রম্যরচনা
প্রদীপ
কুমার দে
ঝিঙাফুল সিরিজ— ৩
দুর্দশার একাদশী
"এরই মধ্যে ট্রামে কয়েকটি বারবণিতা উঠে পড়ল আর তারা বউয়ের পাশের ফাঁকা সিটে বসে পড়ল। ব্যস! হয়ে গেল কেলোর কীর্তি! ঝিঙাফুল পরের স্টপেজেই আমাকে টেনে নিয়ে ট্রাম থেকে নেমে পড়ল। আমি থ!"
বউয়ের সাথে
থেকে থেকে আমারও অনেক পরিবর্তন ঘটে চলেছে। এখন নেশায় ক্যালেন্ডার, পাঁজি উল্টে
দেখি কবে কোন তিথি। ভীষণ ছোঁয়াচে রোগ এটা, মানে রোগীর সাথে থাকলে রোগীই হয়ে
যায়। আজ দেখেছিলাম একাদশী,
তাই ভোরবেলায় একটু অন্যরকম খেলা খেললাম। পাশে শুয়েও অনাবশ্যক ভাবেই ঝিঙাফুলকে
অবজ্ঞা করতে থাকলাম। বউ একটু অবাক হল, এমনটিতো হয় না। কী হল আজ?
আগেই বলেছিলাম না এরা ভীষণ চাপা মনোভাবাপন্ন হয়।
আমি খেলছি,
-হরে কৃষ্ণ
হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে…
-উরি বাপরে! কী হল আজ তোমার?
আমি হাসছি।
-আজ আমি কথা রেখেছি। তোমায় কিন্তু ছুঁইনি।
-সে তো দেখছি। কিন্তু কী কথা?
-নিজেই করো
আর নিজেই মনে রাখো না?
আজ যে নির্জলা একাদশী।
বউ ঝিঙাফুল লাফিয়ে বিছানা ছাড়ল,
-দেখেছ কাণ্ড? গতকালই
পিসিমা পইপই করে মনে করিয়ে বলে দিল, 'মনে রাখিস এটা নির্জলা উপবাসের
একাদশী, শরীরের
ভিতর যেন এক ফোঁটা জলও না পড়ে।'
এবার আমি
হোহো করে হেসে উঠলাম,
-ওইজন্যই তো
আমি আর এক ফোঁটাও...
-আচ্ছা, আচ্ছা, হয়েছে হয়েছে, খুব হয়েছে, আর কায়দা মারাতে হবে না। মনে করিয়ে ভাল অবস্থায় রেখেছ, থ্যাংকুউ।
বলেই দুহাত দিয়ে আমার পায়ের ধুলো মাথায় তুলে নিল।
শুরু হয়ে গেল,
-জয় সীতারাম
জয় সীতারাম পবনপুত্র পবননন্দন…
এ অবস্থায় আমি অফিসের ক্যান্টিনের দ্বারস্থ হই। গোপাল ম্যানেজ করে ওই একটু ভাল খাবার দিতে চেষ্টা করে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে চাইছি, বউয়ের মন্ত্রসাধনা এড়াতেই। বউ ঝিঙাফুল ঠিক ব্যাগড়া দিয়ে দিল,
-আজ অফিসে না
গেলে কী হয়? চল-না গঙ্গায় একটা ডুব দিয়ে আসি।
-উরি বাব্বা, মাফ করো মা ভবানী।
-সে আবার কী? চলো দুজনেই শুদ্ধ হয়ে আসি।
-না, তুমি একা যাও...
-একদম অভদ্র তুমি, একটা বউ একা গিয়ে স্নান করবে আর তুমি ঘরে বসে থাকবে? চলো এক্ষুনি।
লড়াইয়ে হার হল। অগত্যা ট্রামে চড়ে বসলাম, বউ দেখি খুশি। গল্প শুরু করলাম। ট্রাম বেশ ফাঁকাই ছিল, তাই অসুবিধা হল না।
-গঙ্গাযাত্রায় গঙ্গাপ্রাপ্তি।
-যত্তসব আজেবাজে কথা।
এরই মধ্যে ট্রামে কয়েকটি বারবণিতা উঠে পড়ল আর তারা বউয়ের পাশের ফাঁকা সিটে বসে পড়ল। ব্যস! হয়ে গেল কেলোর কীর্তি! ঝিঙাফুল পরের স্টপেজেই আমাকে টেনে নিয়ে ট্রাম থেকে নেমে পড়ল। আমি থ!
