প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

তূয়া নূর সংখ্যা | জিরাফের গলা

বাতায়ন/ তূয়া নূর সংখ্যা/ সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/ ৪০ তম সংখ্যা/ ২৪শে মাঘ,   ১৪৩২ তূয়া নূর সংখ্যা | সম্পাদকীয়   জিরাফের গলা "সম্পূর্ণ ভাবে ...

Tuesday, January 21, 2025

শেষ থেকে শুরু [১২তম পর্ব] | পারমিতা চ্যাটার্জি

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক উপন্যাস/২য় বর্ষ/২তম সংখ্যা/১৮ই মাঘ, ১৪৩১
ধারাবাহিক উপন্যাস
পারমিতা চ্যাটার্জি
 
শেষ থেকে শুরু
[পর্ব – ১২]


"আসলে কী বল তো! আমি তোমার যোগ্য ছিলাম না ঠিকই কিন্তু সুচরিতার যোগ্য ছিলাম। ও আমাকে ভালবাসতযোগ্য সম্মান দিত। আমরা নিজেদের চিনতে অনেক দেরি করে ফেলিসামনে যে আছে তার তার চোখের ভাষাটা পড়তেও অনেক সময় লেগে যায়। তাই যা অনেক আগে হবার কথা ছিল তা অনেক পরে হচ্ছে।"

 
পূর্বানুবৃত্তি মনকলি বউয়া কাছে এসেছে দরকারে। সুচরিতা অবাক হয়ে রাহুলের দিকে তাকায়। রাহুল বলে, তোমার দরকারি কথা শুনেই যাইমনকলি বলে, বউয়াদা সেদিন তোমাকে যে নিষ্ঠুর অপমান করেছি তার জন্য মাপ করসুচরিতা ভয় ভয় গিয়ে রাহুলের পাশে বসল, রাহুল ওকে কাছে টেনে নিল, বুঝতে পারল, সুচি একটা অমূলক ভয় পাচ্ছেতারপর…

-না ছাড়ব না, আগে চোখের জল মোছো। তোমার মনে আছে সুচি? একবার রিহার্সালের সময়  তুমি আর প্রলয় ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলে আর আমি কী বকেছিলাম তোমাদের
-হ্যাঁ এমন করে বকলে যে আমি কেঁদেই ফেলেছিলাম।
-তখন আমি ব্যস্ত হয়ে তোমার কাছে এসে বললাম, আর কাঁদতে হবে না এবার রিহার্সালে মন দাও। তাও দেখি মেয়ের কান্না থামে না, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কী কান্না


-নাও এবার সরো
-তখন থেকেই তোমার কান্না আমার সহ্য হত না এখন তো আরও হয় না, রিহার্সালের পর ডেকে গোটা কয়েক লজেন্স দিয়েছিলাম।
-হ্যাঁ তা দিয়েছিলে কিন্তু
-কিন্তু কী?
-কিছু না সরো অতিথিকে খাওয়াই।
রাহুল মনে মনে ভাবতে লাগল, সুচি আজ আমি যাব বলায় এত দুঃখ পেল কেন? কী ভাবল মনের প্রতি আমার যদি আগের সেই দুর্বলতা ফিরে আসে!  তাই কী কখনও হয়, যে একবার সুচরিতার মতন স্নিগ্ধ মন আর ভালবাসা যত্নের স্বাদ পেয়েছে তার মন কী কখনও আর কোথাও যেতে পারে?
-চলো ওকে খাবার দি,
-হ্যাঁ চলো
বাইরের বসার জায়গায় এসে ওরা দেখল, মনকলি মাথায় হাত দিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। সুচরিতা টেবিলে খাবার বাড়ছিল, লাখিয়া এর মধ্যে ডিম চচ্চড়ি করে ফেলেছে এখন ব্যাসনে ডুবিয়ে বেগুন কুমড়ো সব ভাজছে।
রাহুল গিয়ে মনকলিকে বলল, চলো খেতে চলো
-হ্যাঁ যাচ্ছি, বলে উঠতে গিয়ে আবার বসে পড়ল
-কী হল?
বলে রাহুল এগিয়ে এল, সুচরিতা এসে সব দেখে মনের কাছে গিয়ে বলল,
-আয় আমার সাথে আয়, অনেকক্ষণ হয়ে গেছে কিছু খাসনি চল খেলে শরীরটা একটু ভাল লাগতে পারে। খালি পেটে অসুস্থ শরীরে গ্যাস হয়ে গেছে আসলে।
মনকলি টেবিলে এসে বসে বলল,
-কী! তোরা খাবি না?
রাহুল বলল,
-না আমরা এখন খাব না, তুমি খেয়ে নাও তারপরে আমরা পরে খাব
-ও আচ্ছা
বলে মনকলি খেতে আরম্ভ করল, সুচরিতাকে বলল,
-সুচি খিচুড়িটা না ফাটাফাটি হয়েছে
সুচরিতা হেসে বলল,
-খেয়েনে তারপর আর একটু দেব কিন্তু
-ওরে বাবা, এই খেয়েই হাঁপিয়ে গেছি আর পারব না।
-আচ্ছা তুই খা-না আসতে আসতে।
-বউয়াদা আমাকে মুম্বাইয়ে পৌঁছাতে তোমাকে যেতে হবে না, আমি একাই যেতে পারব। আর তাছাড়া তুমি পৌঁছে দেবে এই ভরসাতে তো আসিনি
বউয়া বলল,
-ঠিক আছে তোমার যাওয়ার এখন অনেক দেরি তার আগে তোমার বন্ধুর বিয়ে আছে সেটা তো এনজয় করো
-আসলে কী বল তো! আমি তোমার যোগ্য ছিলাম না ঠিকই কিন্তু সুচরিতার যোগ্য ছিলাম। ও আমাকে ভালবাসত, যোগ্য সম্মান দিত। আমরা নিজেদের চিনতে অনেক দেরি করে ফেলি, সামনে যে আছে তার তার চোখের ভাষাটা পড়তেও অনেক সময় লেগে যায়। তাই যা অনেক আগে হবার কথা ছিল তা অনেক পরে হচ্ছে।
আর একটু খেয়েই মনকলি উঠে পড়ল বলল,
-আর পারছি না রে
-সে কী রে! কিছুই তো খেলি না, একটু বেগুনি খেয়ে দেখ খুব মচমচে
-না রে, আমি কোনদিনই ওসব ভাজাপোড়া খাই না।
-ও হ্যাঁ সত্যি ভুলেই গিয়েছিলাম।
এরপর মনকলি চলে গেল, রাহুল বলল,
-লাখিয়া দিদিকে একটু এগিয়ে দিয়ে এসো তো
-না, বউয়াদা লাগবে না আমি একাই যেতে পারব, বলে হনহন করে হাঁটা লাগাল
সুচরিতা লাখিয়াকে ইশারা করল, পেছনে যেতে। ওরা চলে যাবার পর রাহুল বলল,
-ফালতু পরিবেশটা গুমোট করে দিয়ে গেল, চলো একটু হালকা করে দিই।
বলেই সুচরিতাকে দুহাতে কোলে তুলে নিল, সুচরিতা হাত-পা ছুঁড়তে লাগল,
-কী করছ? ভাল হবে না কিন্তু
রাহুল ঘরে গিয়ে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজেও পাশে শুয়ে ওকে বুকের ওপর টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরল, ওকে আদর করতে করতে বলল,
-আজ তোমার চোখের জল আমাকেও কাঁদিয়েছে আমি আর তোমার কান্না সহ্য করতে পারি না। অনেকদিন আমার মূঢ়তার জন্য তোমাকে কষ্ট পেতে হয়েছে আর আমার সুচিকে কোন কষ্ট পেতে দেব না।
সুচরিতা বলল,
-আচ্ছা মন কেমন করে আধপেটা খেয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেল না?
-দেখ যা অপমানিত আমি হয়েছিলাম তারপরও যদি আশা করে আমি ওর ব্যাপারে গদগদ হয়ে যাব, তা হয় না। আমি একবার মুখ ফিরিয়ে নিলে আর ফিরে তাকাই না
-থাক হয়েছে, এই তো সাথে করে নিয়ে একেবারে মুম্বাই চলে যাচ্ছিলে, তোমাদের ছেলেদের আমার খুব চেনা আছে
রাহুল সুচরিতার দুইগাল টিপে জিজ্ঞেস করল,
-কী চেনা আছে?
-এই একজনকে পেলেই আর একজনকে ভুলে যাও
-সব দোষ তো আমাদের, ওদিকে প্রদোষ তোমার কালো হরিণ চোখের বিরহে খাবি খাচ্ছে, আচ্ছা সুচি আমরা তো এক সপ্তাহের মধ্যেই বিয়ে করছি আজ থেকে আমরা একসাথে শুতে পারি-না?
- না পারি না গো, সব কিছুর একটা নিয়ম আছে সেগুলো মানতে হয়
-আমার যে এবার নিয়ম ভাঙার খেলায় মাততে ইচ্ছে করছে
-সবসময় সব ইচ্ছাকে পাত্তা দিলে চলে না, যাও এবার শুতে অনেক রাত হয়ে গেল বউয়াদা
-কী নিষ্ঠুর মেয়ে রে বাবা! আমিও দেখাচ্ছি কালই বিয়ে করে একসাথে থাকা শুরু করব, তারপর যেদিন রেজিস্ট্রি হবে তো হবে, মালাবদল আর সিঁদুর-দান কালই সেরে নেব ভাবছি।
 
যাই হোক রাহুল বললেও ব্যাপারটা সেরকম দাঁড়াল না। পরেরদিন সুচি স্নান করে এসে এক পিঠ চুল ছড়িয়ে একটা হালকা গোলাপি শাড়ি পড়ে চোখে কাজল দিয়ে কপালে একটা টিপ দিয়ে রাহুলকে ডাকতে এল।
 
এদিকে মনকলি বাড়িতে ফিরে ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে দিল বিছনায়, প্রচণ্ড রাগে নিজের মনেই বলতে লাগল এই না কী মানবিকতা? এত বড় অসুখ শুনেও আমায় পৌঁছাতে গেল না। সুচিটাও ভালবাসার নেশায় বুঁদ হয়ে আছে।
যেই বউয়াদা বলেছে আমাকে নিয়ে যাবে অমনি চোখের জল টলটল করে উঠল, যত সব ন্যাকামি। রাগের মাথায় এ কথাও ভুলে গেল, যখন সে রাহুলকে বিশ্রী ভাবে অপমান করেছিল তখন তার বয়স নেহা কম ছিল না প্রায় তেইশ পেরিয়ে চব্বিশে পা দিয়েছে। এখন এখানে যেন একটা দিনও ভাল লাগছে না। সত্যি কথা বলতে এক বুক আশা নিয়ে বউয়াদার ওপর নির্ভর করেই সে এসেছিল। ভেবেছিল বউয়াদা যখন এখনও তার জন্য অপেক্ষা করে আছে তখন সে গিয়ে ক্ষমা চাইলেই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। স্বপ্নেও ভাবেনি এরা দুজন মধুচন্দ্রিমার জন্য প্রস্তুত। তাহলে সুচরিতা তার মনে বৃথা আশা জাগিয়ে বলেছিল কেন বউয়াদা এখনও তার জন্য নিজেকে একলা রেখেছে।
 
সদ্যস্নাতা সুচরিতাকে দেখে রাহুল বুকে টেনে নিল,
-কী অপূর্ব স্নিগ্ধ আর সুন্দর লাগছে তোমাকে, আমার চোখটাও আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, মনটা তো করেছিল তোমার মধ্যে থাকা এই সুন্দর মনটার কোন খবরই আমি রাখিনি
-নাও হয়েছে, এখন ওঠো কলেজ যেতে হবে-না?
-ওহো! যেতে তো হবেই বরং তাড়াতাড়ি হবে, প্রিন্সিপালের সাথে আলোচনা করতে হবে না। উনি খুব খুশি হবেন, আমাকে খুব ভালবাসেন। ওঁর সাথে আয়োজনের কথা সব বলে নেব, উনি ভাল পরামর্শ দিতে পারেন। কলেজের প্রফেসর স্টাফ সবাইকে মোটামুটি বলতে হবে বুঝলে। ওহ্‌ আজ রিহার্সাল আাছে তৈরি থেকো
-ঠিক আছে চা-টা খেয়ে তুমি স্নানে যাও আমি ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসি
 
ক্রমশ
 
 

No comments:

Post a Comment

গঙ্গার পাড়ে সূর্যাস্ত


Popular Top 10 (Last 7 days)