বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
ইন্দ্রজিৎ রায়
মাহতারি
রাস্তায় নেমে, এই প্রথম চোখে পড়ে কচি পাকা, নানা রকম বাঁশ ঢুকে পড়েছে আশেপাশে। ঠেলাগাড়ি ভর্তি ভর্তি বাঁশ, এই শহরের দিক থেকে ওদিক যাচ্ছে। মা’র সঙ্গে বাঁশের এই যোগ প্রাচীন
আসতে
চাইনি আমি, সত্যিই আসতে চাইনি। পরে
মা'র মুখে শুনেছিলাম, যে মা'র নরমাল ডেলিভারি হচ্ছিল না
কিছুতেই। ডাক্তারও অপেক্ষা করেই চলেছে, মা'র কষ্টের অবসান হচ্ছে
না। শেষে মা রাঁচি হাসপাতালে ছাদে উঠে গেছে। বলেছে হয় সিজার কর, বাচ্চাটা বের কর নাহলে আমি
ঝাঁপ দেব, আমি আর এই কষ্ট নিতে
পারছি না। তখন পেট কেটে আমাকে বের করা হয়, খুব সুন্দর ছিলেন মা, আমার চোখগুলো মা'র,
দৃষ্টিটা মা’র
কিনা জানি না, মা’কে কখনো আলফাল লেখালেখি
করতে তো দেখিনি। আমাকে বারণ করত,
বলত
লেখালেখি রাখ এখন, পয়সা কামা, দাড়ি কামা আর পয়সা কামা
দুটোই কামানোর যদিও দুটো ফল আলাদা।
মা
এগুলো কেন বলত সেটা আজ বুঝতে পারি, অনেকেই বুঝতে পারে। পাতরাতু তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সিকিউরিটি ইনচার্জ ছিলেন
আমার মাতামহ। মা'র মধ্যে একটা পাগলামি
ছিল, যেটা আমি খুব অল্প
বয়সে বুঝতে পেরেছিলাম। বাকিরা সেটা বুঝতে পারত না তেমন, তবে হ্যাঁ দাদু সম্ভবত বুঝতেন, বাবারা মেয়েদের বুঝতে পারে একটু। কিছু বাবারা, সবাই কিনা জানি না। খ্যাপা
লোক ছিল আমার দাদু, এত বড় চাকরি করেছে চিরকাল, তার আগে পুলিশকর্তা
ছিলেন, ডিএসপি, কোনদিন এক পয়সা নেয়নি। কেউ
মাছ দিয়ে গেলে, তার দাম দিতে চাইতেন।
এখনকার পুলিশ দেখলে ভিরমি খাবে। ফলে গাড়ি-বাড়ি দাদুর হয়নি। ছোটবেলাতে, সোনাদানা যা ছিল মা'র, টুকটাক বিক্রিবাটা
হয়ে গেছিল পরবর্তী বছরগুলোতে, আমি পরে বুঝতে পেরেছিলাম। আমার পরে একটা সন্তান হয় মা'র, সে থাকেনি। সেই ট্রমা, বাকি সারাটা জীবন মা বহন করে গেছিল, তাতে মা’র পাগলামিটা আরো আগে রিফাইন্ড হয়ে গেছিল। রিফাইন সাদা তেলের মতো, তখন পোস্টম্যান তেল আসত
বাড়িতে। সাদা তেল চৌকো টিনের কৌটো, টিন।
মানুষ
যতই চা'ক, জল তাকে অনুসরণ করে না। জল
একমাত্র ঢালুকে সমীহ করে, অনুসরণ করে। মানুষকে
না। মানুষ, প্রকৃত প্রস্তাবে, জলকে অনুসরণ করতে গিয়ে ঢালু
আরো ঢালুতে নেমে যায়। বুঝতে পারে না প্রথমে সেটা। এর
সঙ্গে, চামচ দিয়ে চাউমিন
খাওয়া, হয়তো একটা সুতো উঠবে
চামচে, তাই সই। এই করে করে
চামচ দিয়ে চাউমিন খেতাম। মা নীরবে দুঃখ করতেন, কোনদিন বলেননি কিছু। রক্তের ভেতর, ইম্প্রাক্টিক্যালিটি ঢুকে গেছিল। তারপর ধরো,
financial acumen, আমার শূন্যের কাছাকাছি। হয়তো এর কারণও যে, মা কাউকে টাকা দিতে দিত না আমাকে। কেউ
টাকা দিতে গেলেই, মা বলতো টাকা দেবে না
বাচ্চার হাতে, ওকে জিনিস কিনে দাও!
আমার ভাইবোনেরা, টাকা পেত, তারা আজীবন ওয়ালেট পার্স
ক্যারি করেছে, আমি কোনদিনই পার্স
পকেটে রাখিনি। এই বিষয়গুলো আমি করেছি, বাউল আশ্রমে যাতায়াত,
সেখানকার
গাছের ফলগুলো কুড়িয়ে এনে,
বাড়িতে
তুলে রাখা। বাড়ির নিম গাছের ফলগুলো দেখতে সুবেশা, তো দেখতাম এখানে নিম ফুলের মতো গোটা গোটা বসন্ত হয়েছিল
আমার।
সেই
বসন্তের যে ওষুধ আমি স্বপ্নে পেয়েছিলাম, সেটা ভয়ংকর। সে এক ওষুধেই,
সেসব
ওষুধের কথা, বোবা সিরিজ বলে একটা
সিডিতে তোলা ছিল এটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে মানে হারিয়ে দিয়েছি। আমি। কারণ ওষুধগুলো
আমি আর মনে করতে চাই না আমার সঙ্গে দেখা করে যাচ্ছে তারা, আজও করেন এর সঙ্গে যোগ হবে, যে ভূতের ভয়ে একলা বাড়িতে থাকতে চাইতাম না। আজও চাই না। ভূত
সম্পর্কে আমার কেমন আছে আমার তো ধারণাই ফ্ল্যাটগুলোতে ভূত আছে, যে কারণে রাতের দিকে ছাদে
যেতে চাই না। কিন্তু যাই। সেই গানটার মতো সব সময় মনে হয় কেউ একটু যেন আছে। এই
গতিময় পৃথিবীর একধারে, স্টেশনের নড়বড়ে
দোকানদারের মতো থেকে গেছি। কোনদিনই গতির অংশীদার নই গতি, গীত, গীতা,
তাগি, সাত্ত্বিক অহংকার, মিথ্যাত্ববোধ। ব্লু তারা, পদ্মসম্ভব গুরু রিনপোচে, এরা সব কারা। রক্তের ভিতর
দৌড়াদৌড়ি করছে পায়েস, সুজাতা, জ্বর হলে কেমন একটা বিকেল, হয়তো জ্বরের সময়ে, কত কী দেখতে পেতাম, দেখতাম সব বড় হয়ে যাচ্ছে
বিরাট বিরাট হয়ে যাচ্ছে আমি ছোট হয়ে যাচ্ছি।
মনোবিদ
তাঁর চশমার ফাঁকে তাকান আমার দিকে,
-চামচ দিয়ে চাউমিন খান, কেমন লাগে আপনার।
-ভালই বেশ তো, অনেকক্ষণ ধরে খাই, সস দিয়ে। ভালই।
-কিন্তু আশেপাশে কাঁটা দিয়ে
তাড়াতাড়ি খেতে দেখেন তো অনেককেই। তখন? ভাবেন?
-নাহ্। যে যা করে ভাল থাকে, সত্যি বলতে কী, বাবা-মা, দাদু-দিদা যে পড়ে যাবে, চলে যাবে, এটাই জানতাম না
আমি...
(মনোবিদ চুপ করে যান। শুধু
এসির ফুসুরফুস শব্দ ছাড়া,
আর কোন
শব্দ নেই। কয়েক সেকেন্ডের জন্য,
হয়। না
এখন তো আর ক্যালেন্ডার থাকে না যে তার পাতা ওড়ার শব্দ হবে)
-prescription ওটাই থাক।
মনোবিদ
বলেন, একটা যোগ শুধু যোগ
করলাম। করবেন সকালে। হালকা। কুড়ি দিন পর আসুন। যে কাজগুলো বলেছিলাম করবেন। দেখা
যাক।
রাস্তায়
নেমে, এই প্রথম চোখে পড়ে
কচি পাকা, নানা রকম বাঁশ ঢুকে
পড়েছে আশেপাশে। ঠেলাগাড়ি ভর্তি ভর্তি বাঁশ, এই শহরের দিক থেকে ওদিক যাচ্ছে। মা’র সঙ্গে বাঁশের এই যোগ
প্রাচীন, "আদি গুরু মাতা-পিতা, শেষের গুরু বাঁশ", গুরুর দেশ মনে পড়ে পূর্বাভাস, বিস্তৃত ছাতা মঙ্গলবারের হাট
গোবিন্দপুরে সেই তিন মাথা এগুলো মনে পড়ে। গাড়ি গাড়ি বাঁশ। শহরে মা আসছেন। থিম
মা। মা যেন অভিনেত্রী। মাতৃভক্তি,
বালতি
বালতি। গর্ভধারিণী মা’র খবর থাক না থাক, এই মা'র খবর আছে।
সবথেকে
উল্লাস সদাগরদের, সারা বছরের জমানো
টাকা এনে ঢেলে দিয়ে যাবে সবাই,
মাল-মেটিরিয়াল কিনে ঘর
যাবে। কী হবে, ও দিয়ে? দুদিন পর তো আলমারিতে ডাঁই, ট্রামলাইন এসে গেছে। পেরোতে
হবে। এখানে পাখির হাট। এও কি পাচার? দিকে দিকে মাতৃপূজার আবহ,
এসময়ে, নুচু নাচগান ও খ্যামটার বাজার
বিস্তৃত হয়।
মা, মানে যার পুজো বলে এসব হচ্ছে, তাঁকে দেখতে পান কয়েকজন
মাত্র। তাদের বাড়ি যান উনি,
আচার, পাঁপড় বানান। বাকিটা
তো। গলির মুখটা অন্ধকার, শেষে, ক্লাবের মুখে কিছু আলো, সংলাপের রেশ। আর কিছু নেই। কিছুই
না। সকলেই বলছে, মা আসছে। আমিও মা
আসছে, বিড়বিড় করতে করতে
নিজের গলির দিকে হাঁটতে থাকি।
~~000~~
No comments:
Post a Comment