বাতায়ন/ধারাবাহিক/১ম বর্ষ/২৯তম সংখ্যা/ ২৬শে মাঘ, ১৪৩০
ধারাবাহিক গল্প
মৌসুমী চক্রবর্তী
ডানা
৪র্থ পর্ব
পূর্বানুবৃত্তি এক কালে নাম করা আর্টিস্ট সৌমিত্র শর্মিলাকে জানাল, সে এখন ফ্রি বার্ড। পরের দিন রিসেপশন হলে শুভ্র ও রোমিতাকে এক ধারে ডেকে সৌমিত্র তার বন্ধু হিমাদ্রির এগ্জিবিশনে চলে আসতে বললেন সঙ্গে রোমিতার আঁকা ছবিগুলো নিয়ে। শুভ্র আশ্চর্য হল! ক’দিন পরে হিমাদ্রির সাত দিনের ওয়ার্কশপে রোমিতাকে আমন্ত্রণ জানালেন। তারপর...
সৌমিত্র বলল, “হিমাদ্রি বলে দিয়েছে সব। রোমিতাকে নতুন নতুন রঙের প্রয়োগ শিখতে হবে একটু। তুমি বললে পরের শনিবার আমি তোমাকে কলেজ স্ট্রিটে নিয়ে যেতে পারি রোমিতা। জিনিসপত্র যা লাগবে কিনতে সাহায্য করতে পারি, এ ব্যাপারে একটু-আধটু জ্ঞান আমারও আছে।”
বউদি এই ওয়ার্কশপের মধ্যে দিয়ে আমিও আবার আঁকায় ফিরছি। আমার প্যাশন।
শুভ্র বলল, “দরকার নেই কাকু তুমি লিস্টটা দিয়ে যাও আমি অনলাইনে আনিয়ে দেবো।”
রোমিতা নিজের কানকে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। বলল, “কাকু আপনাকে থ্যাঙ্ক ইউ বলব না, ডিমের অমলেট আর চা করে আনি, বসুন আপনি।”
**
ওয়ার্কশপের দিন কয়েক আগে সৌমিত্র ফোন করল রোমিতাকে। “হ্যাঁ সৌমত্রকাকু বলুন। ও আচ্ছা আপনি আসবেন আমাকে নিতে। তাহলে তো ভালই হয়। ওকে কাকু আমি তিনটের মধ্যে তৈরি হয়ে নেবো। ভয় ভয় করছে। আচ্ছা বাই, দেখা হচ্ছে।”
শুভ্র ল্যাপটপ নিয়ে বসে কিছু কাজ করছিল। জিজ্ঞাসা করল, “কার ফোন?” রোমিতা বলল, “সৌমিত্র কাকুর।”
শুভ্র মুখ না তুলেই বলল, “কেন উনি নিতে আসবেন কেন? তুমি নিজে উবের বুক করে যেতে পারবে না? ফোন করার কী দরকার ছিল রোজই তো প্রায় মেসেজ করে তোমাকে।”
রোমিতা অবাক চোখে বলল, “তাই জন্য কী রোজ তুমি আমার ফোন চেক করো নাকি?”
শুভ্র এবার গলাটা চড়ালো, “আমি কিন্তু এগুলো টলারেট করব না রোমিতা। লোকটা এক নম্বরের ফ্লার্ট। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, বউ নেই, এখন তোমার ওপর ভর করেছে। তোমার মধ্যে কী উনি ওনার মৃতা আর্টিস্ট বউকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন নাকি?”
রোমিতা স্তম্ভিত, তারপর ওর স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে চিৎকার করে উঠল, “হোয়াট রাবিশ ইউ আর টকিং?” শর্মিলা পাশের ঘর থেকে দৌড়ে এলেন। “কী হল, এমন ভাবে চিৎকার করছ কেন রোমিতা?”
“দেখো না মামনি কী বলছে তোমার ছেলে!”
শর্মিলা রোমিতার হাত ধরে ওকে নিজের ঘরে নিয়ে গেল, “চলো আমার সাথে, এসো এদিকে।”
শুভ্রও পেছন পেছন এসে ঢুকল ওই ঘরে। “ঠিকই বলছি। মা এই মুহূর্তে তুমি ওই লোকটাকে বলে দাও রোমিতা কোথাও যাবে না। ওকে এ বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে যেন না দেখি আর।”
শর্মিলা সতর্ক ভাবে বলল, “চুপ কর তোর বাবা এই সব কথা শুনলে আর...”
**
রাতে খাওয়ার টেবিলে
শুভ্রই তুলল কথাটা, “জানিয়ে দিয়েছ তো ওকে?” শর্মিলা শুধু বলল, “হ্যাঁ” শুভ্র জিজ্ঞাসা করল, “কী বলল?” শর্মিলার ভীষণ খারাপ লাগছিল। শিবপ্রসাদ এখনো জানে না কী হয়েছিল সন্ধেবেলা বাড়িতে। জানলে কী যে হবে। ঠিক জিজ্ঞাসা করে বসলেন, “কাকে কী বলার কথা হচ্ছে? কী রে রোমিতা?” শর্মিলা ওঁর কথার মাঝেই বলে উঠল, “আমার ফোনটা দেখে নিই টেক্সট করে জানিয়েছে। এইসব কুরুচিকর কথা আমি ফোনে বলতে পারিনি, কারণ ওর উত্তরগুলো আমি শুনতে পারতাম না।”
শিবপ্রসাদ আরো অবাক হয়ে বললেন, “কী বিষয়ে কথা বলছ তোমরা আমাকে একটু বলবে দয়া করে?”
শর্মিলা রিয়াকে বলল, “দিদিভাই আমার খাটের ওপর রাখা ফোনটা নিয়ে এসো তো মা। আমি পড়ছি, তুমি শোনো তাহলেই বুঝতে পারবে।”
শর্মিলা পড়তে শুরু করলেন — “শর্মিলা বউদি তোমার ছেলেকে বলে দিয়ো আমি শুভ্রর বউ রোমিতার খোঁজে কখনো তোমাদের বাড়ি যাইনি। যাবও না। সেরকম রোমিতাদের তো সবসময়ই দেখি, গল্পগুজব করি, মিথ্যা বলব না ভালই লাগে তাদের সঙ্গ, হাসি, ঠাট্টা। বাট্ তোমার বউমা রোমিতার মধ্যে অন্য কিছু আছে। আমি সেটার খোঁজে যেতাম, সেটা খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছি মাত্র। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে যখন কথা বলতাম তখন একটা শিল্পী ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনি আমার। শুভ্রকে বোলো আমি ওকে একটু উড়তে সাহায্য করতে চাইছিলাম মাত্র, ডানাটা ওর নিজস্ব। আমি সরে যাব কিন্তু রোমিতা একদিন উড়বেই। এইসব রোমিতাদের আটকে রাখা যায় না।”
শিবপ্রসাদ অবাক চোখে ছেলের দিকে তাকালেন। কিছু বলার আগেই শুভ্র বলে উঠল, “বাবা রোমিতা আর এখন তোমার ছাত্রী নয়, আমার ওয়াইফ, আমি ওর ডিসিশনগুলো নেব।”
রোমিতার চোখে জল। শিবপ্রসাদ মুখ নিচু করে খেয়ে উঠে যাওয়ার সময় শুধু বলে গেলেন, “রোমিতা ছাত্রী, বউ, বউমা, মা সব খোলস ছিঁড়ে ফেলে দে। মানুষ রোমিতা হয়ে ওঠ। নিজের ডিসিশন নিজে নে।
**
এগ্জিবিশনের দিন তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া সেরে রোমিতা শর্মিলার ঘরে ঢুকল, “মামনি তোমার এইবার পুজোতে কেনা তসরটা দেবে, পরে যাব আজ।” শর্মিলা আলমারির চাবিটা ওর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “যেটা ইচ্ছে বার করে নে।”
রোমিতা তৈরি হয়ে নিল। খুব স্নিগ্ধ লাগছে ওকে গোলাপি রঙের শাড়িতে। বাপি-মামনিকে প্রণাম করে, নিজের বাবা মায়ের ছবিতে প্রণাম করে পায়ে চটিটা গলাতে যাবে তখন শুভ্র এসে জিজ্ঞাসা করল, “কীসে যাবে?” রোমিতা বলল, “মেট্রোতে।”
শুভ্র বলল, “একটু দাঁড়াও আমি পৌঁছে দিয়ে আসব। কাকুর সাথেও একবার দেখা করে আসব। বাবা যাবে?” শিবপ্রসাদ বললেন, “তুই সাথে থাকলে আর আমার দরকার নেই।”
শার্টটা গায়ে গলাতে গলাতে শুভ্র বলল, “রোমি আমি তোমাকে আনতে যাব, অপেক্ষা করবে, একা চলে এসো না।” রোমিতা কাঠের পুতুলের মতন দাঁড়িয়ে ছিল। শুভ্র ফ্ল্যাটের দরজা খুলে এগিয়ে গেল। রোমিতা এক পাও নড়ল না।
শুভ্র এসে ওর হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বলল, “প্লিজ রোমি এটুকু করতে দাও।”
রোমিতা পেছনে তাকিয়ে, “আসি” বলে এগিয়ে গেল শুভ্রর সাথে। গাড়িতে ওঠার আগে রোমিতা একবার ওপর দিকে তাকিয়ে দেখল গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে বাপি আর মামনি। আর দুটো কচি কচি হাত ওকে টা টা করছে।
শুভ্র ওর হাতটা ধরে টানল, “তাড়াতাড়ি করো এখনো আর্টিস্ট হওনি। প্রথমদিনই লেট করে পৌঁছবে নাকি?”
সমাপ্ত
Golpo ta khub bhalo laglo
ReplyDeleteVisooon shundor golpo ta...erokom aro golpo porte chai...apekhai thaklam 🙂🙂
ReplyDeletevery very good story
ReplyDelete