প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Wednesday, June 17, 2026

অপেক্ষার প্রহর | সূপর্ণা চন্দ

বাতায়ন/নাসির ওয়াদেন সংখ্যা/গদ্য/৪র্থ বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/২রা আষাঢ়, ১৪৩৩
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | গদ্য
সূপর্ণা চন্দ
 
অপেক্ষার প্রহর

"অপেক্ষা মানে নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় মানুষ চুপচাপ বসে আছে, কিন্তু ভেতরে চলছে তীব্র আলোড়ন। প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে—এই অপেক্ষার শেষ কোথায়?"

 
অপেক্ষা—মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। জন্মের পর থেকেই মানুষ যেন অপেক্ষার পাঠ নিতে শুরু করে। শৈশবে বড় হওয়ার অপেক্ষা, কৈশোরে নিজের পরিচয় খোঁজার অপেক্ষা, যৌবনে সাফল্য আর ভালোবাসার অপেক্ষা, আর পরিণত বয়সে স্থিরতার অপেক্ষা—এইভাবেই অপেক্ষা মানুষের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে ওঠে। অথচ এই অপেক্ষা কখনোই প্রকাশ্যে উচ্চকণ্ঠ হয় না; সে নীরবে মানুষের ভেতরে জমে ওঠে।
অপেক্ষা মানে কেবল সময় পার করা নয়। অপেক্ষা মানে নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় মানুষ চুপচাপ বসে আছে, কিন্তু ভেতরে চলছে তীব্র আলোড়ন। প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে—এই অপেক্ষার শেষ কোথায়? আদৌ কি শেষ আছে? তবু মানুষ থামে না, কারণ অপেক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আশা। আর আশা ছাড়া মানুষ বাঁচে না।
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই অপেক্ষার মধ্য দিয়েই আসে। একটি চাকরির ইন্টারভিউয়ের ফল, একটি পরীক্ষার রেজাল্ট, প্রিয় মানুষের উত্তর, কিংবা বহুদিনের স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত—সবকিছুর আগেই থাকে দীর্ঘ অপেক্ষা। এই সময়টুকু মানুষকে ভেঙেও দেয়, আবার গড়েও তোলে। যে অপেক্ষা করতে পারে না, সে অনেক সময় জীবনের গভীরতাকেও বুঝতে পারে না।
আজকের দ্রুতগতির সময়ে অপেক্ষা যেন এক অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা। প্রযুক্তির দুনিয়ায় সবকিছু এখন ‘এখনই’ চাই। কিন্তু জীবন প্রযুক্তির মতো কাজ করে না। জীবন ধীরে চলে, নিজের ছন্দে। সে কাউকে তাড়া পছন্দ করে না। তাই জীবন বারবার মানুষকে থামিয়ে দেয়, শেখায়—সবকিছুর জন্য সময় লাগে, ধৈর্য লাগে।
অপেক্ষার সবচেয়ে কঠিন দিক হলো অনিশ্চয়তা। জানা নেই—এই অপেক্ষার শেষে সুখ আসবে, না হতাশা। তবু মানুষ অপেক্ষা করে। কারণ মানুষের মন আশায় ভর করে বাঁচে। অপেক্ষার সময় মানুষ নিজের অতীতের দিকে তাকায়, নিজের ভুলগুলো চিনে নেয়, নিজের শক্তি আর দুর্বলতার মুখোমুখি হয়। এই আত্মসমালোচনাই মানুষকে পরিণত করে।
অনেক অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায় না। কিছু স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়। কিছু মানুষ জীবনে এসেও থেকে যায় কেবল স্মৃতিতে। তবু সেই অপেক্ষাগুলো বৃথা নয়। কারণ তারা মানুষকে শেখায় মেনে নিতে, হারকে সম্মান করতে, আর জীবনের বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে। অপেক্ষার মধ্য দিয়েই মানুষ শেখে—সব পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু তাতেই জীবনের সৌন্দর্য কমে না।
অপেক্ষার আরেকটি দিক আছে, যা আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না। অপেক্ষা আমাদের ভেতরে ধৈর্যের পাশাপাশি কৃতজ্ঞতাও জন্ম দেয়। যখন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কোনো স্বপ্ন পূরণ হয়, তখন সেই প্রাপ্তির আনন্দ অনেক গভীর হয়। সহজে পাওয়া জিনিসের মূল্য মানুষ সবসময় বোঝে না, কিন্তু অপেক্ষার পর পাওয়া সামান্য সাফল্যও হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেয়। তাই অপেক্ষা আমাদের শেখায় প্রাপ্তিকে সম্মান করতে।
তবে অপেক্ষা মানেই কেবল স্থির থাকা নয়; অপেক্ষা মানে প্রস্তুতি নেওয়া। যে সময়টুকু আমরা অপেক্ষায় কাটাই, সেটাই হতে পারে নিজেকে আরও দক্ষ করে তোলার, নিজের ভেতরটাকে গুছিয়ে নেওয়ার সময়। অনেক সময় আমরা ভাবি—সব ঠিক হলে তবে শুরু করব। অথচ সত্য হলো, অপেক্ষার সময়টুকুই আসল প্রস্তুতির সময়। এই প্রস্তুতিই ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দেয়।
অপেক্ষা মানুষকে সম্পর্কের মূল্যও শেখায়। কারও জন্য অপেক্ষা করা মানে তাকে গুরুত্ব দেওয়া, তাকে নিজের সময়ের অংশ করে নেওয়া। আবার কেউ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে—এই অনুভূতিও গভীর এক আশ্বাস দেয়। তাই অপেক্ষা কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, এটি সম্পর্কের এক নীরব ভাষাও।
অপেক্ষা মানুষকে সংযত করে, নম্র করে। সে মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—জীবন কোনো দৌড় প্রতিযোগিতা নয়, বরং এক দীর্ঘ যাত্রা। যেখানে থেমে দাঁড়ানোরও মূল্য আছে। যেখানে না-পাওয়ার মধ্যেও শেখার সুযোগ থাকে।
সবচেয়ে বড় কথা, অপেক্ষা আমাদের শেখায় বর্তমানকে অনুভব করতে। আমরা প্রায়ই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকতে গিয়ে বর্তমানকে হারিয়ে ফেলি। কিন্তু অপেক্ষার সময়েই মানুষ নিজের চারপাশকে নতুন চোখে দেখে, ছোট ছোট মুহূর্তের সৌন্দর্য খুঁজে পায়। তখন বোঝা যায়—গন্তব্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, পথও ততটাই মূল্যবান।
সবশেষে বলা যায়, অপেক্ষা জীবনের নীরব শিক্ষক। সে কড়া শাসন করে না, তবু গভীর শিক্ষা দেয়। যে মানুষ অপেক্ষা করতে শেখে, সে কেবল সময়কে নয়—নিজেকেও বুঝতে শেখে। আর এই বোঝাপড়াই মানুষকে সত্যিকারের পরিণত করে তোলে।
 

~~~000~~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)