ধারাবাহিক গল্প
তন্ময় কবিরাজ
সমরের বাড়ি
[২য় পর্ব]
"ব্যাসদেবের মহাভারত পড়তে হবে আপনাকে। ঠাকুরবাড়ির বারান্দায় রবীন্দ্রনাথ আর রথেনস্টাইনের গল্প করার ঠেক ছিল। মোগলযুগে জাহাঙ্গীরের ঠেকে আড্ডা দিতে আসতেন এডওয়ার্ড টেরি। আমি তো শুনেছি, চৌরঙ্গীর আড্ডা থেকেই রায়বাবু পথের পাঁচালীর কথা ভেবে ছিল। বীরেনবাবু, যাঁরা বাংলা ভাষাতে খিস্তি মেরে শেষ করে দিল আজ তারা ভাষার ধ্রুপদীতা দাবি করে।"
পূর্বানুবৃত্তি কবিতাকে ছাড়তে চাইনি মোহিনীবাবু। চারদিকের পরিস্থিতি আমাকে বড়
কষ্ট দেয়। কবিতা বড্ড ব্যক্তি-কেন্দ্রিক হয়ে গেছে।
সমাজ-মানুষ কবিতায় আর নেই। সেদিন মলয়বাবুর সঙ্গেই এ নিয়ে কথা হলো।
তিনিও একই কথা বললেন। আপনি তো জানেন, আমি কোনদিন আপস করতে শিখিনি। স্টেটসম্যান, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডস-এর চাকরি ছেড়েছি। নিজের কথা বলব বলে ফ্রন্টিয়ার বানিয়েছি। তারপর…
এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক এসে চা দিয়ে গেলো। সমরবাবু বললেন,
- আপনারা চা মোহিনীবাবু।
ধন্যবাদ জানিয়ে চায়ের কাপটা নিজের দিকে টেনে নিলেন মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায়। সমর সেন প্রশ্ন করলেন,
- আপনি এলেন, সারদা কোথায়?
- আসছে। গীতাঞ্জলির অনুবাদের সমস্যা হয়েছে ওর একটা।
উত্তর দিলেন মোহিনীমোহন। সমরবাবু গর্বের সঙ্গে বললেন,
- মলয়বাবুর মতো ঐ একজন আছেন যিনি নিজের জাতির জন্য গীতাঞ্জলি পর্যন্ত অনুবাদ করে ফেললেন।
শেখার আছে।
মোহিনীমোহনবাবু হেসে বললেন,
এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক এসে চা দিয়ে গেলো। সমরবাবু বললেন,
ধন্যবাদ জানিয়ে চায়ের কাপটা নিজের দিকে টেনে নিলেন মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায়। সমর সেন প্রশ্ন করলেন,
- আসছে। গীতাঞ্জলির অনুবাদের সমস্যা হয়েছে ওর একটা।
উত্তর দিলেন মোহিনীমোহন। সমরবাবু গর্বের সঙ্গে বললেন,
মোহিনীমোহনবাবু হেসে বললেন,
- আমি তো ওনাকে বলি ভানুভক্ত
আচার্য্য। ভানুভক্ত রামায়ন অনুবাদ করেছিলেন আর আমাদের সারদা গীতাঞ্জলি অনুবাদ
করলেন।
- আপনার পড়াশোনা তো মশাই বেশ গভীর।
- ওই যে সমরবাবু আপনি একটু আগে বললেন না মাটির গন্ধ। মাটির গন্ধ যেখানেই পাই সেখানেই চলে যাই।
কথাটা শুনতে ভালো লাগল। তাই জানতে চাইলেন সমরবাবু,
- কী রকম?
মোহিনীবাবু জমিয়ে বলতে শুরু করলেন,
- নেপালের ভানুভক্ত ছাড়াও
যেসব মহারথীরা আছেন সবার সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক রয়েছে। লেখনথ পাউদিয়াল তো
বেনারসে এসেছিলেন। কালিদাস পড়েছেন। গান্ধীজির জন্য কবিতা লিখেছেন। নেপালের
শেক্সপিয়ার বালকৃষ্ণ শামা দেরাদুনে আর্মি ট্রেনিং করেছেন। লক্ষ্মীপ্রসাদের জীবন
খুব কষ্টের। তিনি চিকিৎসার জন্য রাঁচি এসেছিলেন। আবার
ভুটানের কুনজং চোডেনের কথাই যদি ধরেন তবে তাঁর আসল কাজের বেশির ভাগই উত্তর ভারতে।
জানেন সমরবাবু, সাহিত্য তো আর কাঁটাতার মানে না।
চুপ করে শুনছিলেন সমরবাবু।
- সুনীলবাবু প্রায় বলতেন, পড়াশোনা না করলে ভাল লেখক হওয়া যায় না। নিয়মিত পড়াশোনার রেওয়াজ দরকার। এখন যাদের লেখা পড়ি তাদের পড়াশোনা নেই।
- আপনি রাম দয়াল মুন্ডার নাম শুনেছেন?
- রাম দয়াল মুন্ডা?
নামটা শুনে অবাক হলেন সমর সেন। মোহিনীবাবু বুঝতে পারলেন,
- একটু অপেক্ষা করুন।
সারদাবাবুই বলবেন।
কথার মাঝ পথেই সারদা প্রসাদ কিসকু হাজির। সমরবাবু হাঁক দিলেন,
- আরোও এক কাপ চা লাগবে।
ঘরের মাঝখানের টেবিলে তিনটে চায়ের কাপ আর প্লেটে রাখা নোনতা বিস্কুট। খোলা জানালার হালকা হাওয়াতে উড়ছে পাণ্ডুলিপি। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে সারদা প্রসাদ বললেন,
- এ তো আড্ডার মেজাজ।
সিগারেটের ছাইটা ফেলে রসিকতা জুড়ে দিলেন বীরেন্দ্র।
- মলয়বাবু আবার সত্যজিতের মতো আড্ডাতে ধিক্কার এলো না তো?
- চা'টা নিই তারপর আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।
কথাটা শেষ করে চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিলেন। প্রথম চুমুকে হালকা শক্তি সংগ্রহ করে মলয়বাবু বললেন,
- আসতে দেরি হয়ে গেল কারণ আমার ওই বৈদ্যুতিক ছুতোর প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন ঝামেলায় জড়িয়ে
পড়ছি। আর ওই যে বললেন রায়বাবু নাকি আড্ডা দেখলে সমালোচনা করতেন তাহলে ওনাদের
মনডা ক্লাবটা কীসের? আসলে উনি আড্ডার মধ্যে পজিটিভ চিন্তা
চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা তো সবসময় সম্ভব নয়। আমাদের দেশের লোক রাজনীতিটা ভাল
বোঝে।
- তাহলে আমাদের মলয়বাবু বলছেন, বাঙালি আড্ডা পছন্দ করে?
বীরেন্দ্রর প্রশ্ন।
- আপনি তো আমাদের পাবলো নেরুদা মশাই, আপনার তো এগুলো ভাল জানা উচিত। বাকিদের থেকে আমাদের আড্ডার বৈচিত্র্য অনেক বেশি। দিলীপদা, নাড়ুদার চায়ের দোকান আপনি বাইরে পাবেন না। আবার তিনটে চা চার জায়গায় সেটাও পাবেন না।
- এটা কিন্তু খাস কথা। চায়ের দোকানে না বসলে আদর্শের ভীত মজবুত হয় না।
- কীরকম?
- কত রকমের মানুষ আসে। নিজেদের মতো করে যুক্তি দেয়। এক কথায় মিনি দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। অনেকটা আবার প্লেটোর আড্ডার অ্যাকাডেমিক, সিনকোনিজিমের মতো।
- বাবা, বীরেনবাবু আপনি তো সোজা ক্লাসিকে চলে গেলেন। আমেরিকার রোটারি ক্লাবের কথা ভুলে গেলেন? আমাদের দেশেও কিন্তু অনেক ইতিহাস রয়েছে।
- যেমন? একটু শুনি
- ব্যাসদেবের মহাভারত পড়তে হবে আপনাকে। ঠাকুরবাড়ির বারান্দায় রবীন্দ্রনাথ আর রথেনস্টাইনের গল্প করার ঠেক ছিল। মোগলযুগে জাহাঙ্গীরের ঠেকে আড্ডা দিতে আসতেন এডওয়ার্ড টেরি। আমি তো শুনেছি, চৌরঙ্গীর আড্ডা থেকেই রায়বাবু পথের পাঁচালীর কথা ভেবে ছিল। বীরেনবাবু, যাঁরা বাংলা ভাষাতে খিস্তি মেরে শেষ করে দিল আজ তারা ভাষার ধ্রুপদীতা দাবি করে।
বীরেন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন,
- বাংলা তো পুরনো ভাষা।
মলয়বাবু বললেন,
- হলেই বা। তথ্যের মধ্যে
বিতর্ক রয়েছে।
কাপের চা'টা শেষ করলেন। বীরেন্দ্রবাবু প্রস্তাব দিলেন,
- আর এক কাপ হোক।
- হলে মন্দ হয় না।
হাসলেন মলয় রায়চৌধুরী। নতুন কাপটা হাতে ধরে মলয়বাবু খবর নিলেন,
- লেখালিখি কেমন চলছে বীরেনবাবু?
- চলছে। তবে সেটা কবিতা কিনা জানি না।
- কেন?
- আমার কবিতায় সে ভাবে রূপক আসে না। যা দেখি তাই লিখি।
উত্তর দিলেন বীরেন্দ্র।
- তবে আপনার কবিতায় কিছু কালজয়ী কথা আছে— রক্ত রক্ত শুধু রক্ত দেখতে দুই চোখ অন্ধ হয়ে যায়।
- এটা উত্তরপাড়া কলেজ কবিতার লাইন।
- আবার একটা লাইন ছিল— রুটি দাও রুটি দাও / রুটি বড়ো দরকার। কীভাবে লেখেন এসব লাইন?
- আপনিও তো দারুণ লিখছেন।
- আমার কথা ছাড়ুন। আপনারাটা বলুন।
- আসলে কী জানেন, জীবনে তো অনেক কিছুই দেখলাম, সেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হোক, ঢাকার আন্দোলন, তেভাগা। মুজিবর, হচি মীনকেও চিনেছি। আমার মাঝে মাঝে ভলতেয়ায়ের সেই কথাটা মনে পড়ে যায়, যেখানে কর্তা ভুল সেখানে সমাজের রোগ কে সারবে? বিপ্লবের দরকার।
- সে তো আপনার কথার মধ্যেই রয়েছে— বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
- আমি তো পলাতক হতে চাইনি।
- হওয়ায়টা উচিতও নয়। কবিরা সব সময় পদাতিক।
- আমি ভালবাসাকেই ধর্ম বলে মনে করি। আমার কবিতাতেও সে কথা বলেছি— আমার ঈশ্বর নেই বলে / সবাই আমাকে উপহাস জুড়ে দেয়।
কথার শেষে আবার একটা সিগারেট ধরালেন মলয়বাবু।
- বীরেনবাবু একটা পিকনিকের আয়োজন করুন। সব কবিরা আসবে সেখানে।
- হোক না। আমার কোনো আপত্তি নেই মলয়বাবু। কিন্তু আপনার লেখা নিয়ে কীসব অভিযোগ উঠছে।
জানতে চাইলেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
- আপনার পড়াশোনা তো মশাই বেশ গভীর।
- ওই যে সমরবাবু আপনি একটু আগে বললেন না মাটির গন্ধ। মাটির গন্ধ যেখানেই পাই সেখানেই চলে যাই।
কথাটা শুনতে ভালো লাগল। তাই জানতে চাইলেন সমরবাবু,
মোহিনীবাবু জমিয়ে বলতে শুরু করলেন,
চুপ করে শুনছিলেন সমরবাবু।
- সুনীলবাবু প্রায় বলতেন, পড়াশোনা না করলে ভাল লেখক হওয়া যায় না। নিয়মিত পড়াশোনার রেওয়াজ দরকার। এখন যাদের লেখা পড়ি তাদের পড়াশোনা নেই।
- আপনি রাম দয়াল মুন্ডার নাম শুনেছেন?
- রাম দয়াল মুন্ডা?
নামটা শুনে অবাক হলেন সমর সেন। মোহিনীবাবু বুঝতে পারলেন,
কথার মাঝ পথেই সারদা প্রসাদ কিসকু হাজির। সমরবাবু হাঁক দিলেন,
ঘরের মাঝখানের টেবিলে তিনটে চায়ের কাপ আর প্লেটে রাখা নোনতা বিস্কুট। খোলা জানালার হালকা হাওয়াতে উড়ছে পাণ্ডুলিপি। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে সারদা প্রসাদ বললেন,
২
- আপনারা জন্যই অপেক্ষা করে
আছি আর আপনারই আসতে দেরি।সিগারেটের ছাইটা ফেলে রসিকতা জুড়ে দিলেন বীরেন্দ্র।
- মলয়বাবু আবার সত্যজিতের মতো আড্ডাতে ধিক্কার এলো না তো?
- চা'টা নিই তারপর আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।
কথাটা শেষ করে চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিলেন। প্রথম চুমুকে হালকা শক্তি সংগ্রহ করে মলয়বাবু বললেন,
- তাহলে আমাদের মলয়বাবু বলছেন, বাঙালি আড্ডা পছন্দ করে?
বীরেন্দ্রর প্রশ্ন।
- আপনি তো আমাদের পাবলো নেরুদা মশাই, আপনার তো এগুলো ভাল জানা উচিত। বাকিদের থেকে আমাদের আড্ডার বৈচিত্র্য অনেক বেশি। দিলীপদা, নাড়ুদার চায়ের দোকান আপনি বাইরে পাবেন না। আবার তিনটে চা চার জায়গায় সেটাও পাবেন না।
- এটা কিন্তু খাস কথা। চায়ের দোকানে না বসলে আদর্শের ভীত মজবুত হয় না।
- কীরকম?
- কত রকমের মানুষ আসে। নিজেদের মতো করে যুক্তি দেয়। এক কথায় মিনি দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। অনেকটা আবার প্লেটোর আড্ডার অ্যাকাডেমিক, সিনকোনিজিমের মতো।
- বাবা, বীরেনবাবু আপনি তো সোজা ক্লাসিকে চলে গেলেন। আমেরিকার রোটারি ক্লাবের কথা ভুলে গেলেন? আমাদের দেশেও কিন্তু অনেক ইতিহাস রয়েছে।
- যেমন? একটু শুনি
- ব্যাসদেবের মহাভারত পড়তে হবে আপনাকে। ঠাকুরবাড়ির বারান্দায় রবীন্দ্রনাথ আর রথেনস্টাইনের গল্প করার ঠেক ছিল। মোগলযুগে জাহাঙ্গীরের ঠেকে আড্ডা দিতে আসতেন এডওয়ার্ড টেরি। আমি তো শুনেছি, চৌরঙ্গীর আড্ডা থেকেই রায়বাবু পথের পাঁচালীর কথা ভেবে ছিল। বীরেনবাবু, যাঁরা বাংলা ভাষাতে খিস্তি মেরে শেষ করে দিল আজ তারা ভাষার ধ্রুপদীতা দাবি করে।
বীরেন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন,
মলয়বাবু বললেন,
কাপের চা'টা শেষ করলেন। বীরেন্দ্রবাবু প্রস্তাব দিলেন,
- হলে মন্দ হয় না।
হাসলেন মলয় রায়চৌধুরী। নতুন কাপটা হাতে ধরে মলয়বাবু খবর নিলেন,
- চলছে। তবে সেটা কবিতা কিনা জানি না।
- কেন?
- আমার কবিতায় সে ভাবে রূপক আসে না। যা দেখি তাই লিখি।
উত্তর দিলেন বীরেন্দ্র।
- তবে আপনার কবিতায় কিছু কালজয়ী কথা আছে— রক্ত রক্ত শুধু রক্ত দেখতে দুই চোখ অন্ধ হয়ে যায়।
- এটা উত্তরপাড়া কলেজ কবিতার লাইন।
- আবার একটা লাইন ছিল— রুটি দাও রুটি দাও / রুটি বড়ো দরকার। কীভাবে লেখেন এসব লাইন?
- আপনিও তো দারুণ লিখছেন।
- আমার কথা ছাড়ুন। আপনারাটা বলুন।
- আসলে কী জানেন, জীবনে তো অনেক কিছুই দেখলাম, সেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হোক, ঢাকার আন্দোলন, তেভাগা। মুজিবর, হচি মীনকেও চিনেছি। আমার মাঝে মাঝে ভলতেয়ায়ের সেই কথাটা মনে পড়ে যায়, যেখানে কর্তা ভুল সেখানে সমাজের রোগ কে সারবে? বিপ্লবের দরকার।
- সে তো আপনার কথার মধ্যেই রয়েছে— বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
- আমি তো পলাতক হতে চাইনি।
- হওয়ায়টা উচিতও নয়। কবিরা সব সময় পদাতিক।
- আমি ভালবাসাকেই ধর্ম বলে মনে করি। আমার কবিতাতেও সে কথা বলেছি— আমার ঈশ্বর নেই বলে / সবাই আমাকে উপহাস জুড়ে দেয়।
কথার শেষে আবার একটা সিগারেট ধরালেন মলয়বাবু।
- বীরেনবাবু একটা পিকনিকের আয়োজন করুন। সব কবিরা আসবে সেখানে।
- হোক না। আমার কোনো আপত্তি নেই মলয়বাবু। কিন্তু আপনার লেখা নিয়ে কীসব অভিযোগ উঠছে।
জানতে চাইলেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment