প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Sunday, April 26, 2026

নাটক— ঝরা বকুলের ঘ্রাণ | নাট্যকার— অজয় দেবনাথ | পর্যালোচক— দীপক বেরা

বাতায়ন/আতঙ্ক/পর্যালোচনা/৪র্থ বর্ষ/২য় সংখ্যা/১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | পর্যালোচনা
নাটক— ঝরা বকুলের ঘ্রাণ
নাট্যকারঅজয় দেবনাথ
পর্যালোচক— দীপক বেরা

"সংলাপে ব্যক্তিগত এক অপূরণীয় ক্ষতির কথা উঠে আসে বকুলের বর্ণনায়—'আমার বুকে মাথা রেখেআমারই কোলের মধ্যে... সব শেষ হয়ে গেল—পাঠকের মনে এটি গভীর এক সহমর্মিতা জাগায়। এটি কেবল একটি মৃত্যু নয়বরং একটি আদর্শ ও ভালবাসার অকাল পরিসমাপ্তি।"

 
কিছুদিন আগে 'বাতায়ন' অনলাইন সাহিত্য পত্রিকার মাননীয় সম্পাদক মশাই একটি নাটক (নাট্যকারের নাম ছাড়া) পাঠিয়েছিলেন পর্যালোচনা করে দেওয়ার জন্য। নাটকের নাম— 'ঝরা বকুলের ঘ্রাণ'। তিনটি দৃশ্য নিয়ে একটি ছোট নাটক, মুহূর্তের মধ্যেই পড়ে ফেললাম। সেদিনের সেই ঝরা বকুলের ঘ্রাণ মিশে গিয়েছিল আমার মর্মমূলে। অন্তর্লোক থেকে তুলে এনে আজ বসেছি নাটকটির পর্যালোচনা করতে। কতটুকু আলোচনা বা বিশ্লেষণ করতে পেরে উঠব জানি না, তবে চেষ্টা তো করতেই হবে—কারণ, প্রিয় সম্পাদক মশাই, অজয়দাকে আমি কথা দিয়ে ফেলেছি। তাই অগত্যা—
 
১ম দৃশ্য :
(বকুল ও রাধার কথোপকথন)
নাটকের প্রথম দৃশ্যে লেখক বকুল এবং রাধা, এই দুই চরিত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে একটি গভীর আবেগীয় এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ফুটিয়ে তুলেছেন।
নাটকের প্রধান চরিত্রটি হলো 'বকুল'। এই বকুল আসলে কোনও ফুল নয়। বকুল হলো বয়সে তরুণ এক যুবকের নাম, যিনি বাংলাসাহিত্য বিষয়ের ওপর উচ্চশিক্ষিত এবং একজন মেধাবী লেখক। বকুলের চরিত্রটি বেশ গাম্ভীর্যপূর্ণ ও স্থিতধী এবং কিছুটা অন্তর্মুখী। তিনি একজন মিতভাষী এবং নিভৃতচারী লেখক। নিজের কৃতিত্ব জাহির করায় একেবারেই বিশ্বাসী নন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ার সস্তা মোহ থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করেন। তাঁর এই নির্লিপ্ততা আসলে তাঁর অতীতের কোনো এক গভীর বিষাদ বা একাকীত্বের ইঙ্গিত দেয়। বকুল যেমন ঝরে যাওয়ার পরেও তার সুগন্ধ ছড়ায়, বকুলের লেখাও সেই রকমই সুবাস ছড়ায়। সেই সুবাসে চারপাশের পাঠককূল আকৃষ্ট বা মোহাবিষ্ট হয়।
অন্যদিকে রাধা চঞ্চল, কৌতুহলী এবং আন্তরিক। অনেক বেশি উচ্ছ্বসিত এবং সামাজিক। তাঁর সরাসরি কথা বলার ভঙ্গি বকুলের ব্যক্তিত্বের ওপর থাকা জড়তাকে ভাঙতে সাহায্য করে। তিনি বকুলের প্রতিভার প্রশংসা করে তাঁকে আরও সহজ করতে চাইছেন। দুজনের মধ্যে একটা স্বভাবগত এই পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাস্তবতা ও ব্যস্ততার দিক থেকে দেখলে উভয় চরিত্রের মধ্যেই ব্যস্ততা আছে, তবে তার ধরণ আলাদা। বকুল মগ্ন থাকেন তাঁর সৃজনশীল কাজে, আর রাধা ব্যস্ত থাকেন তাঁর সাংসারিক কাজে। রাধার কথায় ফুটে ওঠে যে, হাজারো কাজের ভিড়েও তিনি সাহিত্যের জন্য সময় ঠিক বের করে আনেন।
আগেই বলেছি যে, নাটকের নাম 'ঝরা বকুলের ঘ্রাণ'। ঝরা বকুলের সেই ঘ্রাণ বা সুগন্ধ—অর্থাৎ বকুলের লেখার গুণগত মান রাধার মনে তেমনই গভীর ছাপ ফেলেছে।
সংলাপের ভিতর— দুজনের মধ্যে এক ধরনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহজ বন্ধুত্বের আভাস এবং দুজনের মধ্যে সম্পর্কের রসায়নের একটা আঁচ পাওয়া যায়—রাধা যখন বকুলের ব্যক্তিগত বিষয়ে জানতে কৌতুহলী হয় এবং বকুল বিয়ে করেছে কিনা জানতে চায়। একদিকে রাধার কৌতূহল এবং অন্যদিকে বকুলের নির্লিপ্ততা নাটকটিতে বেশ সূক্ষ্ম একটি টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
 
২য় দৃশ্য (ফ্ল্যাশব্যাক):
(বকুল ও ক্যামেলিয়ার কথোপকথন)
 
নাটকের এই অংশটি অত্যন্ত গভীর, আবেগপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট বিশ্লেষণধর্মী।
ফ্ল্যাশব্যাকে এই অংশের নাট্যরূপটি বকুল ও ক্যামেলিয়ার কথোপকথনের সংলাপ। নাটকের এই অংশটিতে দেখা যাচ্ছে আবেগ, স্মৃতি এবং ভালোবাসার এক জটিল সন্ধিক্ষণ। আবার বর্তমান বাংলাদেশের তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আমাদের এক ঐতিহাসিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়— সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা উঠে এসেছে, যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর বুদ্ধিজীবী নিধন এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার ঘৃণ্য প্রচেষ্টার চিত্র ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রজয়ন্তী বা নববর্ষ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাটি পাকিস্তানি শাসকের বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা পাঠকমাত্রই এক তীব্র ক্ষোভ ও বেদনার জন্ম দেয়।
 
তারপর বকুল চরিত্রের মাধ্যমে উঠে এসেছে তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের মুক্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনার দ্বারা বুদ্ধিজীবীদের নিধন। পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধ। কাজী নজরুল ইসলামকে শুধুমাত্র 'মুসলিম কবি' হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টা এবং রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করার যে কৌশল পাকিস্তান নিয়েছিল, বাঙালি তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ১৯৬১-র রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন এবং 'ছায়ানট' প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের কথা বকুল বলেছে, তা পাঠকদের বাঙালি হিসেবে আমাদের আত্মগৌরব ও প্রতিরোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।
 
একসময় বকুলের সংলাপের মধ্যে স্মৃতি ও শোকের প্রকাশ ঘটেছে। বকুল তার বাবার স্মৃতি নিয়ে আবেগতাড়িত। বাবার মৃত্যু এবং মায়ের একক সংগ্রামের কথা ভেবে সে বিচলিত। অর্থাৎ বকুলের সংলাপে ফুটে উঠেছে একজন পিতৃবিয়োগ হওয়া সন্তানের হাহাকার এবং মায়ের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা।
 
ক্যামেলিয়াকে দেখা যাচ্ছে এখানে বাস্তববাদী ও সান্ত্বনাদাতার ভূমিকায়। সে বকুলকে শান্ত করার চেষ্টা করছে এবং মায়েরা এমনই হয় বলে সাধারণ সত্যকে মেনে নিতে বলছে।
নাটকের মোড় ঘোরে যখন ক্যামেলিয়া বিয়ের কথা তোলে। বকুল যখন সরল মনে অন্যের সাথে ক্যামেলিয়ার বিয়ের কথা ভেবে নিমন্ত্রণের আবদার করে, তখন ক্যামেলিয়া তাকে মনে করিয়ে দেয় যে সে আসলে বকুলকেই পছন্দ করে। তোমার সঙ্গে গল্প করতে যাব কেন?’—এখানে ক্যামেলিয়ার এই সংলাপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা তাদের মধ্যকার এক গভীর প্রেমের সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়, যেন লুকোনো প্রেমের স্বীকারোক্তি।
বকুল যেখানে শোকের সাগরে ভাসছে, ক্যামেলিয়া সেখানে তাদের ভবিষ্যতের কথা ভাবছে। এই বৈপরীত্য নাটকটিতে দ্বিধা ও সংঘাতের মধ্যে একটি মানসিক টানাপোড়েন তৈরি করেছে। অর্থাৎ বকুল ও ক্যামেলিয়ার কথোপকথনের একটি আবেগপ্রবণ দৃশ্য দেখতে পাই, যেখানে একদিকে (বকুলের মধ্যে) রয়েছে হারানো বাবার প্রতি শ্রদ্ধা ও মায়ের সংগ্রামের স্বীকৃতি, আর অন্যদিকে (ক্যামেলিয়ার মধ্যে) রয়েছে হৃদয়ের অস্ফুট ভালবাসার প্রকাশ।
এই অংশের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো আদর্শ বনাম বাস্তবের সংঘাতের একটি নিবিড় প্রতিফলন। যেন আদর্শের অগ্নিপরীক্ষা— বকুল নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক দাবি করলেও, বাস্তব জীবনে যখন সেই আদর্শ প্রয়োগের সময় এল, সে তখন সমাজের ভয়ে পিছু হটেছে। এখানে বকুলের চরিত্রের এক ধরণের দোদুল্যমানতা বা আদর্শগত দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
উল্টোদিকে ক্যামেলিয়ার খুব সাহসী অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। ক্যামেলিয়া চরিত্রটি অনেক বেশি স্পষ্টবাদী এবং আপসহীন। সে বকুলের তথাকথিত 'হিপোক্রেসি' বা ভণ্ডামিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। তার কাছে ভালবাসা কোনো সামাজিক চুক্তির চেয়ে বড়।
বকুলের যুক্তিগুলোও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তাঁর মনের মধ্যে সামাজিক ও বাস্তবতার একটা ভয় কাজ করছে। সে জানে যে সমাজ আজও ভিন্ন ধর্মের মানুষের মিলনকে সহজে গ্রহণ করে না। বকুলের ভয়টা মূলত সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং গ্লানির। মূলত বকুল ও ক্যামেলিয়ার মধ্যে একটা মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।
 
বকুল যখন বলে, ‘নজরুল আর আমি এক নই, তখন সে স্বীকার করে নেয় যে বিপ্লব সবার দ্বারা সম্ভব নয়। আসলে, সাধারণ মানুষ অনেক সময় মহান ব্যক্তিদের আদর্শ মুখে বললেও নিজের জীবনে তা পালন করার সাহস পায় না— তখন এটি একটি সম্পর্কের টানাপোড়েনের চেয়েও  সামাজিক দ্বিধার গল্পটাই বড় হয়ে ওঠে। বকুলের যুক্তিগুলো বাস্তবসম্মত হলেও ক্যামেলিয়ার প্রশ্নগুলো কিন্তু নৈতিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী।
 
নাটকের শেষ দৃশ্য—(ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ড)
(বকুল ও রাধার কথোপকথন):
 
এই নাট্যাংশটি বকুলের স্মৃতির এক শোকাতুর বয়ান। এটি একটি গভীর বিষাদময় এবং ট্র্যাজিক অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি।
বকুলের সংলাপের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। মৌলবাদ ও অসহিষ্ণুতা কীভাবে একটি সাজানো সংসার এবং দুজন মানুষের স্বপ্নকে নিমেষেই ধ্বংস করে দিতে পারে। যেখানে একটি সুন্দর বসন্তের বিকেলে প্রেমের জয়গান হওয়ার কথা ছিল, সেখানে বুলেটের আঘাত সমাজব্যবস্থার চরম নিষ্ঠুরতাকে তুলে ধরেছে—যা ধর্মীয় উগ্রপন্থা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শিকার হওয়া সাধারণ মানুষের জীবনের এক বিষাদময় করুণ পরিণতি!
 
