বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
সঞ্জিতা চৌধুরী
উমার আগমন
আমরা আছি গো বাচ্চারে নিয়া, পুলিশের জন্যে। বাচ্চাটারে একলা ছাড়বুনি গো, আমার নাতনির বয়স হবে কচিটার। কপালের ফের দেখো, আজই এই পথে যাচ্চি শুনি বাচ্চার কান্না। ডেকে আনি গাঁজাখোরগুলোরে। ঝোঁপ থেকে তুলি কোলে দিল আমারে।
রেললাইন
ঘেঁষে যে রাস্তাটা গেছে, ওটা ধরে ফিরলে সময়
বাঁচে অনেকটা। কিন্তু ওই জায়গাটা নেশাখোরদের আড্ডা তাই অন্ধকার। দলবেঁধে ফেরে
বেশিরভাগ ট্রেনযাত্রীর দল। একলা একেবারেই নিরাপদ নয় রাস্তাটা। সামান্য পঞ্চাশ-একশো টাকার জন্যও
সমস্যায় পড়ে যাত্রীরা।
সেদিন
ছাতা অফিসে ফেলে আসায়, বৃষ্টিতে ভিজে অপূর্ব
একটু অসুস্থবোধ করে। ঠান্ডা হাওয়াটা ওর ভেজা শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছিল। স্টেশনে
নেমেই মা’কে
ফোন করে চা বসাতে বলে, এটাও বলে ওই খারাপ
রাস্তাটা ধরবে আজ। মায়ের মনটা ভয়ে শিহরিত হয়, কিন্তু বোঝে কিছু অসুবিধা হয়েছে নাহলে অপূর্ব ওই রাস্তায়
একলা আসার মতো ছেলে নয়। অপূর্ব কিছুটা এগিয়ে দেখে একটা জটলা। ভেবেই নিয়েছিল ওই
নেশাখোরদের হাতে আজ হারাতে হবে অনেক কিছু। প্রথমে শরীরের কথা বলে দয়া ভিক্ষা করবে, না মানলে ১০০টাকা দেবে। বাকি
টাকা, ঘড়ি, মোবাইল ব্যাগে ঢুকিয়ে পকেটে
শুধু ১০০টাকাই রেখেছে সে। বুকটা ভয়ে ঢিপ ঢিপ করছে, কেন যে শরীর খারাপের জন্য এই পথে আসতে বাধ্য হলো, নিজেকে দোষারোপ করে অপূর্ব। পা
তো এগিয়ে যাচ্ছে মাথা ব্যস্ত এসব চিন্তায়। হঠাৎ দেখে একগাদা লোকের মধ্যে বয়স্ক
দুজন মহিলাও আছে। বুকে বল এলো,
হয়তো ওরা
বাজারের বিক্রেতা মাসিরা। একসাথে তাহলে নেশাখোরদের কিছু টাকা দিলে সকলেরই সুবিধা
হবে।
এগিয়ে
গিয়ে গম্ভীর গলায় বলতেই যাবে,
কী গো
মাসি কী হলো? দেখে একজন মহিলা ময়লা
কাপড়, কোলে একটা পুঁটুলি। বয়স ষাটের ঊর্ধ্বে। অপূর্বকে
দেখে বরং জটলা থেকেই আগে কথা বলে উঠল।
-দাদা দাদা দেখুন না কী
বিপদ, কী করি? আপনি শিক্ষিত, একটা উপায় করেন।
ঝুঁকে
দেখে অপূর্ব ওই বয়স্কা মহিলার কোলের পুঁটুলিতে একটা সদ্যজাত শিশু। শুনেছিল এরকম
বহু ঘটনার কথা। বাচ্চা মেরে ফেলে দেয় রেললাইনের পাশের ওই অন্ধকার ডোবায়। পরেরদিন
ফুলে ওঠে সদ্যজাত।
-কী দোষ ছিল তার? সে তো নির্ধারণ করেনি তার
জন্মের কারণ, কিন্তু ভোগ করতে হলো
কেন?
প্রশ্নের
উত্তর নেই। মোবাইল বের করে মা’কে ফোন করে অপূর্ব। মা বলেন,
-পাশের বাড়ির
রবিকাকুকে ফোন কর। উনি পুলিশে আছেন বাচ্চাটার একটা ব্যবস্থা হবে ঠিক।
রবিকাকুর
সাথে কথা বলে ওই নেশাখোরদের দেয় ফোনটা। কথা হয়, সকলের মুখে হাসি ফোটে। ওই বয়স্কা মহিলা দুজন বলে,
-বাবু তুমি এবারে ঘরে যাও, তোমার মা চিন্তা করতিছে, তুমার শরীরও খারাপ রাঙা চোখ। আমরা
আছি গো বাচ্চারে নিয়া, পুলিশের জন্যে। বাচ্চাটারে
একলা ছাড়বুনি গো, আমার নাতনির বয়স হবে
কচিটার। কপালের ফের দেখো, আজই এই পথে যাচ্চি
শুনি বাচ্চার কান্না। ডেকে আনি গাঁজাখোরগুলোরে। ঝোঁপ থেকে তুলি কোলে দিল আমারে। এক-দুটা
বদ্দরলোক যেতে যেতে দেখল টুকুন। পরাণ একটুসও কাঁদলেনি? ফেঁসে যাওনের এত্ত ভয়? চলি গেল। তুমিই মাত্তর দাঁড়ালে।
ব্যাগ
থেকে একটা ৫০০টাকা বের করে ওই মাসির হাতে দিয়ে বলল অপূর্ব,
-বাচ্চাটার জন্য কিছু
যদি লাগে দেবেন। আমি যাই…
নেশাখোরগুলো
বলল,
-দাদা কোনো ভয় নেই, পুলিশ যদি এখন না নেয় ঘরে
নিয়ে যাব আমরা কেউ, তোমার নম্বরে সব
জানিয়ে দেব, ঘরে যাও।
হাঁটতে
থাকলাম অন্ধকার রাস্তা ধরে। লজ্জিত লাগছিল শিক্ষিত সমাজের অংশ হওয়ায়। যে
মাতাল-গাঁজাখোরদের ঘৃণা করে সমাজ। আজ ওরাই পাহারাদার ওই ছোট্ট প্রাণের। কে ফেলে
গেছে নিজের অংশ? কারা রক্ষা করছে
নিজের স্বার্থত্যাগ করে? পরেরদিন মহালয়া আগমনি
সুরে মাতবে ভুবন। এদিকে এক উমার আগমনে নেশাখোরদের হলো শাপমুক্তি, জাগল চেতনা।
~~000~~
No comments:
Post a Comment