বাতায়ন/ঝড়/যুগলবন্দি/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড় | যুগলবন্দি | অজয় দেবনাথ ও সুচরিতা চক্রবর্তী
অজয় দেবনাথ
ঝড় | যুগলবন্দি | অজয় দেবনাথ ও সুচরিতা চক্রবর্তী
অজয় দেবনাথ
মুনিয়াকে চিরসখা
"আমিও একটা গ্রুপে জয়েন করলাম। রঙ্গনার কাছে রিহার্সাল হতো। যে-কথা বলার জন্য এত কথা— গ্রুপে সুচরিতা নামে একটা মেয়ে ছিল, মেয়ে না বউ। ফর্সা, ছিপছিপে, বড়ো বড়ো চোখ, ফটোক্রোমাটিক ব্রাউনিশ চশমা, বেশ দেখতে।"
"তোমার লিড রোল ছিল। তখন খুব ভয় পেতাম তোমাকে সিনিয়র হিসেবে। আমার রোলটা এলেবেলে ছিল। দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো নয়। তোমার সে কী দাপুটে ভয়েস আর দক্ষ অভিনয় ক্ষমতা!"
পর্ণা,
আজ একটা অন্য প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করব ভাবছি। তুমি সেদিন কবিদের কথা বলছিলে, আমি কবিতার কিছু বুঝি না। কখনো-সখনো লাইনের শেষে মিল রেখে বা না রেখে কিছু লিখেছি বটে তবে সেগুলোকে কবিতা না বলাই ভালো। বরং রাজনৈতিক কিছু একটা বললেও বলতে পার। বুঝতেই পারছি তুমি এখনও যথেষ্ট চর্চার মধ্যেই আছ, তাই তোমাকেই
জিজ্ঞেস করছি।
আচ্ছা আজকাল কবিতার নামে যেসব লেখা হচ্ছে সেগুলো তোমার কেমন লাগে? লুকিয়ো-না স্পষ্ট
বোলো কিন্তু। আমার ধারণাও আমি জানিয়ে রাখি। আমার তো অধিকাংশই মাথামুণ্ডুহীন মনে হয়।
পারস্পরিক সম্পর্কহীন অর্থহীন কিছু শব্দের সমাহার। এগুলো কবিতা!
যখন তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, যেদিকে তাকাই অন্ধকার…
ফাঁকা, অর্থহীন জীবনে আদর্শ, মূল্যবোধ সব অন্তঃসারশূন্য, যেন মহাশূন্যের মাঝে লক্ষ্যহীনভাবে
ছুটে চলা। কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি জান, আমাদের রাজনৈতিক দলের কিছু বিধিবদ্ধ
গাইডলাইন ছিল। আদর্শ, মূল্যবোধ, শিক্ষা, সুস্থ-সংস্কৃতি, শালীনতা ইত্যাদি। স্বেচ্ছাচারিতাকে
প্রশ্রয় দেওয়া হতো না। প্রচুর গ্রুপথিয়েটার গড়ে উঠেছিল এবং তারা নিয়মিত শো করত সাধ্য
অনুযায়ী। তখন আমিও একটা গ্রুপে জয়েন করলাম। রঙ্গনার কাছে রিহার্সাল হতো। যে-কথা বলার
জন্য এত কথা— গ্রুপে সুচরিতা নামে একটা মেয়ে ছিল, মেয়ে না বউ। ফর্সা, ছিপছিপে, বড়ো
বড়ো চোখ, ফটোক্রোমাটিক ব্রাউনিশ চশমা, বেশ দেখতে।
আমার বয়স তখন খুব জোর কুড়ি-একুশ। সুচরিতার আনুমানিক
তিরিশ। যাদবপুরে বাংলার অধ্যাপিকা। বরের সঙ্গে বনিবনা নেই, ডিভোর্স ফাইল করেছে। মনে
মনে সুচরিতার প্রেমে পড়লাম। সুচরিতাও বোধহয় পড়েছিল, হাবেভাবে তাই মনে হতো। সদ্য বিরহে
কবিতা লেখার চেষ্টায় খাতা ভরাচ্ছি। রোজ নয় তবে প্রায়ই। লিখলেই আগেভাগে দলে গিয়ে সুচরিতাকে
দেখাই, সুচরিতা দেখে মন্তব্য করে।
একদিন, তখনও দলে অন্যরা আসেনি, এটা-সেটা কথার ফাঁকে
পরেরদিন ফ্রি আছি কিনা জেনে নিয়ে আমাকে কিছু টাকা দিয়ে মিত্রার ম্যাটিনি শোয়ে ‘হাত
বাড়ালেই বন্ধু’র দুটো টিকিট কেটে হলের সামনে দাঁড়াতে বলল। আবার
দলের সবাই এলে ঢাক পিটিয়ে বলেও দিল আমরা পরেরদিন সিনেমায় যাচ্ছি! সেইমতো আমি তো দাঁড়িয়ে
আছি, সুচরিতা এলো না। পরে জানতে পারলাম দলের ডিভোর্সি ডিরেক্টর অফিস কামাই করে ঝাঁপিয়ে
পড়ে সুচরিতাকে তুলে নিয়েছে। আমার হাত বাড়ানোও হল না আর…
যাকগে, তুমি… ভালো থেকো, সুখে থেকো মুনিয়া।
ইতি—
তোমার অতীত দিনের…
যুগলবন্দি | সুচরিতা চক্রবর্তী ও অজয় দেবনাথ
তোমার অতীত দিনের…
সুচরিতা চক্রবর্তী
চির সখা
প্রথমেই ক্ষমা প্রার্থনা করে
নিলাম চিঠির উত্তর দিতে দেরি হওয়ার কারণে। আমি চিরকাল তোমার কাছে অবোধ্য কবিতার
মতো হয়েই রইলাম। অথচ একটু মন দিলেই হয়তো জীবনের ছবিটা পরিষ্কার হতে
পারত। যা দুর্বোধ্য তাকে একবার বুঝে গেলে জলের মতো সোজা হয়ে যায়। কয়েকটা শব্দ
সংযোগ করে কবিতার কথা বলছ তাহলে আধুনিক ছবির সামনে দু মিনিট দাঁড়িয়ে দেখেছ কখনো? বুঝতে পারো কয়েকটা আঁচড়ে কেমন অর্থবহ ছবি হয়ে যায়? আসলে সবই আধুনিকতার আর এক নাম। আমাদের জীবনগুলো আধুনিক হতে
হতে কেমন নিউক্লিয়ার হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ কমে আসছে আত্মীয়পরিজন বন্ধুবান্ধব। কেউই আর
স্বার্থ ছাড়া তেমন মিশতে চায় না।
শুধু কী তাই এই যে
রমরমিয়ে সংসার করছি সেও তো পারস্পরিক প্রয়োজনে। আসলে জীবনে একটা আশ্রয় লাগে। তা সে
মানসিক বলো আর্থিক বলো বা সামাজিক। সংসারে ভালোবাসা অর্থ প্রয়োজন বুঝলে কেবল মাত্র
প্রয়োজন। সে তো দুর্বোধ্য কবিতাই। তাহলে তুমি বলতেই পারো আমি স্বার্থপর। সব কিছু
উপভোগ করার এত বছর পরে বলছি প্রয়োজনের তাগিদ নইলে কোথাও কিছু নেই। বলতেই পারো। আমি
কিন্তু তা বলব না। আমি তোমার কাছে শিখেছি ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ। ত্যাগ সংযম আর
সর্বপরি নিঃস্বার্থভাবে একটা ভালোবাসাকে টেনে টেনে জীবনভর
বয়ে নিয়ে যাওয়া যেখানে কোনো প্রত্যাশা নেই প্রয়োজন নেই।
সুচরিতা নামটা খুব সুন্দর। এই
নাম আমার মায়ের খুব পছন্দের নাম। তবে যাই বলো এতে আমি তোমারই দোষ দেখছি কারণ তোমার
চাওয়ায় হয়তো সেই জোর ছিলো না। তেমন করে আটকে রাখতে চাওনি। সেখানেও উদাসীনতা।
কলেজে আমাদের একটা নাটক হয়েছিল
মনে আছে? তোমার লিড রোল ছিল। তখন খুব
ভয় পেতাম তোমাকে সিনিয়র হিসেবে। আমার রোলটা এলেবেলে ছিল। দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো
নয়। তোমার সে কী দাপুটে ভয়েস আর দক্ষ অভিনয় ক্ষমতা! দক্ষতা তোমার সব জায়গাতেই এই যে দেখো
আমাকে কীভাবে ক্লিন বোল্ড করে দিলে এই জীবনে। ব্রেভো বিজীত
ব্রেভো। আমার কাছে তোমার কাছে জীবনের কাছে আমি প্রকৃতই ক্লিন বোল্ড।
ভালো থেকো বিজীত। যেন কখনো
আমার কাছে খবর না আসে যে তুমি অসুস্থ। ব্যস এইটুকু চাওয়া রইল।
পর্ণা

এই কাব্যিক যুগলবন্দী বেশ ভাল লাগছে। রোমাঞ্চকর পরিভ্রমন যেন ....
ReplyDeleteসুন্দর!