বাতায়ন/চৈতি
হাওয়া—নববর্ষ/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা
বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | ধারাবাহিক গল্প
জয়নাল
আবেদিন
নোনা
জল
[১ম পর্ব]
"দিন দুই হয়ে গেল বিমলের ছোট মেয়েটার জ্বর কমছে না। বেশ উদ্বেগের মধ্যে কাটছে বিমলের স্ত্রী ঝুমার দিনকাল। ঘরে টাকাপয়সা নেই। স্বামী বাড়ি নেই। আশাকর্মী দিদিটা সকালে কটা ট্যাবলেট দিয়ে গেছে।"
নৈনান খেয়াঘাটে তখন নৌকোটা
বাঁধা আছে। যাত্রীরা অপেক্ষায় পাড়ে বসে। একটু পাশেই মাছ ধরা ট্রলারখানায় জাল
গোছানো থেকে অন্যান্য জিনিসপত্র গোছগাছ চলছে। এখন নদীতে জোয়ার শেষ হয়েছে ভাটার অপেক্ষায়
জহরের দলবল। চোদ্দো জনের দল নিয়ে রওনা হচ্ছে সমুদ্রে মাছ
ধরতে। পাড়ে বসে মেয়ে-বউ-বাচ্চা এমন কয়েকজন মানুষ। ঠায়
নৌকায় নজর তাদের, যে-কোনো মুহূর্তে
ছেড়ে যাবে মাঝ দরিয়ার দিকে। কবে ফিরবে কেউ জানে না। শেষ শীতের এই সময়টা সমুদ্র
খুব একটা উত্তাল হয় না। ঝড়ঝঞ্ঝা এ-সময় থাকে না প্রায়। কিন্তু
এ-বছর মৌসুম বড় বেগতিক, কিছুদিন আগেই আমফান ঝড়ে বেসামাল তামাম এলাকা। ক্ষয়ক্ষতি
সেরে উঠতে এখনো মাথা তোলেনি কত ঘরবাড়ি। ঘাটের পাশে ছোট্ট দোকান ঘরে চা-পানের
দোকান মহিলার। ঘরের মানুষটা যুঝতে পাড়ি দেবে, চোখটা পাতা আছে নৌকায়।
-আমাদের জীবন তো পদ্মপাতায়
জলের মতোই বাবু। ঝড়বাদলে নদী পাগল হয়। তখন পাড় উপচে জল। সব পাড়ের ঘরবাড়ি তচনচ
করে দেয়।
-ভয় করে না, এভাবে বাস করতে?
-ভয়কে জয় করেই তো বেঁচে আছি গো। এইতো পুরুষ মানুষরা চলে
যাচ্ছে। ফিরবে কিনা ঠাকুরই জানে। এক মাস-দেড় মাস পরে ফেরে। কখনো মাছ বোঝাই, কখনো অর্ধেক খালি। পেটের তাগিদে জীবন নিয়ে খেলা।
ভাটা শুরু হয়েছে সবে। হালে
হাত রেখে দাঁড়িয়ে বিমল, অভিজ্ঞ হাত। কোন পথে
কেমন ঢেউ কাটিয়ে যেতে হয়, নখদর্পণে গভীর জলের
হালহকিকত। ইঞ্জিন মোটর চালু করার জন্য দাঁড়িয়ে হারুর ছেলে বাদল। ট্রলারে একটু
গুঞ্জন যেটা যাত্রা শুরুর আগে হয়। চেয়ে চেয়েও উঠল জহর, দরিয়ার পাঁচপীর। বদর বদর কোরাসে সকলে বলে উঠল। ইঞ্জিন চলার
শব্দ শোনা গেল, সচকিত পাড়ে বসা
আপনজনের চোখগুলো। ট্রলার ছেড়ে এগিয়ে চলল দক্ষিণে। ছলাৎ ছলাৎ জলের শব্দ ট্রলারের
গায়ে আছড়ে পড়তে দেখা চোখগুলো, টলটলে জল ভরে যায়।
কারো চোখের বাঁধ উপচে ফোঁটা হয়ে ঝরে পড়ে।
মানুষগুলোর জীবনের বেশি
সময়টাই নোনা জলের ঘ্রাণে ধাতস্থ। জলের মাঝেই দিনরাত, জলের
মাঝেই প্রাণপাত। জাল ফেলা। সময় বুঝে জাল তোলা। মাছ বেছে আলাদা করা। বরফ প্যাকিং
করা। ক্রমানুসারে চলতে থাকে কাজ। প্রথম প্রথম যাওয়া মানুষগুলো নোনা জল নোনা বাতাস
সহ্য করতে পারত না। ধাতস্ত হতে গিয়ে বমি পায়খানা শরীরকে
নিংড়ে নিত। কতজনকে আবার ফিরতি কোন ট্রলারে বাড়ি ফিরে আসতেও হত। যারা কষ্ট সহ্য
করতে করতে ধাতস্থ হয়, তারা ভয়কে জয় করে নেয়।
ধু-ধু জলরাশি কোন কূলকিনারা নেই।
দিনের আলোয় দূরকে দেখা যায়। আরো কত কত ট্রলার ভাসছে। জাহাজ
যাচ্ছে দূর দিয়ে। রাতের অন্ধকার। নিকষ কালো। চড়াই-উতরাই ঢেউ কাটায় ট্রলারখানা।
জাল ফেলতে ফেলতে এগিয়ে যাওয়া। ট্রলারে বেঁধে রাখা জালের রশি।
রশিতে হাত ছুঁয়ে পরখ করা। এই
কাজটা জহর মালও বেশি বুঝত, তাই তাকেই বেশি নজর
রাখতে হতো। মাঝরাতে পরপর যাচাই করে ভোররাতে জাল গুটানো হতো। দুটো দিন পর পর কপাল
খারাপ গেল, মাছ তেমন উঠল না। জাল
গুছিয়ে ট্রলার আরো গভীরে গেল। দুপুরের পর আবার জাল ফেলা হলো। খাওয়াদাওয়া সেরে
পাটায় বসে জলের দিকে নজর রাখছিল জহর।
-কী বুঝছ গো কাকা?
মজবুত হাতে হাত ধরা বিমল
চেঁচাল।
-আজ একটু ভাল যাবে, মনে হচ্ছে।
হাওয়ার দাপটে বিমলের কানে
কোন শব্দ পৌঁছল কিনা কে জানে। তবে মুখ নাড়া ভঙ্গিতে বুঝে গেছে কাকার কথা।
-ঠাকুর যেন মুখ তুলে তাকায় গো কাকা।
নোনা বাতাসে ভেসে গেল একটা
দীর্ঘশ্বাস বিমলের।
-সবই তো তার ইচ্ছে রে বাপ। আজ কিছু রূপো পাব মনে হচ্ছে।
মনে মনে বিড়বিড় করে জহর।
দুই
দিন দুই হয়ে গেল বিমলের ছোট
মেয়েটার জ্বর কমছে না। বেশ উদ্বেগের মধ্যে কাটছে বিমলের স্ত্রী ঝুমার দিনকাল। ঘরে
টাকাপয়সা নেই। স্বামী বাড়ি নেই। আশাকর্মী দিদিটা সকালে কটা ট্যাবলেট দিয়ে গেছে।
ভরসা দিয়ে গেছে জ্বর কমে যাবে। বেলার দিকে শম্ভুনাথের আড়তে টাকার জন্য
গিয়েছিল ঝুমা।
-আরে বাবা, কাজে বেরোনোর আগে
সকলকে আগাম টাকা দিয়েছি তো। আর এখন দেবো কোথা থেকে। টাকাকড়ি বড় মন্দা।
বড় ব্যাজার শম্ভুনাথ টাকার
কথায়।
-ছোট মেয়েটার খুব জ্বর ক'দিন তাই!
-আরে জ্বর হয়েছে তো বসে থাকলে হবে। হাসপাতালে যাও। বিনা
পয়সার ওষুধ দেয় তো। যাওগে দেখাও।
কর্কশ গলায় শম্ভুনাথ।
-কিছু টাকা দিলে ভাল হতো বাবু।
করুণ সুর ঝুমার
গলায়।
-বলে দিয়েছি তো,
এখন
টাকাপয়সা হবে না। ট্রলার ফিরুক তারপর দেখা যাবে। এখন যাও ব্যস্ত আছি।
বিড়বিড় করে শম্ভুনাথ। খালি
হাতে ফিরে আসতে হয় ঝুমাকে। নিয়তি বড় নিষ্ঠুর। অসহায়ের সহায় সহজে জোটে না।
চাষির দোরে চাষা যেমন খেটে
মরে। ফসল তুলে দিতে হয় চাষির গোলায়। কোনরকমে পেটের খোরাকটুকু জোটে। পালপার্বণে, অসুখবিসুখ ভগবানের দয়ায় কাটে। মালিকের দরজায় হাত পাততে
হয়। কখনো জোটে, কখনো জোটে না।
গাঙ পাড়ের জেলেবস্তির
পরিবারগুলো একই কাঁটায় গাঁথা। মাসের পর মাস ট্রলারে বাস। জাল-মাছ, কূলকিনারাহীন জলে হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে, মালিকের আড়ত ভরো। খোরাকের টাকা নাও। বাড়ির মানুষগুলো বেঁচে
থাক। মাছের ঠিকমতো দাম না থাকায়, হিসাবের দিনগুলোয়
পাওনার অঙ্কে চোখের নোনা জলে গামছার খুঁট ভেজাও।
-এবারে তো মরসুম ভাল গো বাবু। গেল বারের থেকে অনেক অনেক বেশি
তুলেছি আমরা। মাঝে তো দুবার ডেলিভারি দিচি। সঙ্গে তো কম এলো না।
-সোনা-রুপো পেলি কটা?
খালি তো
লোহা রে! কথায় কি আর টাকা আসে?
মুখগুলো সব চুপসে যায়। বেশি
জোর যার করলে ট্রলার ছুঁতেই দেবে না আর। পরিবার শুকিয়ে মরে মরবে। অন্য কোন কাজ
নেই।
শম্ভুনাথ মানুষটা বড় একরোখা।
তবে মনটা কিন্তু ভাল। দুই মুন্সি একেবারে হাড়বজ্জাত। হিসেবের দাঁড়িপাল্লা সামনে
ঝুঁকে থাকবে তো, পিছনে ঝুঁকবে না।
টাকার যোগ-বিয়োগে ভুল করে কম হয়ে যায়। বেশি কোনদিন হয় না। বড় ডাগর ডাগর কথা
বলে। কথায় আছে, বাবুর থেকে পেয়াদার
দাম বেশি। চুপচাপ মেনে নিতে হয়।
দিন যায়। রাত যায়। পৃথিবীর
কত পরিবর্তন হয়। প্রকৃতির কত পরিবর্তন হয়। শুধু পরিবর্তন নেই এই জেলেবস্তির।
পাল্টায়নি তাদের জীবনযাত্রা। পাল্টায়নি তাদের পারিবারিক ছন্দ। নদীই তাদের
রুটি-রুজির প্রধান ভরসা। নৌকো-ট্রলার তাদের আয়ের বাহন। ভুটভুটিতে মানুষজন পারাপার
করা। সদর থেকে মাল বোঝাই করে ঘাটে ঘাটে পৌঁছে দেওয়া। দক্ষিণ বাদা থেকে খড়বোঝাই
করে শহরমুখী ঘাটে পৌঁছে দেওয়া। নৌকো ছেড়ে কিছু মানুষ আজকাল ইটের ভাঁটিতে মজুরের
কাজে লেগেছে। পরিশ্রম অনেক বেশি। কেউ কেউ হাঁপিয়ে ওঠে। মজা করে সেদিন ম্যানেজার
বাবু বলেছিল,
-তোমরা আসলে জলের কুমির, ডাঙায় বাস
করতে কষ্ট হবে গো। দেখো কিছুদিন বাস করে, না হলে আবার জলে নেমে যাবে।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment