বাতায়ন/তূয়া
নূর সংখ্যা/হলদে খাম/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া
নূর সংখ্যা | হলদে খাম
অদিতি চ্যাটার্জি
সোনালিকে অদিতি
"আর বাংলাদেশে ফিরে যাননি। একাত্তর সালের পরেও না। কিন্তু মিতা হক, সানজিদা খাতুন সবার গান শুনতেন, লেখা পড়তেন আমাদের বাড়িতে দাদুর মধ্যে একটা বাংলাদেশ বেঁচেছিল।"
প্রিয় সোনালি,
আমাদের পরিচয় সমাজমাধ্যমে, তোমার লেখার মধ্যে দিয়ে তোমার চিন্তার জগত, তোমার তোলা তোমার দেশের ছবি ওই লাইক, কমেন্টস, শেয়ারের বাইরে তোমার
সাথে আরো একটু কথা বলতে আমাকে উৎসাহিত করে। বিগত চার বছর আমরা মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ-এর দুনিয়ার মধ্যে আটকে আছি, চাক্ষুষ দেখাটা এখনো হয়ে ওঠেনি, জানি না আমার ভারতের সাথে তোমার বাংলাদেশের যা সম্পর্ক সহজে
হয়তো আর দেখা হবে না!
যে কারণে এই চিঠি লিখতে বসলাম, কাগজ (আনন্দবাজার ২০.১২.২৫. ২১.১২.২৫.)
ও
সমাজমাধ্যমে বাংলাদেশের খবর পড়ে শিউরে উঠেছিলাম, তবুও মনে হচ্ছিল চিঠিটা কি লেখা উচিত হবে, জানি না আমি তোমাকে বোঝাতে পারব কিনা খবরগুলো পড়ে আমিও কষ্ট
পেয়েছি, তোমারই মতো। তুমি স্বপ্ন
দেখছিলে নির্বাচন হবে নতুন বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, তোমার বাংলাদেশ আবার আগের মতো হয়ে উঠবে চাপা আতঙ্কে থাকতে
হবে না, অন্য ধর্মের মানুষ আর
আক্রান্ত হবে না। আমিও আশা রাখছিলাম সেই শুভ দিনটার জন্য, কারণ প্রতিবেশী যদি খারাপ থাকে, ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে আমিও ভাল থাকতে পারি না। খুব
চাইছিলাম ভারতের প্রতি যে বিদ্বেষের আগুন জ্বলছে (সবার মনে না), সেটা বন্ধ হবে। আর ভিসা পেতে সমস্যা হবে না সাধারণ মানুষের।
সোনালি তুমি জানো বাংলাদেশকে কলকাতার বাঙালিরা কী অসম্ভব ভালবাসে। তোমাদের শাড়ি থেকে হুমায়ুন আহমেদ হয়ে নিশো কী জয়া আহসান, চঞ্চল চৌধুরী আমাদের
কলকাতার বাঙালিদের খুব প্রিয়। আয়ুব বাচ্চু আর নগর বাউলকে আমি রাতে ঘুম না এলে ইউটিউবে চালিয়ে শুনে গেছি। পয়লা বৈশাখে যত আমরা শ্রেয়া গুহঠাকুরতাকে
শুনেছি অদিতি মহসিনকেও শুনে গেছি। তোমাদের ছায়ানট তো ফিনিক্স পাখি, আগুনের কালে তার জন্ম,
২০০১
সালে বোমায় সে আক্রান্ত হয়ে আবারও পথ চলতে শুরু করে, সানজিদা খাতুন মহাশয়ার তো দেশ-কালের ভাগ হয় না, তাঁর প্রয়াণে আমরা সবাই কেঁদেছি স্বজন হারানোর শোকে, আবারও কাঁদলাম শনিবার খবরের কাগজের পাতায় চোখ রেখে, হারমোনিয়াম ভাঙা থেকে সানজিদা খাতুনের ছবি নষ্ট করা
দেখে। কিন্তু ওই যে প্রথমেই বলেছিলাম ফিনিক্স পাখি, তাই তোমাদের ছায়ানটের ছাত্র-ছাত্রীদের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে
দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেছে।
আমার মায়ের বাবা বাহান্ন সালে
ভাষা আন্দোলনের কথা বলতেন আমাদের, মুখ্যমন্ত্রী লিয়াকত
হোসেন (?) এবং মহঃ আলী জিন্নার ঘোষণার
বিরুদ্ধে (উর্দু হবে প্রধান ভাষা) প্রতিবাদ জানায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্রকে এক বছর বহিষ্কার করা হয়, পরের বছর পরীক্ষা দিয়ে এই দেশে, আর বাংলাদেশে
ফিরে যাননি। একাত্তর সালের পরেও না। কিন্তু মিতা হক, সানজিদা খাতুন সবার গান শুনতেন, লেখা পড়তেন আমাদের বাড়িতে দাদুর মধ্যে একটা বাংলাদেশ
বেঁচেছিল। জানো কত বাংলাদেশের মানুষ এই শহর,
এই দেশে
চিকিত্সার জন্য আসেন। জানো নিউমার্কেটের পেছন দিকে যেখানে কনজিউমার অ্যাফেয়ারসের
অফিস আছে, ওখানে একটা ছোট করে ‘শ্রী লেদারস’ আছে তার আশেপাশে কত গেস্ট হাউস, যেখানে বেশির ভাগ অতিথি কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ। ওখানে আমি দেখেছিলাম সৌহার্দ্য আর
শ্যামলী বাস দুটোকে। যেটা চলে যাবে বাংলাদেশ! জানি না নির্ভয়ে আবার কবে যাওয়া-আসা
শুরু হবে।
তোমাকে কয়েকটি মজার ঘটনা বলি
যার সব কিছুর সাথে আমি জড়িত। টালিগঞ্জের হাউজিং-এ যখন থাকতাম আমরা, জেঠিনের কিছু
আত্মীয়স্বজন থাকতেন চট্টগ্রামে,
দেবু-দা, বুলাপিসি ওঁরা যখন আসতেন কলকাতায়, জেঠিন শুঁটকিমাছ রান্না করত, হয়তো ওঁরা নিয়ে আসতেন। আমার ছিল একবার নেমন্তন্ন, তেল দেওয়া, লাল রঙের ঝাল
রান্নাটা খাচ্ছি তো বেশ, কিন্তু জলও খেয়ে চলেছি পাল্লা দিয়ে। মনে আছে, বুলাপিসি মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিচ্ছে। আর দাদা, দেবু-দা, জেঠু আমার খাওয়া দেখে
হাসছে। আবার কচি-বাঁশের সুপও খেয়েছি। খাব কী গো! চামচে
তুলে দেখেই যাচ্ছি এটা বাঁশ! খাব?
মুখে
দিয়ে মনে হলো মাছ বা মাংসের মতো অনেকটা। সেই প্রথম ক্লাস ফোর কী ফাইভের একটা
মেয়ের সরাসরি বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ। আবার মণিমেলাজেঠির কথা মনে
আসছে, স্বাধীনতার কিছুটা পরে তাঁর
জন্ম। উত্তর কলকাতার মেয়ে, জেঠি বাংলাদেশে
কিন্তু যাননি যখনই মা কিছু রান্না করে দিত বলতেন, ‘দূর তোমাদের ঘটি (বিবাহ সূত্রে মা ঘটি)দের মিষ্টি রান্না ভাল না। রান্না জানি
আমরা ঢাকার লোকরা।’ ভাবো আজীবন কলকাতা থাকা, নাটক করা মেয়ে সে নিজেকে বলছে, ‘ঢাকার’ মানুষ। সত্যি এই ইমোশনের কি কোনো ব্যাখ্যা
হয়! এই পশ্চিমবঙ্গের কমবেশি প্রতিটা মানুষ তোমার দেশটাকে নিজের মতো করে ভালবাসে।
যাইহোক চিঠিটা বড্ড লম্বা হয়ে
যাচ্ছে, গতবছরের মতো এই বছরও কলকাতা বইমেলাতে বাংলাদেশের প্যাভিলিয়নকে মিস করব।
আমি 'শহীদের মা' কিনেছিলাম জানো! সেখানে দেখেছিলাম 'রাসেলের' ওপর লেখা ছোটদের বই।
স্টলে দাঁড়িয়ে খুব সাবধানে বইটা শেষ করে ঐশানীর জন্য কিনেছিলাম। সে মেয়ে তখন ক্লাস
সিক্স আর রাসেল ছিল ফোরের ছাত্র। বাংলা বেশি পড়ে না কিন্তু ওই বইটা পড়ে সেও আমার মতো রাসেলের জন্য
কেঁদেছিল। এইরকম রাসেলের গল্প যেন আর কোনো ঐশানী বা অদিতিকে পড়তে না হয়।
আশা করব বাংলাদেশ আবারও আগের
মতো হয়ে উঠুক, প্রিয় প্রতিবেশী বিদ্বেষ
পোষণ করলে, শান্তিতে কি থাকা
যায়!
ভাল থেক তুমি আর তোমার
বাংলাদেশ।
ইতি—
অদিতি
No comments:
Post a Comment