প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

চৈতি হাওয়া—নববর্ষ

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ , ১৪৩৩ চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | সম্পাদকীয়   চৈতি হাওয়া—নববর্ষ "দুগ্ধপোষ্য...

Wednesday, April 8, 2026

শিবের গাজন [২য় পর্ব] | অর্পিতা রায় মোদক

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/২য় সংখ্যা/১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
 
অর্পিতা রায় মোদক
 
শিবের গাজন
[২য় পর্ব]

"সকাল হতেই মেঘ গুরগুর করছে। সন্ধ্যায় আরো ভারী হয়ে এল আকাশ। ভাদুরা একে অপরের হাত চেপে ধরে চড়ক খেলা দেখছে। ভয়ে বুক কাঁপেতবু চোখ ফেরানো যায় না!"

 
পূর্বানুবৃত্তি ভাদু শিঙা আর ডুগডুগির শব্দ শুনে তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়েছে যুক্তিতর্কের অবকাশ ছাড়াই। ভাদুর মধ্যে বিপ্লব ঘটে গেছে! ভাদু মিশে যাচ্ছে চৈত্রের ঠাঠা রোদে, এ বাড়ি থেকে ও বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারপর…
 
সেই ফালু কিনা সেবারে গাজনের দলে পার্বতী সেজে বসল! নিত্য সাজল শিব। এক উঠোন থেকে আরেক উঠোনে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে শিঙায় ফুঁ পড়ে। ফালু আর নিত্য হাত ধরাধরি করে পা তুলে নাচে।
 
শাড়ি পরে ফালুর বেহাল দশা! ঠনঠনে কাঁধ থেকে বারবার খসে পড়ে জড়ি বসানো ব্লাউজ। ছিপছিপে কোমর থেকে সায়ার গিঁ আলগা হয়ে বারবার নেমে যাচ্ছে শাড়ি। যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে শাড়ি টেনে তুলতে তুলতে ফালু বলে—উঁ রে শ্লা!
 
মাথার উপর চড়া রোদ। গরমে ঘেমে-নেয়ে ফালুর বুক আর গলা থেকে তিলক মাটির সাথে চটা চটা জমা ময়লা উঠে আসছিল। সারা মুখে লাল কুমকুমে মাখামাখি। ও-পাড়ার জ্যোৎস্না ছেলে কোলে ফালুকে বলেছিল—ওই ফালু আট্টু নাচ দেখা। তিনপা চাইল দিমু!ফালুর তখন মাথা ঝিমঝিম করছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। ইশারায় জ্যোৎস্নার কাছে জল চেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। সে-কী ছটফটানি ফালুর! মাটিতে শুয়েই টেনে খুলছে শাড়ি-ব্লাউজ। ব্লাউজের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল দলা পাকানো ন্যাতা!
 
রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছে ভাদু। ধুত্তেরি নতুন জামা! ভাদু বড়াই-বাড়ি যাবেই যাবে। অসময়ে শিঙা বাজিয়ে চড়ক ঠাকুরই তো ডেকে পাঠিয়েছে ভাদুকে।
বড়াই বাড়িতে একবার পা রাখলে আর রায়-বাড়িতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না। যদিও রায়-বাড়িতে এখন আগের চেয়ে অনেক সুখে দিন কাটে ভাদুর। রায়-গিন্নি কাজলের এখন ভাদুর উপর মায়া বেড়েছে। এমনিতে বাড়েনি। ভাদুর বাবার সঙ্গে কথা বলে কাজল ভাদুকে এনেছিল বুড়ো শাশুড়িকে দেখাশোনা করার জন্য। ভাদু তখন ভীষণই আনকোরা। বুড়ির বিছানার পাশে খাটিয়াতে শোয়া ছাড়া আর কোন কাজই পারে না। বুড়ি যেখানে-সেখানে থুতু ফেললে, কিংবা কাপড় নোংরা করে ফেললে ঘেন্নায় গা গুলিয়ে উঠত ভাদুর। কী দুঃসহ ছিল সেসব দিন!
 
সে রাতের কথা কোনদিন ভুলতে পারবে না ভাদু। পৌষের শীতে কাঁপতে কাঁপতে সে-রাতে কিনা বুড়ির লেপের তলায় সেঁধিয়ে গেছিল! বুড়িকে সেদিন একটুও ঘেন্না করেনি।
 
তারপর একদিন বুড়ি মরল। বুড়ির বিছানার পাশে রাতে শুতে কী ভয়টাই না করত! ভাদু বাড়ি ফিরে মাথা নাড়িয়েছিল, রায়-বাড়িতে সে আর ফিরে যাবে না। তারপরও বাবার ঠেলাঠেলিতে যেদিন আরেকবার রায়-বাড়িতে পা রাখতে বাধ্য হল কাজলের সেদিন যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে! বমি করে ঘর ভাসিয়েছে। নিজের ছেলে পর্যন্ত নাক কুঁচকে দূরে সরে গেছিল। দেবদূতের মতো ভাদু এসে হাত রেখেছিল কাজলের মাথায়। ভাদুকে হাত দিয়ে কাঁকিয়ে কাঁকিয়ে বমি পরিষ্কার করতে দেখে কাজলের চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে পড়েছিল বালিশে। সেই থেকে রায়-বাড়িতে ভাদুর প্রমোশন হয়েছে। কাজল আর কখনো ভাদুর সাথে খিটমিট করেনি।
 
ন্ত বিকেল। ভাদু ব্যাগ দোলাতে দোলাতে হাঁটছে। ভাদুকে সম্ভাষণ জানাতে কচুরিপানার জঙ্গল থেকে সমস্বরে চিৎকার করে উঠল একদল ডাহুক।
-ভাদু আইসলি নাকি! তরে ত চিনাই যায় না রে!
চমকে তাকাল ভাদু। ফালু না! কিন্তু সেদিনের সেই ফালু গেল কই! এর যে ঠোঁটের উপর গোঁফ, পায়ে কালো কালো লোম! বেটাছেলের মতো দুভাঁজ করে লুঙ্গি পরে বসে আছে! ফিক করে হেসে মাথা দোলায় ভাদু।
-হ।
সৌজন্যের খাতিরে ফালুর সঙ্গে দুটো কথা বলা উচিত। কিন্তু কী বলা উচিত ভাদু ভেবেই পাচ্ছে না। অযথা কিছুটা সময় নষ্ট করে ভাদুর মুখে কথা জোগালো।
-কিমন আছ?
ফালু মুচকি হেসে চলে গেল।
ফালুর কথাই ঠিক। ভাদু সত্যিই অনেক বদলে গেছে। আসার পর জনে জনে বলেছে। সস্তার ক্রিম মেখেও গালে গোলাপি আভা ফুটে উঠেছে। পুরোনো ফ্রকগুলো আঁটোসাঁটো হয়ে গায়ে কামড়ে থাকে।
 
ফালু এবারে শিব বা পার্বতী সাজেনি। তবে গাজনের দলে ঘুরে বেড়িয়েছে। ভাদুও একদিন ঘুরেছে দলের সাথে সাথে। এবারে নাকি ফালুই বঁড়শি নিয়েছে। ঘুরতে ঘুরতে বেশ কবার ফালুর গায়ে ভাদুর ছোঁয়া লেগে গেছে। ভাদু ভয়ে ভয়ে তাকিয়েছিল ফালুর দিকে। নাহ্, ফালু রাগ করেনি। 
 
সেই সকাল হতেই মেঘ গুরগুর করছে। সন্ধ্যায় আরো ভারী হয়ে এল আকাশ। ভাদুরা একে অপরের হাত চেপে ধরে চড়ক খেলা দেখছে। ভয়ে বুক কাঁপে, তবু চোখ ফেরানো যায় না! ফালুরা আটজন। জলন্ত কয়লার উপর দিয়ে হাঁটছে, রামদার উপর দিয়েও হাঁটল! মুখে কেরোসিন নিয়ে ফুঁ করে ছুঁড়ে দিচ্ছে জ্বলন্ত মশালে। ওফ্ফ, কী ভয়ংকর! ভয়ংকরেরও সৌন্দর্য আছে, তাইতো চোখ সরে না।
 
মেলা প্রায় শেষের দিকে। মেঘের তর্জনগর্জন শুরু হয়ে গেছে। একে একে শূন্য হচ্ছে মেলা প্রাঙ্গন। সবশেষে চড়ক ঘোরানো। ফালু এসে বসেছে। হঠাৎ ফালুর মুখের দিকে তাকিয়ে বুকটা মুচড়ে উঠল ভাদুর। ফালুর পিঠে বঁড়শি বিঁধল। ফালু হাত-পা ছড়িয়ে গোলগোল ঘুরছে। খুব হাসছিল ফালু, হঠাৎ কেমন চুপ করে গেল। ভয়ে মাটিতে বসে পড়ল ভাদু।
 
এমনি সময় তেড়ে এল ঘূর্ণিঝড়। হুড়মুড় করে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে মেলা। সঙ্গীরা ভাদুকে ছেড়েই পালিয়েছে। ওরা ভাদুর হাত ধরে টানাটানি করেছিল। ভাদু সেসময় কেমন যেন স্থবির হয়ে বসে রইল!
 
চোখ কচলাতে কচলাতে এগিয়ে যাচ্ছে ভাদু। ওই তো ফালু। উপুড় হয়ে শুয়ে আছে মাটিতে। বেঁচে আছে তো! ভাদু হাঁটু মুড়ে বসল ফালুর পাশে। ভয়ে ভয়ে হাত রাখল ফালুর কাঁধে।
-ফালুদা, ও ফালুদা!
ফালু মাথা তুলে সরু চোখে তাকাল।
-তুই বাড়ি যাছ নাই ক্যা?
ভাদু চলেই যাচ্ছে। বড় বড় জলের ফোঁটা স করে গায়ে বিঁধছে। ফালু চিৎকার করে উঠল।
-ওই ভাদু যাইছ না, হুইন্না যা।
ভাদু ঘাড় কাত করে ফিরে এল।
-কী কও?
-আমার লগে বিয়া বি? তরে আমার ভাল্লাগে!
 
কিছুক্ষণের স্তব্ধতা। ফিক করে হেসেই ছুট দিল ভাদু। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। তরঙ্গ উঠেছে ভাদুর বুকে। ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত— কিছুতেই আর ভয় নেই। চড়ক ঠাকুর ভাদুকে এক জ্যান্ত শিব উপহার দিয়েছে!
 
~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 8 (Last 7 days)