ধারাবাহিক গল্প
ডঃ
নিতাই ভট্টাচার্য
দুলালের মা
[৩য়
পর্ব]
"দাওয়ায় বসে আদুরি। আজ মনটা অন্য কথা বলে। মানুষটা ফিরবে ঠিক। সত্যি দুলালের মায়ের কাছে ঋণের শেষ নেই, মানুষটা ঘরে ফিরলে একটা সাদা শাড়ি কিনে দেবে আদুরি। গরিব হোক বড্ড উপকারী দুলালের মা, আদুরি বড্ড ভালবাসে মহিলাটিকে।"
পূর্বানুবৃত্তি
উঠানের একপাশে দাঁড়িয়ে আদুরি। সর্পাঘাতে মৃত্যুর ভয়ে থরথর
কাঁপে। হাতচারেক লম্বা গোখরো সাপ! ভাগ্যিস সাপুড়েটা দেখেছিল সাপটাকে, নয়তো! ভাবলেই শিউরে ওঠে আদুরির গা। গামছা বাঁধা কলসির দিকে চেয়ে আছে
আদুরি। গেলাসে করে জল নিয়ে আসে আদুরি। ধুপ নেই ঘরে। তিনকড়ির মা ধুপ নিয়ে আসে।
সুগন্ধে ভরে ওঠে বাড়ির উঠান। রতন চেয়ে দেখে আদুরিকে একবার। তখনও ভয়ে ফ্যাকাশে
হয়ে রয়েছে মুখ। তারপর…
রেগে ওঠে দুলালের মা। বলে,
-মানুষের বিপদ আর তোমাদের পৌষ মাস। যাও অনেক দেখেছ। সাপুড়ে বাবার কাজ আছে।
দুলু ঘোষ বলে— তারপর একলা মেয়েমানুষকে বেকায়দায় ফেলে চুরি করে চম্পট দেবে সাপুড়ে, তখন!
রেগে ওঠে দুলালের মা। বলে,
-মানুষের বিপদ আর তোমাদের পৌষ মাস। যাও অনেক দেখেছ। সাপুড়ে বাবার কাজ আছে।
দুলু ঘোষ বলে— তারপর একলা মেয়েমানুষকে বেকায়দায় ফেলে চুরি করে চম্পট দেবে সাপুড়ে, তখন!
-কার
এত সাহস! আমি রইলাম বসে। বিদেয় হও দেখি তোমরা এবার।
গলা তুলে বলে দুলালের মা। উঠানের ভিড় ফাঁকা হয়ে আসে।
-আমার মেয়ের জন্য একটা কিছু করো সাপুড়ে বাবা। বড় বিপদ...
-জয় মা বিষহরি
বলে চিৎকার করে সাপুড়ে। আদুরিকে ডাকে,
-আয় মা, মা মনসার সামনে বোস।
কাঠের পুতুলের মতো বসে পড়ে আদুরি। দুলালের মা সামান্য দূরত্ব রেখে দাওয়ার এক পাশে বসে।
-দেখি মা তোর কপালটা দেখি।
বলে আদুরির দিকে চেয়ে থাকে সাপুড়ে। দুচোখ বন্ধ রেখে ফুঁপিয়ে ওঠে আদুরি।
-রাতদিন মন উচাটন। ঘরে টিকতে পারত না স্বামী, তাইতো?
বলে সাপুড়ে। ঘাড় নেড়ে সায় দেয় আদুরি।
-তুমি তো সব জানো বাবা। একটা কিছু করো, আমিও যেন দাঁড়াতে পারি। বাঁচতে বড় সাধ হয়।
ঘর থেকে বলে আদুরির শাশুড়ি।
-তোমায় বাণ মেরেছে মা। তোমারই কাছের মানুষ সর্বনাশ করেছে। তবে নিস্তার পাবে না আর।
বলে সাপুড়ে।
-ওই কালো বাগদির বউ। কদিন খুব আসত বাড়িতে। আমি বুঝেছিলাম কোনো মতলব...
-তুমি শান্ত হও দেখি। বাবা যা করার করছে।
আদুরির শাশুড়িকে চুপ করায় দুলালের মা। আদুরির ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠিতে ধরে সাপুড়ে। সাপের হাঁড়ির ভিতর থেকে একটা মাদুলি বের করে দেয় আদুরির হাতে।
-গলায় বেঁধে রাখবি, বর তোর ফিরে আসবে। শাশুড়ি উঠে দাঁড়াবে।
বলে পাশের ঘরে যায় সাপুড়ে। আদুরির শাশুড়ির কোমরে পায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। দুলালের মা বলে,
-জয় মা জয় মা।
আদুরির শাশুড়ি বলে,
-জয় মা। সোজা করে দাও মা আমায়, মা মনসার পুজো দেবো বাবা।
-সব হবে মা, সব হবে। তুমি সাত দিনের মধ্যে উঠে দাঁড়াবে। ছেলেও তোমার ঘরে ফিরবে। এইবার মায়ের নামে পুজো দে মা।
বলে আদুরির সামনে হাত পাতে সাপুড়ে। অস্বস্তিতে পড়ে আদুরি। বলে,
-ঘরে যে কানাকড়িও নেই বাবা। যা ছিল শাশুড়ির ওষুধ আনতে সব শেষ। কী দিই?
দুলালের মা বলে,
-তোমার কি চোখ নেই বাবা? দেখতে পাও-না এরা বেঁচে আছে কীভাবে! এদের যে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা। কী দেবে? দেখছ না মেয়ের হাতে নোয়া ছাড়া কোনো গয়না নেই অঙ্গে। না বাবা ক্ষমা করো, অপরাধ নিও না। আমরা পারব না বাবা।
-কিন্তু কিছু তো দিতেই হবে মা, মায়ের কাছে কথা দিয়েছি।
গম্ভীর গলায় বলে সাপুড়ে।
-তাই বলে এই ভাবে মেরে দেবে মেয়েটাকে!
-কিছু তো দিতেই হবে মা।
বলে সাপুড়ে।
-কী দেবে। এই দেখো হাতে একগাছি লোহার চুড়ি স্বামীর মঙ্গলের কথা ভেবে। আর তো কিছুই নেই বাবা। আদুরির ডান হাতটা সাপুড়েকে দেখিয়ে বলে দুলালের মা। ঘর থেকে আদুরির শাশুড়ি বলে,
-মা মনসাকে ঠকাসনি। ঘরে যা আছে দে। জীবনের ব্যাপার। টাকাপয়সা না থাকলে তোর সেই কানের দুলজোড়া তো আছে, সেটাই দে। আমি সোজা হলে আবার গড়িয়ে দেবো। গয়না আগে না মানুষ! মন নয়তো তোর বউ পাষাণ!
-এ কী কথা বললে দিদি! তাই বলে মেয়ের গয়না! সেটাই দিতে বললে! ছি ছি।
-মানুষটা যদি ফেরে...
কানের দুল দুটো এনে সাপুড়ের হাতে দেয় আদুরি। মাটির হাঁড়ি থেকে পুঁতির মালাটা খুলে আদুরির হাতে দিয়ে সাপুড়ে বলে ঘরের পুবদিকে ঝুলিয়ে রাখতে হবে, কারো বিষনজর পড়বে না সংসারে।
দুলালের মা তাড়াতাড়ি করে জায়গা মতন রেখে দেয় মালাটাকে।
-আদুরির যে কিছুই রইল না বাবা, সবকিছু তোমায় দিলো! তোমার দেওয়া মাদুলিতে কাজ হবে তো?
দুচোখে জল নিয়ে বলে দুলালের মা।
-হবে হবে হবে। জয় মা মনসা।
বলে সাপের হাঁড়ি নিয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখে সাপুড়ে।
-তোমার জন্যই এত কিছু হলো কাকিমা, জানি না কপালে কী আছে। মানুষটা ফিরলে জানব তোমার জন্যই... দুলালের মাকে প্রণাম করে আদুরি।
-ফিরবে
ফিরবে। যে মানুষ এসেছিল আজ! নে, এবার শান্তি মতো নাওয়াখাওয়া কর। আমি পরে আসব, চাল আর বেগুন দিয়ে
যাব।
দাওয়ায়
বসে আদুরি। আজ মনটা অন্য কথা বলে। মানুষটা ফিরবে ঠিক। সত্যি দুলালের মায়ের কাছে
ঋণের শেষ নেই, মানুষটা ঘরে ফিরলে একটা সাদা শাড়ি কিনে দেবে আদুরি। গরিব হোক বড্ড
উপকারী দুলালের মা, আদুরি বড্ড ভালবাসে মহিলাটিকে।
আদুরির বাড়ির বাইরে এসে রাস্তা ধরে বেশ কিছুটা এগিয়ে আসে দুলালের মা। দূরে দাঁড়িয়ে সাপুড়ে। চারপাশ দেখে নিয়ে সাপুড়ের কাছে এগিয়ে যায় দুলালের মা। নিজের ভাগের একটা কানের দুল খুঁটে বেঁধে নিয়ে বলে,
-এই একই সাপ নিয়েই তোমার কাল কেটে গেল দেখছি। শোনো, পাশের গ্রামের একটা খবর হবে, সাংসারিক বিবাদ, টাকাপয়সা অনেক। সব কথা আগে ভাল করে জানি। দুলালকে দিয়ে জানিয়ে দেবো তোমায়।
মাথা নেড়ে ফিরে যায় সাপুড়ে। বেলা চড়েছে। বাড়ির দিকে মুখ ফেরায় দুলালের মা। বেজায় খুশি, উপায় আজ মন্দ হয়নি।
গলা তুলে বলে দুলালের মা। উঠানের ভিড় ফাঁকা হয়ে আসে।
-আমার মেয়ের জন্য একটা কিছু করো সাপুড়ে বাবা। বড় বিপদ...
-জয় মা বিষহরি
বলে চিৎকার করে সাপুড়ে। আদুরিকে ডাকে,
-আয় মা, মা মনসার সামনে বোস।
কাঠের পুতুলের মতো বসে পড়ে আদুরি। দুলালের মা সামান্য দূরত্ব রেখে দাওয়ার এক পাশে বসে।
-দেখি মা তোর কপালটা দেখি।
বলে আদুরির দিকে চেয়ে থাকে সাপুড়ে। দুচোখ বন্ধ রেখে ফুঁপিয়ে ওঠে আদুরি।
-রাতদিন মন উচাটন। ঘরে টিকতে পারত না স্বামী, তাইতো?
বলে সাপুড়ে। ঘাড় নেড়ে সায় দেয় আদুরি।
-তুমি তো সব জানো বাবা। একটা কিছু করো, আমিও যেন দাঁড়াতে পারি। বাঁচতে বড় সাধ হয়।
ঘর থেকে বলে আদুরির শাশুড়ি।
-তোমায় বাণ মেরেছে মা। তোমারই কাছের মানুষ সর্বনাশ করেছে। তবে নিস্তার পাবে না আর।
বলে সাপুড়ে।
-ওই কালো বাগদির বউ। কদিন খুব আসত বাড়িতে। আমি বুঝেছিলাম কোনো মতলব...
-তুমি শান্ত হও দেখি। বাবা যা করার করছে।
আদুরির শাশুড়িকে চুপ করায় দুলালের মা। আদুরির ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠিতে ধরে সাপুড়ে। সাপের হাঁড়ির ভিতর থেকে একটা মাদুলি বের করে দেয় আদুরির হাতে।
-গলায় বেঁধে রাখবি, বর তোর ফিরে আসবে। শাশুড়ি উঠে দাঁড়াবে।
বলে পাশের ঘরে যায় সাপুড়ে। আদুরির শাশুড়ির কোমরে পায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। দুলালের মা বলে,
-জয় মা জয় মা।
আদুরির শাশুড়ি বলে,
-জয় মা। সোজা করে দাও মা আমায়, মা মনসার পুজো দেবো বাবা।
-সব হবে মা, সব হবে। তুমি সাত দিনের মধ্যে উঠে দাঁড়াবে। ছেলেও তোমার ঘরে ফিরবে। এইবার মায়ের নামে পুজো দে মা।
বলে আদুরির সামনে হাত পাতে সাপুড়ে। অস্বস্তিতে পড়ে আদুরি। বলে,
-ঘরে যে কানাকড়িও নেই বাবা। যা ছিল শাশুড়ির ওষুধ আনতে সব শেষ। কী দিই?
