বাতায়ন/নৃপেন
চক্রবর্তী সংখ্যা/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/২৮ সংখ্যা/১৪ই কার্ত্তিক,
১৪৩২
নৃপেন চক্রবর্তী
সংখ্যা |
ছোটগল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
ডিপ্রেশন
"উফ্ আমি প্রাইজ নিয়ে এলাম তা নিয়ে কেউ কিছু বলছে না, যেটা ভুল করে ফেলেছি তাই নিয়ে সবাই কথা বলছে আর খেতে টেতে দেবে না না কি?"
শৌনক কিছুতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে না। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে তাঁরা চান ছেলে তাদের ইঞ্জিনিয়ার হোক কিন্তু ছেলের ঝোঁক ফটোগ্রাফিতে। এই নিয়ে মনোমালিন্য শেষপর্যন্ত বাবা-মায়ের জেদের কাছে হার মানতে হল শৌনককে। রেজাল্ট ভাল হয় না কিছুতেই।
বাবা প্রবীর গজগজ করে আমরা
সাধারণ বাবার ছেলে ছিলাম অত টিউশন দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না তাও কত ভাল রেজাল্ট করতাম
আর একে সাধ্যের বাইরে গিয়ে টিউশন দিচ্ছি তাও কিছুতেই একটা প্রপার রেজাল্ট করতে
পারছে না। এই রেজাল্টে কোথায় চাকরি পাবে?
শৌনক দিনরাত এসব শুনে শুনে
আরও নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। কারুর সাথে কথা বলে না, কলেজ যায় না জোর করে মা দুটো খাইয়ে দেয়। ইজিচেয়ারে শুয়ে শুয়ে ওপর দিকে চেয়ে কী যেন ভাবে।
শৌনকের মামা অভি ডাক্তার, সে বোনকে বকে বলল,
-তোরা কেন ওকে
জোর করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ালি ওর যেটা ভাল লাগে সেই সাবজেক্ট
দিতে হয়। বাবা-মায়ের এই জেদের জন্য যে কত ছেলের ডিপ্রেশনের
শিকার হচ্ছে তার ঠিক নেই। আজকাল সমস্ত লাইনেই ভাল সুযোগ আছে। জানিস ফ্রান্সে একটা
ফটোগ্রাফির এক্সজিবিশন হচ্ছে সেখানে কত ছাত্র যোগ দিচ্ছে আমি তো ভাবছি শৌনককে ওই এক্জিবিশনে যোগ দেওয়াব, তোমরা জান না শৌনক
পুরো ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে।
-তুমি কী করে জানলে?
-আরে আমি একজন
সাইকোলজিস্ট ওর দৃষ্টির মধ্যে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেছিলাম। পরশুদিন দেখলাম
ফ্যানের দিকে চেয়ে কী ভাবছে একটা দড়ি হাতে করে, আমি তাড়াতাড়ি করে গিয়ে ওর হাত থেকে দড়িটা কেড়ে নিয়ে বললাম কী করতে
যাচ্ছিস?
-আমার মরে
যাওয়াই ভাল মামা, আমি না পারছি নিজে
খুশি হতে, না পারছি বাবা-মাকে খুশি
করতে।
-আচ্ছা তোর ভার
আমি নিলাম, আমি তোর বাবা-মায়ের সাথে
কথা বলব।
প্রবীর বলল,
-সবসময় তো
আমাদের ইচ্ছেটা ওদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিই। ও কোনদিন
শেখেনি ও কী করে পারবে? যে যা ভালবাসে তা তার ভেতরেই থাকবে একবার দিক না যোগ খারাপ তো কিছু হবে না।
ফোটোগ্রফির এক্জিবিশনে যোগ
দেবে শুনে শৌনকের চেহারাই বদলে গেল। বিভিন্ন জায়গায় অসাধারণ সব ফটো তুলে বেড়াতে
লাগল। ফটোগুলো দেখে প্রবীর অবাক হয়ে গেল। ছেলেকে উৎসাহ দিতে লাগল তোর যত ইচ্ছে ছবি
তোল তুই চাইলে আমি তোকে বিদেশ থেকে ফটোগ্রাফি শিখিয়ে আনব, শৌনক উৎসাহ পেয়ে বলল,
-আগে এখানেই
ভাল করে শিখি তারপর বিদেশের কথা ভাবা যাবে।
শেষপর্যন্ত এক্জিবিশনে
শৌনকের তোলা ছবি গেল শৌনক তো ভয়ে মামাকে জড়িয়ে ধরে আছে। বাবা প্রবীর বলল,
-তোকে তো আমরা
ফটোগ্রাফি কোনদিন শেখাইনি, ধরে নে এবার হবে না
এরপর থেকে তুই ফটোগ্রাফি শিখে তখন যোগ দিবি ঠিক হবে। আমাদেরই বুঝতে ভুল হয়েছিল
ভাগ্যিস তোর মামা সাইকোলজিস্ট তাই ও তোর সাথে কথা বলে সবটা বুঝতে পেরেছে।
এক্জিবিশন
আরম্ভ হওয়ার পর দেখা গেল শৌনকের ছবি বেশ ভাল দর পাচ্ছে
বিক্রি হচ্ছে অনেক। মাইকে যখন ঘোষণা হবার সময় এল শৌনক মামাকে জড়িয়ে ধরল শৌনক দ্বিতীয় স্থানে আছে। শৌনকের বাবা এসে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-আর একটু হলে আমরা তোকে হারিয়ে ফেলতাম। এরকম কেউ ভাবে একবারও
বাবা-মায়ের কথা ভাববি না?
শৌনক লজ্জিত হয়ে বলল,
-আমি ফটোগ্রাফির সাথে সাথে ইঞ্জিনিয়ারিংও পড়ব বাবা।
-না বাবা দুটো
একসাথে হয় না, তুমি ফটোগ্রাফিই শেখ
এখানকার শেখা শেষ হলে আমি তোমাকে বিদেশে পাঠাব।
সবাই খুব খুশি এখন দাদুর বাড়ি
যাচ্ছে ওখানেই ওদের আজ নিমন্ত্রণ। এতক্ষণে মা স্বাতী এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে
ফেলে বলল,
-তুই কী করে আত্মহত্যা করতে গেছিলি?
ভাগ্যিস
অভি দেখে ফেলেছিল তাই তোকে আবার কাছে পেলাম। আর কখনও এরকম মনেও ভাববি না। সত্যি
আমরা বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের ইচ্ছেটা একটুও বুঝি না সবসময় ওদের মাথার ওপর বোঝার মতন
চাপিয়ে নিজের ইচ্ছেটা চাপিয়ে দিই আর এই বোঝা বইতে না পারলেই
বাবা-মায়ের মার বকুনি। আমরাও অবুঝ ওদের
মনটা বুঝি না।
প্রবীর বলল,
-বুঝি নাই তো। তাই তো আমাদের
জীবনে এতবড় একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল!
শৌনক এবার লজ্জা পেয়ে বলল,
-আমারও ভুল
হয়েছে, সব বাবা-মায়েরই তো ছেলেকে
নিয়ে একটা স্বপ্ন থাকে আমার বাবা-মায়েরও ছিল, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সাথে সাথে আমি ফটোগ্রাফিটা চালিয়ে নিয়ে যেতে
পারতাম তাতে দুজনেরই ইচ্ছে পূরণ হত।
অভি বলল,
-সে তো এখনও হতে পারে কী ভাগ্নে?
-হ্যাঁ তাই হবে
তাতে সবারই ইচ্ছে পূরণ হবে।
চিত্রা বললেন,
-তোমার যেটা
ইচ্ছে সেটাই কর বাবা আমি আর জোর করব না।
দাদু এসে শৌনকের কান ধরে বলল,
-তুই গলায় দড়ি
দিতে গিয়েছিলি আমরা সবাই বেঁচে থাকতে এতবড় সাহস তোর?
-ওহ্ দাদু ছাড়
লাগছে বলছি তো আর কখনও হবে না।
অভি বলল,
-ডিপ্রেশনটা
মনে কখনও আসতেই দিবি না। যেটা এখন বললি সেটা তখনও করতে পারতিস দুমিনিট দেরি হলে
তোকে বাঁচাতে পারতাম না।
-উফ্ আমি
প্রাইজ নিয়ে এলাম তা নিয়ে কেউ কিছু বলছে না, যেটা ভুল করে ফেলেছি তাই নিয়ে সবাই কথা বলছে আর খেতে টেতে দেবে না না কি?
মামি এসে
শৌনককে আদর করে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
-চল আজ সব তোর
ফেভারিট রান্না করেছি।
অভি চিৎকার করে উঠল,
-হিপ হিপ হুররেএ ভাগ্নে কী জয়।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment