বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
সূপর্ণা চন্দ
শেষ প্রদীপের আলো
ছোট্ট অশোক তখন বুঝতেন না, বাড়ি কি কখনও ঘুমোয়? আজ বুঝতে পারেন। মানুষের মতো বাড়িরও মন থাকে। কেউ থাকলে সে বাঁচে, কেউ চলে গেলে সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।
"আবার এসেছে আশ্বিন, হিমের পরশ লাগে
প্রাণে..."
শরৎ
এলেই রায়চৌধুরী বাড়িটা যেন একটু বেশি জেগে উঠত। বছরের বাকি সময়টা বাড়িটা
নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকত—পুরোনো লোহার ফটক, শ্যাওলা ধরা দেওয়াল, বন্ধ হয়ে যাওয়া বারান্দা আর বিশাল ঠাকুরদালান নিয়ে।
কিন্তু আশ্বিনের হাওয়া গায়ে লাগলেই কোথা থেকে যেন তার ঘুম ভাঙত। মনে হতো, বাড়ির পুরোনো ইট-কাঠগুলোও
বুঝি অপেক্ষা করে থাকে—কবে আবার ঢাক বাজবে, কবে ধূপের গন্ধে ভরে উঠবে উঠোন, কবে দেবী আসবেন।
রায়চৌধুরী
বাড়ির দুর্গাপুজোর বয়স দেড়শো বছরেরও বেশি। এই বাড়ির পুজো শুধু একটা ধর্মীয়
অনুষ্ঠান ছিল না, ছিল একটা ইতিহাস।
একসময় দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত এই বাড়ির ঠাকুর দেখতে। নাটমন্দিরে যাত্রা হতো, উঠোনে বসত খাওয়াদাওয়ার আসর, আর বিজয়ার দিন গ্রামের মানুষ
ভিড় করত প্রণাম করতে।
কিন্তু
সময় তো সবকিছুর হিসাব বদলে দেয়। এখন বড় উঠোনে আগের মতো মানুষের ভিড় হয় না।
বাড়ির ছেলেরা ছড়িয়ে পড়েছে শহরে, কেউ বিদেশে, কেউ নিজের ব্যস্ত
জীবনে। বিশাল বাড়িটায় এখন থাকেন শুধু অশোক রায়চৌধুরী আর তাঁর ছোট ভাইয়ের বিধবা
স্ত্রী।
অশোকবাবু
জানেন, এই বছরই হয়তো
শেষবারের মতো দেবী আসবেন এই বাড়িতে। কারণ বাড়িটা বিক্রি হয়ে যাবে। রক্ষণাবেক্ষণের
খরচ আর সামলানো যাচ্ছে না। পুরোনো দিনের ঐতিহ্য ধরে রাখার মতো মানুষ আর নেই। কথাটা
তিনি কাউকে বলেন না। শুধু প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঠাকুরদালানে এসে দাঁড়ান। দেওয়ালে
ঝোলানো পূর্বপুরুষদের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন। মনে হয়, ছবির মানুষগুলো যেন নীরবে
জিজ্ঞেস করছেন,
—তোমার
হাতে দেওয়া প্রদীপটা কি তবে আজ নিভে যাবে?
---
মহালয়ার
দিন ভোরে অশোকবাবু নিজেই পুরোনো রেডিয়োটা বার করলেন। রেডিয়োটার গায়ে এখনও বাবার
হাতের লেখা—"১৯৭৮"। সেই বছরই প্রথম তিনি বাবার সঙ্গে মহালয়ার ভোরে
উঠেছিলেন। মা তখন শিউলি ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথতেন। ঠাকুমা বলতেন, "দেবী আসার আগে বাড়িটাকে
জাগিয়ে তুলতে হয়।"
সেই
ছোট্ট অশোক তখন বুঝতেন না,
বাড়ি
কি কখনও ঘুমোয়? আজ বুঝতে পারেন। মানুষের
মতো বাড়িরও মন থাকে। কেউ থাকলে সে বাঁচে, কেউ চলে গেলে সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।
---
ষষ্ঠীর
সকালে বাড়ির ফটকের সামনে আবার আলপনা পড়ল। পুরোনো কর্মচারী হরিপদ এখনও প্রতি
বছরের মতো এসে হাজির। অশোকবাবু অবাক হয়ে বললেন,
—তুই এখনও এলি হরিপদ?
