প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Thursday, December 12, 2024

দুলালের মা [২য় পর্ব] | ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য

বাতায়ন/সাপ্তাহিকী/ধারাবাহিক গল্প/২য় বর্ষ/২তম সংখ্যা/০৫ই পৌষ, ১৪৩১

ধারাবাহিক গল্প

ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য

দুলালের মা

[২য় পর্ব]

"মাটির হাঁড়িতে সাপটাকে চালান করে কাপড় দিয়ে হাঁড়ির মুখ বেঁধে দেয় সাপুড়ে। নিজের মাথায় বাঁধা গামছাটা খুলে মাটির দাওয়ার একপাশে বিছিয়ে নিয়ে তার উপর মাটির হাঁড়িটা রাখে। গড় হয়ে প্রণাম করে সাপুড়ে।"



পূর্বানুবৃত্তি আজ মাসখানেক হলো আদুরির স্বামী নিখোঁজ হয়েছে। গ্রামে সেই নিয়ে ভালমন্দ নানা কথা শিমুল তুলোর মতো উড়ে বেড়ায়। কেউ বলে জামালপুরের কাছে কোনো এক মহিলার রূপে মজেছে। কেউ বলে অন্য একটা সংসার আছে। আসলে মাথার ব্যামো, এমন কথাও শোনা যায় কারোর মুখে। আদুরি বলে অন্য কথা। তারপর…


-আহা খিদে পেয়েছে রে বউ।
বলে দুলালের মা।
-কী করি কাকিমা, বসে তো নেই।
বলে আদুরি।
-হাঁড়িতে দুটি আলু দিসনি বউ? খাবি কীভাবে! দাঁড়া।
বলে দুলালের মা ছুটে গিয়ে বাড়ি থেকে দুটো আলু এনে দেয়। লজ্জায় মাথা নামায় আদুরি। ভাবে এমন মানুষ হয়!
চুলায় কাঠ দিয়ে উদাসী হয় আদুরি। সত্যি কপাল বটে! বিয়ের ছ’মাস না কাটতেই স্বামী ঘর ছেড়েছে। সহজ সরল মানুষটা কোথায় আছে, কী খাচ্ছে কে জানে? আদৌ বেঁচে আছে কিনা তাই বা কে জানে। কথাটা মনে আসতেই দুচোখে বান নামে আদুরির। সান্ত্বনা দেয় দুলালের মা। আচমকা বিপদ বাধে। হঠাৎ করেই একটা বড় গোখরো সাপ উঠানের ওপাশ থেকে ছুটে আসে আদুরির দিকে। সাপ দেখে চিৎকার করে ওঠে দুলালের মা,
-যা যা সব শেষ...
ঠিক সেই সময় মাটি ফুঁড়ে হাজির হয় এক সাপুড়ে। আদুরিকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে খপ করে ধরে ফেলে সাপটাকে। ঘর থেকে আদুরির শাশুড়ি বলে— কী হলো রে আদুরি? ও আদুরি...
মাটির হাঁড়িতে সাপটাকে চালান করে কাপড় দিয়ে হাঁড়ির মুখ বেঁধে দেয় সাপুড়ে। নিজের মাথায় বাঁধা গামছাটা খুলে মাটির দাওয়ার একপাশে বিছিয়ে নিয়ে তার উপর মাটির হাঁড়িটা রাখে। গড় হয়ে প্রণাম করে সাপুড়ে। ভরাট গলায় বলে,
-বিষহরি মা গো, সংসারের মঙ্গল করো মা। বাড়ির বিপদ দূর করো। মেয়ের স্বামীকে ঘরে ফিরিয়ে দাও। শাশুড়িকে সুস্থ করো যেন হেঁটে চলে বেড়ায় আবার।
সাপুড়ের মুখে এমন কথা শুনে দুহাত জড়ো করে কপালে ছোঁয়ায় দুলালের মা। দৌড়ে গিয়ে প্রণাম করে সাপুড়েকে। বলে,
-জয় মা বিষহরি একদম ঠিক লোককে নিয়েই তুমি এসেছো মা। বউ, মনে হয় তোর বিপদ কাটবে এবার। দুলালের মায়ের চোখে জল আসে। নিজের গলায় ঝোলা পুঁতির মালাগুলোর মধ্যে থেকে একটা মালা খুলে হাঁড়ির মুখে জড়িয়ে দেয় সাপুড়ে। বলে,
-নে মা নে, বাড়ির লোক তোকে মালা চড়িয়ে দিচ্ছে মা, তোর পুজোও চড়াবে এবার, তুই শান্ত হ। এদের বিপদমুক্ত কর।
উঠানের একপাশে দাঁড়িয়ে আদুরি। সর্পাঘাতে মৃত্যুর ভয়ে থরথর কাঁপে। হাতচারেক লম্বা গোখরো সাপ! ভাগ্যিস সাপুড়েটা দেখেছিল সাপটাকে, নয়তো! ভাবলেই শিউরে ওঠে আদুরির গা। গামছা বাঁধা কলসির দিকে চেয়ে আছে আদুরি। মাথাটা ঘুরছে বনবন করে। দেওয়াল ধরে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখে কোনরকমে। মনে মনে ভাবে এই সাপুড়ে যে-সে লোক নয়। বাড়ির উঠানে পা রেখেই বলে দিয়েছে আদুরির সংসারের যন্ত্রণার কথা। দুচোখে জল আসে আদুরির, এতদিনে একজন সঠিক মানুষ এসেছে ঘরে।
-মা বিষহরি।
বলে ডেকে ওঠে সাপুড়ে। হাউ হাউ করে কাঁদে আদুরি। ঘরের ভিতর থেকে আদুরির শাশুড়ি রিনরিনে গলায় বলে, -কী হলো রে আদুরি? কী হলো?
ভীত গলায় আদুরি বলে— মা মনসা।
-বলিস কী রে! কাটলো নাকি? হায় ভগবান!
দুশ্চিন্তা আর আতঙ্কের ভার নিয়ে মহিলার কথাগুলো ঘরের ভিতর থেকে বাইরে আসে।
-ও আদুরি? ও বউ? কাটলো নাকি রে? বউ ও...!
ঘরের ভিতরের মহিলাটি উদ্‌বিগ্ন ভীষণ। আবার কিছুক্ষণ পরে বলে,
-উত্তর দিস না কেন? যাব নাকি? আমার কী ছাই সে ক্ষমতা আছে!
-তুমি চুপ থাকো। বিপদ হয়নি কিছু। সাপুড়ে এসেছে। মা মনসাকে ধরে ফেলেছে ঠিক সময়ে। নয়তো..
বলে দুলালের মা।
-যাক, পেন্নাম কর সাপুড়ে বাবাকে।
নিশ্চিন্ত হয়ে চুপ করে ঘরের ভিতরের মহিলা। ততক্ষণে পাড়াঘরে খবর পৌঁছে গেছে। সাপুড়ে এলে গ্রামে যেমন হয়। ছোটখাটো একটা ভিড় জমেছে আদুরির বাড়ির উঠানে। তিনকড়ির মা বলে,
-মা মনসাকে একবার দর্শন করব সাপুড়ে বাবা।
-সদ্য ধরা দিয়েছে, এখন মা রেগে আছে গো, আগে শান্ত হোক। একটা ধুপকাঠি আর এক গেলাস জল দেবে মা?
বলে রতন। গেলাসে করে জল নিয়ে আসে আদুরি। ধুপ নেই ঘরে। তিনকড়ির মা ধুপ নিয়ে আসে। সুগন্ধে ভরে ওঠে বাড়ির উঠান। রতন চেয়ে দেখে আদুরিকে একবার। তখনও ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে রয়েছে মুখ। রতন উচ্চস্বরে বলে,
-কোনো ভয় নেই বেটি। আমি এসেছি, সব বিপদ কেটে যাবে।
দুলালের মা আড়ালে ডাকে আদুরিকে। বলে,
-এই সাপুড়েকে ছাড়িস নে আদুরি। ওর দু পা জাপটে ধর। মা মনসাই ওকে পাঠিয়েছে তোর কাছে। না বলতেই তোর বাড়ির সব কথা বলে দিলে। শোন আদুরি...
ভিড়ের মধ্যে থেকে কে যেন বলে— সাপের খেলা দেখব।
 
ক্রমশ…
 

1 comment:

  1. ভালো লাগলো
    পরাণ মাঝি

    ReplyDelete

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)