-এটা কী হল?
-ছি ছি আজও
দিনটা অশুভ হয়ে গেল।
-এসব কী বোকা বোকা কথা তোমার? জানো ওরা কত পুণ্যবতী। ওদের মাটি ছাড়া দুর্গা প্রতিমা তৈরি হয় না। আর ওরা সমাজের কত বড় উপকার করে?
-সব জানি।
তাও! আর তুমি দেখছি আমার কাকার মতোই বকছ? পুরুষেরা একই সব?
-কেন তোমার
কাকা আবার কী করলেন?
-আমাদের
গ্রামের শেষপ্রান্তে এরকম বেশ্যালয় আছে। কয়েকটি ঘরের মেয়েরা এই নোংরামি করে। কাকা
তো লুকিয়েচুরিয়ে যেতই,
আর ধরা পড়ে যেতেই কত সাফাই না গাইল, উনি নাকি ওনাদের একপ্রকার সাহায্য
করেছেন। কাকিমা বোকা ছিল বড় ধোঁকা খেয়েছিল।
-তাই নাকি? কই আগে কোনদিন বলোনি তো? বা কী ভাল খবর? এবার তোমাদের গ্রামে গেলে তোমার কাকার সঙ্গে আলাপ করব।
ঝিঙাফুল বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল রাস্তার মাঝেই,
-তুমি যাবে
নোংরামি করতে?
-তা কেন? দেখতে ক্ষতি
কী?
বউ ঝিঙাফুল
রাস্তায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল চোখে জল ভরে এসেছে, কেঁদে ফেলবে এক্ষুনি। তাই তাড়াতাড়ি
উল্টো পথে হাঁটা শুরু করলাম,
-আরে মজা
বোঝো না? আমাদের
বংশ অনেক ভাল। এসব কেউ করে না। আমার কাকা কী সৎ নিষ্ঠাবান লোকই
না ছিলেন। কিন্তু কাকিমা ছিলেন পুরো উল্টো প্রকৃতির।
বউ ঝিঙাফুলের রাগ কমল,
-কেন? তাহলে কি কাকিমাই বেশ্যাবাড়ি যেত?
-না না তখন পুরুষেরা বেশ্যাবৃত্তি শুরু করেনি। কাকিমার ঘরে পরপুরুষ আসত।
-ছি ছি কী বিশ্রী বংশ তোমার। লজ্জার কথা। শুনলেও পাপ হয়। আজ নির্জলা দিনটা একেবারে রসাতলে গেল। ঠাকুর ক্ষমা করে দিও, ঠাকুর!
খিদেতে পেটে ডন মারছে। মুখে না বললেও ঝিঙাফুলের অবস্থা তথৈবচ। সামনে রেস্তোরাঁ দেখে ওকে একপ্রকার টেনেই ঢোকালাম। ও খুব আপত্তি করল না। আমি লুকিয়ে মটন বিরিয়ানি অর্ডার করে এলাম। খাবার টেবিলে আসতেই আমি খাওয়া শুরু করে দিলাম। ও ইতস্তত করছিল, কিন্তু খিদের নাম বাবাজী! খাওয়া শুরু করে দিল। গন্ধটা যেন খুব চেনা আর লোভনীয়।
তবুও ঝিঙাফুল রাগ দেখালো,
-আজ কিন্তু
নির্জলা, মুখে
মাংস ছুঁতে নেই।
-জানি তো। ওটা তো সোয়াবীন শুধু কৃত্রিম স্বাদেই ভরা।
বউ বোকার মতো হাসছে আর খাচ্ছে, আমিও
-নির্জলা তাই খাবারে এক ফোঁটাও জল নেই কিন্তু!
আমি খেলছি,
-উরি বাপরে! কী হল আজ তোমার?
-আজ আমি কথা রেখেছি। তোমায় কিন্তু ছুঁইনি।
-সে তো দেখছি। কিন্তু কী কথা?
বউ ঝিঙাফুল লাফিয়ে বিছানা ছাড়ল,
-আচ্ছা, আচ্ছা, হয়েছে হয়েছে, খুব হয়েছে, আর কায়দা মারাতে হবে না। মনে করিয়ে ভাল অবস্থায় রেখেছ, থ্যাংকুউ।
বলেই দুহাত দিয়ে আমার পায়ের ধুলো মাথায় তুলে নিল।
শুরু হয়ে গেল,
এ অবস্থায় আমি অফিসের ক্যান্টিনের দ্বারস্থ হই। গোপাল ম্যানেজ করে ওই একটু ভাল খাবার দিতে চেষ্টা করে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে চাইছি, বউয়ের মন্ত্রসাধনা এড়াতেই। বউ ঝিঙাফুল ঠিক ব্যাগড়া দিয়ে দিল,
-উরি বাব্বা, মাফ করো মা ভবানী।
-সে আবার কী? চলো দুজনেই শুদ্ধ হয়ে আসি।
-না, তুমি একা যাও...
-একদম অভদ্র তুমি, একটা বউ একা গিয়ে স্নান করবে আর তুমি ঘরে বসে থাকবে? চলো এক্ষুনি।
লড়াইয়ে হার হল। অগত্যা ট্রামে চড়ে বসলাম, বউ দেখি খুশি। গল্প শুরু করলাম। ট্রাম বেশ ফাঁকাই ছিল, তাই অসুবিধা হল না।
-গঙ্গাযাত্রায় গঙ্গাপ্রাপ্তি।
-যত্তসব আজেবাজে কথা।
এরই মধ্যে ট্রামে কয়েকটি বারবণিতা উঠে পড়ল আর তারা বউয়ের পাশের ফাঁকা সিটে বসে পড়ল। ব্যস! হয়ে গেল কেলোর কীর্তি! ঝিঙাফুল পরের স্টপেজেই আমাকে টেনে নিয়ে ট্রাম থেকে নেমে পড়ল। আমি থ!
-এটা কী হল?
-এসব কী বোকা বোকা কথা তোমার? জানো ওরা কত পুণ্যবতী। ওদের মাটি ছাড়া দুর্গা প্রতিমা তৈরি হয় না। আর ওরা সমাজের কত বড় উপকার করে?
-তাই নাকি? কই আগে কোনদিন বলোনি তো? বা কী ভাল খবর? এবার তোমাদের গ্রামে গেলে তোমার কাকার সঙ্গে আলাপ করব।
ঝিঙাফুল বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল রাস্তার মাঝেই,
বউ ঝিঙাফুলের রাগ কমল,
-ছি ছি কী বিশ্রী বংশ তোমার। লজ্জার কথা। শুনলেও পাপ হয়। আজ নির্জলা দিনটা একেবারে রসাতলে গেল। ঠাকুর ক্ষমা করে দিও, ঠাকুর!
খিদেতে পেটে ডন মারছে। মুখে না বললেও ঝিঙাফুলের অবস্থা তথৈবচ। সামনে রেস্তোরাঁ দেখে ওকে একপ্রকার টেনেই ঢোকালাম। ও খুব আপত্তি করল না। আমি লুকিয়ে মটন বিরিয়ানি অর্ডার করে এলাম। খাবার টেবিলে আসতেই আমি খাওয়া শুরু করে দিলাম। ও ইতস্তত করছিল, কিন্তু খিদের নাম বাবাজী! খাওয়া শুরু করে দিল। গন্ধটা যেন খুব চেনা আর লোভনীয়।
তবুও ঝিঙাফুল রাগ দেখালো,
-জানি তো। ওটা তো সোয়াবীন শুধু কৃত্রিম স্বাদেই ভরা।
বউ বোকার মতো হাসছে আর খাচ্ছে, আমিও
-নির্জলা তাই খাবারে এক ফোঁটাও জল নেই কিন্তু!
সমাপ্ত

আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল সম্পাদক মহাশয় সহ সকল গুনীজনে 🙏
ReplyDeleteআন্তরিক ধন্যবাদ, বাতায়ন।
Deleteখুব ভাল লাগল। মজা পেলাম বেশ। ধন্যবাদ বাতায়ন।
ReplyDelete