প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

তূয়া নূর সংখ্যা | জিরাফের গলা

বাতায়ন/ তূয়া নূর সংখ্যা/ সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/ ৪০ তম সংখ্যা/ ২৪শে মাঘ,   ১৪৩২ তূয়া নূর সংখ্যা | সম্পাদকীয়   জিরাফের গলা "সম্পূর্ণ ভাবে ...

Friday, February 6, 2026

কবিতা— দেখা | কবি— তূয়া নূর | পর্যালোচক— চন্দ্রনাথ শেঠ

বাতায়ন/তূয়া নূর সংখ্যা/পর্যালোচনা/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা | পর্যালোচনা
কবিতা দেখা
কবি— তূয়া নূর
পর্যালোচক— চন্দ্রনাথ শেঠ

"সুতরাং, ‘দেখা কবিতার রস নিষ্পত্তি এক রোমান্টিক হাহাকার আর না পাওয়ার যে 'আকাশ ভর্তি তৃষ্ণাতৈরি করে—তা অতুলনীয়। কবিতাটির অমরত্ব যেএই সুগভীর 'তৃষ্ণা'-র মধ্যেই নিহিত—তা বলায়বাহুল্য নেই।"

 
কাছাকাছি এসেছিল একদিন দুটো অচেনা গ্রহ
মহাশূন্যের হিসাব না রাখা
কোন এক ক্ষণে নভোপথে
দেখা হয়েছিল প্রথম যেখানে, আবার
সেখানেই দেখা অযুত বছর পর
সেখানেই দেখা অযুত বছর পর
অদূরে দাড়িয়ে কেউ যেন খেলে এ খেলা!
যায় হাত ধরা বাড়িয়ে, যায়-না ধরে রাখা
জগতের টানে ফিরে যায়
,
জগতের টানে ফিরে যায়, চেয়ে থাকে শুধু অপলক
দূরে যেতে যেতে ভাবে, আর কত কাল পরে হবে দেখা!
শুধু যেন
শুধু যেন নীহারিকা চোখে চেয়ে থাকা
এক আকাশ ভর্তি তৃষ্ণা নিয়ে
এক আকাশ ভর্তি তৃষ্ণা নিয়ে



খুব ভাল একটি লেখার সঙ্গে আজ ভ্রমণ। কবিতাটি—সূচনা থেকে শেষ পর্যন্ত মহাজাগতিক এক অনুসঙ্গময় টানটান সেতুবন্ধন ঘটিয়েছে:
 
'কাছাকাছি এসেছিল একদিন দুটো অচেনা গ্রহ'...
 
পাঠক কি লাইনমাত্র পড়েই ধারণা করে নিলেন, এ তো দুই মানব-মানবীর কথা বলা হচ্ছে? সম্পর্কের আবর্তনে জোড় বাঁধা দুই নর-নারীর মিলন মাত্র? কিন্তু মিলনের মধ্যেও একটি কসমিক ইমাজিনেশন খেলা করছে আলোচ্য কবিতার বিষয় ও বাক্যগঠনের কুশলী বিন্যাসে। এটিই কবিতাটির মহার্ঘ শোভা। বার্তাও।
 
রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি গানে লিখেছেন:
'কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে—
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।'
তেমনি নর-নারীরও; দুটি গ্রহ বা নেবুলার মতো নিয়তি নির্ধারিত তাদের দেখাশোনা। কোন্ টাইম বা স্পেস-এ তাদের দেখাসাক্ষাৎ—তা আজ আর মনে নেই কারও। অলক্ষ্যে, কোনো এক নিপুণ বাজিকরের—অদৃশ্য সুতোর টান! দেখে নেওয়া যাক কবিতাটির আশ্চর্য উড়ান; শেষে কীভাবে যে, এসে ধাক্কা দিল কবিতাটি! সরাসরি হৃদমাঝারে;অসামান্য! পড়ুন, আদরণীয় পাঠক:
 
'বারংবার' ফিরে যাওয়া জরুরি—কবিতার কাছে। মালার্মে-ই তো বলেছিলেন?
"কবিতা বোঝা-র জিনিস নয়, বাজা-র;—তৈরি করার জিনিস।" 
তাই, যতবার পাঠ নিই আলোচ্য কবিতার, বেজে ওঠে এক অনাস্বাদিতপূর্ব বেদনা। তৈরি হয় পাঠের আরও আকুতি। দেখুন না: কবিতাটির গঠন বেশ— অসম; চমকপ্রদ! ৬+৫ পঙক্তি বিশিষ্ট দুটি প্যারাগ্রাফ।

*'কাছাকাছি আসার' সুসংবাদ জানিয়ে শুরু কবিতাটি।
'দেখা' নামকর কবিতার ললাটে সাঁটা। তাই, দেখা হওয়ার আনন্দঘন সুসংবাদ সংলগ্ন হয়ে রয়েছে কবিতাটি—জুড়ে।
গ্রহের আগে—'অচেনা' বিশেষণটিও লক্ষণীয়। গ্রহের চিত্রকল্পে যে—নবীন যৌবনা রমণীকে আহ্বান, তা বুঝে উঠতে দেরি হয়না দীক্ষিত পাঠকের। যে নারীর—চকিত, 'অপলক' চাহনি, আলোড়ন-বিলোড়ন ঘটায় হৃদয়ে—ঘটতে থাকে অরিরল রক্তক্ষরণ। হৃদয়ে হৃদয় মেশায়। যে হৃদয়—কস্তুরীর গন্ধে উতরোল যেন!
 
-হেন নারীকে নিয়েই আলোচ্য কবিতার গড়ে উঠেছে—
আশ্চর্য কাব্য-শরীর। কবিতার উত্তমপুরুষের—স্বগত সংলাপ যেন; সলিলকি-তুল্য— 'অযুত বছর ধরে' প্রাণপ্রিয়ের অন্বেষণ। জানাচ্ছেন ওই উত্তমপুরুষ—
 
'যার হাত ধরা বাড়িয়ে, যায়-না ধরে রাখা
জগতের টানে ফিরে ফিরে যায়, চেয়ে থাকে শুধু অপলক'
 
কবিতাটি ঘিরে, এই ধরে রাখতে না পারার রক্তক্ষরণ—তৈরি করেছে, এক অদ্ভুত টানাপোড়েন; 'খেলা'— বেদনাঘন আর্তি
দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে— না পাওয়ার, অদেখার, — বেদনাঘন আর্তি আছড়ে পড়েছে যেন:
'দূরে যেতে যেতে ভাবে, আর কতকাল পরে হবে দেখা!'
 
এই যে না-দেখার অতৃপ্ত-মাধুরী, কবিতাটিকে ঘিরে ধরেছে—তা শুধু কবিতার-উত্তমপুরুষের নয়—সঞ্চারিত হয়েছে আপামর পাঠকের। 'নীহারিকা চোখে চেয়ে থাকা' অপূর্ব, অজানিত এক চিত্রকল্প! সুতরাং, ‘দেখা কবিতার রস নিষ্পত্তি এক রোমান্টিক হাহাকার আর না পাওয়ার যে 'আকাশ ভর্তি তৃষ্ণা' তৈরি করে—তা অতুলনীয়। কবিতাটির অমরত্ব যে, এই সুগভীর 'তৃষ্ণা'-র মধ্যেই নিহিত—তা বলায়, বাহুল্য নেই।
 

1 comment:

  1. সুন্দর সংখ্যা। 'বাতায়ন'-কে আমার সপ্রেম
    শুভেচ্ছা ; অভিনন্দনও। একটি করে কবিতা (কবির নাম ছাড়া) পাঠিয়ে তার উপর 'আলো-ফেলা'।
    এই উষ্ণ-উদ্যোগকে স্বাগত। বাংলা কবিতার পক্ষে--স্বাস্থ্যকরও।

    ReplyDelete

গঙ্গার পাড়ে সূর্যাস্ত


Popular Top 10 (Last 7 days)