সংলাপে ব্যক্তিগত এক অপূরণীয় ক্ষতির কথা উঠে আসে বকুলের বর্ণনায়—'আমার বুকে মাথা রেখে, আমারই কোলের মধ্যে... সব শেষ হয়ে গেল—পাঠকের মনে এটি গভীর এক সহমর্মিতা জাগায়। এটি কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং একটি আদর্শ ও ভালবাসার অকাল পরিসমাপ্তি।
নাটকের এই সংলাপ দৃশ্যে বিচারের অপ্রাপ্তি ও অসহায়ত্ব দেখতে পাওয়া যায়। একনায়কতন্ত্র শাসনব্যবস্থার অধীনে প্রশাসন যখন নীরব থাকে, তখন একজন সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব আরও প্রকট হয়। বিচার না পেয়ে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তটি প্রতিবাদের চেয়েও বেশি এক গভীর হতাশা এবং নিরাপত্তার অভাবকে নির্দেশ করে।
এখানে জীবনযুদ্ধ ও টিকে থাকার লড়াই পরিলক্ষিত হয়। বদলা না নিয়ে আম্মীকে নিয়ে চলে আসার মধ্যে একধরণের বাস্তববাদী ক্লান্তি রয়েছে। রাধা যেখানে 'বদলা'র কথা বলছে, সেখানে বকুল বেছে নিয়েছে কেবল বেঁচে থাকা এবং স্মৃতির ভার বয়ে নিয়ে চলাকে।
 
যেকোনও নাটকের ক্ষেত্রে শেষ অংশটি কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাঠক বা সমাজের প্রতি নাটকের মেসেজটা মূলত এখানেই থাকে।
এই অংশটি পাঠ করার পর মনের মধ্যে এক ধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হল। একদিকে যেমন বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা ও বর্তমান প্রজন্মের শিকড়বিচ্ছিন্ন হওয়ার আক্ষেপ এবং সমাজের এক গভীর সংকটের প্রতিফলন ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে দুই বিপরীতধর্মী চরিত্রের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে এক ধরণের দৃঢ় সংকল্পের সুরও পাওয়া যায়। 
শেষ দৃশ্যে বকুল ও রাধার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে আমার ভাবনায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে উঠেছে, সেগুলি কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে আলোচনা করলে বোধ হয় পর্যালোচনাটির বোধগম্যতার পথ আরও সুগম হবে—
 
১) ভাষার সংকট ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং বিজাতীয় অনুকরণ:
 
বকুলের সংলাপে যে গভীর বিষণ্ণতা প্রকাশ পেয়েছে, তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। ২১শে ফেব্রুয়ারির দিন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সত্ত্বেও ঘরের কোণে বাংলা ভাষা যে ভাবে কোণঠাসা হচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে 'বিদেশি ভাষার গোলামি' করার যে প্রবণতা বাড়ছে, তা আমাদের বর্তমান সমাজের এক রূঢ় প্রতিফলন। বকুলের কথায়— প্রাণের তাগিদ হারিয়ে যাওয়ার যে আক্ষেপ, তা পাঠককে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।
উৎসবের প্রাণহীনতা এবং বিদেশি ভাষার প্রতি মোহ আমাদের নিজস্ব স্বকীয়তা হারানোর যন্ত্রণাকে তুলে ধরে। লেখক এখানে দেখাতে চেয়েছেন যে, দেশের মানুষ কীভাবে নিজেদের সংস্কৃতি থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।
 
