বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১১ম সংখ্যা/০৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
শ্রীময় ঘোষ
চোখের জল
[২য়
পর্ব]
"সবার মন থেকে কিরণবালার কথা মুছে গেছে। ব্যস্ত জীবনে কে আর মনে রাখে সেই যুবতী কিরণবালাকে যে মনের অভ্যন্তরে একজন পুরুষকে ভালোবেসে নিজের জীবন তুলে দিতে চেয়েছিল তার হাতে। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারেনি তার ভালোবাসার কথা কখনও।"
পূর্বানুবৃত্তি
কিরণবালা
আর হিরণ্ময়ী দুই বোন আজকাল আর একসাথে কলেজ যায় না। কলেজে নিত্যদিন হিরণ্ময়ী আর
শুভেন্দু থাকে অ্যাবসেণ্ট। কিরণবালার রাগ বাড়তে লাগল। তারও ক্লাসে মন বসে না। সে
বুঝতে পারছে না কী করবে! তার আর করার কী-ই বা আছে! দুই বোনের মধ্যে কোন কথাবার্তা
হয় না আজকাল। যেন দুই অজানা প্রাণী। দুই বোনের মধ্যে সখ্যতায় চিড় লেগেছে। এটা
কলেজে অনেকেই লক্ষ্য করেছে। বাড়িতে বাবা-মা আগেই বুঝে গিয়েছিল কারণটা। তারা এ নিয়ে
আর জল ঘোলা করেনি। তারা কখনোই অনুমান করতে পারেনি যে দুই মেয়েই একই ছেলেকে পছন্দ
করে বসবে। ভেবেছিল সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।
প্রেম
নীরবে আসে, নিঃশব্দে আসে। কিরণবালার প্রেম শুভেন্দুর প্রতি নিঃশব্দে
জন্ম নিচ্ছিল। প্রতিটি মুহূর্তে তার হৃদয়ে জমছিল প্রেমের সুরভি। মনের ভিতর আঁকা
হচ্ছিল ভবিষ্যতের ছবি যেখানে শুধু কিরণবালা আর শুভেন্দু। রাত্রি জেগে সে কত চিঠি
লিখেছে শুভেন্দুকে। যার একটাও সে শুভেন্দুকে দিতে পারেনি। শুভেন্দুর প্রতি তার
ভালোবাসা জন্ম নিচ্ছিল তিল তিল করে। সে তিল তিল করে গড়ে তুলছিল তার স্বপ্নের জীবন
শুভেন্দুর সাথে। সেখানে তার নিজের দিদি কী করে ঢুকে গেল! সে কিছুতেই বুঝে উঠতে
পারছে না। সে ভাবে, আর কাঁদে নির্জনে
বসে। তার মধ্যে অভিমান জন্ম নেয়। অভিমান থেকে জন্ম নেয় রাগ। রাগ থেকে জন্ম নেয়
নিজেকে ধ্বংস করার উগ্র বাসনা। কিরণবালার চিঠিগুলি দিদি হিরণ্ময়ী একদিন লুকিয়ে পড়ে
বুঝতে পারে বোনের দুঃখ কোথায়। সে কেন তাকে হিংসে করে! কেন তার প্রতি ঈর্ষান্বিত!
কেন সে তাকে ঘৃণা করে! ভালোবাসতেও যে তাদের পছন্দ এক হবে কে জানত!
