প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা | সম্পাদকীয় | রাজতন্ত্র

বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই কার্ত্তিক , ১৪৩৩ দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা সম্পাদকীয়   রাজতন্ত্র ...

Saturday, October 24, 2026

রহিমার ঠিকানা [১ম পর্ব] | আনোয়ার রশীদ সাগর

বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই কার্ত্তিক, ১৪৩৩
দেবকুমার মুখোপাধ্যায় | ধারাবাহিক গল্প
আনোয়ার রশীদ সাগর
রহিমার ঠিকানা
[১ম পর্ব]

শরৎ উঁকি দেয় আকাশে বাতাসে। শিউলি ঘ্রাণ ছড়ায়। ভোরে ঝরে যায়। মাঠে ধান লাগানো শুরু হয়। সেদিন পাশের গ্রামের দূর সম্পর্কের চাচা আব্দুল এসে হাজির হয়। হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ নিয়ে।

 
ভাদ্র মাস। শ্রাবণের জল সরে গিয়ে মাঠে এখন কাদার গন্ধ। আকাশে মেঘ  নেই, কিন্তু বাতাসে কেমন যেন একটা ভার। সন্ধ্যা নেমেছে। পশ্চিমের বাঁশঝাড়ের মাথায় শেষ রোদটা রক্তের মতো লেগে আছে। রাহেলা খাতুন উঠোনে হাঁসমুরগি ঘরে তুলছিলেন। একটা একটা করে গুনছেন। খাকি হাঁস, দেশি মুরগি, লাল মোরগ। সব আছে। গোয়ালেও গরুটা "হাম্বা" করে ডাকছে।
 
শুধু নেই রহিমা।
-রহিমা... ও রহিমা, রহিমারে... গেলি কনে?
গলা ফাটিয়ে ডাকলেন। উত্তর নেই। পুকুরপাড়, বাঁশঝাড়, মসজিদের সামনে — সব খোঁজা শেষ হলো। রাহেলার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে। যেমন পুকুরে পানি কমে গেলে মাছগুলো ছটফট করে, তেমন।
-হাঁসমুরগি গরুছাগল সব বাড়ি এলো অথচ মা-টা এলো না।
বিড়বিড় করে বললেন। চোখের পানি গাল বেয়ে পড়ে নোনতা হয়ে যায়। কদিন আগেই দালাল হাবিবুল এসেছিল। শহরের মতো প্যান্ট-শার্ট। হাতে চকচকে মোবাইল।
-খালা, রহিমারে সৌদি পাঠাই দেই। মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতন। দুই বছরে ঘর উঠাই ফেলবেন।
রহিমা তখন উঠোন ঝাঁট দিচ্ছিল। মুখ তুলে বলেছিল,
-আমি বিদেশ যাব না ভাই। দেশেই থাকব। মা-রে ছেড়ে কই যাব? কোথাও যাব না।
হাবিবুল দাঁত বের করে হেসেছিল।
-জেদি মেয়ে তো।
আরেকটা ছায়া ঘুরঘুর করে। উত্তরপাড়ার রমজান আলি। বাপের দুই বিঘা জমি রয়েছে। নিজে বেকার। সারাদিন রহিমার পিছু পিছু ঘোরে। যেমন ফুলের পিছে ভ্রমরের মতো, গুনগুন করতেই থাকে। রহিমা ওকে দুই চোখে দেখতে পারে না। একদিন বটি নিয়ে তাড়াও করেছিল।
-আর যদি নাম নিস, জিহ্বা কেটে দেবো৷ যাহ্, বের হ।
রমজান আলি একবার সামনে একবার পিছনে তাকাতে বের হয়ে যায়।
 
রাহেলা সবই ভাবে। আর ভাবতে ভাবতে বুকের ভেতরটা কুয়োর মতো খালি হতে থাকে। রাহেলার জীবনটা ট্র্যাজেডিতে ভরা। লোকে বলে, "স্বামী খেকো মেয়ে"। চব্বিশ বছর বয়সে প্রথম স্বামী মারা যায় ডায়ারিয়ায়। একটা মেয়ে রেখে যায়  — নাম রহিমা খাতুন। তারপর বিয়ে করে, পাশের গ্রামের আব্দুলকে। ভাল মানুষ। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মাথায় বর্ষাকালে মাঠে গিয়ে, বজ্রপাতে মারা যায়। লাশ হয়ে ফেরে। কপালপোড়া রাহেলাকে পাড়াপড়শিরা সহানুভূতিও দেখায়। বছর খানিক যেতে না যেতে আবার বিয়ে হয়। স্বামীর নাম সোলেমান। মাছ ধরত। ভাদ্র মাসে বিলে সাপের কামড়ায়। ওঝা ডাকার আগেই সোলেমানও মারা যায়। এবার আর পাড়াপড়শিরা সহানুভূতি দেখায় না। বরং দুর্নাম করে, বারো ভাতারি স্বামী খেকো মহিলা। তারপর থেকে রাহেলা আর বিয়ের নাম নেয়নি। "আমার কপাল পোড়া। আর কারো জীবন নষ্ট করব না।"
 
গরু, ছাগল, হাঁসমুরগি পোষে। অন্যের জমিতে ধান কেটে, নুনে ভাতে খেয়ে রহিমাকে মানুষ করেছে। মেয়েটা আগুনের মতো। কড়া মেজাজ। পাড়ার কোনো ছেলেকে পাত্তা দেয় না। পাড়ার বউ-ঝিরাও বলতে পারে না "রহিমার চরিত্র খারাপ"। যৌবনের উত্তালতা রয়েছে। তবে প্রকাশ পায় না। পুরুষের চোখে ধরা পড়ে। ভরাট শরীর। উপচে পড়ে দিকে দিকে। নতুন বেড়ে উঠা কলাগাছের মতো।
 
সারারাত ঘুম নাই। ফজরের আজানের সাথে সাথে রাহেলা বের হয়। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন। মামা-খালা-চাচা। সবাইকে খবর দেয়। "আমার রহিমারে কেউ দেখছ?" কেউ বলে, "কাল বিকালে বাজারে দেখছি।" কেউ বলে, "না খালা, দেখি নাই।"
 
থানায় জিডি হলো। পুলিশ বলল, "৭২ ঘণ্টা যাক খালা।" গাঁয়ে গুঞ্জন। "দালাল নিয়ে গেছে।" কেউ বলে, "রমজানের সাথে ভেগেছে।" "গলায় দড়ি দিছে।" রাহেলা কানে আঙুল দেয়। "আমার মেয়েডা তো এমন   নাগো।" রাতের বেলা উঠোনে বসে থাকে। জোনাকির আলোর মতো আশা জ্বলে, আবার নিভে যায়।
 
এক মাস কেটে যায়। বর্ষা শেষ হয়ে যায়। শরৎ উঁকি দেয় আকাশে বাতাসে। শিউলি ঘ্রাণ ছড়ায়। ভোরে ঝরে যায়। মাঠে ধান লাগানো শুরু হয়। সেদিন পাশের গ্রামের দূর সম্পর্কের চাচা আব্দুল এসে হাজির হয়। হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ নিয়ে।
-রাহেলা আপা, এই চিঠি। ঢাকা থেকে আইছে। পোস্টম্যান আমার কাছে দিয়া গেছে।
রাহেলার হাত কাঁপছে। চিঠি খোলে। অক্ষরগুলো বাঁকা। রহিমার হাতের লেখা।
—মা,
আমি ভাল আছি। রাগ করো না। আমি ঢাকা চলে আসছি। গার্মেন্টসে চাকরি নিছি। মাসে ১২ হাজার টাকা বেতন। আমি একা আসি নাই মা। রমজানও আমার সাথে আছে। ও রিকশা চালায়। আমরা একই বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া নিছি। বিয়ে করি নাই এখনো। কিন্তু একসাথে থাকি।
তুমি কষ্ট পাইও না। আমি টাকা পাঠাব। বিয়েও করে নেব। আমারে মাফ করে দিও।
ইতি,
তোমার রহিমা
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)