২) আবেগ বনাম বাস্তবতার সংঘাত:
 
বকুলের চরিত্রে এক ধরণের হতাশাবাদী দেশপ্রেম দেখা যায়। তিনি বাঙালির আবেগকে 'পলিমাটির সন্তান' হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সমাজের 'স্বার্থপরতা' 'জাত্যাভিমান' হারিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ সমাজের কাঠামোতে এক বড়সড় 'ফাঁক' তৈরি হয়েছে।
 
অন্যদিকে রাধা চরিত্রটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রাণবন্ত। সে কেবল আক্ষেপ করে বসে থাকতে রাজি নয়, বরং কর্মের মাধ্যমে সেই আক্ষেপ দূর করতে চায়।
 
৩) ব্যক্তিগত সম্পর্কের নতুন রসায়ন:
 
নাটকের শেষ অংশে রাধা ও বকুলের সম্পর্কের মধ্যে এক সুন্দর উত্তরণ দেখা যায়। 'আপনি' থেকে 'তুমি' সম্বোধনে আসা এবং রাধার লোকাল গার্জেন হওয়ার দাবি বকুলের একাকীত্ব ও হতাশার জীবনে এক পশলা বৃষ্টির মতো কাজ করেছে। এটি নাটকের এই অংশে একটি মানবিক মোড় এনেছে। রাধার জেদ আর বকুলের সংকোচ—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত আশার জয় হয়েছে। এটি প্রতিকূল সময়ের মধ্যেও একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এক ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়।
 
৪) নিস্পৃহতা ও অবক্ষয়:
 
বকুল নিজেকে 'দাউদাউ আগুনের মতো দুর্ভাগ্য' হিসেবে বর্ণনা করে নিজের জীবনের কোনো এক গভীর ট্র্যাজেডির ইঙ্গিত দিয়েছে, যা সমসাময়িক মানুষের হতাশারই নামান্তর।
 
৫) জীবনমুখী সমাপ্তি:
 
নাটকটি কেবল অভিযোগ জানিয়ে শেষ হয়নি। আগুনের সঙ্গে আগুন মেলে ভালো—রাধার এই সংলাপটি ইঙ্গিত দেয় যে, অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে নিজের ভেতরের আগুনকে জ্বালিয়ে রাখতে হয়। বকুলকে বই প্রকাশের কাজে বের করে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে একটি সৃজনশীল কাজের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা নিরাশার অন্ধকারে আশার আলো দেখায়।
 
সামগ্রিকভাবে বলা যায়— নাটকটি কেবল একটি সাধারণ আলাপচারিতা নয়, বরং সমাজ ও সভ্যতার নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক করুণ আর্তি এবং আমাদের আত্মোপলব্ধির দর্পণ হিসেবে কাজ করে। সেই সঙ্গে অবশ্যই মৌলবাদের বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ।
কারণ, মৌলবাদ সমাজের বৈচিত্র্য ও সংহতি নষ্ট করে একটি রাষ্ট্রের প্রগতিশীল ভবিষ্যতের পথ রুদ্ধ করে দেয়।
তাছাড়া— এটি যেমন একদিকে আমাদের মাতৃভাষা—বাংলা ভাষার প্রতি অনীহা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তেমনই আবার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সহমর্মিতার মাধ্যমে সেই বন্ধ্যাত্ব কাটানোর পথও বাতলে দেয়।
পরিশেষে— বলা যায় নাটকটির কাহিনি, সংলাপ, চরিত্র ও দৃশ্যবিন্যাস চমৎকার। ঝরা বকুলের ঘ্রাণ, সামাজিক ও নৈতিক বার্তাবহ সুন্দর একটি নাটক। প্রিয় নাট্যকারকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানিয়ে পর্যালোচনায় এখানেই ইতি টানলাম।
এই নাটকের বিষণ্ণ মাধুর্য কোনো এক স্নিগ্ধ বকুল তলার স্নিগ্ধতার মতো আমার হৃদয়ে এক গভীর প্রশান্তি হয়ে মিশে রইল।
 

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)