প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Wednesday, April 8, 2026

অভিমান | অন্বেষা সরকার

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | ছোটগল্প
অন্বেষা সরকার
 
অভিমান

"দুজনের চোখেই তখন জল, কিন্তু সেই জল কষ্টের নয়—স্বস্তির। তারা বুঝতে পারল, অভিযোগ মানেই সম্পর্কের শেষ নয়; বরং তা নতুন করে বোঝাপড়ার শুরু হতে পারে।"

 
শান্ত বিকেলের আলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল। আকাশে লালচে রঙের আঁচড়, যেন কারও মনের ভিতরের অভিমানটুকু ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। শহরের এক নিরিবিলি পার্কে মুখোমুখি বসে আছে অর্ণব আর মেঘলা—দুজন মানুষ, যারা একে অপরকে ভীষণ ভালবাসে, অথচ আজ তাদের মাঝখানে জমে আছে অগণিত না-বলা কথা।
অর্ণব চুপচাপ। মেঘলা তাকিয়ে আছে দূরের গাছগুলোর দিকে। হঠাৎ মেঘলাই নীরবতা ভাঙল।
—তুমি কি সত্যিই আমাকে আগের মতো ভালবাসো, অর্ণব?
অর্ণব একটু চমকে উঠল।
—এই প্রশ্নটা কেন এলো হঠাৎ?
—হঠাৎ নয়। অনেকদিন ধরেই মনে হচ্ছে তুমি বদলে গেছ। আগে যেখানে আমার একটুখানি মনখারাপ দেখলেই বুঝতে, এখন দিনের পর দিন আমার সঙ্গে কথা না বলেও তোমার কিছু যায় আসে না।
অর্ণব গভীর শ্বাস নিল।
—আমি বদলাইনি মেঘলা। দায়িত্ব বেড়েছে, কাজের চাপ বেড়েছে। সবকিছু সামলে চলতে গিয়ে হয়তো সময় দিতে পারছি না। কিন্তু ভালবাসা কি কমেছে?
মেঘলার চোখ জলে ভরে উঠল।
—ভালবাসা শুধু মনে রাখলেই হয় না, অনুভব করাতে হয়। আমি তোমার ব্যস্ততার কাছে হেরে যাচ্ছি অর্ণব।
কথাগুলো অর্ণবের বুকে কাঁটার মতো বিঁধল।
—তাহলে তুমি কি ভাবছ আমি ইচ্ছে করে দূরে সরে যাচ্ছি? তুমি কি একবারও ভাবো না, আমি কতটা চেষ্টা করি সবকিছু ঠিক রাখতে?
—চেষ্টা যদি এতটাই করো, তবে কেন একটা মাত্র ফোনের অপেক্ষায় আমি একা রাত জেগে থাকি?
মেঘলার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। অর্ণব এবার একটু কষ্ট পেয়ে বলল,
—তুমিও তো আমাকে বুঝতে পারতে। সব সময় অভিযোগ করলে কি সম্পর্ক টিকে থাকে?
মেঘলা ধীরে বলল,
—আমি অভিযোগ করি কারণ আমি তোমাকে হারাতে চাই না। যে মানুষটাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসি, তার কাছেই তো অভিমান করি।
নীরবতা নেমে এলো। বাতাসে শুকনো পাতার শব্দ। যেন প্রকৃতিও শুনছে তাদের কথোপকথন। অর্ণব মৃদুস্বরে বলল,
—আমি জানি, আমি ভুল করি। অনেক সময় তোমার মন বোঝার আগেই নিজের ক্লান্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে ছাড়া আমার দিনগুলো অসম্পূর্ণ।
মেঘলা তাকাল তার চোখে।
—তাহলে আমাকে সময় দাও। পাঁচ মিনিট হলেও, মন দিয়ে কথা বলো। আমি বড় কিছু চাই না, শুধু তোমার অনুভবটুকু।
অর্ণব মেঘলার হাতটা ধরে বলল,
—আজ থেকে আমি চেষ্টা করব শুধু সময় দেওয়ার নয়, তোমাকে অনুভব করানোর। কিন্তু তুমিও প্রতিশ্রুতি দাও, অভিমান জমিয়ে রাখবে না। সঙ্গে সঙ্গে বলবে।
মেঘলা হালকা হেসে বলল,
—অভিমান তো ভালবাসারই অন্য রূপ। তবে হ্যাঁ, আমি আর চুপ করে থাকব না।
 
দুজনের চোখেই তখন জল, কিন্তু সেই জল কষ্টের নয়—স্বস্তির। তারা বুঝতে পারল, অভিযোগ মানেই সম্পর্কের শেষ নয়; বরং তা নতুন করে বোঝাপড়ার শুরু হতে পারে। সূর্য তখন প্রায় ডুবে গেছে। অন্ধকার নামার আগে যেমন আকাশ সবচেয়ে সুন্দর হয়, তেমনই সম্পর্কও সবচেয়ে গভীর হয় তখনই, যখন অভিমান আর অভিযোগের ভিতর দিয়ে সত্যিকারের ভালবাসা নিজের জায়গা খুঁজে পায়।
অর্ণব ধীরে বলল,
—চলো, বাড়ি ফিরি। নতুন করে শুরু করি।
মেঘলা মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ, নতুন করে। এবার আর অভিযোগ নয়, শুধু বোঝাপড়া।
 
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। পেছনে পড়ে রইল অভিমান, সামনে খুলে গেল ভালবাসার নতুন পথ। কারণ সত্যিকারের ভালবাসা কখনও অভিযোগে ভাঙে না—বরং কথোপকথনের মধ্য দিয়েই আরও শক্ত হয়ে ওঠে।
 
~~000~~

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)