প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Monday, September 15, 2025

কুমাতা কদাপি নয় | ইন্দ্রাণী তুলি

বাতায়ন/শারদ/হলদে খাম/৩য় বর্ষ/২তম সংখ্যা/১লা আশ্বিন, ১৪৩২
শারদ | হলদে খাম
ইন্দ্রাণী তুলি
 
কুমাতা কদাপি নয়

"তোমার একমাত্র মেয়ের জন্মদিনও তুমি কখন পালন করনিশুধু অনেক অনেক বই কিনে দিতেতার জন্যে অবশ্য উপলক্ষ্য দরকার হতো না। তোমার হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যকে ভালবাসতে শিখেছিলাম।"


মা গো
[শারদ-নবমীর রাত]
 

দুহাজার কিলোমিটার দূরে বসে, রাত তিনটের সময়ে খবর পেলাম তুমি আর নেই। সেই থেকে জেগে আছি মা, চোখের সামনে বায়োস্কোপের পর্দায় কতরকমের ছবি যে দৌড়ে চলেছে। ছোটবেলাটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। জ্ঞানত তোমার আদরে বাহুল্য দেখিনি, কঠিন শাসনে ঘেরা ছিল আমার মেয়েবেলা। এখন বুঝতে পারি, মেয়ে মানুষ করে তোলা চাট্টিখানি কথা নয় আর আমি তো ছিলাম ভয়ংকর দুষ্টু।

 
বাড়িতে তোমার মাথার ওপরে ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী শাশুড়ি-মা, পান থেকে চুন খসলেই যিনি তোমার ওপরে খড়গহস্ত হতেন সেই তিনিই আবার নাতনির দুষ্কর্ম্মের লিস্টি নিয়ে হাজির হতেন তুমি ক্লান্ত হয়ে স্কুল থেকে ফিরতেই, কাজে কাজেই আমার শাস্তির বহরটা বেশিই হতো।
 
তোমার নীরব চোখের কঠিন নির্দেশে আর নিয়ন্ত্রণেই বেড়ে উঠেছিলাম। আমার কিছু বন্ধুর মায়ের মতো তুমি কখন আমার বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করনি অবশ্য সে-যুগে আজকের মতো মা-মেয়ের বন্ধুত্বের সম্পর্ক কমই দেখা যেত। কথায় কথায় শাস্ত্র আওড়াতে তুমি কিন্তু- প্রাপ্তে তু ষোড়শ বর্ষে… যুক্তির ধার ধারতে না। তোমার সঙ্গে ভাব-ভালবাসার সম্বন্ধ আমার ছিল না, কথায় কথায় তর্ক বেধে যেত আর তাতে বেশ ভাল রকমের ঘৃতাহুতি দিতেন আমার দিদু। তাঁকে তখন খুব ভাল লাগত আমার।
 
বাবা ছিলেন আমার পরম সুহৃৎ, তাঁর সমর্থনেই আমার সবরকমের ইচ্ছে পূরণ করে আমি বড় হয়ে উঠছিলাম। খুব দুঃখ ছিল মা, তোমাকে কখন আমার পাশে পাইনি। পরে বুঝেছিলাম আমার ঠাকুমার বিরুদ্ধাচারণ করে, আমাকে আমার ইচ্ছেমতো বড় হয়ে উঠতে দেওয়ার সাহস তুমি জুগিয়ে উঠতে পারতে না। সাহসের অভাব না বলে তাকে সংযমী ব্যবহারের আখ্যা দেওয়া যায়।
 
আমি ছিলাম জন্ম-বিদ্রোহী। তোমার ওই মুখ বুজে সবকিছু সহ্য করে যাওয়ার শিক্ষাটা আমি গ্রহণ করতে পারিনি। তুমি কষ্ট পেতে আর আমার মন ভরে উঠত অদ্ভুত এক মর্ষকামী আনন্দে, তোমাকে হারিয়ে দিতে পারার খুশিতে।
 
বিয়ে হয়ে চলে গেলাম বহুদূরে। আমি থাকতেও তুমি একা ছিলে, আমার অবর্তমানেও থাকলে, সকলের সঙ্গে থেকেও। তখন যোগাযোগের মাধ্যম কেবলমাত্র চিঠি, তা’ও হয়তো মাসে একটা কী দুটো কখন বাইরে বেরিয়ে দোকান থেকে ফোনে 'কেমন আছ মা?'
 
গরমের ছুটির আশায় আশায় থাকতাম, তোমার কাছে আসব সে'ও তো কলকাতায় পৌঁছবার পরে শ্বশুরবাড়ির ডিউটি সেরে তবেই। তোমার মুখটা দেখতে পেলেই তখন আনন্দে নেচে উঠত প্রাণ। কত কী যে রান্না করতে তুমি যা আমাদের ভাল লাগে। সবকিছুই সুপ্ত ছিল তোমার মনের মণিকোঠায়। মা, বিয়ের আগে এইসব ভাল লাগা, মন্দ লাগাকে তুমি কখন প্রশ্রয় দাওনি। বলতে, 'কী জানি কেমন শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে পড়বে আর প্রতি পদে তুলনা করে কষ্ট পাবে।'
 
তোমার একমাত্র মেয়ের জন্মদিনও তুমি কখন পালন করনি, শুধু অনেক অনেক বই কিনে দিতে, তার জন্যে অবশ্য উপলক্ষ্য দরকার হতো না। তোমার হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যকে ভালবাসতে শিখেছিলাম।
 
বাবা আর দিদু প্রায় একসঙ্গেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রচণ্ড মানসিক শক্তির অধিকারী তুমি, আমাকে জানতেও দিলে না, আমার সংসারে অসুবিধে হবে। মেয়েরা যে প্রেশার কুকারের মতোই অপরিহার্য কিন্তু সেই আগুনের আঁচ লাগল আমার গায়েও। নিজের কাজ ছেড়ে, প্রবাসের পাট চুকিয়ে ফিরে এলাম তোমার কাছে। ছোটবেলা থেকে তোমাকে চাকরি করতে দেখে, বাইরের কাজের প্রতি কেমন যেন এক বিতৃষ্ণা জন্মেছিল আমার মনে যদিও সেইসময়ে আমার বিজ্ঞান-স্নাতক-শিক্ষক মায়ের জন্যে আমার গর্বেরও শেষ ছিল না। মনের অগোচরে কোথাও হয়তো একটা গোপন আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে ছিল। বড় হয়েছিলাম যে তোমাকে দেখেই। মা, তুমি বড় অভিমানী ছিলে 'কারো কাছে হাত পাতব না' নিঃশব্দে কখন যেন আমার হৃদয়ের গভীরেও শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছিল, বীজ বুনেছিল মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তার।
 
দিদু আর বাবা চলে গেলেন কাছাকাছি সময়ে। তুমি একদম একা হয়ে পড়লে। এই সময়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম তোমার সঙ্গে থাকার, বাবাকে কথা দিয়েছিলাম যে। প্রবল প্রতাপান্বিত শাশুড়ির অধীনে জীবনের প্রমুখ সময়টা ব্যয় করে ফেলে, তোমার নিশ্চয়ই ইচ্ছে হয়েছিল কিছুদিন হলেও স্বাধীনভাবে জীবন কাটাবার। বিয়ের আগে বাবা-দাদার, বিয়ের পরে স্বামীর আর বার্ধক্যে ছেলে-সন্তানের ছত্রছায়ায় থাকতে বাধ্য হয় মেয়েরা। ঈশ্বর তোমাকে পুত্র-সৌভাগ্য দেননি, একটু দুঃখ থাকলেও পরে চারপাশে পুত্রগর্বে গর্বিত আত্মীয়স্বজনের দুর্গতি দেখার পরে তুমি নিজেকে আশীর্বাদধন্য মনে করেছিলে।
 
আমাদের একসঙ্গে থাকাটা তুমি মেনে নিতে পারনি। আশ্চর্য মানুষের মানসিক স্থিতি! তুমি যে অভ্যস্ত ছিলে নিজেকে দাতার ভূমিকায় দেখতে, হাত পেতে নিতে বড় দ্বিধা ছিল তোমার, হলই বা সে মেয়ে-জামাইয়ের কর্তব্যের অপার্থিব দান। তোমার মেয়ে তোমাকে সাংসারিক কাজকর্ম থেকে নিষ্কৃতি দিতে চাইল, বিশ্রাম দেওয়ার জন্য, তা'ও মেনে নিতে পারলে না। মাথার ওপর থেকে শাশুড়ি নামক কালো ছায়ার আস্তরণ সরে যাওয়ায় তুমি হয়তো বাঁচতে চেয়েছিলে মুক্ত আকাশের নিচে।আমার মুক্তি আলোয় আলোয় / এই আকাশে…’ তুমি কিন্তু সেই একাই রয়ে গেলে মা। 'পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা গাছের মতো / মানুষের ভিড় অনেক কথাই বলে যায় / হাওয়ায় দোলা পাতার শব্দে, বোঝে না কেউ / মাটির নিচে শিকড় ছড়িয়ে ছড়িয়ে, ছুঁয়ে ফেলার নিষ্ফল চেষ্টা করে একে অন্যকে'
 
দুটি শক্তিশালী নারী চরিত্রের বোধহয় এক ছাদের নিচে থাকতে সমস্যা হয়, থাকলই বা তাদের নাড়ির বন্ধন। তোমারও প্রায়-প্রায়ই সংঘাত বেধে যেত তোমার রক্ত-মাংসে তৈরি, তোমারই চরিত্রের ধাঁচে বেড়ে ওঠা আত্মজার সঙ্গে। একসঙ্গে থেকেও একা ছিলাম আমরা দু’জনেই।
 
আজ তুমি আর নেই মা। বিসর্জনের ঢাকের বাজনায়, মহিষাসুরমর্দিনীর সঙ্গে সঙ্গে আমার দশভূজা মা'ও চলে গেছেন অমৃতলোকে। বরফের ঘরে রাখা তোমার ঠান্ডা, কঠিন শরীরটাকে ছুঁয়ে বসে অশ্রুধারায় ভেসে যাচ্ছি। আজীবন তোমাকে বুঝতে আমি ভুল করেছি মা। ভুল বুঝিনি আমি, আমাকে ভুল বোঝানো হয়েছিল। পারিপার্শ্বিক হয়তো বা আমার ঠাকুমা আমাকে ভুল বুঝিয়েছিলেন, সেই শিশু বয়স থেকেই আমার কানে মন্তর দিয়ে, তোমার বিরুদ্ধাচারণ করার ইন্ধন যুগিয়ে।
 
আমাকে ক্ষমা কোর।
-আমি যদি ভুল করি মা, তুই যেন করিস নে ভুল
আবার আমার কাছে এস মা। আমার মা অথবা মেয়ে হয়ে, আমার একাকীত্ব ঘোচাতে
 
তোমার অনুতপ্ত সন্তান
 

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)