বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/ছোটগল্প/২য়
বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/শারদ/১১ই আশ্বিন, ১৪৩১
শারদ | ছোটগল্প
পারমিতা চ্যাটার্জি
এপার-ওপার
"আমি শিল্পী, আমি ভালবাসতে পারি কিন্তু কোন বন্ধনে বাঁধা পড়তে পারি না। বৈচিত্র্যহীন জীবন, নিত্য চালডালের হিসেবের মধ্যে আমার শিল্পীমনটা মরে যাবে। আমি পারব না আমার এই মনটাকে নিজে হাতে মেরে ফেলতে। আমি ভালবাসি পাখির মতন ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে আর দেশবিদেশের বিভিন্ন গাছের শাখায় নীড় বাঁধতে, তারচেয়ে এই ভাল হল।"
একদিন শান্ত পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বল্পস্রোতা অজয় নদীর জলে
পা ডুবিয়ে বলেছিলে— জানো তিতির, ভালবাসাও না এরকম ঠোক্কর খেতে খেতে পথ চলে, তবু
বয়ে যায়, যেমন এই নদীটা বয়ে যাচ্ছে— ও কিন্তু পথ হারিয়ে ফেলছে না, ও ঠিক পৌঁছে
যাবে ওর গন্তব্যে।
আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম
- তোমার কথার মানেটা বুঝলাম না দীপ
- আমি বলতে চাইছি আমাদের ভালবাসাও এরকম বাধা পেয়েই চলবে কিন্তু ভালবাসা থাকবে শুধু দুটি মনের মোহনায়।
- এখনও বুঝলাম না দীপ তোমার কথা
- তাহলে তোমায় একটা গুরুদেবের কবিতার লাইন বলি শোন,
- কোন কবিতা?
- ভালো মন্দ যাহাই ঘটুক সত্যরে লও সহজে… আমি তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি এখনও তুমি বোঝনি আমার কথা তাই না?
- হ্যাঁ সত্যি বুঝিনি
- যে ভালবাসা সবসময় পার্থিব চাওয়া পাওয়ার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, সে ভালবাসার দমবন্ধ হয়ে যায়।
- অপার্থিব ভালবাসা বলতে তুমি কী বোঝ?
- বিচ্ছেদ বিরহ বেদনা ভালবাসার আকর্ষণকে আরও অনেক বাড়িয়ে দেয়, সমস্ত অন্তর প্রিয় মানুষটার জন্য আকুল, অথচ আকাশে মেঘ নেই কোথাও বৃষ্টি নেই, নেই জল থই থই পথে ভেজা পাগলামো।
- তারপর?
- তারপর? তারপর হঠাৎ একদিন সেই ভীষণ প্রিয় মানুষটা সামনে এসে পড়ে, তখন তাকে ব্যাকুল মন জড়িয়ে ধরতে চায়, কিন্তু পারে না— তার চতুর্দিকে বাধার প্রাচীর, সামাজিক বাধা, লজ্জার বাধা, আরও কত কী?
- তাতে লাভ?
- এই সব বাধাকে দুহাতে সরিয়ে, সব লোকলজ্জাকে বলি দিয়ে, সামাজিক প্রাচীর ভেঙে ফেলে আমরা যদি পরস্পরের কাছে আসতে পারি তবেই সেই ভালবাসা ঐশ্বরিক রূপ নেবে, হবে সার্থক ভালবাসা।
- তার মানে তুমি বলতে চাইছ, যা সহজলভ্য তা সহজেই হারিয়ে যায়?
- হ্যাঁ এবার তুমি ঠিক বলেছ
- আমি খুব সাধারণ দীপ, তোমার এই দার্শনিক তথ্য আমি মানতে পারলাম না— সামাজিক প্রাচীর ভেঙে, দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করে আমি পারব না ভালবাসার অঙ্গীকারকে জয় করতে, আসলে তুমি দায় নিতে চাও না, তাই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ভয় পাচ্ছ, তুমি কাপুরুষ দীপ, তুমি আমার ভালবাসার মালাটা ছিন্নভিন্ন করে দিলে। আমি চললাম দীপ, তুমি যে নদীর কথা বললে, সে নদী কিন্তু যতই ঠোক্কর খাক ঠিক মোহনায় পৌঁছে যায়, তেমনি ভালবাসার পবিত্র বন্ধন একমাত্র বিবাহ। সেই জীবনে যতই পাথর থাকুক, তাকে দুজনের হাত শক্ত করে ধরে ভেঙে ফেলে এগিয়ে যেতে হয় মোহনার দিকে, ভালবাসার পরিণতিতে জন্ম নেয় আগামীর প্রজন্ম, দুটি মিলিত প্রাণের ভালবাসার সন্তান, এ সবই ভালবাসার ফল। তুমি সেই ভালবাসাকে অস্বীকার করে এক অসামাজিক ভালবাসার কথা কী করে বলছ? না দীপ আমি এমন কাপুরুষের ভালবাসায় আপ্লুত হতে পারলাম না।
- তিতির দাঁড়াও চলে যেও-না… তুমি আমার কথাটা বুঝতেই পারলে না।
- আমি যা বোঝার বুঝেছি দীপ, সত্যি ভালবাসা কখনও দমবন্ধ হয়ে মরে যায় না, রাগ, অভিমান, পারস্পরিক মতবিরোধ থাকতে পারে কিন্তু মরে যায় না। সময়ের সাথে সাথে ভালবাসার রং বদল হতে পারে, প্রথম যৌবনের সেই উচ্ছ্বাস আবেগ হয়তো থাকে না, কিন্তু পরস্পর নির্ভরতার মধ্যে দিয়ে ভালবাসা অনেক শক্ত দৃঢ় হয়। ব্যতিক্রম সব জায়গায় আছে, কিছুদূর চলার পর কোন কোন ভালবাসার সংসার হয়তো ভেঙে খানখান হয়ে যায়, তবুও যোগসূত্র থাকে সন্তানের মধ্যে দিয়ে।
- তাহলে তুমি তো সেই একই কথা বললে তিতির, ভালবাসার সংসার ভেঙেও যায়, আমিও তো তাই বলছিলাম বিয়ে করে ভালবাসাকে আবদ্ধ জালায় বন্ধ করে মেরে ফেলতে চাই না।
- কিন্তু দীপ দীর্ঘ বিচ্ছেদ বিরহে ভালবাসার রঙে জং ধরে যায়, ও সব দার্শনিক তথ্যেই ভাল শোনায়, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। সন্তানই হল ভালবাসার পরিণতি, দুটি জীবনের মেলবন্ধন। মন সব বাধা ভাঙতে পারে কিন্তু সন্তানকে অস্বীকার করতে পারে না। তাই তোমার এই তথ্য আমার কাছে অমূলক। আমি চললাম দীপ, আর দেখা হবে না।
- আর কেনদিনও নয়?
- না আর কোনদিনও নয়।
- তোমার কথার মানেটা বুঝলাম না দীপ
- আমি বলতে চাইছি আমাদের ভালবাসাও এরকম বাধা পেয়েই চলবে কিন্তু ভালবাসা থাকবে শুধু দুটি মনের মোহনায়।
- এখনও বুঝলাম না দীপ তোমার কথা
- তাহলে তোমায় একটা গুরুদেবের কবিতার লাইন বলি শোন,
- কোন কবিতা?
- ভালো মন্দ যাহাই ঘটুক সত্যরে লও সহজে… আমি তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি এখনও তুমি বোঝনি আমার কথা তাই না?
- হ্যাঁ সত্যি বুঝিনি
- যে ভালবাসা সবসময় পার্থিব চাওয়া পাওয়ার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, সে ভালবাসার দমবন্ধ হয়ে যায়।
- অপার্থিব ভালবাসা বলতে তুমি কী বোঝ?
- বিচ্ছেদ বিরহ বেদনা ভালবাসার আকর্ষণকে আরও অনেক বাড়িয়ে দেয়, সমস্ত অন্তর প্রিয় মানুষটার জন্য আকুল, অথচ আকাশে মেঘ নেই কোথাও বৃষ্টি নেই, নেই জল থই থই পথে ভেজা পাগলামো।
- তারপর?
- তারপর? তারপর হঠাৎ একদিন সেই ভীষণ প্রিয় মানুষটা সামনে এসে পড়ে, তখন তাকে ব্যাকুল মন জড়িয়ে ধরতে চায়, কিন্তু পারে না— তার চতুর্দিকে বাধার প্রাচীর, সামাজিক বাধা, লজ্জার বাধা, আরও কত কী?
- তাতে লাভ?
- এই সব বাধাকে দুহাতে সরিয়ে, সব লোকলজ্জাকে বলি দিয়ে, সামাজিক প্রাচীর ভেঙে ফেলে আমরা যদি পরস্পরের কাছে আসতে পারি তবেই সেই ভালবাসা ঐশ্বরিক রূপ নেবে, হবে সার্থক ভালবাসা।
- তার মানে তুমি বলতে চাইছ, যা সহজলভ্য তা সহজেই হারিয়ে যায়?
- হ্যাঁ এবার তুমি ঠিক বলেছ
- আমি খুব সাধারণ দীপ, তোমার এই দার্শনিক তথ্য আমি মানতে পারলাম না— সামাজিক প্রাচীর ভেঙে, দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করে আমি পারব না ভালবাসার অঙ্গীকারকে জয় করতে, আসলে তুমি দায় নিতে চাও না, তাই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ভয় পাচ্ছ, তুমি কাপুরুষ দীপ, তুমি আমার ভালবাসার মালাটা ছিন্নভিন্ন করে দিলে। আমি চললাম দীপ, তুমি যে নদীর কথা বললে, সে নদী কিন্তু যতই ঠোক্কর খাক ঠিক মোহনায় পৌঁছে যায়, তেমনি ভালবাসার পবিত্র বন্ধন একমাত্র বিবাহ। সেই জীবনে যতই পাথর থাকুক, তাকে দুজনের হাত শক্ত করে ধরে ভেঙে ফেলে এগিয়ে যেতে হয় মোহনার দিকে, ভালবাসার পরিণতিতে জন্ম নেয় আগামীর প্রজন্ম, দুটি মিলিত প্রাণের ভালবাসার সন্তান, এ সবই ভালবাসার ফল। তুমি সেই ভালবাসাকে অস্বীকার করে এক অসামাজিক ভালবাসার কথা কী করে বলছ? না দীপ আমি এমন কাপুরুষের ভালবাসায় আপ্লুত হতে পারলাম না।
- তিতির দাঁড়াও চলে যেও-না… তুমি আমার কথাটা বুঝতেই পারলে না।
- আমি যা বোঝার বুঝেছি দীপ, সত্যি ভালবাসা কখনও দমবন্ধ হয়ে মরে যায় না, রাগ, অভিমান, পারস্পরিক মতবিরোধ থাকতে পারে কিন্তু মরে যায় না। সময়ের সাথে সাথে ভালবাসার রং বদল হতে পারে, প্রথম যৌবনের সেই উচ্ছ্বাস আবেগ হয়তো থাকে না, কিন্তু পরস্পর নির্ভরতার মধ্যে দিয়ে ভালবাসা অনেক শক্ত দৃঢ় হয়। ব্যতিক্রম সব জায়গায় আছে, কিছুদূর চলার পর কোন কোন ভালবাসার সংসার হয়তো ভেঙে খানখান হয়ে যায়, তবুও যোগসূত্র থাকে সন্তানের মধ্যে দিয়ে।
- তাহলে তুমি তো সেই একই কথা বললে তিতির, ভালবাসার সংসার ভেঙেও যায়, আমিও তো তাই বলছিলাম বিয়ে করে ভালবাসাকে আবদ্ধ জালায় বন্ধ করে মেরে ফেলতে চাই না।
- কিন্তু দীপ দীর্ঘ বিচ্ছেদ বিরহে ভালবাসার রঙে জং ধরে যায়, ও সব দার্শনিক তথ্যেই ভাল শোনায়, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। সন্তানই হল ভালবাসার পরিণতি, দুটি জীবনের মেলবন্ধন। মন সব বাধা ভাঙতে পারে কিন্তু সন্তানকে অস্বীকার করতে পারে না। তাই তোমার এই তথ্য আমার কাছে অমূলক। আমি চললাম দীপ, আর দেখা হবে না।
- আর কেনদিনও নয়?
- না আর কোনদিনও নয়।
দীপ তাকিয়ে দেখল তিতির চলে যাচ্ছে, তার হলুদ শাড়ির আঁচলটা মিলিয়ে
যাচ্ছে শেষ বিকেলের গোধূলির আলোর সাথে… নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল,
- আমি কি ভুল করলাম?
তারপর নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিল,
- না আমি ভুল করিনি, আমি শিল্পী, আমি ভালবাসতে পারি কিন্তু কোন বন্ধনে বাঁধা পড়তে পারি না। বৈচিত্র্যহীন জীবন, নিত্য চালডালের হিসেবের মধ্যে আমার শিল্পীমনটা মরে যাবে। আমি পারব না আমার এই মনটাকে নিজে হাতে মেরে ফেলতে। আমি ভালবাসি পাখির মতন ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে আর দেশবিদেশের বিভিন্ন গাছের শাখায় নীড় বাঁধতে, তারচেয়ে এই ভাল হল।
- আমি কি ভুল করলাম?
তারপর নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিল,
- না আমি ভুল করিনি, আমি শিল্পী, আমি ভালবাসতে পারি কিন্তু কোন বন্ধনে বাঁধা পড়তে পারি না। বৈচিত্র্যহীন জীবন, নিত্য চালডালের হিসেবের মধ্যে আমার শিল্পীমনটা মরে যাবে। আমি পারব না আমার এই মনটাকে নিজে হাতে মেরে ফেলতে। আমি ভালবাসি পাখির মতন ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে আর দেশবিদেশের বিভিন্ন গাছের শাখায় নীড় বাঁধতে, তারচেয়ে এই ভাল হল।
তিতির কিছুটা দূর গিয়ে তিরতির করে বয়ে যাওয়া অজয় নদীর তীরে একটা
পাথরের ওপর বসে ডুবে যাওয়া সূর্যের দিকে চেয়ে গান ধরল— আমার এ পথ তোমার পথের থেকে
অনেক দূরে গেছে বেঁকে গেছে বেঁকে… গাইতে গাইতে একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল দীপ
ফিরে যাচ্ছে, আস্তে আস্তে দিনের আলোটা নিভে যাচ্ছে…
সমাপ্ত

দুবার পড়লাম
ReplyDeleteগল্পটি ভালো হয়েছে।
ReplyDelete