বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/২য় সংখ্যা/১১ই
বৈশাখ, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
জয়নাল
আবেদিন
নোনা
জল
[২য় পর্ব]
"পরপর কটা দিন জালে মাছ উঠছে। বেশ খুশির ব্যস্ততা ‘মা-মনসা’ ট্রলারে। আঠাশটা হাত সদা ব্যস্ত থাকলেও কোন ক্লান্তি নেই কারো শরীর-মনে। রশি টেনে জাল তোলা।"
পূর্বানুবৃত্তি চোদ্দো জনের দল নিয়ে জহর রওনা হচ্ছে সমুদ্রে মাছ ধরতে।
পাড়ে বসে মেয়ে-বউ-বাচ্চা এমন কয়েকজন মানুষ। ভয়কে
জয় করে বেঁচে থাকে তারা। তারপর…
তিন
দেখতে দেখতে দুটো মাস কেটে
গেল। একবার ডেলিভারি হয়েছে ডায়মন্ডে। প্রথম প্রথম বদ্ধ ঝুঁকিপূর্ণ বলে অন্যেরা এড়িয়ে
চলে গেছে। দিন সাতেক বলতে গেলে ছিপ ফেলে বসে থাকার মতোই। আস্তে
আস্তে ট্রলার এগোয় গহীনে। নিজেদের জীবন বিপন্ন
হলেও, বাকি জীবনগুলোর জন্য এগোতেই
হবে। এই দূরূহ সীমানায় খুব বেশি ট্রলার আসে না। ঝুঁকিপূর্ণ বলে এড়িয়ে চলে
অন্যেরা। জলের ঘনত্ব বেশি বলে, উথালপাতাল ঢেউ বড়
কট্টর। হাল কাটাতে পাঁজর ব্যথা হয়ে যায়। দুজন লাগে হাল মজবুত রাখতে। বিমল একা
সেঁটে ওঠে না, সাহায্য করে লালন। বড় মজার মানুষ হাল-দাঁড়ে হাত দিলেই মুখে গান চলে আসে। সোঁদা মাটি,
নোনা জলের গান। ভাটিয়ালি সুর ঢেউয়ের পরতে পরতে ভেসে যায়।
দূর থেকে দূরান্তে। কুলকিনারাহীন সাগরে মাছের মতোই জল ছুঁয়ে ছুটে বেড়ায়।
গতকাল বেশ কিছু রুপো উঠেছে।
ওজনদার জাল হয়েছে। জহরের মনটা আজ বেশ উৎফুল্ল। খুশি দলের সকলেই। একটা নিম্নচাপের
আবহাওয়া হতে গিয়েও কেটে গেল। এই সময়টা জাল ফেলে রাখায়
একটা আশঙ্কা থেকে যায়। ঢেউয়ের প্রকোপে জালের টানে ট্রলার ডুবে যাওয়ার ভয় থাকে।
তাই জাল গুটোনোও ছিল, নামানো হয়নি।
সকাল থেকে আকাশ বেশ পরিষ্কার। জাল
গোছগাছ করে ফেলা শুরু হয়েছে। একটু পরেই জোয়ার শুরু হবে। ফুলে ওঠা জলে মাছ ঢুকবে
জালে। সতর্ক জহর। তৎপর সকলেই, জোয়ার শেষ হলেই জাল
তুলতে হবে। ভরা কোটাল। জল ক্রমশ ফুলতে থাকছে। মরুভূমি কোনদিন দেখেনি জহর। তবে গল্প
শুনেছে মানুষের কাছে। যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর বালি। উটের পিঠে চড়ে যেতে হয়
ক্রোশ ক্রোশ রাস্তা। কূলকিনারাহীন এ পথ কোথায় শেষ তা বলা যায় না।
আজ ট্রলারে বসে জহর তাকায়
দূর পানে। দৃষ্টিশক্তির বাইরে কতটা জলপথ আরো রয়েছে জানে না সে। খোঁজও পাবে না।
দেশের সীমানা বোঝাও দায়। কিছু দূরে কয়েকটা ট্রলার পরপর ভাবছে। মাথায় বাঁধা
খুঁটিতে দেশের পতাকা।
দেশের সীমানা, জলপথের সীমানা,
রাজনীতির
রূপরেখা। কে মন্ত্রী, কে সান্ত্রী। জিনিসপত্রের দাম কেন বাড়ছে, কিছুই জানে না বোঝে না জহররা। খাটলে খাবার জুটবে, না খাটলে খাবার জুটবে না। অনাহারে থাকতে হবে বউ- ছেলে
নিয়ে। এটাই বোঝে তামাম মানুষগুলো। আর তাই,
দিনের
পর দিন, মাসের পর মাস। ঝড়বাদলা মাথায় নিয়েও মাছ দরিয়ায় জীবন কাটে। প্রাণের
ঝুঁকি থাকলেও বারবার ফিরে যেতেই হয় অগাধ জলে। জলের অপর নাম জীবন, জহরদের কাছেও তাই। তবে এই জীবনের বিশ্লেষণটা একরকম আলাদা।
পরপর কটা দিন জালে মাছ উঠছে।
বেশ খুশির ব্যস্ততা ‘মা-মনসা’ ট্রলারে। আঠাশটা হাত সদা ব্যস্ত
থাকলেও কোন ক্লান্তি নেই কারো শরীর-মনে। রশি টেনে জাল তোলা।
মাছ বাছাই করে প্লাস্টিক কার্টুনে ভরে রাখা। ট্রলারের খোলের মধ্যে আলাদা আলাদা
রাখা। অনেক কাজ। জাল ঝেড়ে সাফসাফাই করে, ছেঁড়া-ফাটা সঙ্গে সঙ্গে মেরামতি করে নামানো। সময়টায় কেমন
যুদ্ধকালীন তৎপরতা। জাল নামিয়ে কিছুটা সময় বিশ্রাম। রান্নাবান্না- স্নান-খাওয়া
মিটে যায় এই অবসরে।
আরও একটা ডেলিভারি হলো
ডায়মন্ডে। শম্ভুনাথের মুখটা বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে আজ। বেশ ব্যস্ততার মাঝেও জহরদের
খাবার জল-চাল-ডাল-আলু-সবজি-ডিজেল ট্রলারে তুলে দিতে তৎপরতা দেখালে। কয়েক ঘন্টার
জন্য জমি ছুঁয়ে আবারও অতল জলের আহ্বানে জহররা পাড়ি দিল নোনা জলের স্বাদ নিতে।
আবারো জাল ফেলা, জাল তোলা, ঝাড়াই-বাছাই, কার্টুন-বরফ।
জীবন তুমি মরুভূমির শুষ্ক
বালি, জীবন তুমি মরুদ্যান। জীবন তুমি খরাক্লান্ত চৌচির ভূমি, জীবন তুমি বৃষ্টিস্নাত বনভূমি। জীবন তুমি জোয়ার,
জীবন তুমি ভাটা। জীবন তুমি খরস্রোতা নদী, জীবন তুমি নোনা
জলের সমুদ্র। দুপুরের পরে জাল পড়েছে জলে। আপাতত আড্ডা দেওয়ার মতো বসে সকলে। কেউবা শুয়ে। হাঁক পাড়ল বিমল হালের হাতলে হাত রেখে।
-কাকা, এবার একটু ভাল দান
পাব তো?
-ভগবান জানে, ভাবি এক আর হয় আরেক।
হিসেবের দিন বোঝা যাবে।
জহরের জবাব।
-এবার কিন্তু দামি মাল ভালই উঠেছে কাকা বলো?