হরিপদ
হেসে বলল,
—বাবু, পুজোয় কি শুধু কাজের জন্য আসি? এই বাড়ির ঢাকের আওয়াজ শুনেই তো বড় হয়েছি। শেষ পুজো হলে
কি আর না এসে থাকা যায়?
কথাটা
শুনে অশোকবাবু মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। কিছু কিছু কষ্ট মানুষের সামনে প্রকাশ করা যায়
না।
---
অষ্টমীর
দিন বাড়িতে আবার সেই পুরোনো গন্ধ ফিরে এল। ধূপ, চন্দন,
শিউলি
আর পুরোনো কাঠের মিশ্রিত এক অদ্ভুত গন্ধ। অশোকবাবুর নাতনি ঐশী প্রথমবারের মতো এই
বাড়ির পুজো দেখতে এসেছে। সে শহরের মেয়ে। বড় বড় আলো, থিমের পুজো, ভিড়—এসবেই অভ্যস্ত। ঠাকুরদালানের সামনে দাঁড়িয়ে সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর
বলল,
—ঠাকুরদা, এখানে এত শান্ত কেন?
অশোকবাবু
মৃদু হেসে বললেন,
—কারণ এই বাড়ি শুধু পুজো দেখে
না, পুজোকে মনে রাখে।
ঐশী
কথাটার মানে তখন বুঝতে পারেনি।
---
দশমীর
সকাল। সিঁদুর খেলার শব্দ, উলুধ্বনি, ঢাকের শেষ তাল—সবকিছু যেন
একটু বেশি ভারী লাগছিল। বিসর্জনের আগে অশোকবাবু একবার ঠাকুরদালানে গেলেন। দেবীর
পায়ের কাছে একটা শিউলি ফুল পড়ে ছিল। তিনি ফুলটা তুলে নিলেন। হঠাৎ মনে হলো, এই ফুলটা শুধু ফুল নয়। এর
মধ্যে আছে মায়ের সকালবেলার ডাক। বাবার গম্ভীর মুখ। ঠাকুমার গল্প। ছোটবেলার
বন্ধুরা। আর এই বাড়ির প্রতিটা মানুষের হাসি।
বিসর্জনের
সময় সবাই যখন ব্যস্ত, অশোকবাবু তখন চুপ করে
দাঁড়িয়ে রইলেন। দেবী চলে গেলেন। ঢাক থেমে গেল। উঠোন আবার ফাঁকা হয়ে গেল। কিন্তু
সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হলো— কিছু বিদায় আসলে শেষ নয়।
---
কয়েক
মাস পরে বাড়ি বিক্রি হয়ে গেল। নতুন মালিকরা বাড়িটা সংস্কার করবে। শহরের মানুষ
বলল, "পুরোনো বাড়ি ভেঙে
নতুন কিছু হবে।" কিন্তু কেউ জানল না, সেই বাড়ির একটা ছোট্ট ঘরে এখনও একটা প্রদীপ রাখা আছে। যেটা
অশোকবাবু যাওয়ার আগে জ্বালিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন— বাড়ি ভেঙে
যায়। দেওয়াল বদলে যায়। দরজা-জানালা পাল্টে যায়। কিন্তু যে বাড়িতে একশো বছরের
প্রার্থনা জমে থাকে, তাকে কি সত্যিই মুছে
ফেলা যায়?
পরের
শরতে যখন হালকা শিউলির গন্ধ বাতাসে ভেসে এল, অশোকবাবু দূরের শহরে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করলেন। কানে যেন
ভেসে এল— ঢাকের শব্দ। উলুধ্বনি। আর ঠাকুরদালানের সেই চিরচেনা ডাক— "মা এসেছে।"
শেষ
প্রদীপের আলো হয়তো নিভে গেছে। কিন্তু তার উষ্ণতা? সে এখনও রয়ে গেছে। কোনো এক পুরোনো বনেদি বাড়ির স্মৃতির
মধ্যে।
~~000~~
No comments:
Post a Comment