বাতায়ন/ঝড়/হলদে খাম/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড় | হলদে খাম
সুশীল বসাক
জীবনানন্দের
চিঠি
১৯২৭ সালে 'ঝরা পালক' কাব্যগ্রন্থটি
স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রবীন্দ্রনাথকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ। বইটি পড়ে কবিকে
একটি চিঠি লেখেন রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বকবির লেখা সেই চিঠির প্রত্যুত্তরে এই নিম্নোক্ত
চিঠিটি লেখেন কবি জীবনানন্দ।
শ্রীচরণেষু,
চিঠিতে আপনি যেসব কথা উল্লেখ
করেছেন সে সম্পর্কে দু-একটা প্রশ্ন উঠে আসছে। অনেক উঁচু জাতের রচনার মধ্যে দুঃখ বা
আনন্দের একটা তুমুল আলোড়ন দেখতে পাই। কবি কখনও আকাশের সপ্তর্ষিমন্ডলকে আলিঙ্গন
করার জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠেন—আবার, কখনও পাতালের
অন্ধকারে দিশাহীনভাবে ঘুরতে থাকেন। কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যে কিংবা জ্যোতির্লোকের
ভিতরেও প্রশান্তি যে খুব নেই তা তো মনে হয় না। প্রাচীন গ্রিকরা 'সেরেনিটি' জিনিসটার প্রতি
অনুরক্ত ছিলেন। তাদের কাব্যের ভিতরে এই সুর অনেক ভাবে ফুটে উঠেছে। দান্তের 'ডিভাইন কমেডি' কিংবা শেলির ভিতর 'সেরেনিটি' বিশেষ নেই। আমার মনে
হয় বিভিন্ন রকম পরিস্থিতিতে এসে মানুষের মনে নানান সময়ে নানান 'মুডস' খেলা করে। সে 'মুড'গুলোর প্রভাবে মানুষ
কখনও মৃত্যুকেই বঁধু বলে সম্বোধন করে, অন্ধকারের মধ্যেই মায়ের চোখের ভালবাসা খুঁজে পায়, বিনষ্টির মধ্যেও বীণার তার বাঁধবার ভরসা পায়। যে জিনিস তাকে
খুশিতে ডগমগ করে তোলে অপরের চোখে হয়তো তা নিতান্তই তুচ্ছ। তবু, তাতেই তার প্রাণে সুরের পরশ লাগে—সে পরশ নিতান্তই ভোলার নয়।
'মুডের' রচনার ভেতরে এই সুরের পরশ থাকে বলেই 'সেরেনিটি' নাও থাকতে পারে। কিন্তু
তাই বলে সে সৃষ্টি সুন্দর ও স্থায়ী হতে পারে না তা মনে হয় না।
আমার যা মনে হয়েছে তাই আপনাকে
জানালাম। আপনার অন্তরের আলোকে আমার ত্রুটি,
অক্ষমতা
মার্জনা করে নেবেন। আপনার কুশল প্রার্থনীয়। আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম নিবেন।
প্রণত—
জীবনানন্দ।
ঝড় | হলদে খাম
সুশীল বসাক
"প্রাণে সুরের পরশ লাগে—সে পরশ নিতান্তই ভোলার নয়। 'মুডের' রচনার ভেতরে এই সুরের পরশ থাকে বলেই 'সেরেনিটি' নাও থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে সে সৃষ্টি সুন্দর ও স্থায়ী হতে পারে না তা মনে হয় না।"
আপনার স্নেহাশিস লাভ
করে অন্তর পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। আজকালকার বাংলাদেশের নবীণ লেখকদের সবচেয়ে বড়
সৌভাগ্য এই যে, তারা তাদের মাথার
উপরে স্পষ্ট সূর্যালোকের মতো আধুনিক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীকে পেয়েছে। এত বড় দানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে যতখানি গভীর
নিষ্ঠার দরকার তা দেবতা পূজারীকে দিতে কখনও কুন্ঠিত হননি। কিন্তু দানকে ধারণ করতে
হলে যে শক্তির প্রয়োজন তার কিঞ্চিৎ অভাব অনুভব করছি। অক্ষম হলেও শক্তির পূজা করা
এবং শক্তির আশীর্বাদ ভিক্ষা করা দুই-ই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাধনা। আর আমার
জীবনের তুচ্ছ সেই আরাধ্য শক্তির সাথে কল্যাণময়ের শক্তির উৎসের যোগাযোগ রক্ষা করাই
আমার জীবনের লক্ষ্য। আশা করি এর থেকে আমি বঞ্চিত হব না।
জীবনানন্দ।

No comments:
Post a Comment