ধারাবাহিক উপন্যাস
পারমিতা চ্যাটার্জি
শেষ থেকে শুরু
[পর্ব – ১২]
পারমিতা চ্যাটার্জি
শেষ থেকে শুরু
[পর্ব – ১২]
"আসলে কী বল তো! আমি তোমার যোগ্য ছিলাম না ঠিকই কিন্তু সুচরিতার যোগ্য ছিলাম। ও আমাকে ভালবাসত, যোগ্য সম্মান দিত। আমরা নিজেদের চিনতে অনেক দেরি করে ফেলি, সামনে যে আছে তার তার চোখের ভাষাটা পড়তেও অনেক সময় লেগে যায়। তাই যা অনেক আগে হবার কথা ছিল তা অনেক পরে হচ্ছে।"
পূর্বানুবৃত্তি মনকলি বউয়ার কাছে এসেছে দরকারে। সুচরিতা অবাক হয়ে রাহুলের দিকে তাকায়। রাহুল বলে, তোমার দরকারি কথা শুনেই যাই। মনকলি বলে, বউয়াদা সেদিন তোমাকে যে নিষ্ঠুর অপমান করেছি তার জন্য মাপ কর। সুচরিতা ভয় ভয় গিয়ে রাহুলের পাশে বসল, রাহুল ওকে কাছে টেনে নিল, বুঝতে পারল, সুচি একটা অমূলক ভয় পাচ্ছে। তারপর…
-না ছাড়ব না,
আগে চোখের জল মোছো। তোমার মনে আছে সুচি? একবার রিহার্সালের
সময় তুমি
আর প্রলয় ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলে আর আমি কী বকেছিলাম
তোমাদের।
-হ্যাঁ এমন করে বকলে যে আমি কেঁদেই ফেলেছিলাম।
-তখন আমি ব্যস্ত হয়ে তোমার কাছে এসে বললাম, আর কাঁদতে
হবে না এবার রিহার্সালে মন দাও। তাও দেখি মেয়ের কান্না থামে না, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কী কান্না।
-তখন থেকেই তোমার কান্না আমার সহ্য হত না এখন তো আরও হয় না, রিহার্সালের পর ডেকে গোটা কয়েক লজেন্স দিয়েছিলাম।
-হ্যাঁ তা দিয়েছিলে কিন্তু…
-কিন্তু কী?
রাহুল মনে মনে ভাবতে লাগল, সুচি আজ আমি যাব বলায় এত দুঃখ পেল কেন? ও কী ভাবল মনের প্রতি আমার যদি আগের সেই দুর্বলতা ফিরে আসে! তাই কী কখনও হয়, যে একবার সুচরিতার মতন স্নিগ্ধ মন আর ভালবাসা যত্নের স্বাদ পেয়েছে তার মন কী কখনও আর কোথাও যেতে পারে?
বাইরের বসার জায়গায় এসে ওরা দেখল, মনকলি মাথায় হাত দিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। সুচরিতা টেবিলে খাবার বাড়ছিল, লাখিয়া এর মধ্যে ডিম চচ্চড়ি করে ফেলেছে এখন ব্যাসনে ডুবিয়ে বেগুন কুমড়ো সব ভাজছে।
রাহুল গিয়ে মনকলিকে বলল, চলো খেতে চলো…
মনকলি টেবিলে এসে বসে বলল,
বলে মনকলি খেতে আরম্ভ করল, সুচরিতাকে বলল,
-ওরে বাবা, এই খেয়েই হাঁপিয়ে গেছি আর পারব না।
-আচ্ছা তুই খা-না আসতে আসতে।
-বউয়াদা আমাকে মুম্বাইয়ে পৌঁছাতে তোমাকে যেতে হবে না, আমি একাই যেতে পারব। আর তাছাড়া তুমি পৌঁছে দেবে এই ভরসাতে তো আসিনি।
-আসলে কী বল তো! আমি তোমার যোগ্য ছিলাম না ঠিকই কিন্তু সুচরিতার যোগ্য ছিলাম। ও আমাকে ভালবাসত, যোগ্য সম্মান দিত। আমরা নিজেদের চিনতে অনেক দেরি করে ফেলি, সামনে যে আছে তার তার চোখের ভাষাটা পড়তেও অনেক সময় লেগে যায়। তাই যা অনেক আগে হবার কথা ছিল তা অনেক পরে হচ্ছে।
আর একটু খেয়েই মনকলি উঠে পড়ল বলল,
-সে কী রে! কিছুই তো খেলি না, একটু বেগুনি খেয়ে দেখ খুব মচমচে।
-ও হ্যাঁ সত্যি ভুলেই গিয়েছিলাম।
এরপর মনকলি চলে গেল, রাহুল বলল,
রাহুল ঘরে গিয়ে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজেও পাশে শুয়ে ওকে বুকের ওপর টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরল, ওকে আদর করতে করতে বলল,
সুচরিতা বলল,
যাই হোক রাহুল বললেও ব্যাপারটা সেরকম দাঁড়াল না। পরেরদিন সুচি স্নান করে এসে এক পিঠ চুল ছড়িয়ে একটা হালকা গোলাপি শাড়ি পড়ে চোখে কাজল দিয়ে কপালে একটা টিপ দিয়ে রাহুলকে ডাকতে এল।
এদিকে মনকলি বাড়িতে ফিরে ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে দিল বিছনায়, প্রচণ্ড রাগে নিজের মনেই বলতে লাগল এই না কী মানবিকতা? এত বড় অসুখ শুনেও আমায় পৌঁছাতে গেল না। সুচিটাও ভালবাসার নেশায় বুঁদ হয়ে আছে।
যেই বউয়াদা বলেছে আমাকে নিয়ে যাবে অমনি চোখের জল টলটল করে উঠল, যত সব ন্যাকামি। রাগের মাথায় এ কথাও ভুলে গেল, যখন সে রাহুলকে বিশ্রী ভাবে অপমান করেছিল তখন তার বয়স নেহাত কম ছিল না প্রায় তেইশ পেরিয়ে চব্বিশে পা দিয়েছে। এখন এখানে যেন একটা দিনও ভাল লাগছে না। সত্যি কথা বলতে এক বুক আশা নিয়ে বউয়াদার ওপর নির্ভর করেই সে এসেছিল। ভেবেছিল বউয়াদা যখন এখনও তার জন্য অপেক্ষা করে আছে তখন সে গিয়ে ক্ষমা চাইলেই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। স্বপ্নেও ভাবেনি এরা দুজন মধুচন্দ্রিমার জন্য প্রস্তুত। তাহলে সুচরিতা তার মনে বৃথা আশা জাগিয়ে বলেছিল কেন বউয়াদা এখনও তার জন্য নিজেকে একলা রেখেছে।
সদ্যস্নাতা সুচরিতাকে দেখে রাহুল বুকে টেনে নিল,
-ঠিক আছে চা-টা খেয়ে তুমি স্নানে যাও আমি ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসি।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment