ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
মৃণাল ও একটি অনবহিত সিনে সংবাদ
[৫ম পর্ব]
"এসব কী শুনছি রে হারামজাদা, মেয়েছেলে নিয়ে ঢুকেছিস লজে? এত সাহস তোর! নিধির ছায়ায় নিজেকে কি মহারাজা ভাবছ বাঞ্চোৎ? আচমকা গুপ্তদার মুখে খিস্তি শুনে চমকে ওঠে নিধি, চোখ কুঁচকে তাকায়, আজ ত্রিশ বছরে এই প্রথমবার।এতদিনে হয়তো লোকটা বাজারটার উপযুক্ত রোজগেরে হল।"
পূর্বানুবৃত্তি ফাঁকা হলের সুবিধে নিতে ছেলেমেয়ে সব হলে ঢুকে কোণের সিটগুলো দখল করে
নিয়েছে। এরই মধ্যে
পর্দায় সিনেমা চলছে, খারিজ। সিনেমাটা নিধি দেখেছিল বহু বছর আগে। নিধির তখন কাঁচা বয়স। হল
থেকে বেরিয়ে নিধি হোটেলে ফেরে না। আজ রাতটা এমনিতেও ঘুম হবে না। একটু পর বাজারের ভেতর মন্দিরের
কীর্তন বন্ধ হয়ে হিন্দি গান চালিয়ে মদ খেয়ে উদ্দাম নাচ শুরু হবে। কখন থামবে কে জানে! কাল সারারাত ধরে
নিধি ভেবেছে গুপ্তদাকে বলে জগৎ সিনেমায় যদি সবকটা বই ও দেখতে পেত! পয়সা তো লাগছে
না। তারপর…
মেয়েটা পাশের কলেজে পড়ে। রোজ সকাল-দুপুর বেঙ্গল লজে খেতে আসে। নিধিকে ‘কাকা’ বলে। মেয়েটা খেতে এলে আবদার করে এটা সেটা। মাছের মুড়ো খাওয়ার খুব শখ মেয়েটার। একটু বড় মাছ আনলে মুড়োটা টিফিন বক্সে ভরে দেয় নিধি। মেয়েটাকে দেখে মা-মরা ভাইঝিটার কথা মনে পরে নিধির, কলেরায় অকালে চলে না গেলে আজ এই বয়সেরই হত। মেয়েটার বাড়ি মছলন্দপুরে। কলকাতার কলেজে পড়বে বলে বাড়ি ঘরদোর ছেড়ে এসেছে। ঠিক যেমন একদিন নিধি এসেছিল এই মায়ার শহরটায় ওর বেড়া টপকানো ইতিহাসটাকে একটা এলেবেলে ধূলিকণা দিয়ে ঢেকে ফেলে।
নিধি নিজে
ইস্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি হয়তো, কিন্তু
পড়াশুনার বেশ কদর করে।
কলেজের দিকে যেতে গিয়ে যে প্রকাণ্ড পুরোনো দিনের
বাড়িটা, দুধারে
দুটো পেল্লাই প্রাগৈতিহাসিক থামে ভর দিয়ে পার করে দিল কাগের ডিম বগের ডিম কত
গ্রীষ্মকালীন সৌরঝড়,
সেটা ইদানীং লেডিস পিজি হয়েছে। মেয়েটা
ওখানেই থাকে।
সারাদিন কলেজের পর রোজ সন্ধেবেলা মেয়েটা টিউশন পড়াতে যায়
রাজাবাজার, বেলেঘাটা। নিধিকে
একদিন বলছিল, "ঘরে
ঠিক কইরা চাল চড়ে না কাকু,
বাপডা আমাগো ছাড়ি অন্য মাইয়ার লগে পলাইসে তা প্রায় এগারো বস্যর হইলো, বাকি ভাই
বোনগুলা তখন খুবই ছোট আসিল।
পড়ার খরচডা নিজেরেই চালাইতে হয়।" কাল রাতে মেয়েটা খেতে আসেনি, আজ সকালেও
না। আজ
দুপুরে শরীর-টরীর খারাপ নাকি জিজ্ঞেস করায় ওর বন্ধুটা বললো কাল রাতে নাকি পিজিতেও
ফেরেনি মেয়েটা।
ফোন করলে ধরছেও না।
একটা মন খারাপের দুশ্চিন্তা সন্ধ্যা কিংবা মাঝরাতের হাওয়ায় উড়ে এসে জুড়ে বসল
নিধির নশ্বর জীবনে।
এর আগে কারো জন্য এত ভাবনা হয়নি ওর। মেয়েটা হয়তো ওর কেউ না, আবার এই
শহরটার সাথেও কোন আত্মীয়তা নেই মেয়েটার। এই শহরের রাতের আলোগুলোর বুকে গজিয়ে
ওঠা অনভিপ্রেত মাংসপিন্ডের মতো মেয়েটার অবস্থান। হয়তো-বা ওর হারিয়ে যাবার খবর, পিঠে ডানা লাগিয়ে উড়তে গিয়ে চাপা পরে
যাবে, গায়ে
ফোস্কা পরা আলোর কোলাহলের মাঝখানে। এই বিদেশ বিভুঁইয়ে কে ওর খবর নেবে? নিধি কী একবার মুচিপাড়া থানায় যাবে? কী উত্তর দেবে যখন পুলিশ ওকে জিজ্ঞেস
করবে মেয়েটা ওর কে হয়?
বাঙাল কথায় একটা প্রবাদ আছে, "আলায় বুলায় না, আমি কার মাউসা?" ভয়ানক একটা
রাগ পায় নিধির।
মনে হয় এই বিষণ্ণ,
পরশ্রীকাতর, আত্মকেন্দ্রিক
শহরটার মুখে গরম তেল ছুঁড়ে মারে। কিন্তু রাগটা কেন হয় ওর? প্রতিদিন
এরকম কতশত মেয়েরা নিয়ম করে হারিয়ে যায়, এই শহরের পেটের ভেতর গজিয়ে ওঠা
অর্ধেক আলো আর অর্ধেক অন্ধকারের ছায়াপথে। তাদের কজনকে পুলিশ খুঁজে বার করতে
পারে? নচ্ছার
হারানটা শুনে বলে "বুড়ো, তোমার ভীমরতি হইসে, ওই মেইয়ে কে লাগে তোমার? হাওয়ার খবর
রাইখো বুড়ো? কলেজির
ভিতর নেতা মন্ত্রীর ছেলেরা আইসে টপ মাগিদের লিয়ে ফুর্তি
কইরে যায়। রাতেও
নাকি কলেজির কমন রুম খুলি রেখি দেয় দারোয়ানডা। দেইখগে যাও এ মাগিও লাইনে নামিসে, পুলিশে ধরিসে নয়তো যমডায় ধরিসে।" হারানের
হলদে দাঁতের নির্লজ্জ হাসিতে কাঠফাঁটা দুপুরে সারা শরীরে যেন আগুন ধরে যায় নিধির। সজোরে এক
থাবড়া কষিয়ে দেয় হারানের গালে, "মুখ সামলে কথা কইস ছ্যারা, মাইয়াদের
লগে কী কইরা কথা কইতে হয় জানস না?"
অসংবৃত মেজাজটা লাগাম ছাড়িয়ে দেশের ভাষা মুখ দিয়ে বার করে এনেছে নিধির। কিন্তু এই অনাম্নী অঙ্গনা কৃষ্ণবেণীর জন্য কেন এত রাগ আসছে নিধির? উত্তর ওর নিজের কাছেই নেই। হয়তো অনেক দিনের জমানো অনেক না বলা ক্রোধ-হিংসা-স্বার্থপরতা জমা হয়েছিল। জীবনের আলো অন্ধকার হাতড়ানো দৌড়টা শেষ করার আগে, দশমীর বিকেলে কাঁটাতার ছিঁড়ে ওর সমগ্র জাগতিক অনুভূতিগুলোকে পিছনে ফেলে উঠে আসতে চাইছে একটা উগ্র স্ফুলিঙ্গ।
বর্ষার
শুরুতে বাজারটার গায়ের কাপড় ভিজে যায় ফুটো অ্যাসবেস্টসের জলে। প্রৌঢ়ার
শরীরের বাড়তি মেদের মতো বাজারটার ভেতর ফুটে ওঠে বেশ কিছু আঁশটে
অনুষঙ্গ। ভোরের
অন্ধকার চিরে হ্যালোজেন বাল্বগুলো থরে থরে সাজানো ইলিশের রুপোলি আঁশে ধাক্কা খেয়ে, আলো করে চারিদিক। শুঁটকির গন্ধটা
এখন হোটেলে বসেই দিব্যি টের পাওয়া যায়, পেচ্ছাপখানার গন্ধটাও আরো তীব্র হয়। মশলার
গন্ধটা আরো মিশে মিশে যায়।
জামগাছটার শরীরে প্যারাসাইট-এর মতো ছাতা
ফেলা কাকগুলো হঠাৎ আসা বৃষ্টিতে শুরু করে দেয় ঠুমরী-টপ্পার ধ্রুপদী কলহ। সেদিন নিধি
রোজকার মতন দুপুরের খাবারের তোড়জোড় করছে। হারানটা কদিনের জন্য বেপাত্তা ছিল, আজ হঠাৎ এসে
হাজির, সাথে
বছর ষোলোর একটা মেয়ে।
শ্যামলা গড়ন, পানপাতার
মতো মুখ, তাতে টানা টানা ডিঙি নৌকার মতো দুটো চোখ, নিটোল স্তন, উদ্যাপী
নিতম্ব। মেয়েটাকে
এক ঝলক দেখে নিধির পোকায় কাটা ফুটিফাটা সাদা পাতার মতো জীবনের আগুপিছু তিরিশটা বছর চোখের সামনে সিনেমার মতো ভেসে ওঠে।
