প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

তূয়া নূর সংখ্যা | জিরাফের গলা

বাতায়ন/ তূয়া নূর সংখ্যা/ সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/ ৪০ তম সংখ্যা/ ২৪শে মাঘ,   ১৪৩২ তূয়া নূর সংখ্যা | সম্পাদকীয়   জিরাফের গলা "সম্পূর্ণ ভাবে ...

Friday, February 6, 2026

একটা বোকা মানুষের গল্প | অদিতি চ্যাটার্জি

বাতায়ন/তূয়া নূর সংখ্যা/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা | ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
 
একটা বোকা মানুষের গল্প

"ঋতচেতার মনটা হুহু করে উঠলশ্‌শ্‌! সায়নকে যদি বলতে পারতাম একবার মনের কথাটা! নাহ্‌ বোকা ঋতচেতা"

 
-এই তো দেখা করে আসলি রে পুপু, আবার ভিডিও কলের কি দরকার ছিল?
হাসতে হাসতেই ননদকে বলে ঋতচেতা। প্রায় কুড়ি বছরের ছোট খুড়তুতো ননদটি মুখটাকে অদ্ভুত ভঙ্গি করে বলে,
-বৌদি আমরা জেন-জি, তোমার মতো ঐ 'নব্বই-এর বেবি' না। যে একটু দেখব, লজ্জা লজ্জা হাসি দিয়ে আগড়ম বাগড়ম বকব। অষ্টমী কী সরস্বতী পুজো এলে পছন্দের রঙের শাড়িতে ঘুরব। বিকেলে অপেক্ষা করব সুযোগটা কখন আসবে, যাতে একটু ঘুরতে যেতে পারি। ঘুরে এসে সেই মুহূর্তটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখব। ধুত্। বোকামি যত, এর চেয়ে আমরাই ভাল। ভাল লাগল তো সময় নষ্ট একদম না। কথা বলতে ইচ্ছে করছে, এখুনি বলব। ব্যস! আমি এটাই বুঝি।
কুড়ি বছরের ননদের মুখে এত কড়া কড়া কথা শুনতে ঋতচেতার মোটেই ভাল লাগছে না, মনে মনে ভাবে তুই কী বুঝবি পুপু এই বোকামিগুলো কত মিষ্টি ছিল।
 
ঋতচেতার বারান্দাটা বড় সুন্দর, সামনে একটা ঝিল আছে, পড়ন্ত বিকেলে দাঁড়িয়ে জলের বুকে আলোর খেলা দেখতে খুব ভাল লাগে। ঋতচেতা মোটেও পুরনো দিন নিয়ে ভাবতে ভালবাসে না। তবু ঐ আলমারিতে রাখা দামী শাড়ি বা গয়নার মতো মাঝে মাঝে নাড়াচাড়া করে, আবারও গুছিয়ে তুলে রাখে অন্য কোনো দিনের জন্য। আজ পুপু আলমারিটার কাছে ঠেলে দিল। ঝিলের জলে নিমগাছটার ছায়া কেন? আচ্ছা এইবার বুঝল কিশোরী ঋতু, মামনি, পিঙ্কি দিরা সবাই মিলে কোয়েলকে একটা ছোট্ট ধাক্কা মেরে জিকোদাকে দেখাবে। সাইকেল চালাতে চালাতে আড় চোখে জিকোদাও একবার দেখে নেবে কোয়েলকে। উফফ! কোয়েলের শ্যামলা গালেও কী সেদিন আলোর ছটা লেগেছিল। কিছুতেই মনে করতে পারছে না এখন ঋতচেতা। বারে বারে ঋতচেতার বাড়ির ল্যান্ড ফোনটা বাজছে, ফোনটা যেই মা ধরছে কেটে দিচ্ছে। কড়া চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে মা বলছে,
-মনে হচ্ছে কলার আইডিটা লাগাতে হবে এইবার।
 
