বাতায়ন/আতঙ্ক/পর্যালোচনা/৪র্থ বর্ষ/২য়
সংখ্যা/১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | পর্যালোচনা
নাটক— ঝরা বকুলের ঘ্রাণ
নাট্যকার— অজয় দেবনাথ
পর্যালোচক— দীপক বেরা
আতঙ্ক | পর্যালোচনা
নাটক— ঝরা বকুলের ঘ্রাণ
নাট্যকার— অজয় দেবনাথ
পর্যালোচক— দীপক বেরা
"সংলাপে ব্যক্তিগত এক অপূরণীয় ক্ষতির কথা উঠে আসে বকুলের বর্ণনায়—'আমার বুকে মাথা রেখে, আমারই কোলের মধ্যে... সব শেষ হয়ে গেল’—পাঠকের মনে এটি গভীর এক সহমর্মিতা জাগায়। এটি কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং একটি আদর্শ ও ভালবাসার অকাল পরিসমাপ্তি।"
(বকুল ও রাধার কথোপকথন)
নাটকের প্রথম দৃশ্যে লেখক বকুল এবং রাধা, এই দুই চরিত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে একটি গভীর আবেগীয় এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ফুটিয়ে তুলেছেন।
নাটকের প্রধান চরিত্রটি হলো 'বকুল'। এই বকুল আসলে কোনও ফুল নয়। বকুল হলো বয়সে তরুণ এক যুবকের নাম, যিনি বাংলাসাহিত্য বিষয়ের ওপর উচ্চশিক্ষিত এবং একজন মেধাবী লেখক। বকুলের চরিত্রটি বেশ গাম্ভীর্যপূর্ণ ও স্থিতধী এবং কিছুটা অন্তর্মুখী। তিনি একজন মিতভাষী এবং নিভৃতচারী লেখক। নিজের কৃতিত্ব জাহির করায় একেবারেই বিশ্বাসী নন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ার ‘সস্তা মোহ’ থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করেন। তাঁর এই নির্লিপ্ততা আসলে তাঁর অতীতের কোনো এক গভীর বিষাদ বা একাকীত্বের ইঙ্গিত দেয়। বকুল যেমন ঝরে যাওয়ার পরেও তার সুগন্ধ ছড়ায়, বকুলের লেখাও সেই রকমই সুবাস ছড়ায়। সেই সুবাসে চারপাশের পাঠককূল আকৃষ্ট বা মোহাবিষ্ট হয়।
অন্যদিকে রাধা চঞ্চল, কৌতুহলী এবং আন্তরিক। অনেক বেশি উচ্ছ্বসিত এবং সামাজিক। তাঁর সরাসরি কথা বলার ভঙ্গি বকুলের ব্যক্তিত্বের ওপর থাকা জড়তাকে ভাঙতে সাহায্য করে। তিনি বকুলের প্রতিভার প্রশংসা করে তাঁকে আরও সহজ করতে চাইছেন। দুজনের মধ্যে একটা স্বভাবগত এই পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাস্তবতা ও ব্যস্ততার দিক থেকে দেখলে উভয় চরিত্রের মধ্যেই ব্যস্ততা আছে, তবে তার ধরণ আলাদা। বকুল মগ্ন থাকেন তাঁর সৃজনশীল কাজে, আর রাধা ব্যস্ত থাকেন তাঁর সাংসারিক কাজে। রাধার কথায় ফুটে ওঠে যে, হাজারো কাজের ভিড়েও তিনি সাহিত্যের জন্য সময় ঠিক বের করে আনেন।
আগেই বলেছি যে, নাটকের নাম 'ঝরা বকুলের ঘ্রাণ'। ঝরা বকুলের সেই ঘ্রাণ বা সুগন্ধ—অর্থাৎ বকুলের লেখার গুণগত মান রাধার মনে তেমনই গভীর ছাপ ফেলেছে।
সংলাপের ভিতর— দুজনের মধ্যে এক ধরনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহজ বন্ধুত্বের আভাস এবং দুজনের মধ্যে সম্পর্কের রসায়নের একটা আঁচ পাওয়া যায়—রাধা যখন বকুলের ব্যক্তিগত বিষয়ে জানতে কৌতুহলী হয় এবং বকুল বিয়ে করেছে কিনা জানতে চায়। একদিকে রাধার কৌতূহল এবং অন্যদিকে বকুলের নির্লিপ্ততা নাটকটিতে বেশ সূক্ষ্ম একটি টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
(বকুল ও ক্যামেলিয়ার কথোপকথন)
ফ্ল্যাশব্যাকে এই অংশের নাট্যরূপটি বকুল ও ক্যামেলিয়ার কথোপকথনের সংলাপ। নাটকের এই অংশটিতে দেখা যাচ্ছে আবেগ, স্মৃতি এবং ভালোবাসার এক জটিল সন্ধিক্ষণ। আবার বর্তমান বাংলাদেশের তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আমাদের এক ঐতিহাসিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়— সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা উঠে এসেছে, যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর বুদ্ধিজীবী নিধন এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার ঘৃণ্য প্রচেষ্টার চিত্র ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রজয়ন্তী বা নববর্ষ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাটি পাকিস্তানি শাসকের বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা পাঠকমাত্রই এক তীব্র ক্ষোভ ও বেদনার জন্ম দেয়।
নাটকের মোড় ঘোরে যখন ক্যামেলিয়া বিয়ের কথা তোলে। বকুল যখন সরল মনে অন্যের সাথে ক্যামেলিয়ার বিয়ের কথা ভেবে নিমন্ত্রণের আবদার করে, তখন ক্যামেলিয়া তাকে মনে করিয়ে দেয় যে সে আসলে বকুলকেই পছন্দ করে। ‘তোমার সঙ্গে গল্প করতে যাব কেন?’—এখানে ক্যামেলিয়ার এই সংলাপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা তাদের মধ্যকার এক গভীর প্রেমের সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়, যেন লুকোনো প্রেমের স্বীকারোক্তি।
বকুল যেখানে শোকের সাগরে ভাসছে, ক্যামেলিয়া সেখানে তাদের ভবিষ্যতের কথা ভাবছে। এই বৈপরীত্য নাটকটিতে দ্বিধা ও সংঘাতের মধ্যে একটি মানসিক টানাপোড়েন তৈরি করেছে। অর্থাৎ বকুল ও ক্যামেলিয়ার কথোপকথনের একটি আবেগপ্রবণ দৃশ্য দেখতে পাই, যেখানে একদিকে (বকুলের মধ্যে) রয়েছে হারানো বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও মায়ের সংগ্রামের স্বীকৃতি, আর অন্যদিকে (ক্যামেলিয়ার মধ্যে) রয়েছে হৃদয়ের অস্ফুট ভালবাসার প্রকাশ।
এই অংশের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো আদর্শ বনাম বাস্তবের সংঘাতের একটি নিবিড় প্রতিফলন। যেন আদর্শের অগ্নিপরীক্ষা— বকুল নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক দাবি করলেও, বাস্তব জীবনে যখন সেই আদর্শ প্রয়োগের সময় এল, সে তখন সমাজের ভয়ে পিছু হটেছে। এখানে বকুলের চরিত্রের এক ধরণের দোদুল্যমানতা বা আদর্শগত দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
উল্টোদিকে ক্যামেলিয়ার খুব সাহসী অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। ক্যামেলিয়া চরিত্রটি অনেক বেশি স্পষ্টবাদী এবং আপসহীন। সে বকুলের তথাকথিত 'হিপোক্রেসি' বা ভণ্ডামিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। তার কাছে ভালবাসা কোনো সামাজিক চুক্তির চেয়ে বড়।
বকুলের যুক্তিগুলোও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তাঁর মনের মধ্যে সামাজিক ও বাস্তবতার একটা ভয় কাজ করছে। সে জানে যে সমাজ আজও ভিন্ন ধর্মের মানুষের মিলনকে সহজে গ্রহণ করে না। বকুলের ভয়টা মূলত সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং গ্লানির। মূলত বকুল ও ক্যামেলিয়ার মধ্যে একটা মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।
(বকুল ও রাধার কথোপকথন):
বকুলের সংলাপের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। মৌলবাদ ও অসহিষ্ণুতা কীভাবে একটি সাজানো সংসার এবং দুজন মানুষের স্বপ্নকে নিমেষেই ধ্বংস করে দিতে পারে। যেখানে একটি সুন্দর বসন্তের বিকেলে প্রেমের জয়গান হওয়ার কথা ছিল, সেখানে বুলেটের আঘাত সমাজব্যবস্থার চরম নিষ্ঠুরতাকে তুলে ধরেছে—যা ধর্মীয় উগ্রপন্থা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শিকার হওয়া সাধারণ মানুষের জীবনের এক বিষাদময় করুণ পরিণতি!
নাটকের এই সংলাপ দৃশ্যে বিচারের অপ্রাপ্তি ও অসহায়ত্ব দেখতে পাওয়া যায়। একনায়কতন্ত্র শাসনব্যবস্থার অধীনে প্রশাসন যখন নীরব থাকে, তখন একজন সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব আরও প্রকট হয়। বিচার না পেয়ে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তটি প্রতিবাদের চেয়েও বেশি এক গভীর হতাশা এবং নিরাপত্তার অভাবকে নির্দেশ করে।
এখানে জীবনযুদ্ধ ও টিকে থাকার লড়াই পরিলক্ষিত হয়। বদলা না নিয়ে আম্মীকে নিয়ে চলে আসার মধ্যে একধরণের বাস্তববাদী ক্লান্তি রয়েছে। রাধা যেখানে 'বদলা'র কথা বলছে, সেখানে বকুল বেছে নিয়েছে কেবল বেঁচে থাকা এবং স্মৃতির ভার বয়ে নিয়ে চলাকে।
এই অংশটি পাঠ করার পর মনের মধ্যে এক ধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হল। একদিকে যেমন বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা ও বর্তমান প্রজন্মের শিকড়বিচ্ছিন্ন হওয়ার আক্ষেপ এবং সমাজের এক গভীর সংকটের প্রতিফলন ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে দুই বিপরীতধর্মী চরিত্রের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে এক ধরণের দৃঢ় সংকল্পের সুরও পাওয়া যায়।
শেষ দৃশ্যে বকুল ও রাধার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে আমার ভাবনায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে উঠেছে, সেগুলি কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে আলোচনা করলে বোধ হয় পর্যালোচনাটির বোধগম্যতার পথ আরও সুগম হবে—
উৎসবের প্রাণহীনতা এবং বিদেশি ভাষার প্রতি মোহ আমাদের নিজস্ব স্বকীয়তা হারানোর যন্ত্রণাকে তুলে ধরে। লেখক এখানে দেখাতে চেয়েছেন যে, দেশের মানুষ কীভাবে নিজেদের সংস্কৃতি থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।
কারণ, মৌলবাদ সমাজের বৈচিত্র্য ও সংহতি নষ্ট করে একটি রাষ্ট্রের প্রগতিশীল ভবিষ্যতের পথ রুদ্ধ করে দেয়।
তাছাড়া— এটি যেমন একদিকে আমাদের মাতৃভাষা—বাংলা ভাষার প্রতি অনীহা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তেমনই আবার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সহমর্মিতার মাধ্যমে সেই বন্ধ্যাত্ব কাটানোর পথও বাতলে দেয়।
পরিশেষে— বলা যায় নাটকটির কাহিনি, সংলাপ, চরিত্র ও দৃশ্যবিন্যাস চমৎকার। ‘ঝরা বকুলের ঘ্রাণ’, সামাজিক ও নৈতিক বার্তাবহ সুন্দর একটি নাটক। প্রিয় নাট্যকারকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানিয়ে পর্যালোচনায় এখানেই ইতি টানলাম।
এই নাটকের বিষণ্ণ মাধুর্য কোনো এক স্নিগ্ধ বকুল তলার স্নিগ্ধতার মতো আমার হৃদয়ে এক গভীর প্রশান্তি হয়ে মিশে রইল।

No comments:
Post a Comment