বাতায়ন/প্রবন্ধ/২য়
বর্ষ/সৈয়দ হাসমত জালাল সংখ্যা/২১শে বৈশাখ, ১৪৩১
প্রবন্ধ
তন্ময় কবিরাজ
স্বপ্নের পাশে অনিল
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
"ভালবাসা যেখানে গভীর নত হওয়া সেখানে গৌরবের।" অনিল সরকারের কথা মনে
করতে গিয়ে এই কথাগুলো মনে হলো কারণ কবিতা তাঁর ভালবাসার জায়গা যেখানে তিনি
স্বাধীনতা খুঁজে পান, শান্তি পান তাই কবিতায় তিনি তাঁর নিজের সব অব্যক্তকে উজাড়
করে দেন সগৌরবে। কবিতাই কবির অগ্নি পরীক্ষা। তিনি মনেপ্রাণে বামপন্থী। তিনি স্বপ্ন
দেখেন, স্বপ্নের পথে এগিয়ে যান প্রতিবাদ-বিপ্লবের হাত ধরে। তিনি মন খোলা। বিতর্কে
তাঁর
ভয় নেই। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মহাশ্বেতা দেবী থাকলে তিনি সাবলীল
ভাষায় বলে দিতে পারেন, ফ্যাসিস্টদের আখড়ায় ঘুরে বেড়ায় সব বুদ্ধিজীবিদের
দালাল। তিনি বাংলা ভাষাকে ভালবাসেন। আবার কখনও তিনি মনের কোণে প্রশ্রয় দেন
দ্বন্দ্বের - "পাহাড় যেন আকাশ ছোঁয়/বুকের ভেতর নদী।" অনিল সরকারের
কাছে "জীবন যেন বিষ"। কবিতায় তিনি যেমন ছন্দ অলংকারের পরীক্ষানিরীক্ষা
করেছেন, তেমনি সাবলীল থেকে গেছেন তাঁর বক্তব্য প্রকাশে। নিজের বক্তব্যকেই তিনি
বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর চিন্তায় স্রোতে ভেসে যায় পাবলো নেরুদা থেকে
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কবিতায় তিনি মেটাফরের আশ্রয় নিয়েছেন শুধু ভাঙা
স্বপ্নের পার্থিবতাকে বোঝানোর জন্য। তিনি আদিম নন, তাঁর কবিতায় ফ্রয়েডের ইড নেই,
আছে মার্কসীয় দর্শন আর পরিবর্তনশীল জীবনে টিকে থাকার ডারউইনের মৌলিক সত্য। হতাশার
জীবনে তিনি খুঁজে পান এলিয়টকে। কখনও বিবর্ণ ব্রেখটের চিন্তায় সমীকরণ যখন মিলতে
চায় না, শুধু দ্বন্দ্ব আর সংশয় পড়ে থাকে চারদিকে। মধ্যবিত্তের বিলাসিতার
সমার্থক শান্তি। চারদিকে রাজরোষ, শাসনের অত্যাচার সেখানে বাঘের অ্যালেগরি তো আসবেই। সুখের থাকার চিন্তা জীবনের পরিহাস।
বৈষম্যমূলক সমাজে থাকতে হলে এই সত্যকে মানতেই হবে। ভবিষ্যৎ পরিবর্তন আনবে না যদি
বর্তমানে পরিবর্তন না আসে। অস্তিত্বের লড়াইয়ে তাই মৃত্যুর হাতছানি, মাঝেমধ্যে
বেন্থামের সুখবাদের হেঁয়ালি জীবনকে তিক্ততা উপহার দেয় সযত্নে। কবি অনিল সরকার
লেখেন, "যতই সামনে যাচ্ছি/যতই নাড়া দিচ্ছি শিকড়ে অস্তিত্বে/মুখোশে খসে
পড়ে, মুখ দেখি দানবে।" সমাজে মুখ আর মুখোশের অবিরত লড়াই। বিশ্বাসের মৃত্যু
ঘটছে । এ যেন ম্যাকবেথ আর সরল ডানকানের বিশ্বাস হারানোর গল্প। শুধু ভালবাসা
নিরুদ্দেশ। কিছু প্রশ্নের উত্তর চান কবি অনিল সরকার, "মাগো, যে ছেলে তোর আগুন
গিলে খায়/বারুদে মাজে দাঁত/কি নাম দিবি তাঁর?" তিনি কবিতাকে চেনা রোমান্টিক
গণ্ডি থেকে টেনে বার করে আনেন। চলমান শব্দের তুলিতে কবিতায় এঁকেছেন চার্লস
ডিকেন্সের মতো জীবনের হার্ড টাইমস। তিনি হোরাস নন, তিনি ওয়েন কিংবা বার্নার্ড
শয়ের যুগলবন্দি তাই অনিল সরকারের কবিতায় মৃত্যুর থেকে জীবনের দাম অনেক বেশি।
জীবন সুন্দর হলে স্বপ্নরা জোনাকির মতো ভিড় জমাবে। "নামুক তোমার বুকে রাত্রি
এখন/ফিরে আসুক সন্ধের পাখিরা।"
সাহিত্যের শুরু হয়েছিল গদ্য দিয়ে। অনিল সরকার গানও ভালবাসতেন। কুমিল্লায় রাম মালা বোর্ডিং-এ থাকার সময় প্রিয়লাল দাসের সঙ্গে আলাপ। তাঁর মুখেই বামপন্থী আন্দোলনের কথা শুনে অনুপ্রাণিত হন। পরবর্তীকালে ভানু ঘোষের কাছে রাজনীতির হাতে খড়ি। ১৯৫৬সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য ত্রিপুরায় চলে আসেন এবং সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। শুরুর দিকে সমর সেনের মতো রবীন্দ্র-নজরুলের প্রভাব ছিল তাঁর কবিতায়। পরের দিকে অবশ্য তিনি সেই প্রভাব কাটিয়ে উঠেছেন। সুকান্তের লেখা পড়তে ভালবাসতেন। শাসকের শোষণ, সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা, ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী কলম বারবার গর্জে উঠেছে। তিনি নিজের বক্তব্যে কোনদিন আপোষ করেননি। তিনি জানতেন, মানুষের সংগঠিত গণজাগরণই একদিন মানুষের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। তাই স্বপ্ন দেখে অলসতা নয়, বরং স্বপ্নের তাগিদে হাঁটতে হবে লক্ষ্যের দিকে। জীর্ণ মানসিকতার বুকে তাঁর কবিতা ইউলিশিসের মতো প্রেরণা জোগায়। তাঁর কবিতা গণজাগরণের পাওয়ার হাউস। কবি লিখেছিলেন, "আমরা একদিন কেড়ে নেবো রাজ দ্বন্দ্ব/এক দিন আমরাই শাসক হবো।" পথিক পথ হেঁটে যায় বিশ্বাসে, বিশ্বাসকে পাথেয় করেই সে জয় করে অচেনা দুনিয়া। অলস পৃথিবীর লোটাস ইটার্স হলে জীবনের অমৃত স্বাদ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তাই স্বপ্ন থাকলে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন কবি অনিল সরকার। তিনি ব্রিটিশ কবি শেলীর মতো জানেন, স্বপ্নের পথে বাধা থাকবেই। তিনি লিখেছিলেন, "আমরা যেন জড়িয়ে আছি স্বপ্নে ও কাঁটায়।" আলংকারিক অ্যান্টি থিসিসের অপূর্ব মেলবন্ধনে জীবন শিখে যায় সংগ্রামের বর্ণময় দর্শন। তাই কবি বলেন, "তুমি বলেছো, তোমার যুদ্ধেই আমাদের ভালোবাসা.../একদিন তুমি কেঁদে ছিলে আমার জন্য/আজ তুমি দ্বিধাহীন/যুদ্ধে যাও আমার জন্য।" যুদ্ধ এখানে রূপক, যার আড়ালে রয়েছে শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। মানুষকে বুঝতে হবে, লড়াই করে ছিনিয়ে নিতে হবে নিজের অধিকার। স্বাধীনতার স্বার্থে বিপ্লবের দরকার। জীবনকে সুস্থ করে রাখতে হলে শাসকের বিরুদ্ধে বিপ্লবই পরম ধর্ম। তাঁর কবিতার শব্দ হয়ে উঠেছে স্লোগান, "চড়া শব্দে কথা বলো", যাতে রাজার কানে শব্দের আবেদন পৌঁছায়। রাজা তো ধ্রুপদী ইডিপাস যে নিজের নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে সমাজে নীতির আলো জ্বালাতে চেষ্টা করছে। রবীন্দ্রনাথের মতো অনিল সরকার একই মতে বিশ্বাসী, রাজা আসবে, রাজা যাবে, মানুষ থেকে যাবে। শ্রমিকের শ্রমেই রচিত হবে সভ্যতার রূপকথা। তাই খেটে খাওয়া মানুষের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। তিনি সত্যের বন্ধু। সরাসরি বলে দিতে পারেন, "যা মানার নয়/কোনদিন মানব না।" উলঙ্গ রাজা কবিতার সেই শিশুটি বোধহয় কবি অনিল সরকার যে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে বস্ত্রহীন রাজার অহংকারে আঘাত হানতে পারেন - রাজা তোর কাপড় কোথায়?
বাংলা ভাষার প্রতি কবি
অনিল সরকারের ছিল গভীর ভালবাসা। তিনি তাঁর ভাষাতেই ভারত বাংলাদেশের অকৃত্রিম সেতু
রচনা করেছিলেন। কবি মাহমুদ সামাদ কবি অনিল সরকারের মৃত্যুর পরে তাঁর অবদানের কথা
মনে করিয়ে দিয়েছেন। ভাষার আবেগের ঝড় ওঠে তাঁর শব্দে। তিনি লেখেন, "যে
ভাষায় আমাদের প্রথম আর্তনাদ ঝরে/সে আমার মাতৃভাষা বাংলা।" যে ভাষায়
প্রতিবাদ শাণিত হয়, স্বপ্নের মশাল জ্বলে, সাফল্যের আবেগ উপচে পড়ে, কবি মনে করেন,
সেই ভাষার আরোও যত্ন ভালবাসা দরকার। বিশ্বায়নের যুগে বাংলা ভাষা তার মৌলিক জায়গা
থেকে অনেকটাই সরে গেছে। কবি অনিল সরকারের যাবতীয় লড়াইয়ের শেষ হয় ভালবাসায়।
আক্ষেপ থাকবেই, চাওয়াপাওয়ার হিসাব মিলবে না কোনোদিন। তা বলে তিনি পলাতক হবেন না।
বরং শেষ থেকে শুরু হবে প্রতি ব্যর্থতার পরেই। তিনি লেখেন, "আমি যারে
ভালোবাসিয়াছি /যদিও মাঝখানে হলো না মিলন।" হেনরি ওয়ার্ডসওয়ার্থ লংফেলোর ডে
ব্রেক কবিতার হাওয়ার মতো অনিল সরকারের কবিতা ঘুমন্ত জীবনে নতুন ভোরের হাতছানি
বয়ে আনে। সমাজকে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন তিনি, বাদ যায়নি পুলিশও, "পুলিশ
তুমি/দেশের ছেলে/দেশ তো তোমার মা/মায়ের শরীর চাটে শিয়াল/তুমি জাগবে না?"।
দেশ তো মা। দেশ কবি অনিল সরকারের কাছে ওয়ার্ডসওয়ার্থের লুসি। ছেলে হয়ে মায়ের সম্মান
রাখাই ধর্ম। ধর্ম তো নীতির বাইরে কিছু নয়। তিন শত্রু কবিতায় তিনি চিরাচরিত ধর্ম
চিন্তায় আঘাত করেছেন। অনিল সরকারের কবিতার বিষয় আলাদা কিছু নয়, চেনা কিন্তু
তাঁর পরিবেশনার হয়ে উঠে অচেনা। তিনি নব্য ভাবনার জন্ম দেন। লেখা তাই সমাজ জীবনের
দলিল হয়ে যায়। স্বপ্ন দেখলে তাঁর লেখায় পাওয়া যায় প্রশ্রয়, অনিশ্চিত জীবনে
বেঁচে থাকাটাই আশ্চর্যের। তাই তিনি লিখে যান, "এখন যেখানে আছি/বেশি ক্ষণ থাকা
যাবে না।"
সাহিত্যের শুরু হয়েছিল গদ্য দিয়ে। অনিল সরকার গানও ভালবাসতেন। কুমিল্লায় রাম মালা বোর্ডিং-এ থাকার সময় প্রিয়লাল দাসের সঙ্গে আলাপ। তাঁর মুখেই বামপন্থী আন্দোলনের কথা শুনে অনুপ্রাণিত হন। পরবর্তীকালে ভানু ঘোষের কাছে রাজনীতির হাতে খড়ি। ১৯৫৬সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য ত্রিপুরায় চলে আসেন এবং সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। শুরুর দিকে সমর সেনের মতো রবীন্দ্র-নজরুলের প্রভাব ছিল তাঁর কবিতায়। পরের দিকে অবশ্য তিনি সেই প্রভাব কাটিয়ে উঠেছেন। সুকান্তের লেখা পড়তে ভালবাসতেন। শাসকের শোষণ, সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা, ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী কলম বারবার গর্জে উঠেছে। তিনি নিজের বক্তব্যে কোনদিন আপোষ করেননি। তিনি জানতেন, মানুষের সংগঠিত গণজাগরণই একদিন মানুষের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। তাই স্বপ্ন দেখে অলসতা নয়, বরং স্বপ্নের তাগিদে হাঁটতে হবে লক্ষ্যের দিকে। জীর্ণ মানসিকতার বুকে তাঁর কবিতা ইউলিশিসের মতো প্রেরণা জোগায়। তাঁর কবিতা গণজাগরণের পাওয়ার হাউস। কবি লিখেছিলেন, "আমরা একদিন কেড়ে নেবো রাজ দ্বন্দ্ব/এক দিন আমরাই শাসক হবো।" পথিক পথ হেঁটে যায় বিশ্বাসে, বিশ্বাসকে পাথেয় করেই সে জয় করে অচেনা দুনিয়া। অলস পৃথিবীর লোটাস ইটার্স হলে জীবনের অমৃত স্বাদ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তাই স্বপ্ন থাকলে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন কবি অনিল সরকার। তিনি ব্রিটিশ কবি শেলীর মতো জানেন, স্বপ্নের পথে বাধা থাকবেই। তিনি লিখেছিলেন, "আমরা যেন জড়িয়ে আছি স্বপ্নে ও কাঁটায়।" আলংকারিক অ্যান্টি থিসিসের অপূর্ব মেলবন্ধনে জীবন শিখে যায় সংগ্রামের বর্ণময় দর্শন। তাই কবি বলেন, "তুমি বলেছো, তোমার যুদ্ধেই আমাদের ভালোবাসা.../একদিন তুমি কেঁদে ছিলে আমার জন্য/আজ তুমি দ্বিধাহীন/যুদ্ধে যাও আমার জন্য।" যুদ্ধ এখানে রূপক, যার আড়ালে রয়েছে শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। মানুষকে বুঝতে হবে, লড়াই করে ছিনিয়ে নিতে হবে নিজের অধিকার। স্বাধীনতার স্বার্থে বিপ্লবের দরকার। জীবনকে সুস্থ করে রাখতে হলে শাসকের বিরুদ্ধে বিপ্লবই পরম ধর্ম। তাঁর কবিতার শব্দ হয়ে উঠেছে স্লোগান, "চড়া শব্দে কথা বলো", যাতে রাজার কানে শব্দের আবেদন পৌঁছায়। রাজা তো ধ্রুপদী ইডিপাস যে নিজের নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে সমাজে নীতির আলো জ্বালাতে চেষ্টা করছে। রবীন্দ্রনাথের মতো অনিল সরকার একই মতে বিশ্বাসী, রাজা আসবে, রাজা যাবে, মানুষ থেকে যাবে। শ্রমিকের শ্রমেই রচিত হবে সভ্যতার রূপকথা। তাই খেটে খাওয়া মানুষের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। তিনি সত্যের বন্ধু। সরাসরি বলে দিতে পারেন, "যা মানার নয়/কোনদিন মানব না।" উলঙ্গ রাজা কবিতার সেই শিশুটি বোধহয় কবি অনিল সরকার যে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে বস্ত্রহীন রাজার অহংকারে আঘাত হানতে পারেন - রাজা তোর কাপড় কোথায়?
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment