প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

চৈতি হাওয়া—নববর্ষ

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ , ১৪৩৩ চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | সম্পাদকীয়   চৈতি হাওয়া—নববর্ষ "দুগ্ধপোষ্য...

Wednesday, April 8, 2026

চৈতি হাওয়ায় মায়ার ছায়া | এম.এম.সাইফুল ইসলাম

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | ছোটগল্প
এম.এম.সাইফুল ইসলাম
 
চৈতি হাওয়ায় মায়ার ছায়া

"যদি কখনো এই হাওয়ায় আমাকে মনে পড়েবুঝবে আমি কোথাও হারিয়ে যাইনি। আমি এই হাওয়াতেই আছি। তারপর মায়া চলে গেল। সেই থেকে প্রতি চৈত্রে প্রতি বিকেলে নওশাদ নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকে।"

 
চৈত্রের শেষ বিকেল। আকাশটা আজ কেমন যেন ফিকে আর তামাটে হয়ে আছে। তপ্ত রোদটা তীক্ষ্ণ হলেও তার মধ্যে এক ধরণের পরিশ্রান্ত ভাব। দিগন্তের ওই প্রান্ত থেকে তেড়ে আসা হালকা এক হাওয়া যখন ধুলোবালি উড়িয়ে গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে বয়ে যায়, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। গ্রামের শেষ সীমানায় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছগুলো আজ বড় একা। এই হাওয়াটাই হলো ‘চৈতি হাওয়া’। এতে মিশে থাকে শুকনো ঝরা পাতার মচমচে শব্দ, পুরনো স্মৃতির নোনা স্বাদ আর এক অজানা বিষণ্নতা।
গ্রামের এক প্রান্তে ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর। সেখানে থাকে নওশাদ। বয়স সবে পঁচিশ কি ছাব্বিশ, কিন্তু তার চোখে-মুখে যেন অনেক বছরের ক্লান্তি জমে আছে। উঠোনের কোণে বসে সে আজও আকাশের দিকে উদাস মনে তাকিয়ে থাকে। চৈতি হাওয়া এসে তার অবিন্যস্ত চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়, কিন্তু তার ভেতরের এলোমেলো ভাবটা আর কেউ ঠিক করতে পারে না।
নওশাদের একটা পুরনো অভ্যাস হলো চৈত্র এলেই সে নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকে। কারণ এই হাওয়াটা তার কাছে কেবল বাতাস নয়, একটি জীবন্ত স্মৃতি। একটি নাম, ‘মায়া’। মায়া নামটা মনে পড়তেই নওশাদের বুকের ভেতরটা হালকা ব্যথা করে উঠল।
কয়েক বছর আগের কথা। তখন নওশাদ ছিল গ্রামের সবচেয়ে চঞ্চল ছেলে। আর মায়া ছিল তার ঠিক উলটো, শান্ত এবং লাজুক। কিন্তু মেয়েটির চোখ দুটো ছিল অতল গভীর। তারা প্রায়ই বিকেলে নদীর পাড়ে বসে থাকত। চৈত্রের এই সময়টায় হাওয়াটা একটু অন্যরকম হতো, শুকনো কিন্তু অদ্ভুত কোমল।
একদিন মায়া বলেছিল,
-জানো নওশাদ, এই চৈতি হাওয়াটা আমার খুব প্রিয়।
নওশাদ হেসে জিজ্ঞেস করেছিল,
-কেন?
মায়া একটু চুপ করে থেকে বলেছিল,
-কারণ এই হাওয়ায় বিদায়ের গন্ধ আছে, আবার নতুন শুরুরও।
নওশাদ তখন সেই কথার গভীরতা বুঝতে পারেনি, শুধু হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু কিছুদিন পরই মায়ার বাবা শহরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই বিদায়ের দিনটাও ছিল চৈত্রের এক তপ্ত বিকেল। ঠিক এমনই এক হাওয়া বইছিল চারদিকে। মায়া যাওয়ার আগে শুধু একটি কথাই বলেছিল,
-যদি কখনো এই হাওয়ায় আমাকে মনে পড়ে, বুঝবে আমি কোথাও হারিয়ে যাইনি। আমি এই হাওয়াতেই আছি।
তারপর মায়া চলে গেল। সেই থেকে প্রতি চৈত্রে প্রতি বিকেলে নওশাদ নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকে। সে জানে না মায়া কোথায় বা কেমন আছে, কিংবা আদৌ বেঁচে আছে কি না। কিন্তু চৈতি হাওয়া এলেই তার মনে হয় মায়া খুব কাছেই কোথাও আছে।
আজও সে নদীর পাড়ে গেল। আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে। হাওয়াটা একটু জোরে বইছে আর চারদিকে শুকন পাতা উড়ছে। হঠাৎ নওশাদ খেয়াল করল পাশে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে। সে তাকিয়ে দেখল একটি ছোট মেয়ে, বয়স বড়জোর দশ-এগারো। তার হাতে কিছু শুকনো বুনো ফুল। মেয়েটা মৃদু হেসে বলল,
-ভাইয়া, ফুল নেবেন?
নওশাদ কিছুটা অবাক হলো। এই চৈত্রের দুপুরে শুকনো ফুল কে কিনবে? তবু মেয়েটার চোখে কিছু একটা ছিল, অদ্ভুত পরিচিত এক চাউনি। সে জিজ্ঞেস করল,
-এই ফুল দিয়ে কী করবে?
মেয়েটি হাসিমুখে উত্তর দিল,
-আম্মুর জন্য। আজকে কিছু বিক্রি করতে পারলে ওর জন্য ভাল কিছু খাবার নিয়ে যাব।
নওশাদের বুকটা কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠল। সে হুট করেই পকেট থেকে টাকা বের করে সব ফুল কিনে নিল। মেয়েটা অবাক হয়ে তাকাল, তারপর এমন এক নির্মল হাসি দিল যেন পুরো পৃথিবীটা এক মুহূর্তে সুন্দর হয়ে গেল। ঠিক তখনই চৈতি হাওয়াটা একটু জোরে বয়ে গেল। নওশাদের মনে হলো এই হাসি আর এই চোখ কোথায় যেন আগে দেখেছে সে। সে কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
-তোমার নাম কী খুকি?
মেয়েটি উত্তর দিল,
-আমার নাম মায়া।
নওশাদের শরীরের রক্ত যেন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। চারপাশে হাওয়াটা হুহু করে বইছে, নদীর জল কাঁপছে আর আকাশটা সিঁদুরে লাল হয়ে উঠেছে। সে কিছু বলতে পারল না, শুধু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটা মিষ্টি করে হেসে বলল,
-আচ্ছা ভাইয়া, আমি যাই।
তারপর সে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল গোধূলির আলোয়।
নওশাদ অনেকক্ষণ একা দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো এটা কি কেবলই কাকতালীয়? নাকি সত্যিই চৈতি হাওয়ার ভেতর লুকিয়ে থাকা কোনো দৈব বার্তা? সে আকাশের দিকে তাকাল। হাওয়াটা তার গালে এসে স্পর্শ করল। এবার আর সেই হাওয়াটা তার কাছে বিষণ্ন লাগল না। বরং মনে হলো এটা যেন এক অমোঘ আশ্বাস। হয়তো সব বিদায় শেষ নয়। কিছু বিদায় ফিরে আসে অন্য রূপে, অন্য নামে বা অন্য কোনো গল্প হয়ে।
চৈতি হাওয়া আবার বইছে। কিন্তু এবার নওশাদের চোখে জল নেই, তার ঠোঁটে লেগে আছে হালকা এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। কারণ সে আজ বুঝে গেছে চৈতি হাওয়া মানে শুধু বিদায় নয়, এটি আসলে নতুন কোনো সুন্দর গল্পের শুরু।
 
~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)