প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Friday, May 3, 2024

বাবুইবাসা | জয়িতা ভট্টাচার্য

বাতায়ন/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/সৈয়দ হাসমত জালাল সংখ্যা/২১শে বৈশাখ, ১৪৩১

ছোটোগল্প

জয়িতা ভট্টাচার্য

বাবুইবাসা


নীল। আর নীলের সঙ্গে মিশিয়ে একটা সাদার প্যাটার্ন তৈরি হচ্ছে। স্টক নয় ফ্লো কনসেপ্ট। ঠিক চলছে চলবে টাইপ। তার মধ্যে একরাশ সবুজ ধেবড়ে পড়ে আছে জলে। ল্যাপটপ বন্ধ করে জানলার বাইরে খানিকক্ষণ তাকিয়ে তারপর দু হাতে চোখ চাপা দিল নির্বাণ। সঙ্গে সঙ্গে  কালো একটা পর্দা নামল সেটে আর সেকেন্ডের মধ্যে ফিনকি দিয়ে লাল। বারান্দায় এসে

দাঁড়াল নির্বাণ। এখান থেকে একটু দূরে রেলপথ দেখা যাচ্ছে। মাঝে একটা মাঠ ছিল। গাছে গাছে বাবুই পাখির বাসা ছিল। প্যাসেরাইন, প্লোসিডি গোত্র। বাবুই পাখির বাসাগুলো কোথায় যে গেল। বাবুই পাখিরা সবাই কোথায় যে...
অনিন্দ্য আসবে একটু দেরিতে আজ। একটু রাতে। ঠিক নেই। নির্বাণ প্রায় সারারাত কাজ করেছে। সারাদিন সারারাত সে অনেক বই পড়েছিল একসময় অকারণ বেকার সময় ব্যয় মনে হয় এখন। এন্ট্রান্স পরীক্ষার পাশ করার জন্য শরীর মন বিপণ্ণ হয়ে গেছিল। মা-বাবার টাকা গচ্চা দিয়ে বালের ইঞ্জিনিয়ার। অর্ধেক জীবন বিক্রি করে এই দাসত্ব কিনেছে নির্বাণ। এখন দিনরাত ভয়ে ভয়ে কাটে । দুঃস্বপ্ন তাড়া করে সকালে অফিস গেলেই কোনোদিন হাতে ধরিয়ে দেবে ছাঁটাইয়ের নোটিশ। একটা নিটোল জরায়ু ঝুলে আছে, ভেতরে একটা বন্ধ ঘর। একটা প্রবেশ পথ। নরম পেট দিয়ে ঘাসের আস্তরণ ঘষে ঘষে মসৃণ করে নিচ্ছে পাখিটা। ভ্যানে করে টাটকা সবজি এনেছে ভানু। ডোরাকাটা নাইলন থলে নিয়ে ধীরে সুস্থে বাজার যাচ্ছে পাড়ার কাকু। চায়ের দোকানে কয়েকটি অল্পবয়সি আর দু-একজন বয়স্ক মানুষ। সামনে বসে আছে ক্লাসের গুডবয়দের মতো একটা রং চটা কুকুর। এইসব  চা-কাগজ-আড্ডার জগতে নির্বাণ কোনোদিন ঢুকতে পারেনি। কেন?
হঠাৎ মেঘ আসছে। নতুন ফ্ল্যাটের চারতলার দাদু বাচ্চা মেয়েটাকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাচ্ছে। একবার বিকেলে তাক লাগিয়ে দেওয়া একটা হলুদ আলোয় ছেয়ে গেছিল চারিপাশ। ওটাকে কি কনে দেখা আলো বলে? সকাল বেলায় হঠাৎ কেন এই কথা মনে হলো কে জানে। সেদিনও অনিন্দ্য এসেছিল।
মিতার আজ দেরি হয়ে গেছে। চারবাড়ি কাজের তৃতীয় বাড়ি কাঞ্চন বউদির। কিন্তু এক ঘন্টা লেট। ওই খালের ওপারে টপ করে একবার গেছিল। নিতান্ত প্রয়োজনে। টাকা ধার চাইতে শামশেরের কাছে। তারপর রাজুদাদার বউ হাতে করে লুচি আলুরদম দিল। যাক বউদি থাকবে না এখন। বকবকানি নেই। বেল বাজায়।
চোখের পর্দায় একটা জাল। আর জালের মধ্যে একটা কালো মাছি উড়ছে। তারপর একটু ধাতস্থ হলে জালের ওপারে শহরটা। প্রসন্নর বেশ কিছুদিন ধরে এমন হচ্ছে। সেদিন চায়ের দোকানের গোপাল বলছিল ছানি হতে পারে। চোখটা গড়বড় করছে। মাথাটাও মনে হয়। নাতনিকে স্কুল বাসে উঠিয়ে দিয়ে মন খারাপের কথাটা ভাবছেন প্রসন্ন। যেমনটা ভেবেছিলেন তেমনটা হচ্ছে না। মিলছে না। প্রেসারের ওষুধ কিনতে হবে। সুগারেরও। বুক ঢিপ ঢিপ করছে। ভয়ে নয় হার্টের সমস্যায়। দুবছর ক্যানসারে ভুগে সোমা চলে যাবার একবছর পর বাগনানের বাড়ি বেচেবুচে টাকাপয়সা সব একমাত্র মেয়ে অমৃতাকে দিয়ে মেয়ে-জামাইয়ের ঢাকুরিয়ার ফ্ল্যাটে চলে এলেন। হাতে শুধু এখন পেনশনের কয়েকটা টাকা। কাজটা কি ভুল হয়েছিল? মাঝে মাঝে সোমাকে জিজ্ঞেস করেন আজকাল। পুরোনো পাড়া লোকজন ছেড়ে নতুন মাটিতে গাছ যেমন থাকে। অমৃতা আর জামাই জয়দীপ জোর করছিল। কথাটা যুক্তিযুক্ত ছিল। সিঁড়ির মুখে এসে একটু দাঁড়িয়ে পড়লেন। হাঁফিয়ে গেছেন রোদে। সব ঠিকঠাক চলছিল প্রথমদিকে। জয়দীপ অতিরিক্ত মদ্যপান করে আজকাল, ঘরের মধ্যে অশান্তি, চেঁচামেচি, সোমার সঙ্গে পঁয়তাল্লিশ বছরের দাম্পত্যে বিস্তর ঝগড়াঝাঁটি হলেও এমনতর কখনও হয়নি। কোভিডের পরে জয়দীপের চাকরি চলে গেল। অনটন। এখন ছোটখাট একটা কাজ পেয়েছে অবশ্য। নাতনির পড়াশোনার জন্য অমৃতা একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। আর ভাল লাগে না বাঁচতে। মিতা কাজ করছে রান্নাঘরে। কাজ হলে দরজা ভেজিয়ে চলে যেতে বলে প্রসন্ন বারান্দার গাছে জল দিতে এসে দেখছেন নীচে জীবনের স্রোত।
বিকেল থেকে বাড়ির সামনে হট্টগোল। পুলিশ, কাগজের রিপোর্টারের ভিড়। মরা আলো কেমন যেন নিস্তেজ। উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের বুড়ো লোকটা বারান্দা থেকে ঝাঁপিয়েছে। বাচ্চাটা তারস্বরে কাঁদছে। রাস্তাটা রক্তময়। আত্মহত্যা কিংবা খুন। জামাইকে পাচ্ছে না। পুলিশ খুঁজছে। কোথায় আর যাবে। তবু, অপঘাতে মৃত্যু হলে সবদিক বিবেচিত হয়। নির্বাণ অন্যমনস্ক। জরায়ুর ভেতর আলাদা আলাদা কোষ। রাতে জোনাকির আলো। প্রতিটা নারীর ভেতরে বাবুই বাসা। প্রতিটা গাছ এক একটা শরীর ছিল। নারী শরীর। মায়ের হাত ধরে ওই পথে বাড়ি ফিরত সে। মাঠের রোদের ভেতর দিয়ে।
আরণ্যক পড়ার পর নির্বাণ চলে গেছিল ঘাটশিলা। বিভূতিভূষণের সময় থেমে নেই, মাওবাদীদের ডেরা কমে এসেছে। মোবাইলের ফ্লেক্স। চকোলেট টাইলসের ধাবা। একটু ভেতরে ঢুকলেই রুক্ষ জমি, জঙ্গল, আগাছা, ফিতের মতো নদী, ছেঁড়া-ফাটা জামার দল। খড়ি ওঠা গায়ের ন্যাংটো বাচ্চাগুলো সাথী তার দিনভর। একটা লজেন্সে কী খুশি। নির্বাণ চলে গেছিল কমলা ইগনাইট পাথর ভেঙে ভেঙে, জঙ্গল আর শুঁড়ি পথ ধরে টিলার টঙে। ওখান থেকে নীচে তাকালে সবুজ। ঘন অরণ্যে  লুকিয়ে থাকা কুটিরে সন্ত্রাসের বীজ বোনা চলেছে গোপনে। টুপটাপ নিঃশব্দে লাশ পড়ে যায় যেভাবে ঝরে পড়ে হলুদ শালপাতারা। কাকা, আর তপনদা আর সমীর সেনগুপ্ত এভাবেই...।
জরায়ুর ভেতর তখন নতুনের বীজ। সিলিং থেকে ঝুলছিল মালবিকা দিদি। আত্মহত্যার কথা নির্বাণ প্রায়ই ভেবেছে। অথবা খুন। ওয়েব সিরিজ ঘেঁটে ঘেঁটে রাত জেগে দেখা সমস্ত প্রকারের হত্যার দৃশ্য। নেশা হয়ে গেল। তারপর...
অনিন্দ্য এসেছে। হুইস্কি খাচ্ছে ভেতরের ঘরে বসে। কানে হেডফোন হেলদোল নেই। অনিন্দ্য এলে দিনটা বিশেষ হয়ে যায়। অথবা বিশেষ বিশেষ দিনে সে আসে। সেবার যখন এসেছিল তার পরদিন কাগজে একটা খবর ছিল নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাট বাড়ির শূন্য ট্যাঙ্কে পচা গলা দেহ পাওয়া যাওয়ার খবর। একটা হালকা স্বর্গীয় হাসি মুখে অনিন্দ্যর থাকে এইসময়। নির্বাণ ভালবাসে ওই মুখটা।
আর একদিন। অনিন্দ্য আর সে রাতে টিভি দেখছিল। ময়দানের গাছ থেকে ঝুলে থাকা এক বৃদ্ধের লাশ। অনিন্দ্যর সঙ্গে সেদিন আলোচনা হয়েছিল অনেক এমন সব প্রাণহীনের গল্প। একবার খালি ফ্ল্যাটের সিলিং থেকে ঝুলছিল আটাত্তর বছরের বৃদ্ধের শরীর। বাবুই পাখির বাসা যেন। গ্রেফতার হয়েছিল অনেকে তবে খুনি ধরা পড়েনি কোনোবারেই। খুব একঘেঁয়ে জীবনে উৎসব হতে পারে একটা খুন।
কেবল অনিন্দ্যকে বলা যায় এসব গোপন ইচ্ছের কথাগুলো। কারণ অনিন্দ্য একমাত্র মানুষ যাকে এসব ইচ্ছে-অনিচ্ছে আর বাবুই বাসা নিয়ে কথা বলে ফেলে নির্বাণ। কারণ অনিন্দ্য বলেছে শুধু প্রথমবারটা পেরে গেলেই পরেরগুলো জলের মতো সোজা... মজাই আলাদা। অদ্ভুত নেশা। অনিন্দ্য বলে নির্বাণ শোনে কিংবা উল্টোটা...
 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)