প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Saturday, May 4, 2024

কবিতাগুচ্ছ | সৈয়দ হাসমত জালাল | ছ'টি কবিতা

বাতায়ন/কবিতা/২য় বর্ষ/সৈয়দ হাসমত জালাল সংখ্যা/২১শে বৈশাখ, ১৪৩১

কবিতাগুচ্ছ

সৈয়দ হাসমত জালাল

ছ'টি কবিতা

চৈত্রসকাল

সৈয়দ হাসমত জালাল

চৈত্রসকাল, শান্ত, অনুষ্ণ
ছেঁড়া কুয়াশার আড়াল সরিয়ে
                        উঁকি দিচ্ছে আরক্ত সূর্যমুখ
টলটলে শিশিরফোঁটার মতো জমে আছে বিষাদবিন্দুরা
গুনগুন সুর তুলে চলেছে দূরগামী পথ
কে তা শুনছে? ধূসর আকাশ?
                 খণ্ড খণ্ড ভেঙে যাওয়া গহন মর্মমূল?
                      খেলার সিংহাসন? নিশ্চুপ দেবীমূর্তিখানি?
আরাবল্লীর পাহাড়ে ফুটেছে পলাশ
                   আমারই অজস্র শুকনো ডালে ডালে
আর ভাঙা হৃদয়ের গান
                           ঢেউ তুলে ভেসে যাচ্ছে
                                             বাংলার চৈত্রসকালে
                                  -----------

আকাশপ্রতিমা
সৈয়দ হাসমত জালাল

তোমাকে ডেকেছি, সান্ধ্যনদীর হাওয়া
                    উড়িয়ে নিয়ে গেছে সেই অনুচ্চ স্বর
ক্ষীণ প্রতিধ্বনি ডুবে গেছে ঘূর্ণি-জলস্রোতে
মাথার উপরে ঝুঁকেছিল মেঘ, উদাসীন মন্থর
নির্নিমেষ দেখেছি ছায়াদের ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়া
এক-একটি নির্জন মৃত্যু পার হয়ে গেছি কোনোমতে
কালো ছায়া নেমেছে দূর দিগন্তপ্রসারে
আমার শরীরে ছিল মগ্ন আষাঢ়ের সজলতা
একদা জেনেছি দহনের রাত, ভস্মপ্রণয়কথা 
দেখেছি সন্ধ্যাতারা জ্বলেছে তোমার নীল স্তনহারে
মুখের শান্ত পাথরে ফুটেছে স্তব্ধ আলোর রেখা
শুনশান চরাচরে বেজেছে বৃষ্টিধ্বনি, উন্মাদ কেকা
তুমি কি ত্রস্ত, আকাশপ্রতিমা, এমন সুদূর, নিরুত্তর
একটি গোপন ডাক তোমাকে থাকবে ছুঁয়ে
                                              আমার মৃত্যুরও পর
                                     --------

আমাদের দিন
সৈয়দ হাসমত জালাল

কতদিন পর ভোরের পাখির ডাক শুনছি আজ
কতদিন পর চোখে পড়ছে ছাদের কিনারে
                            ঝুঁকে আছে মসৃণ নারকেলপাতা
ওপাশে টিনের চালে ব্যস্ত কাঠবেড়ালি
আর বাগানের কোণে ভোরের আলোয়
                       ঝলমল করছে গাছভর্তি কনকচাঁপা
ভাবি, এও কি আমারই জীবনপ্রবাহ নয়—
যদিও এক-একটি দিন জ্বলন্ত চিতা
ঘরে ঘরে দাবদাহ, ছাইচাপা প্রেম আর হাহাকার
যদিও তোমাদের ছায়াচ্ছন্ন ভৌতিক করিডরে
                                             ক্লিন্ন মাছিদের গুঞ্জন
আর ভারী জুতোর শব্দ সারি সারি শবের উপর
তবু ভোরের পাখিরা ডাকছে আজ
ডানা মেলে উড়াল দিচ্ছে আমাদের জেদী থমথমে দিন
                                   ------------

অনিঃশেষ
সৈয়দ হাসমত জালাল

মেঘ ও মৃত্যুছায়ার ভেতর থমথম করে দিন
বুকে চেপে থাকে বোবাকষ্ট ও রাত্রিপাথর
প্রেম আর পরিচর্যার কাছে বেড়ে যায় ঋণ
কে কাকে পরিশোধ করে, যে ক্ষুৎকাতর
হাতগুলি জলস্ৰোত ভেঙে শূন্য আঁকড়ে থাকে
স্তব্ধ আকাশ কি তাদের সান্ত্বনা দেয়, নাকি শোক
শোকের ওপার থেকে মায়াবী ভাতের গন্ধ ডাকে
আহা ভাত আর মাটির গন্ধে খসে পড়ে নির্মোক
শতাব্দী পেরিয়ে সারি সারি কঙ্কাল হেঁটে আসে
ভয়ে নয়, ত্রাসে নয়, লজ্জায় আমার স্বদেশ
দুই হাতে ঢাকে মুখ, তবুও কে ভালোবাসে
এই জল হাওয়া মাটির সন্তান আর স্বপ্ন অনিঃশেষ
                             --------

শিলালিপি
সৈয়দ হাসমত জালাল

তোমার ভাষায় কথা বলি আমি, চোখে রাখি চোখ,
ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে পাহাড় নদী আর শস্যপ্রান্তর
মেঘ ও রৌদ্রের শিলালিপি তোমার পথের পাশে,
ওইখানে ভ্রমণ আমার, বুকের ভেতরে অনন্তলোক
ওইখানে শালবনে আমাকে ডেকেছে হাওয়াদের মর্মর
ডেকেছ তুমিও, গোধূলিতে, চোখের আলোর গাঢ় উদ্ভাসে
সে এক শান্ত আগুনশিখা জ্বলে যায় শব্দের বুকে অবিরত
তুমি কি সেই ভাষা বোঝো, তীব্র ঘূর্ণিস্রোতের মতো
পাকে পাকে আমাকে জড়িয়ে রাখে-- সারারাত
ডুবে থাকি অবিস্মরণে, অন্ধকারেও বাড়াই দু-হাত
আগলে রাখি এক আজন্ম স্বভূমি, নীল দিগন্তরেখা
পড়ে নিয়ো, শব্দের ভেতরে যে মেঘবিদ্যুৎ নিঃসঙ্গ কেকা
                               -----------

একটি আলোর ধ্বনি
সৈয়দ হাসমত জালাল

বহুদিন পরে আজ দীর্ঘ অবকাশ,
সূর্যোদয়ের নিচে
জেগে উঠছে একটি উজ্জ্বল অঘ্রাণভোর,
কুয়াশা ও হিমপতনের শব্দ আর রুদ্ধ সময়স্রোত
পার হয়ে এসে
উদ্বেগ, মৃত্যুর ছায়া আজ কত তুচ্ছ হয়ে আসে, হিরণ্যপ্রভ, তোমার উদ্ভাসে
একটি পাখির ডাকে বেজে ওঠে মৃদু স্বপ্নঘোর
বাতাসের সুরে পাতাদের অলক্ষ্য শিহরণ
ক্রমশ নিবিড় হয়ে হেমবর্ণ একটি সকাল
বুকের অতলে থেমে থাকে স্থির,
একটি আলোর ধ্বনি এভাবে জাগাও, রাত্রিপাথর
এই অবকাশ পূর্ণ করো প্রেমে, অচঞ্চল মায়া
পূর্ণ করো এ আকাশ-মাটির জীবন
সে ধ্বনি ছড়াক শেকড়ে, দিগন্তপথে,
নদীর প্রবহস্বরে,
হিরণ্যপ্রভ, তোমার আলো-শুশ্রূষা জেগে থাক
গোধূলি ও শান্ত জ্যোৎস্নাশিখরে
                             --------
 
কবি পরিচিতি

সৈয়দ হাসমত জালালের জন্ম ১৯৫৭ সালের ১২ জুলাই, মুর্শিদাবাদ জেলার খোশবাসপুর গ্রামে। পারিবারিকভাবেই সাহিত্য-শিল্পচর্চার পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা। পিতা সৈয়দ আব্দুর রহমান ফেরদৌসী ছিলেন সাহিত্যিক, ইতিহাস-গবেষক ও স্বাধীনতা-সংগ্রামী।
স্কুলে ছাত্রাবস্থায় ছড়া-পদ্য দিয়ে লেখার শুরু। একাদশ শ্রেণীর ছাত্র জালালের প্রথম কবিতা বহরমপুর থেকে প্রকাশিত কবি মণীশ ঘটক সম্পাদিত 'বর্তিকা' কর্তৃক পুরস্কৃত হয়।
 
এক অনুদ্ধারণীয় রোমান্টিকতা জালালকে টেনে নিয়ে যায় ভারতীয় বিমান বাহিনীতে। স্বাধীনতা-সংগ্রামী পিতার কাছ থেকে পাওয়া দেশাত্মবোধও অনুপ্রাণিত করেছিল তাঁকে। ভারতের বিভিন্ন শহর ও সীমান্তে যৌবন যাপন করেছেন। কিন্তু তাঁর সাহিত্যচর্চা থেমে থাকেনি। কম বয়স থেকেই উল্লেখযোগ্য পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে এবং সাহিত্য মহলে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেন। সত্তর দশকের শেষ ভাগে দিল্লির সাহিত্যচর্চায় তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
 
১৯৯০ সাল থেকে কলকাতা শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু। কর্পোরেট সংস্থার প্রশাসন সামলেছেন দক্ষতার সঙ্গে। পরে পুরোপুরি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। সংবাদপত্রে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লিখেছেন প্রচুর গদ্য। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে অংশ নিয়েছেন বহু সেমিনারে ও সাহিত্য সম্মেলনে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাংলা আকাদেমি পুরস্কার, বিষ্ণু দে পুরস্কারসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এবং বাংলাদেশে পেয়েছেন অনেক উল্লেখযোগ্য পুরস্কার, বহু সম্মাননা এবং সংবর্ধনা। সাহিত্য ছাড়াও সংস্কৃতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাঁর উপস্থিতি যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য।
 

2 comments:

  1. ভীষণ প্রিয় লেখক। কবিতা গুচ্ছ অসাধারণ। শুভেচ্ছা কবিকে

    ReplyDelete
  2. খুব ভালো লাগল। প্রিয় লেখককে শুভকামনা জানাই। - জয়িতা বসাক

    ReplyDelete

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)