বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
সাহানা নন্দন
ক্ষণিকা
আতঙ্ক | ছোটগল্প
সাহানা নন্দন
"বলেছিলাম, আসব। এসেছি। কথা রেখেছি। কিন্তু তুমি রাখোনি। ফেলে গিয়েছিলে জীর্ণ পোশাকের মতো! চলন্ত মেট্রো থেকে ঝাঁপ দিলে শরীরে কিছুই থাকে না, একথা তোমার জানা উচিত! আমার ইচ্ছে আজও অপূর্ণ, মাতৃত্ব অধরা!"
বিস্তৃত দিগন্ত জুড়ে খেলা করে, শব্দহীন ছায়া-কায়া!
মন আর হৃদয়ের যোজন ফারাকে
আমাদের নীরব অভিমান;
একফালি কৃষ্ণা দ্বাদশীর চাঁদ ঈষৎ হরিদ্রাভ!
শুধু তোমারই থাক।
হাওয়াটা বেশ ঠান্ডা! পাশ ফিরে ঘরে ফিরে আসার উপক্রম করেন শুভব্রত ওরফে শুভব্রত মজুমদার। পেশায় একজন অধ্যাপক হওয়ার পাশাপাশি থ্রিলার এবং ক্রাইম স্টোরি লিখে ইতিমধ্যেই অনুরাগীদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছেন। মাত্র সাতচল্লিশেই প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা একশো ছাড়িয়েছে, অসংখ্য ছোটগল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি তো আছেই। কাজের ফাঁকে একটু ছুটি পেলেই পাহাড়ি গ্রামে বা হোম-স্টেতে ঘুরে আসা তাঁর অভ্যাস। লক্ষ্য করে দেখেছেন, লেখার হাতটা বেশ খোলে এই পরিবেশে। আচমকা চিন্তার রেশটা কেটে যায়। গেটের ওপাশে আপাদমস্তক শাল মুড়ি দিয়ে কে যেন নড়াচড়া করছে!
-কে? কে?
-কৌন্ সাব?
-কোই নেহি সাব।
সত্যিই! গেট ফাঁকা! ঘরে ঢুকে আবার টেবিলে বসেন। দামী মদের নেশাটা বেশ জাঁকিয়ে চেপেছে! নির্জনতা ভাল লাগে ঠিকই কিন্তু এই মুহূর্তে উষ্ণতার জন্য ভেতরটা ছটফট করছে! একটু আগে কি ভুল দেখলেন? নারীমূর্তি নয়? ঠক্! ঠক্! ঠক্! কাঠের দরজায় টোকা পড়ল!
-অন্দর আও।
ভাবলেন রাতের খাবার হয়তো! নিঃশব্দে দরজা ঠেলে ঢুকেছে এক রমণী। সত্যিই রাতের খাবার। হাতের ট্রে-তে। কড়া কফির জাগ। একদৃষ্টিতে দ্যাখেন শুবব্রত। কী সুন্দর একটা লাল পোশাক মেয়েটির। মাথায় শালের ঘোমটা। পাশ থেকে আয়তকার চোখ আর সুডৌল মুখের আভাস পাচ্ছিলেন। ধীরে ধীরে উঠে রমণীর পেছনে দাঁড়ান তিনি!
সেও যেন টের পায় কিছু! ফিরে তাকাতেই... অসাধারণ সুন্দর এক মুখশ্রী... চোখাচোখির সঙ্গে সঙ্গে শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বেজে ওঠে সুরবাহার... সঞ্চারিত আবেগে নাক ফুলে ওঠে… মুখ লাল… দুটি ওষ্ঠ কাছাকাছি আসে... খুব কাছে। হঠাৎ... ছিটকে ওঠেন শুভব্রত।
-তু-তুমি তুমি কে?
-কেন, চেনো না আমায়?
-কেন? আসতে পারি না? পুরনো খেলাটা খেলবে না? আমি এসেছি তো!
-মানে?
ভ্রূ বাঁকিয়ে অপরূপ ভঙ্গি করে সুচেতা। একলাফে জীবন পিছিয়ে যায় দশ বছর! প্রথম দর্শনেই সুচেতাকে ভাল লেগেছিল তাঁর। লম্বা বিনুনি, ছিপছিপে তন্বী... ঝকঝকে কেরিয়ার... কলেজের ক্লাস শেষ করেই দুজনে কফি হাউস, ইকো পার্ক, ভিক্টোরিয়া চষে বেড়াতেন। কালচারাল ফাংশনে রাত কাটাতেন ডোভার লেনে। বন্ধুত্ব গাঢ় হতে হতেই শরীরী ভাষায় প্রেম প্রকাশিত হল! কিন্তু বিয়ের বাঁধনে জড়াতে নারাজ শুভব্রত সম্পর্ক ছিন্ন করলেন আচমকাই, না জানিয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়ে। চ্যাটবক্সে জমে থাকা অজস্র মেসেজ একটাও খুললেন না! তিন বছর পরে দেশে ফিরে আর দেখতে পেলেন না সুচেতাকে। খোঁজ নেবার চেষ্টাও করলেন না। শুধু ঘনিষ্ঠ সহ-অধ্যাপকদের একজন গায়ে পড়ে জানিয়ে গেছিলেন, সুচেতা নাকি সম্পূর্ণভাবে মানসিক রোগে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এখন কীরকম আছে, জিজ্ঞেস করলেন আলগোছে। ব্যস্! ওইটুকুই। আরও বছর দুই পরে এক শীতের রাতে হঠাৎই সুচেতার মেসেজ বক্স জ্বলজ্বল করে উঠল! কৌতূহলে তাকাতেই দেখলেন বড় বড় করে লেখা— আমি ফিরে আসব।
-বলেছিলাম, আসব। এসেছি। কথা রেখেছি। কিন্তু তুমি রাখোনি। ফেলে গিয়েছিলে জীর্ণ পোশাকের মতো! চলন্ত মেট্রো থেকে ঝাঁপ দিলে শরীরে কিছুই থাকে না, একথা তোমার জানা উচিত! আমার ইচ্ছে আজও অপূর্ণ, মাতৃত্ব অধরা! এই স্মৃতি তোমার, হয়তো চিরকালীন হবে! আমিই জীবন্ত করে তুলব তোমার উপেক্ষার দিনগুলোকে!
***
~~000~~

No comments:
Post a Comment