বাতায়ন/ঝড়/ছোটোগল্প/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড় | ছোটোগল্প
সাহানা
অসম্ভব
"ফাঁকা জমিটা পেরিয়ে আসার সময় দুজনেই দেখেন, ক'টা লক্কড়মার্কা ছেলে তাস খেলছে আর নিজেদের মধ্যে কী সব কথা বলতে বলতে হাসাহাসি... ভঙ্গিটা খুব সুখকর নয়, অশ্লীল বললেও কম বলা হয়।"
বাজার থেকে বেরোতেই একটা ফাঁকা জমি। বেশ অনেকটা। পুরনো বাড়ি ছিল, এখন ভাঙাচোরা। কয়েকটা গাছপালা, আগাছা। জমিটা পরিষ্কার করে একটা পার্ক তৈরির কথা চলছে।
বিকাশবাবুর বাড়িটা জমিটার শেষ
প্রান্তে দুখানা বাড়ির পরেই। রবিবার সকালে বেশ আয়েশ করেই চা আর খবরের কাগজটা নিয়ে
বারান্দায় বসেছিলেন। এমন সময়ে প্রগতিদেবী একটা লম্বা কাগজ আর দুখানা ব্যাগ নিয়ে
ধপাস করে বসলেন এসে পাশেই।
আড়চোখে তাকিয়ে বেশ বুঝলেন, লম্বা কাগজখানা বাজারের ফর্দ। মাসকাবারি বাজার। অর্থাৎ, এখন এই জৈষ্ঠ্যের ঘামঝরানো রোদে যেতে হবে বাজারে এবং দোকানে। উপায় নেই! অগত্যা
কাগজটা ফেলে, উঠে আসা দীর্ঘশ্বাসটা গিলে
ফেলে জিনিসগুলো নিয়ে নেন। এবং সুবোধ বালকের মতো বাজারের রাস্তায়... পেছন থেকে একবার ডাক
শোনেন,
-শুনছ, একটু হলুদ গুঁড়ো এনো আর একশো গ্রাম আদা...
মাথা
নেড়ে বেরিয়ে আসেন। দাঁড়ালেই বিপদ। আরও কত কী যে মনে পড়বে! প্রগতিদেবী মানুষটি বেশ! ঘর
সংসারে পটু। রান্না করেন খাসা। কিন্তু মুশকিল হলো, তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কিছুতেই এঁটে উঠতে পারেন না বিকাশ।
কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম, অতি সূক্ষ্ম তফাৎ
তাঁকে পীড়া দেয়। সচরাচর অদ্ভুত কিছু ঘটে না। কিন্তু... বেশ কয়েকটা অস্বাভাবিক ঘটনা
ইদানীং তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছে।
প্রগতিদেবী হকার, কাগজওয়ালা, নিত্যদিনের ভিখিরি
এইসব মানুষদের বড়ো দয়ার চোখে দেখেন। সাহায্য করেন আপদে বিপদে। কিন্তু মিথ্যাচার
করে যদি কেউ টাকা নেয়… একবার ভানু নামক দুধ সরবরাহকারীটি ঠকাচ্ছিল বেশ কিছুদিন
ধরে। একদিন প্রগতি তাঁকে ধরলেন,
-হ্যাঁ রে, তুই তো প্রতিদিন এক প্যাকেট দুধ দিস, এক রোববার দু প্যাকেট দিয়েছিলি, হিসেবে পাঁচ প্যাকেট এক্সট্রা! কী হিসেব
করেছিস?
ভানু
আবোলতাবোল বকতেই মুহূর্তে উগ্রচন্ডী হয়ে ওঠেন তিনি। হাতের খুন্তি তুলে,
-তবে রে, লোক ঠকানো?
এমন তেড়ে ওঠেন! বিকাশবাবু
ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে খুব কমই এই রূপ দেখেছেন! মানুষটা যেন সেই চিরপরিচিতই
নন! আর একবার, কাজের মেয়েটি ফাঁকি দিয়ে
দুখানি কাপ নিয়েছিল আঁচলে... ধরা পড়বি তো পড় সটান গিন্নির কাছে! ব্যস! আবার সেই
মূর্তি! কাজের মেয়েটি হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে!
-মা
গো, ভুল করেছি! ক্ষমা করে দাও, মা!
প্রগতি
একটা ঠাস করে চড় মেরে ফুঁসে ওঠেন,
-চুরি করছিস? চোর কোথাকার!
এই
দুবারের এবং আগেও ছোটোখাটো ঘটনাগুলো বিকাশকে বেশ নাড়া দেয়! কাউকে কিছু না জানিয়ে
একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সব শুনে বিশেষজ্ঞের মত,
-এইরকম রাগের বহিঃপ্রকাশ অবদমিত ক্ষোভের কারণ।
-ক্ষোভ? কীসের ক্ষোভ?
বিকাশবাবুকে
অবাক করে কিছু অত্যন্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন করেন সাইকিয়াট্রিস্ট। ক্ষুব্ধ বিকাশ
দায়সারা উত্তর দিয়ে উঠে আসেন। অফিসে ফিরে প্রথমেই কম্পিউটার খুলে গুগল সার্চ করেন।
নানারকম তথ্য মেলে। সবকিছুর মধ্যে মাথায় ঘোরে, সিজোফ্রেনিয়া... স্প্লিট পার্সোনালিটি... দ্বৈতসত্ত্বা... আরও কত্ত মানসিক ব্যাধি! চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে।
এর পরের
ঘটনা বছর দেড়েক বাদে... বছর দুয়েক আগে এক দুপুরে কর্তা-গিন্নিতে
সিনেমা দেখতে বেরিয়েছেন। হঠাৎই টিকিট কাটা। তাও নিজেরা নয়, একমাত্র ছেলে অনলাইনে টিকিট কেটে মেসেজ করেছে, সে যেতে পারছে না,
অগত্যা
দুটো টিকিটের যেন সদ্ব্যবহার তাঁরা করেন!
ফাঁকা
জমিটা পেরিয়ে আসার সময় দুজনেই দেখেন, ক'টা লক্কড়মার্কা ছেলে তাস খেলছে আর নিজেদের মধ্যে কী সব কথা বলতে
বলতে হাসাহাসি... ভঙ্গিটা খুব সুখকর নয়, অশ্লীল
বললেও
কম বলা হয়।
-এরা
আবার কোথা থেকে এলো? উটকো বদমাশের দল!
স্বগতোক্তি
বিকাশের। প্রগতি
কিছু বলেন না, তাকিয়ে দেখেন এবং মুখ ঘুরিয়ে
নেন। প্রগতিদেবী সেই অর্থে
সুন্দরী না হলেও বেশ ব্যক্তিত্বময়ী। এই মুহূর্তে চওড়া পাড়ের শাড়ি আর লাল ব্লাউজে
তাঁকে অপরূপা লাগছে! উঁচু করে চুল বেঁধেছেন বেশ আধুনিক স্টাইলে। হাতে চামড়ার ব্যাগ
এবং ছোট্ট ছাতা। ছেলেগুলো
অবশ্য নিজেদের নিয়েই মশগুল।
শো
ভাঙলো একটু দেরিতে। বাড়ি ফেরার পথে দেখলেন,
ছেলেগুলো...
রাস্তাটা আলোছায়ার অন্ধকারে... স্ট্রিট লাইটগুলো খারাপ... তার মধ্যেই দেখা গেলো
একটি অল্পবয়সি মেয়ে প্রাণপণে চেষ্টা করছে হাত ছাড়িয়ে নিতে, ঘিরে ধরেছে দু-তিন জন ছেলে, রীতিমতো টানাটানি... ঘেমে উঠলেন বিকাশ। পাশ থেকে চাপা গলায় কেউ যেন বলে উঠল,
-তবে রে...
গলাটা
সম্পূর্ণ অচেনা! তার পরক্ষণেই প্রচণ্ড বেগে সাক্ষাৎ ঘূর্ণিঝড়ের মতো কেউ যেন
গিয়ে পড়ল সবকিছুর মাঝে... শুধু হুঙ্কার আর একটা হাতের ওঠানামা... মুঠোয় ধরা একটি
ছোট্ট ছাতা! হুড়মুড়িয়ে আশেপাশের বাড়ি থেকে ছুটে আসছে লোক। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে
বিকাশবাবু ছাতাধরা হাতটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন!
সমাপ্ত

ভালো লাগল গল্প।
ReplyDeleteধন্যবাদ
Deleteভালো লাগল গল্প।
ReplyDeleteKhub bhalo laglo ❤️
ReplyDeleteKhub valo laglo didi...amader sobar modhyekar Progoti debo eivabei atmoprokash koruk
ReplyDeleteধন্যবাদ
Deleteধন্যবাদ
Deleteধন্যবাদ
ReplyDelete