বলে লালন।
-আমাদের দামি
মালগুলোই মালিকেরা কম দামে বিক্রি করে। ওরা কখনোই বেশি দাম পায় না।
ম্লান হাসিতে স্বগতোক্তি জহর
মালোর। আমরা যদি সঠিক দাম পেতাম, তাহলে আমাদের এমন
দুরবস্থা থাকত। কপাল দোষে জেলে ঘরে জন্মেছিলাম।
-এবার কিন্তু একটু চাপ রাখতে হবে। কথা মেনে নিলে হবে না।
চেঁচিয়ে লালনকে আশ্বস্ত করে
জহর।
চার
ট্রলার ঘাটে ভিড়েছে রাত
দুটোয়। আড়তে মাছ নামিয়ে সবকিছু গোছগাছ করতে করতেই বেলা উঠে এলো। কাল হিসাব, মালিকের কথায় বাড়ি ফেরে আগে-পিছে। পরদিন সকালসকাল আড়তে
আসে জহর মালো, তার দলবল। অফিস ঘরের বাইরে দালানে বসে সকলে। হিসেব
চলছে কত মাছ এসেছে। কত দামে বিক্রি হয়েছে।
মালিক-ট্রলার-জাল-খাবার-ডিজেল। হিসেব মতো আয়ের ষাট শতাংশ বাদে, চল্লিশ শতাংশ আয় জহর মালো আর তার দলের লোকেরা পাবে। অফিস
ঘরে হিসেব চলছে, কে কত টাকা আয় করল।
অগ্রিম টাকা নেওয়া বাদ দিয়ে এখন হাতে কত টাকা পাবে।
বাইরের দালানে বসে অপেক্ষায়
থাকা মানুষগুলোর মনের ভিতর মেঘ জমছে আস্তে আস্তে। এবার যদি হিসেব ভাল না হয়, তাহলে আর ট্রলারে উঠবে না জীবনে। অন্য কাজ দেখে নেবে। শুকনো
মুখগুলো মাঝেমধ্যে দরজায় উঁকি দিয়ে আর কত বাকি হিসাব শেষ হতে জরিপ করে। কেউ কেউ
উদাস মনে বিড়ির ধোঁয়া ছাড়ে।
একসময় জহর মালোর ডাক পড়ে
অফিস ঘরে। তোমাদের প্রত্যেকের নামে আলাদা আলাদা করে হিসাব কষে দেওয়া আছে। যার যেমন কাজের
হিসাবে পাওনা দেওয়া, একটু দেখে নাও। শম্ভুনাথ
দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বললে জহরকে। পাওনার চেহারা দেখে প্রথমেই গর্জে ওঠে লালন।
-জীবন বাজি রেখে খাটব আমরা, পাওনা শেষে মুঠো খালি। দুশো
টাকাও রোজ হয় না। তাহলে খেটে কী লাভ আমাদের?
বিমলও কিছুটা বিরক্ত।
-মেয়ের শরীর
খারাপে বউ টাকা চাইলে খালি হাতে ফিরিয়েছিল মালিক। কোন দাম নেই আমাদের গতরের। খেটে খেতে পারব না আমরা। এবারেই কত দামি মাল উঠল। পাওনার খাতা সেই এক।
প্রকারান্তরে জহর মালোকেই
চেঁচানি শুনতে হলো।
-আর কোনদিন
ডাকবে না আমাদের।
চিৎকার চেঁচামেচি। চোখের নোনা
জলে ঠোঁট ভিজল অনেকের। শম্ভুনাথ শান্ত করল সকলকে। সেই-ই একমাত্র বোঝে জেলেদের নাড়ির স্পন্দন।
কখন কোথায় কেমন অবস্থায় জল ঢালতে হয়। এভাবেই চলছে জেলেদের জীবন। এমনটাই
চালাচ্ছে শম্ভুনাথের মতো আড়তদার। ট্রলার মালিকেরা। ওরা রুপালি ইলিশের মতোই, নোনা জল ছাড়া ওদের জীবন বাঁচবে না।
~~000~~

No comments:
Post a Comment