঁয়ের সবাই মিলে বেঁচে আছি আমরা। কেউ কেউ মারা গেছে, কত আহত হয়ে পড়ে আছে! গরু ছাগল সব শেষ বাবা সব!
ভেঙে পড়লেন বৃদ্ধ। জয়ন্ত
বৃদ্ধ জ্যাঠাকে কাঁধে শক্ত করে ধরে এগোয় বাবা-মায়ের খোঁজে। বুকটাতে মুগুর
পিটছে অজানা আতঙ্ক! পথে সেই ছোট্ট গোলাপী বাড়িটা পড়ে, কিন্তু কোথায়?
কিছুই
তো নেই! মুখে কোন কথা আসছে না, শুধু আঙুল তুলে দেখাল
জয়ন্ত।
-ওরা কেউ নেই রে,
একটা
কামানের গোলা এসে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে সব! জ্যাঠা কঁকিয়ে কেঁদে উঠলেন।
এদিক-ওদিকে সৈন্য, সেচ্ছাসেবক, মেডিকেলের লোকেরা আসা-যাওয়া করছে। পা
টলছিল জয়ন্তর। কোন একজনের ধাক্কায় উল্টে পড়ে। পকেট থেকে
মিষ্টি শব্দ করে ছিটকে পড়ল একজোড়া পায়েল।
সন্ধের আকাশটা যেন লাল রক্তে
মাখামাখি, আর নিশ্চিহ্ন গোলাপী বাড়িটার
কাছের পলাশ গাছটা ফুলে ফুলে লাল আল্পনা দিয়ে রেখেছে মাটির উপর। ছড়ানো-ছিটানো
পাপড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে জয়ন্ত ভাবে, বসন্তের এমন রূপ কেউ কি কখনো কল্পনাও করতে পারবে!
~~000~~
No comments:
Post a Comment