পরীক্ষা
হয়ে গিয়েছে। কলেজ শেষ। হিরণ্ময়ী খুব একটা বাড়িতে থাকে না। কিরণবালা বোঝে যে সে
শুভেন্দুর সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্ন রচনা করছে তারা দুজন। এদিকে
কিরণবালা সম্পূর্ণ একা হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে তাকে ডিপ্রেশন গ্রাস করছে। তার শরীরের
জৌলুসও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। কোন কাজেই তার মন নেই। হিরণ্ময়ীও তাকে একদিন বোঝাতে
চেয়েছিল। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি।
মাস
ছয়েক পর একদিন শুভেন্দুর বাড়ি থেকে শুভেন্দু আর হিরণ্ময়ীর বিয়ের প্রস্তাব এল।
হিরণ্ময়ীর জেদের কাছে বাবা-মা হার মেনে এই বিয়েতে রাজি হল। বিয়ের দিন ঠিক হল।
কিরণবালার মধ্যে কোন আলোড়ন নেই। সে নিশ্চুপ। তার মুখে একটিও কথা নেই। শুভেন্দুও
ইতিমধ্যে জানতে পেরে গিয়েছিল যে কিরণবালাও তাকে ভালোবাসে।
বিয়ের
দিন সবাই ব্যস্ত। আত্মীয়স্বজন,
অতিথিদের
ভিড়। সবাইকে আপ্যায়নে বাড়ির লোকজনেরা মগ্ন। বিয়ের মণ্ডপে কিরণবালা অনুপস্থিত। সবাই
জানে কেন! তাই এই নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করছে। সবার
মনোযোগ হিরণ্ময়ী আর শুভেন্দুর উপর। মা তবুও উঠে গেল ঘরের ভিতর দেখতে কিরণবালা কী
করছে! কোথাও দেখতে না পেয়ে ভাবল হয়তো কোন নির্জন জায়গায় চুপ করে বসে আছে। পরে ফিরে
আসবে। মা ফিরে এসে বিয়ের মণ্ডপে বসে পড়ল। মনটা পড়ে রইল ছোটো মেয়ে কিরণবালার উপর।
সকালে
মেয়েকে বিদায় করে মায়ের মনে পড়ল ছোটো মেয়ে কিরণবালার কথা। শুরু হল খোঁজা। বাড়িতে, বাড়ির আশেপাশে কোথাও পাওয়া
গেল না কিরণবালাকে। বাড়িতে হুলুস্থুলস। শোবার ঘরে ছড়িয়ে আছে শুভেন্দুকে না-দেওয়া
ছেঁড়া চিঠির টুকরো। পাখার হাওয়ায় সারা ঘর জুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে টুকরোগুলো হাহাকার
করতে করতে।
পুলিশে
রিপোর্ট করা হল। অনেক খোঁজাখুঁজি হলো কিন্তু কিরণবালার সন্ধান পাওয়া গেল না কোথাও।
তারপর
বহু বছর কেটে গেছে। সবার মন থেকে কিরণবালার কথা মুছে গেছে। ব্যস্ত জীবনে কে আর মনে
রাখে সেই যুবতী কিরণবালাকে যে মনের অভ্যন্তরে একজন পুরুষকে ভালোবেসে নিজের জীবন
তুলে দিতে চেয়েছিল তার হাতে। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারেনি তার ভালোবাসার কথা কখনও।
অফিস
যাবার সময় পাড়ার মোড়ে কৃষ্ণচূড়ার নিচে একটা ছোট্ট জটলা দেখল শুভেন্দু। তার দেরি
হয়ে যাবে এই ভেবে সে না দাঁড়িয়ে গাড়ি চালিয়ে অফিসের দিকে এগিয়ে চলে গেল। পরের দিন
সকালে স্থানীয় কাগজে একটা ছোট্ট খবর পড়ে সে থমকে গেল। “মানসিক রোগগ্রস্ত এক
বৃদ্ধার মৃতদেহ পাওয়া গেছে। তার কাপড়ের খুঁটে বাঁধা একটি কলেজের পরিচয় পত্র দেখে
অনুমান করা হচ্ছে মৃতদেহটি কিরণবালা দত্ত নামে কোন মহিলার”।
যে
পুরুষ কিরণবালার জীবনে ‘প্রিয়-মানুষ’ হতে পারত,
তার
জানালার শিক ধরে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কী করণীয় এখন?
~~000~~
No comments:
Post a Comment