বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/অন্য চোখে/২য়
বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই আশ্বিন, ১৪৩১
শারদ | অন্য চোখে
সমরেশ মাইতি
দুর্গাপূজা শক্তি ও ঐক্যের উৎসব
"বোধন মানে জাগরণ। মনে করা হয় বাংলার শ্রাবণ মাস থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত দক্ষিণায়ন কালে দেবতারা নিদ্রা যান। আর উত্তরায়নের সময় দেবতারা আবার জেগে ওঠেন। পুরাণ মতে, ব্রাহ্মণ নির্দেশ মতে পিতৃপক্ষের অবসানে টানা ১৫ দিন ধরে স্বর্গীয় পিতৃপুরুষেরা মর্ত্যের কাছাকাছি আসেন।"
দুর্গাপূজা ভারতীয় উপমহাদেশে পালিত
প্রধান হিন্দু উৎসবগুলির মধ্যে অন্যতম। এটি দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধার সাথে
উৎযাপিত হয়, অন্যতম
শ্রদ্ধেয় হিন্দু দেবতা। হিন্দুরা দেবী দুর্গাকে শক্তির দেবী এবং অশুভ শক্তির
বিনাশকারী হিসাবে পূজা করে। এটি ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে
একটি উল্লেখযোগ্য উৎসব। দেবী দুর্গা মূলত নারী শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজিত হন।
যিনি মহিষ-দানব মহিষাসুরকে পরাজিত করেছিলেন।
মহালয়া থেকে দুর্গাপূজা শুরু হয়ে
যায়। দুর্গাপূজা বাঙালিদের শ্রেষ্ঠ উৎসব। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিন থেকে শুরু হয়ে দশম
দিন পর্যন্ত এই দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষ তিথিকে
দেবীপক্ষ বলা হয়। মহালয়া হল পিতৃপক্ষের শেষ দিন।
বাঙালির দুর্গাপূজা মহালয়া থেকে শুরু।
বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে আসে শারদ প্রান্ত শুনতে শুনতে বাংলার বুকে সূচিত হয়
দেবীপক্ষ। এই দিন থেকে
বাঙালির ঘরে পুজোর রব ছড়িয়ে পড়ে। মহালয়া যেন দেবী দুর্গার আবহন বার্তা বয়ে
আনে প্রতিটি মানুষের হৃদয়।
‘মহালয়া’ শব্দটির অর্থ মহান যে আলোয়। মহালয়া শব্দটিকে স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দ
হিসেবে ব্যবহার করা হয় কারণ এই দিনে পিতৃপক্ষের অবসান হয়। এবং অমাবস্যার অন্ধকার
দূর হয়ে আলোকময় দেবীপক্ষের শুভারম্ভ হয়। এই দেবী
দুর্গাই হলেন সেই মহান আলয়। এই দিনে পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের সূচনা ঘটে।
এই মহালয়ার দিনেই দেবী দুর্গার বোধন
হয়। বোধন মানে জাগরণ।
মনে করা হয় বাংলার শ্রাবণ মাস থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত দক্ষিণায়ন কালে দেবতারা
নিদ্রা যান। আর উত্তরায়নের সময় দেবতারা আবার জেগে ওঠেন। পুরাণ মতে, ব্রাহ্মণ নির্দেশ মতে পিতৃপক্ষের অবসানে
টানা ১৫ দিন ধরে স্বর্গীয় পিতৃপুরুষেরা মর্ত্যের কাছাকাছি আসেন। আর তাই এই সময়
তাদের উদ্দেশ্যে কিছু অর্পণ করলে তারা তুষ্ট হন। এই
মহালয়ার দিনেই দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করার দায়িত্ব পান ব্রহ্মার কাছ থেকে।
ব্রহ্মার বরেই মহিষাসুর মানুষ ও দেবতাদের কাছে অপরাজেয়
হয়ে উঠেছিল বলে তাকে পরাস্ত করার জন্য ব্রহ্মা-বিষ্ণু আর মহেশ্বর একত্রিত হয়ে
মহামায়ারূপী যে নারীশক্তি তৈরি করেন, তিনি হলেন দেবী
দুর্গা। দশ অস্ত্রে বলীয়ান হয়ে দশভূজা দেবী দুর্গা টানা
ন দিন যুদ্ধ করে মহিষাসুরকে বধ করেন। হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী এই দিনের পরেই
অশুভ শক্তির বিনাস ঘটেছিল। বাঙালি জীবনে দুর্গাপূজার সুরলহরী বেঁধে দেয় এই
মহালয়া। আর এই মহালয়ার সুরটি বেঁধে দেন নিয়ম করে অর্ধশতাব্দী ধরে যিনি তিনি
বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র। তার অননুকরণীয় ভঙ্গিমায় আকাশবাণী প্রচারিত মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানটি বাঙালিদের জীবনে পরস্পার বাহিত ঐতিহ্যের মতো।
উৎসবটি পাঁচদিনব্যাপী চলে এই সময়ে
বিস্তৃত প্যান্ডেল (অস্থায়ী কাঠামো) তৈরি করা হয়, যা জটিল শিল্পকর্ম এবং মূর্তিপূজা প্রদর্শন করে।
দুর্গার মূর্তিগুলি, তার চার সন্তান - গণেশ, সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং কার্তিকসহ অত্যন্ত
উৎসাহের সঙ্গে পূজা করা হয়।
প্রথম দিন, মহালয়া, দুর্গা
পূজার সূচনা করে, তারপরে ষষ্ঠী, সপ্তমী,
অষ্টমী এবং সবশেষে বিজয়া দশমী। প্রতিটি দিন আচার-অনুষ্ঠান,
প্রার্থনা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সঙ্গীত,
নৃত্য এবং নাটকের পরিবেশনায় পূর্ণ।
উৎসবটি কেবল
একটি ধর্মীয় উৎযাপন নয়, এটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক
এবং সাংস্কৃতির মেল বন্ধন ঘটিয়ে আনন্দকে উৎসাহিত করে৷ লোকেরা উৎসবের আনন্দ করতে,
ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে দেখা
করতে, নতুন পোশাক পরে একত্রিত হয়।
দুর্গাপূজার তাৎপর্য ধর্মের বাইরেও
প্রসারিত, মন্দের ওপর ভালর
চিরন্তন বিজয়, অজ্ঞতার ওপর জ্ঞান এবং হতাশার ওপর আশার
প্রতিনিধিত্ব করে। এটি আমাদের নিজেদের জীবনে দুর্গার সাহস এবং স্থিতিস্থাপকতা
অনুকরণ করতে, শক্তি এবং দৃঢ়তার সাথে চ্যালেঞ্জের
মোকাবিলা করতে অনুপ্রাণিত করে।
সবশেষে, দুর্গাপূজা হল একটি প্রাণবন্ত উদ্যাপন ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐক্য এবং বিজয়ের
চেতনাকে মূর্ত করে। এর তাৎপর্য গভীরভাবে অনুরণিত হয়, ধর্মীয়
সীমানা অতিক্রম করে, এবং সাহস, শক্তি
এবং মন্দের উপর ভালর চিরন্তন বিজয়ের মূল্যবোধকে আলিঙ্গন করতে আমাদের অনুপ্রাণিত
করে।
***

No comments:
Post a Comment