দুলালের মা বলে,
-তোমার কি চোখ নেই বাবা? দেখতে পাও-না এরা বেঁচে আছে কীভাবে! এদের যে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা। কী দেবে? দেখছ না মেয়ের হাতে নোয়া ছাড়া কোনো গয়না নেই অঙ্গে। না বাবা ক্ষমা করো, অপরাধ নিও না। আমরা পারব না বাবা।
-কিন্তু কিছু তো দিতেই হবে মা, মায়ের কাছে কথা দিয়েছি।
গম্ভীর গলায় বলে সাপুড়ে।
-তাই বলে এই ভাবে মেরে দেবে মেয়েটাকে!
-কিছু তো দিতেই হবে মা।
বলে সাপুড়ে।
-কী দেবে। এই দেখো হাতে একগাছি লোহার চুড়ি স্বামীর মঙ্গলের কথা ভেবে। আর তো কিছুই নেই বাবা। আদুরির ডান হাতটা সাপুড়েকে দেখিয়ে বলে দুলালের মা। ঘর থেকে আদুরির শাশুড়ি বলে,
-মা মনসাকে ঠকাসনি। ঘরে যা আছে দে। জীবনের ব্যাপার। টাকাপয়সা না থাকলে তোর সেই কানের দুলজোড়া তো আছে, সেটাই দে। আমি সোজা হলে আবার গড়িয়ে দেবো। গয়না আগে না মানুষ! মন নয়তো তোর বউ পাষাণ!
-এ কী কথা বললে দিদি! তাই বলে মেয়ের গয়না! সেটাই দিতে বললে! ছি ছি।
-মানুষটা যদি ফেরে...
কানের দুল দুটো এনে সাপুড়ের হাতে দেয় আদুরি। মাটির হাঁড়ি থেকে পুঁতির মালাটা খুলে আদুরির হাতে দিয়ে সাপুড়ে বলে ঘরের পুবদিকে ঝুলিয়ে রাখতে হবে, কারো বিষনজর পড়বে না সংসারে।
দুলালের মা তাড়াতাড়ি করে জায়গা মতন রেখে দেয় মালাটাকে।
-আদুরির যে কিছুই রইল না বাবা, সবকিছু তোমায় দিলো! তোমার দেওয়া মাদুলিতে কাজ হবে তো?
দুচোখে জল নিয়ে বলে দুলালের মা।
-হবে হবে হবে। জয় মা মনসা।
বলে সাপের হাঁড়ি নিয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখে সাপুড়ে।
-তোমার জন্যই এত কিছু হলো কাকিমা, জানি না কপালে কী আছে। মানুষটা ফিরলে জানব তোমার জন্যই... দুলালের মাকে প্রণাম করে আদুরি।
আদুরির বাড়ির বাইরে এসে রাস্তা ধরে বেশ কিছুটা এগিয়ে আসে দুলালের মা। দূরে দাঁড়িয়ে সাপুড়ে। চারপাশ দেখে নিয়ে সাপুড়ের কাছে এগিয়ে যায় দুলালের মা। নিজের ভাগের একটা কানের দুল খুঁটে বেঁধে নিয়ে বলে,
-এই একই সাপ নিয়েই তোমার কাল কেটে গেল দেখছি। শোনো, পাশের গ্রামের একটা খবর হবে, সাংসারিক বিবাদ, টাকাপয়সা অনেক। সব কথা আগে ভাল করে জানি। দুলালকে দিয়ে জানিয়ে দেবো তোমায়।
মাথা নেড়ে ফিরে যায় সাপুড়ে। বেলা চড়েছে। বাড়ির দিকে মুখ ফেরায় দুলালের মা। বেজায় খুশি, উপায় আজ মন্দ হয়নি।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment