প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Tuesday, May 5, 2026

ক্ষণিকা | সাহানা নন্দন

বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
সাহানা নন্দন
 
ক্ষণিকা

"বলেছিলামআসব। এসেছি। কথা রেখেছি। কিন্তু তুমি রাখোনি। ফেলে গিয়েছিলে জীর্ণ পোশাকের মতো! চলন্ত মেট্রো থেকে ঝাঁপ দিলে শরীরে কিছুই থাকে নাএকথা তোমার জানা উচিত! আমার ইচ্ছে আজও অপূর্ণমাতৃত্ব অধরা!"

 
ইচ্ছেডানা মেলে উড়ানের পথে;
কাব্যরসী লাল ফানুসের ঝাঁক—
বিস্তৃত দিগন্ত জুড়ে খেলা করে, শব্দহীন ছায়া-কায়া!
মন আর হৃদয়ের যোজন ফারাকে
আমাদের নীরব অভিমান;
মাঝরাতে হঠাৎ জেগে ওঠা—
একফালি কৃষ্ণা দ্বাদশীর চাঁদ ঈষৎ হরিদ্রাভ!
 
কটাক্ষ করে রাতপ্যাঁচা বলেঢের হয়েছে!
 
আজ, এই স্মৃতি তোমার
শুধু তোমারই থাক।
 
কলমটা নামিয়ে শুভব্রত বাইরে তাকালেন। পাহাড়ি পথটা একদম নির্জন। লাল টালির বাংলোর ভেতরের ঘরগুলো বেশ উষ্ণ আর আরামদায়ক। দেওয়াল জোড়া কাচের জানলায় ফায়ারপ্লেসের আগুন ঝেঁপে-কেঁপে অস্থির! একটু বেশিই নির্জন সন্ধ্যাটা। লেখার টেবিল থেকে উঠে পাশের ছোট্ট ক্যাবিনেট খুলে স্কচের বোতলটা বের করলেন। কাচের গ্লাসে পানীয় মিশিয়ে সরে এলেন। দরজাটা ঈষৎ ফাঁক করে দেখলেন বাইরেটা। একটুকরো বারান্দা, ফুলের কেয়ারি... সোজা রাস্তাটা গেটের কাছে গিয়েছে। একটু আড়াআড়ি সার্ভেন্ট'স কোয়ার্টার। আলো আসছে অল্পল্প। বড়ুয়া মনে হচ্ছে রান্নায় ব্যস্ত। এপাশে একখানা ঢাকা বাতি বারান্দার অনেকটা অংশে আলো ফেলছে, বাকিটা অন্ধকারের বৃত্তে। সোজাসুজি তাকালেই গেটের বাইরে পাহাড়ি রাস্তা আর অনতিদূরেই খাড়া ঢাল! এখন সবকিছু নীল কুয়াশায় মোড়া।
হাওয়াটা বেশ ঠান্ডা! পাশ ফিরে ঘরে ফিরে আসার উপক্রম করেন শুভব্রত ওরফে শুভব্রত মজুমদার। পেশায় একজন অধ্যাপক হওয়ার পাশাপাশি থ্রিলার এবং ক্রাইম স্টোরি লিখে ইতিমধ্যেই অনুরাগীদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছেন। মাত্র সাতচল্লিশেই প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা একশো ছাড়িয়েছে, অসংখ্য ছোটগল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি তো আছেই। কাজের ফাঁকে একটু ছুটি পেলেই পাহাড়ি গ্রামে বা হোম-স্টেতে ঘুরে আসা তাঁর অভ্যাস। লক্ষ্য করে দেখেছেন, লেখার হাতটা বেশ খোলে এই পরিবেশে। আচমকা চিন্তার রেশটা কেটে যায়। গেটের ওপাশে আপাদমস্তক শাল মুড়ি দিয়ে কে যেন নড়াচড়া করছে!
-কে? কে?
উচ্চ কন্ঠের শব্দে বড়ুয়া ছুটে আসে।
-কৌন্ সাব?
হাতের ইশারায় বোঝান। অবাক চোখে বড়ুয়া বলে ওঠে
-কোই নেহি সাব।
সত্যিই! গেট ফাঁকা! ঘরে ঢুকে আবার টেবিলে বসেন। দামী মদের নেশাটা বেশ জাঁকিয়ে চেপেছে! নির্জনতা ভাল লাগে ঠিকই কিন্তু এই মুহূর্তে উষ্ণতার জন্য ভেতরটা ছটফট করছে! একটু আগে কি ভুল দেখলেন? নারীমূর্তি নয়? ঠক্! ঠক্! ঠক্! কাঠের দরজায় টোকা পড়ল!
-অন্দর আও।
ভাবলেন রাতের খাবার হয়তো! নিঃশব্দে দরজা ঠেলে ঢুকেছে এক রমণী। সত্যিই রাতের খাবার। হাতের ট্রে-তে। কড়া কফির জাগ। একদৃষ্টিতে দ্যাখেন শুবব্রত। কী সুন্দর একটা লাল পোশাক মেয়েটির। মাথায় শালের ঘোমটা। পাশ থেকে আয়তকার চোখ আর সুডৌল মুখের আভাস পাচ্ছিলেন। ধীরে ধীরে উঠে রমণীর পেছনে দাঁড়ান তিনি!
সেও যেন টের পায় কিছু! ফিরে তাকাতেই... অসাধারণ সুন্দর এক মুখশ্রী... চোখাচোখির সঙ্গে সঙ্গে শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বেজে ওঠে সুরবাহার... সঞ্চারিত আবেগে নাক ফুলে ওঠে… মুখ লাল… দুটি ওষ্ঠ কাছাকাছি আসে... খুব কাছেহঠাৎ... ছিটকে ওঠেন শুভব্রত।
-তু-তুমি তুমি কে?
লাল শাল সরিয়ে মুচকি হাসেন সুচেতা।
-কেন, চেনো না আমায়?
-তু-তুমি এখানে? কীভাবে?
তোতলাতে থাকেন শুভব্রত।
-কেন? আসতে পারি না? পুরনো খেলাটা খেলবে না? আমি এসেছি তো!
-মানে?
-আহা! খেলার মানে তোমাকে বোঝাতে হবে নাকি!
ভ্রূ বাঁকিয়ে অপরূপ ভঙ্গি করে সুচেতা। একলাফে জীবন পিছিয়ে যায় দশ বছর! প্রথম দর্শনেই সুচেতাকে ভাল লেগেছিল তাঁর। লম্বা বিনুনি, ছিপছিপে তন্বী... ঝকঝকে কেরিয়ার... কলেজের ক্লাস শেষ করেই দুজনে কফি হাউস, ইকো পার্ক, ভিক্টোরিয়া চষে বেড়াতেন। কালচারাল ফাংশনে রাত কাটাতেন ডোভার লেনে। বন্ধুত্ব গাঢ় হতে হতেই শরীরী ভাষায় প্রেম প্রকাশিত হল! কিন্তু বিয়ের বাঁধনে জড়াতে নারাজ শুভব্রত সম্পর্ক ছিন্ন করলেন আচমকাই, না জানিয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়ে। চ্যাটবক্সে জমে থাকা অজস্র মেসেজ একটাও খুললেন না! তিন বছর পরে দেশে ফিরে আর দেখতে পেলেন না সুচেতাকে। খোঁজ নেবার চেষ্টাও করলেন না। শুধু ঘনিষ্ঠ সহ-অধ্যাপকদের একজন গায়ে পড়ে জানিয়ে গেছিলেন, সুচেতা নাকি সম্পূর্ণভাবে মানসিক রোগে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এখন কীরকম আছে, জিজ্ঞেস করলেন আলগোছে। ব্যস্! ওইটুকুই। আরও বছর দুই পরে এক শীতের রাতে হঠাৎই সুচেতার মেসেজ বক্স জ্বলজ্বল করে উঠল! কৌতূহলে তাকাতেই দেখলেন বড় বড় করে লেখাআমি ফিরে আসব।
 
আজ, এই নির্জন পাহাড়ি রাতে সুচেতা, আবার! তাকিয়ে দেখলেন... একি! একি! ঘরের আলোটা হঠাৎ দপদপ করে উঠল! সুচেতার মুখে একটা আড়াআড়ি কাটা দাগ... বীভৎস ক্ষত ক্রমশ জমাট হয়ে উঠছে... চোখ-মুখ কেমন যেন পালটে যাচ্ছে... অতল গহ্বরের মতো ফাঁক বড় হচ্ছে... একদা মসৃণ তৈলাক্ত ত্বক বেয়ে গড়াচ্ছে রক্তের লাল ধারা...
 
ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসা শরীরটা লম্বা হয়ে ছাদের দিকে উঠছে, খসখসে কন্ঠস্বর...
-বলেছিলাম, আসব। এসেছি। কথা রেখেছি। কিন্তু তুমি রাখোনি। ফেলে গিয়েছিলে জীর্ণ পোশাকের মতো! চলন্ত মেট্রো থেকে ঝাঁপ দিলে শরীরে কিছুই থাকে না, একথা তোমার জানা উচিত! আমার ইচ্ছে আজও অপূর্ণ, মাতৃত্ব অধরা! এই স্মৃতি তোমার, হয়তো চিরকালীন হবে! আমিই জীবন্ত করে তুলব তোমার উপেক্ষার দিনগুলোকে!
 
***
সকালের প্রাতরাশ নিয়ে দরজা ঠেলতেই শুভব্রতকে নিজের খাটে আবিষ্কার করে বিস্মিত বড়ুয়া। চোখ বিস্ফারিত, যেন অস্বাভাবিক কিছু দেখেছিলেন, মুখ থেকে জিভ বেরিয়ে ঝুলছে আর মুখেও গলায় আড়াআড়ি একটা লম্বা গভীর ক্ষত, দীর্ঘক্ষণ রক্তক্ষরণে জমাট সাদা বালিশ কালচে রক্তবর্ণ!
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)