কলেজে সরস্বতী পুজো প্রথমবার, কোনো মতে একবার হাজিরা দিয়ে মধুমিতা, পায়েলদের সাথে গঙ্গার ঘাটে। ওরা তিনজনে দেখছে হলুদ গাঁদার বাগান আজ এই গঙ্গার ঘাটটা। ঋতচেতার মনটা হুহু করে উঠল, শ্‌শ্‌! সায়নকে যদি বলতে পারতাম একবার মনের কথাটা! নাহ্‌ বোকা ঋতচেতা সেই সময় কেন কোনোদিনও সায়নকে কিছু বলতে পারেনি। চোখের সামনে দেখেছে কফি হাউসে বসে সুন্দর দেখতে কোনো মেয়েকে দেখিয়ে বলেছে ঋতচেতাকে,
-দ্যাখ তো আমার জন্য পছন্দ হয়?
সজোরে ঘাড় নেড়েছে ও,
-না হয় না।
উত্তরে শুনেছে,
-ইডিয়ট।
ইডিয়ট তো সত্যি ইডিয়ট! ল্যান্ড নম্বরটার দিকে তাকিয়ে থেকেছে কিন্তু বিনা কারণে ফোন করতে পারেনি। ঝিলের জলটি ধীরে ধীরে লাল হচ্ছে, সেই পুরনো সাদা ফোনে মেসেজ টাইপ করেও ডিলিট করে ফেলেছে। এক রাশ লজ্জা ঘিরে ধরত ওকে, যদি 'না' বলে! বন্ধুকে হারাতে হবে, সবাই জেনে যাবে। পারবে না ঋতচেতা। পারেওনি বোকা মানুষটা, ঝিলের জলে সায়নের মুখটা ভেসে আছে। বন্ধু হারায়নি ও, জন্মদিনে, নতুন বছরে শুভেচ্ছা বিনিময় করে ওরা। স্বামী হিসেবে পেলে কী অন্য কিছু হতো! পরে একঘেয়ে হয়ে যেত না!
 
শাঁখ বাজতে শুরু করেছে আশেপাশের বাড়িগুলো থেকে, এই মফস্‌সলের কিছু বাড়িতে এখনো সন্ধ্যায় শাঁখ বাজে, ঋতচেতাও যাবে ঠাকুর ঘরে এইবার। ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখে ননদ চোখের জল মুছছে। জানতে চাইবে না ভেবেও মেয়েটাকে দেখে মায়া হয়। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-কী হল পুপু?
লাল চোখ দুটো তুলে পুপু বলে,
-বৌদি মনে হয় এই রিলেশনটা থাকবে না, পাবলো কথায় কথায় বলে আমি নাকি বেশি ন্যাগ করি, যখনতখন ভিডিও কল করি, ফোন করি, ওর পড়া, কাজের ক্ষতি হয়। বোর লাগছে ওর। বাই বলে ফোনটা কেটে দিল। এইভাবে কেউ কথা বলেনি বৌদি, খারাপ লাগছে আমার।
-আর ফোন করিস না, দ্যাখ ও হয়তো করে নেবে নিজে। একটু সময় দে নিজেকে। চল চোখ-মুখ ধুবি। যা চা-টা কর, সবাই খাব।
পুপুকে বাথরুমে যেতে দেখে হাসে ঋতচেতা। নাহ্‌ সায়নকে মনের কথা বলতে পারেনি বলে কোনো আফসোস নেই, যদি কোনোদিনও ওর জন্য কেনা কার্ডগুলো দেখে হাসতে হাসতে সায়ন বলত, পাগলি করেছিস কী! ঋতচেতা কিছুতেই সেই আঘাত সামলাতে পারত না। আর্চিসের সেই বিশেষ কার্ডগুলো এখনো যত্ন করে রেখে দিয়েছে ঋতচেতা। থাক সায়ন ওর মনের একটা কোণেই থাকুক, একটা বোকা মানুষ এর চেয়ে বেশি আর কি সাহস দেখাতে পারত! ঠাকুর ঘরের দিকে পা বাড়ায় ঋতচেতা।
 
~~০০~~

No comments:

Post a Comment

গঙ্গার পাড়ে সূর্যাস্ত


Popular Top 10 (Last 7 days)