প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Saturday, September 13, 2025

আমাদের সিঁদুর খেলা আমাদের বিজয়া দশমী | রত্না দাশগুপ্ত

বাতায়ন/শারদ/অন্য চোখে/৩য় বর্ষ/২২তম সংখ্যা/১লা আশ্বিন, ১৪৩২
শারদ | অন্য চোখে
রত্না দাশগুপ্ত
 
আমাদের সিঁদুর খেলা আমাদের বিজয়া দশমী

"বিজয়ার দিনটির সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ও আনন্দময় অংশটি হলো সিঁদুর খেলা। এই খেলায় বিবাহিত অবিবাহিত মেয়েরা বা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সামিল হতে পারেন যেহেতু লাল রংটি রক্ত ও প্রাণের প্রতীক অতএব রক্ত, প্রাণের সমন্বয়কারী সকল মানুষই সামিল হতে পারেন।"


"শুধু যাওয়া আসা
শুধু স্রোতে ভাসা
শুধু আলো আঁধারে
কাঁদা হাসা..."
 

জাগতিক এই যাওয়া আসার খেলায় আমরা চির পরিচিত। ঢাকের শব্দে বাজির শব্দে এবং বিভিন্ন ভাষা ও বিচিত্র গানের ককটেলে মুখরিত আকাশ বাতাস এবং হাজারো আলোর রোশনাইয়ে আলোকিত এক অনবদ্য মায়াময় মোহময় ও আনন্দময় পৃথিবীর সকল রোশনাই একসময় থেমে যায় শারদীয়ার বিদায় মুহূর্ত এসে পড়ে বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায়। মহালয়ার পুণ্য লগ্নে যে মাকে আমরা আগমনির জয়গানে স্বাগত জানাই তাকেই আবার দশমী পূজায় বিসর্জনের বিদায় জানাই।

 
আশ্বিন মাসের শুক্লা চতুর্থীর দিন মতান্তরে মহালয়ার দিন দেবীপক্ষের সূচনা দেবীর আগমন। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন নানা প্রথায় দেবীর পূজা। তারপর এই দশমীর দিনটি। নয় দিন নয় রাত্রি একটানা মহাপরাক্রমশালী মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধের পর মহিষাসুর বধের শেষে আসে এই বিজয়ার দিনটি।
 
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষ করে মধ্য এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মহা সমারোহে পালিত হয় দশেরা। এই দিনটিতেই রঘুপতি রাঘব দশরথ পুত্র রামচন্দ্র, দেবী দুর্গার বর-প্রাপ্ত হয়ে মহাপরাক্রমশালী দানব লঙ্কাধিপতি দশানন রাবণকে বধ করে বিজয়ী হন। অর্থাৎ আমরা দেখছি এই দিনটি অধর্মের উপর ধর্মের ও মিথ্যার উপর সত্যের বিজয়ের দিন তাই এদিন দুঃখের হতে পারে না।
 
অবশ্য এই দিন আমাদের ঘরের মেয়ে উমা পিত্রালয় থেকে শ্বশুরালয়ে চলে যান। তার আসাকে অবলম্বন করে কত আয়োজন, আমাদের অঞ্জলি পূজা আবেদন-নিবেদন প্রার্থনা, আমাদের বানভাসি আনন্দ সবকিছুর একটা সমাপ্তির মুহূর্ত এসে পড়ে। তাই আমাদের বিষণ্ণতা অস্বীকারেরও নয়।
 
এই বেদনা জর্জরিত জীবনে আনন্দ একটি পরম দুর্লভ শব্দ। আনন্দকে বিসর্জন দিতে আমরা কে কবে চেয়েছি? তাই অপেক্ষা শব্দটিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে শিখেছি আমরা আনন্দময় মুহূর্তগুলির প্রতীক্ষার দিকে তাকিয়ে। এমনি করেই তো আমরা কত অপেক্ষা করে থাকি আমাদের জীবনে, যাপনে। অপেক্ষা একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ আমাদের শিক্ষায় ও মননে। যা আমাদের ধৈর্য তৈরি করে।
 
এই বিজয়ের দিনটি নানাভাবে নানা উপাচারে আমরা পালন করি দেবী দুর্গা অপরাজিতা হিসেবে পুজিত হন। শিব শক্তির অঙ্গ বা অংশ বলে তাকে এই দিন সাদা বা নীল অপরাজিতা সহযোগে পূজা নিবেদন করা হয়। লোকমুখে কথিত আছে যে এই দিন কোন ইচ্ছা বা প্রার্থনা পূরণের জন্য দেবী দুর্গার পায়ে সাদা বা নীল অপরাজিতা নিবেদন করে প্রার্থনা করলে সেই ইচ্ছা অপূর্ণ থাকে না। এই দিনে যদি কোন মেয়ে বা নারীকে কিছু দান করি মা খুশি হয়। তাই এই দিন আমরা এই দাটির প্রতি বিশেষ যত্নশীল হব। যদিও দানের মতো মহৎ কর্মের কোন মুহূর্ত হয় না। বরং দান নামক পবিত্র এবং পূর্ণময় কর্মটি প্রচারহীন এবং অহংকারহীন, নীরবে নিভৃতে যেখানে যে মুহূর্তে পালিত হয় সেই মুহূর্তটি অপার পূর্ণময় হয়ে ওঠে।
 
আমরা জানি এ বিজয়ার দিনটির সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ও আনন্দময় অংশটি হলো সিঁদুর খেলা। এই খেলায় বিবাহিত অবিবাহিত মেয়েরা বা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সামিল হতে পারেন যেহেতু লাল রংটি রক্ত ও প্রাণের প্রতীক অতএব রক্ত, প্রাণের সমন্বয়কারী সকল মানুষই সামিল হতে পারেন।
 
আজ বিজয়ার দিনটির সিঁদুর খেলা প্রসঙ্গেটিতে আলোকপাত করে দু-চারটি কথা বলতে চেষ্টা করব....
 
১) আমাদের অর্থাৎ বিবাহিত নারীদের গালে-মুখে মেখে নেওয়া সিঁদুরকে, আনন্দে টলমল আবেগকে, বলব কোন মানুষই অন্য কোন মানুষের ক্রীতসম্পদ হতে পারে না। মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে কেউ নয় কখন নয়। যদি নারী পুরুষ যে কেউ এমন ধারায় বিশ্বাসী হন তবে তা প্রবল ভাবে নিন্দনীয়।
 
২) আমাদের মেয়েদের টাইটেল পরিবর্তন হয় ঠিকানা পরিবর্তন হয় নতুন ঘর নতুন সংসার হয়। আর যুগযুগান্ত বলে দেওয়া হয় ওটা শ্বশুর ঘর। আমরা সেই ভুলে পথ চলি ভুলে যাই শাশুড়ি-মাও আমার মতোই একটি মেয়ে যিনি এই পরিবারে প্রথম সিঁদুর পরে এসেছিলেন এবং পুত্রবধূ হয়েছিলেন। তার এবং আমার পরিচয় একজন নারী হিসেবে একি একেবারে অভিন্ন। আমি এখানেই থাকব এখানেই আমার প্রজনন, হয়তো মৃত্যুও এখানে। এ ঘর শ্বশুরবাড়ি কী করে হয় এ ঘরকে আমরা এখন আমার ঘর বলতে শিখিনি।
 
৩) কথায় কথায় আমরা বলি বাপের বাড়ি চলে যাব। কী আশ্চর্যভাবে ভুলে যাই বাবার বাড়িটা বাবার বাড়ি হলেও ওটা একান্তভাবে মায়ের ঘরসংসার। ওখানকার সাম্রাজ্ঞী শুধু মা। আইনসঙ্গতভাবে বাবা-মার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অংশীদার হলেও আমরা মায়ের সংসারটিকে কিছুতেই আমার সংসার বলতে পারি না। বিজয়ার সন্ধ্যায় যে সিঁদুর খেলাকে আমরা আবেগে অনুরাগে রক্তিম হয়ে উঠি প্রতিদিনকার সেই সিদুরকে যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারি কই।
 
৪) প্রথম সিঁদুর পড়ার পর থেকেই আমরা মনে করতে শুরু করি স্বামী আমার একলার সম্পদ। একটিই পরিচয় তার। তিনি একমাত্র আমার স্বামী। গোটা মানুষটাই আমার। ভাবতে শুরু করি কেবলমাত্র আমার ইচ্ছায় তার ওঠাবসা। তিনি কার সন্তান নন, ভাই নন, বন্ধু নন, আত্মীয় নন, পরিজন ন। পৃথিবীর রঙ্গ-পাঞ্জে তার হাজারো চরিত্র গ্রহণের নাম ক্রমশ মুছে যায়। তিনি আমার এবং তার সকল কিছুর অধিকার একমাত্র আমার! এভাবে যে স্বামী মানুষটির আকাশটি ক্রমশ ছোট হতে হতে ঘরের কোণায় দম আটকে মরে, তার জীবন সকলপ্রকার আনন্দের উড়ান ভুলে যায় আমরা তা মনে রাখতে ভুলে যাই। আমরা তার বন্ধু হতে ভুলে যাই। অবশ্য স্বামী মানুষটির কাছেও অবশ্যই আমাদের প্রত্যাশা একইরকম থাকবে যদি আমরা নিজেরা বিবেচনায় এমন টানটান হতে পারি।
 
সিঁদুর খেলার হই-হই রইরই আনন্দ যেন বিজয়ার সন্ধ্যায় শেষ না হয়ে যায়। আপনার একান্ত কাছের মানুষ, আপনার স্বামীটিকে নয় তার হৃদয়টিকে কিনতে চেষ্টা করুন। আর তাকে ভাল রেখে প্রতিদিন জয়ের আনন্দের গৌরবের এবং পরম অহংকারের সিঁদুর পরুন। বিজয়ার রাত্রে সিঁদুর খেলা দিনটি যেন কোনভাবেই খেলা না মনে হয়। দিনটির যেন আমরা প্রকৃত মূল্যায়ন করি। এবং সবটাই তো করব আমাদের একান্ত আপন একেবারে কাছের মানুষটি আমার এবং আপনার স্বামীর জন্য। তিনি ভাল থাকবেন আনন্দে থাকবেন। আমরা তাদের আদরে থাকব সোহাগে থাকব। সেই গরবে ভাল লাগায় অভূতপূর্ব এক প্রাণ উজ্জ্বলতায় জ্বলজ্বল করুক আমার আপনার সিঁদুর। ঘর বেঁচে থাক। ঘরের বন্ধনের এই সোহাগী চিহ্ন বেঁচে থাক। আগামী প্রজন্মের জন্য সিঁদুরের টান বেঁচে থাক...
 
সমাপ্ত
 

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)