হারান বলে,
"খুড়া বিয়া কইরা আইলাম দিশ থিকা।" হারান হাত
বাড়িয়ে নিধির পা ছোয়,
ইশারায় কাজল চোখের মেয়েটিকেও নিধির পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে বলে। নিধির
হাতদুটো উপরের দিকে উঠে থমকে যায়।
"আজ লাল লাল করি মাগুরের রসা রাইন্ধ খুড়া, সাথে সর্ষির তেল ছড়ায়ে আলু পোস্ত। আর খুড়া আমাদের থাইকবার ব্যাপারখানা তোমারে ম্যানেজ দিতি হবে। নতুন বৌ, বুঝই তো! এই কয়টা টাকায় কোথায় নিয়া তুলব? লজের দ্বিতলে যে স্টোরখান খালি পইরা আসে, ঐখানেই থাইকবে লাহয়, কী কও?" ফুলকির মতো হারানের কথার তোরে ভেসে যেতে থাকে নিধি, "ছ্যাড়া কয় কী? গুপ্তরে ম্যানেজ দিবে এই হারানিধি দাস? বুইড়া এককে নম্বরের কনজুস। ঘরখান স্টোর কইরা রাখসে, সিজনে কম পয়সায় ভাড়া দেওনের লগে। আর এ আপদ কয় কিনা ওই ঘরডাতে মাইয়া লইয়া থাকব!" মনে মনে কথার জাল বোনে নিধি, সংখ্যাহীন চোখদুটো দিয়ে আপনমনে জ্যামিতিক অঙ্ক কষতে থাকে। মেয়েটার উপর মায়া লাগে তার। ইশারায় মেয়েটাকে ওর পিছু পিছু আসতে বলে, হোটেলের ভেতর ঢুকে নিধি তাকে নিয়ে দোতলায় ওঠে। স্টোরটা খুলতে বলে সামনে পড়ে থাকা নোংরা তক্তপোশটার দিকে ইঙ্গিত করে বলে, "মা, এইখানে একটু বস, আমি দেখি ঘরখানা একটু সাফা করাই।" মনে মনে ভাবে "গেলো জনমে তুই আমার কেডা আছিলি রে? তোরে দেইখ্যা এত মায়া লাগে ক্যান?" দূর থেকে ঠাকুর চাকর ঝি সব হাঁ করে দেখছিল ওদের। এর মধ্যে বাজার থেকে কেঁদো একখানা মাগুর কিনে নিয়ে এসেছে হারান। মুহূর্তে খবরটা আশেপাশের দোকান ছুঁয়ে বাজারের ঘিঞ্জি গলিগুলো দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, মহাত্মা গান্ধী রোড আর বি বি গাঙ্গুলী স্ট্রিট-এর ক্রসিংএ এসে থমকে দাঁড়াল। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে স্বস্তার ছাপা শাড়িতে করে নবদম্পতির সাথে যে হাওয়াটা হোটেল অবধি এসেছিল সেটার কাঁধে করে গিয়েই উঠল এবার ‘শসাবাবু’র কানে। নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে সেদিন সন্ধ্যায় তার পায়ের ধুলো পড়ল বেঙ্গল লজে। অন্যান্য লোকের উপর বেশ একটু চোটপাট করে উপরে উঠে গেলেন তিনি, কিছুক্ষণ পর টিউবেলাইটের ফ্যাকাশে আলোতে, উপরে ডাক পড়ল হারানিধি আর হারানের।
"এসব কী শুনছি রে হারামজাদা, মেয়েছেলে নিয়ে ঢুকেছিস লজে? এত সাহস তোর! নিধির ছায়ায় নিজেকে কি মহারাজা ভাবছ বাঞ্চোৎ?" আচমকা গুপ্তদার মুখে খিস্তি শুনে চমকে ওঠে নিধি, চোখ কুঁচকে তাকায়, আজ ত্রিশ বছরে এই প্রথমবার। এতদিনে হয়তো লোকটা বাজারটার উপযুক্ত রোজগেরে হল।
"আজ লাল লাল করি মাগুরের রসা রাইন্ধ খুড়া, সাথে সর্ষির তেল ছড়ায়ে আলু পোস্ত। আর খুড়া আমাদের থাইকবার ব্যাপারখানা তোমারে ম্যানেজ দিতি হবে। নতুন বৌ, বুঝই তো! এই কয়টা টাকায় কোথায় নিয়া তুলব? লজের দ্বিতলে যে স্টোরখান খালি পইরা আসে, ঐখানেই থাইকবে লাহয়, কী কও?" ফুলকির মতো হারানের কথার তোরে ভেসে যেতে থাকে নিধি, "ছ্যাড়া কয় কী? গুপ্তরে ম্যানেজ দিবে এই হারানিধি দাস? বুইড়া এককে নম্বরের কনজুস। ঘরখান স্টোর কইরা রাখসে, সিজনে কম পয়সায় ভাড়া দেওনের লগে। আর এ আপদ কয় কিনা ওই ঘরডাতে মাইয়া লইয়া থাকব!" মনে মনে কথার জাল বোনে নিধি, সংখ্যাহীন চোখদুটো দিয়ে আপনমনে জ্যামিতিক অঙ্ক কষতে থাকে। মেয়েটার উপর মায়া লাগে তার। ইশারায় মেয়েটাকে ওর পিছু পিছু আসতে বলে, হোটেলের ভেতর ঢুকে নিধি তাকে নিয়ে দোতলায় ওঠে। স্টোরটা খুলতে বলে সামনে পড়ে থাকা নোংরা তক্তপোশটার দিকে ইঙ্গিত করে বলে, "মা, এইখানে একটু বস, আমি দেখি ঘরখানা একটু সাফা করাই।" মনে মনে ভাবে "গেলো জনমে তুই আমার কেডা আছিলি রে? তোরে দেইখ্যা এত মায়া লাগে ক্যান?" দূর থেকে ঠাকুর চাকর ঝি সব হাঁ করে দেখছিল ওদের। এর মধ্যে বাজার থেকে কেঁদো একখানা মাগুর কিনে নিয়ে এসেছে হারান। মুহূর্তে খবরটা আশেপাশের দোকান ছুঁয়ে বাজারের ঘিঞ্জি গলিগুলো দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, মহাত্মা গান্ধী রোড আর বি বি গাঙ্গুলী স্ট্রিট-এর ক্রসিংএ এসে থমকে দাঁড়াল। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে স্বস্তার ছাপা শাড়িতে করে নবদম্পতির সাথে যে হাওয়াটা হোটেল অবধি এসেছিল সেটার কাঁধে করে গিয়েই উঠল এবার ‘শসাবাবু’র কানে। নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে সেদিন সন্ধ্যায় তার পায়ের ধুলো পড়ল বেঙ্গল লজে। অন্যান্য লোকের উপর বেশ একটু চোটপাট করে উপরে উঠে গেলেন তিনি, কিছুক্ষণ পর টিউবেলাইটের ফ্যাকাশে আলোতে, উপরে ডাক পড়ল হারানিধি আর হারানের।
"এসব কী শুনছি রে হারামজাদা, মেয়েছেলে নিয়ে ঢুকেছিস লজে? এত সাহস তোর! নিধির ছায়ায় নিজেকে কি মহারাজা ভাবছ বাঞ্চোৎ?" আচমকা গুপ্তদার মুখে খিস্তি শুনে চমকে ওঠে নিধি, চোখ কুঁচকে তাকায়, আজ ত্রিশ বছরে এই প্রথমবার। এতদিনে হয়তো লোকটা বাজারটার উপযুক্ত রোজগেরে হল।
ক্রমশ…



No comments:
Post a Comment