বাতায়ন/নাসির ওয়াদেন
সংখ্যা/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/২রা আষাঢ়, ১৪৩৩
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা
| ছোটগল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
বৃষ্টিভেজা
সন্ধ্যা
"হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে এইটুকু কোনমতে বলে অনুমিতা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। প্রত্যুষ অনুর থুতনিটা তুলে ধরে বলল,"
আকাশে স্তূপ স্তূপ মেঘ জমেছে।
ছাদের আলসে ধরে অভিমানী মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনুমিতা। বৃষ্টি ঝিরঝির করে পড়তে
আরম্ভ করেছে। অনুমিতা গুণগুণ করে গান আরম্ভ করল, 'কবে নব ঘন বরিষণে গোপনে গোপনে এলি কেয়া— ছায়া''।
হঠাৎ ভরাট পুরুষ কণ্ঠে গেয়ে
উঠল, "পূরবে নীরব ইশারাতে একদা
নিদ্রাহীন রাতে"। কণ্ঠস্বর শুনেই অনুমিতার মেঘের মতন মুখটা নির্মল হাসিতে ভরে
উঠল, সে ছুটে এলো গায়কের কাছে
বুকের ওপর কিল মেরে বলল,
-কবে একটু কী বলেছিলাম তারজন্য এত শাস্তি? কতদিন পরে এলে বল তো প্রত্যুষদা? কতবার ভুল স্বীকার করে মেসেজ পাঠালাম তাও কোন উত্তর নেই।
হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে এইটুকু
কোনমতে বলে অনুমিতা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। প্রত্যুষ অনুর থুতনিটা তুলে ধরে বলল,
-এখন এত কান্না কেন?
সেদিন
তো ডাঁট দেখিয়ে খুব বললে, যাও আর আসতে হবে না।
-আরে সে রাগের মাথায় অনেকে অনেক কিছু বলে সব অত ধরে না কি?
-ধরতে নেই না, কথাটা নিজের বেলায় মনে থাকে যেন।
-হ্যাঁ মনে
থাকবে।
-তাহলে মনে করে
বল তো তুমি কী বলেছিলে?
-আমার যতদূর
মনে পড়ছে আমি বলেছিলাম, "এই তুমি রোজ এসো না তো, আমার তো পরীক্ষা,
আর কদিন
পরে, বাপি আমাকে বলছিল সামনে
পরীক্ষা পড়াশোনায় তো খুব অমনোযোগী দেখছি। তোমরা ছেলেরা যে মেয়েদের অসহায় অবস্থাটা
কবে বুঝবে?
-আর তোমরা
মেয়েরা যে ছেলেদের অসহায় অবস্থাটা কবে বুঝবে?
-আচ্ছা চল অনেক
ঝগড়া হয়েছে এবার একটু শ্রাবণের গান গাই, আর তোমার শ্রাবণের কবিতা শুনি।
-আমার শ্রাবণের
কবিতাগুলো বৃষ্টিতে সব ভিজে গেছে অনু,
কবিতাগুলো
সব ঘুমিয়ে আছে আমার হৃদয়ের গভীর অন্তরে।
-দূর পাগল
কবিতা তো তোমার বুকে, তোমার মনের আধারে
আছে। হয়তো কিছুদিনের জন্য ঘুমিয়ে আছে আবার এক নতুন ভোরের আলোর আদরের ছোঁয়ায় তারা
আবার জেগে উঠবে দেখ।
প্রত্যুষের মনে হতে লাগলো
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসার সময় অনুর বাবার কড়া ভাষায় অপমানজনক কথাগুলো। আজ প্রত্যুষ
ওপরে উঠে আসার সময় অনুর বাবা হঠাৎ প্রত্যুষকে ডেকে বললেন,
-প্রত্যুষ শোন
তোমার সাথে আমার একটা কথা ছিল।
-হ্যাঁ
কাকাবাবু বলুন।
মনের মধ্যে তখন বোধহয় সাময়িক
বসন্তের বাতাস বয়ে গেল। তারপর আবার সেই গম্ভীর গলা ভেসে এলো,
-হ্যাঁ যা
বলছিলাম তুমি অনুর সাথে মেশা বন্ধ করে দাও একেবারে। বহুকষ্টে আমি আর অনুর মা ওকে
কর্পোরেটে কাজ করা একজন ব্রিলিয়ান্ট ছেলের সাথে বিয়ের ঠিক করেছি, তোমার সাথে মিশতে আরম্ভ করলে বেঁকে বসতে পারে।
এবার ভরাট গম্ভীর গলায়
প্রত্যুষও বলল,
-দেখুন মেশোমশাই আমি আজ এসেছিলাম ও অনেকবার ফোন করেছিল বলে, নইলে আসতাম না। আমিও একজন রিসার্চ স্কলার, তারপর হাত জোর করে নমস্কার করে বলল, আচ্ছা আমি আসছি।
তাই যে মন নিয়ে অনুর কাছে
এসেছিল তা যেন একটু ধাক্কা খেল।
এর তিন মাস পর। প্রত্যুষ
মনপ্রাণ দিয়ে রিসার্চের কাজ করছে, কোনদিকে না তাকিয়ে। ফোনটা
বেজে উঠল, প্রত্যুষ নাম না দেখে ফোনটা
কেটে দিল। আবার ফোন বেজে উঠল, প্রত্যুষ ফোন কেটে
দিল। পরের বার ফোন করতে ফোনটা ধরে ধমকের সুরে বলে উঠল,
-কী ব্যাপার, এত রাতে বিরক্ত করছ কেন?
-কেন এরকম করছ
বল তো আমার সাথে?
-তোমার তো
বিয়ের ঠিক হয়ে গেছে, তারপরও ফোন করে এত
বিরক্ত? আমারও একটা আত্মসম্মান আছে
ভবিষ্যতে আর কোনদিন আমাকে ফোন করবে না,
তোমার
বাবা আমাকে সেদিন যেভাবে অপমান করলেন তারপরও তুমি কী করে আমাকে ফোন করার কথা ভাবলে?
-বাবা তোমাকে
অপমান করেছেন তা তোমার মুখে এইমাত্র শুনলাম। আমি তোমাকে ভালবাসি এখনও তাই তোমাকে
নির্লজ্জের মতন ফোন করি, সেটা তুমি বুঝতেই
পারলে না, আর নিষ্ঠুরভাবে আমাকে অপমান
করে গেলে।
প্রত্যুষ অবাক হয়ে বলল,
-তুমি জানতে না?
তোমার
বিয়ের কথা?
-না আমি কিছু
জানতাম না। বাবা-মা দুজনে মিলে অত্যন্ত জোর করে বলতে পারো
প্রায় ব্ল্যাকমেল করে রাজি করিয়েছেন।
-সরি অনু সরি, আমিই বা কী করে বুঝব বল যে তোমাকে প্রেশার দিয়ে রাজি করানো হয়েছে?
-মেয়েরা যে কত
অসহায় তা তোমরা কোনদিন বুঝবে না।
-সত্যি আমরা
বুঝি না, আমার তোমার সাথে ভাল
করে কথা বলে বুঝিয়ে বলা উচিৎ ছিল।
-এখন আমাদের কী করা উচিৎ প্রত্যুষদা?
-এখন তুমি বিয়ে
করে নাও বাবা-মায়ের কথা মতো। ওরা যখন
কিছুতেই রাজি নন তখন এ ছাড়া তো উপায় নেই। তোমাকে আর একটা কথা বলি। রাগ কর-না। তুমি যে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলে তা
আবেগের, সত্যি কথা বল তো? তুমি যে স্ট্যাটাসে বড় হয়েছ তাতে আমাদের মতন একান্নবর্তী
পরিবারে একেবারেই মানাতে পারতে না, প্রথম অসুবিধা হবে
টয়লেটের, অতগুলো লোকের জন্য মাত্র
তিনটে টয়লেট, তুমি একা একটা টয়লেট ব্যবহার
কর তাছাড়া আমাদের বাড়ি দেখতে বড় হলেও তা কাকা, জ্যাঠা মিলে অনেকের পুরানো বাড়ি, তোমাদের মতন ঝাঁ
চকচকে নয়। সবদিকটা ভেবে দেখতে হবে যে,
বাস্তবের
মাটিতে এসে ভালবাসা দুদিনেই জানলা দিয়ে পালিয়ে গেছে। আর যে আমাদের আলাদা থাকার কথা
তুমি বলেছিলে তা কোনমতে সম্ভব নয়, আমার পক্ষে বাড়ি ছেড়ে
অনত্র ফ্ল্যাট নিয়ে থাকা সম্ভব নয় দ্বিতীয়ত তোমার বাবার কর্পোরেট জগতের বাইরে যে
পড়াশোনা বা রিসার্চের একটা জগত আছে তার কাছে তার কোন মূল্য নেই। কাজেই যাকে বিয়ে
করতে যাচ্ছ তাকে ভালবেসো আর আমাকে ভুলে যেতে চেষ্টা কর।
-আর আমাদের সেই
বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাগুলো?
-সেও থাকবে
হৃদয়ের কোণে কোন এক গোপন অযত্নে অবহেলায়, আবার কোন এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় হৃদয়ের গোপন কোণে এসে ঘা দিয়ে যাবে বলবে, 'দরজা খোল আমি এসেছি,
একবারের
জন্য আমায় কাছে ডেকে নাও।
অনু বলল,
-আমি চিরকাল
থাকব তোমাদের মনের কোণে একটি ভালবাসার পাখি হয়ে ভুলে যেও-না
কিন্ত আমাকে।
প্রত্যুষ রাখি তাহলে, বলেই ফোনটা কেটে দিল। তার পুরুষ চোখও আজ জলে ভিজে গেল। অনুও
আপন মনে বসে আছে, দু চোখ দিয়ে জলের
ধারা আপন মনে গান গেয়ে যাচ্ছে 'আজ শ্রাবণের
পূর্ণিমাতে'।
মা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে
বললেন,
-মন খারাপ করে না মা,
দেখবি আস্তে আস্তে সব
ঠিক যাবে।
-হ্যাঁ সে তো
যাবে শুধু মরে যাবে আমাদের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা আর এক শ্রাবণের প্রত্যুষদার
শ্রাবণের কবিতাগুলো।
অনু নিজের মনে বলতে লাগল এই
ভাবেই মরে যায় কত মেয়ের, স্বপ্নের ভালবাসা।
পড়ে থাকে শুধু কিছু স্মৃতি।
~~000~~
No comments:
Post a Comment