প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা | সম্পাদকীয় | রাজতন্ত্র

বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই কার্ত্তিক , ১৪৩৩ দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা সম্পাদকীয়   রাজতন্ত্র ...

Saturday, October 24, 2026

অনিন্দিতাকে সুজিত | সুজিত চক্রবর্তী

বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/হলদে খাম/৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই কার্ত্তিক, ১৪৩৩
দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা | হলদে খাম
সুজিত চক্রবর্তী
অনিন্দিতাকে সুজিত

বেঁচে থাকে মানুষের অনুভব আর অভিজ্ঞতা। তাই শেষ করছি। চিঠির উত্তর চাই এমন দাবি করা মূর্খমির নামান্তর। তাই সে পথে যাব না। তবে তার পথ চেয়ে বসে থাকব আমৃত্যু, সে যতই বোকামি হোক না কেন এই করিতকর্মাদের সমাজে।

 
প্রিয় অনিন্দিতা,
 
আজ আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মেঘের ভিড়ে অনেক পুরনো কথা খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, তাই এত বছর পরে তোমাকে চিঠি লিখতে বসেছি। যদিও আমি সুদীর্ঘ কাল কলকাতার বাইরে আর তোমার বিয়ের আগে থেকেই আমাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল না বলে আজ কোন ঠিকানায় এ চিঠি পাঠাব তা জানি না। তাহলে কেন এই চিঠি লিখছি? এ প্রশ্নের উত্তরে বলতে পারি, 'নিজেকে হালকা করার জন্যে'।
 
সত্যি কি এভাবে হালকা হওয়া যায়? আমি মনে করি, যায়। আমি তো এখনও কবিতা লিখি, গল্প লিখেও হালকা হওয়ার চেষ্টা করি। এ চিঠি তোমার হাতে পৌঁছোনোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, কারণ তোমার ঠিকানা তো আমার জানা নেই। তার অর্থ এই যে এ চিঠি কেউ পড়বে না। ঠিক আমার লেখা কবিতার মতো। এমন নয় যে তারা কোথাও কখনও প্রকাশিত হয়নি! হয়েছিল। তাদের সংখ্যাও মোটামুটি মন্দ নয়। কিন্তু, তারা পাঠক পেয়েছিল কিনা বলা মুশকিল। এ কথা বলার পেছনে কারণ আছে। আমার ধারণা, আজকালকার ব্যস্ত মানুষ নিজের লেখাটুকুই পড়েন। হয়তো ব্যতিক্রম আছে, হয়তো পাঠকও আছে!
 
এই 'হয়তো' আমাদের জীবনের পথে এগিয়ে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। সেই একইরকম আশা নিয়েই এ চিঠি লিখছি। তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় হয়নি, আমরা ছোটবেলা থেকেই পরস্পরের পরিচিত ছিলাম। সে কেবলমাত্র কলকাতায় কাছাকাছি থাকার জন্যে নয়, তুমি আমাদের বাড়িওয়ালার ভাগনি সেই সূত্রে।  দুজনেরই সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি টান ছিল জন্মগত। দুজনেরই লেখালেখির অভ্যাস ছিল স্কুলে পড়ার সময় থেকে। আর এখানেই লুকিয়ে আছে এক 'হয়তো' রহস্য। আমার লেখা গল্প, কবিতা, অথবা কে বলতে পারে, এই চিঠি যদি মনোনীত হওয়ার পর প্রকাশিত হয়, হয়তো কোনও দিন তোমার হাতে পৌঁছে গেলেও যেতে পারে। তুমিও হয়তো সেই পত্রিকার একই সংখ্যায় লেখা পাঠিয়েছিলে... এমন কত কী স্বপ্ন দেখে যে বেঁচে আছি আমি, অথবা ব্যাপক অর্থে আমরা সবাই, সে কথা বলে বোঝানো আমার পক্ষে সহজ কাজ নয়।
 
এখানেই শেষ নয়। আসলে আমি দীর্ঘদিন কলকাতা, তথা বাংলার বাইরে। তোমার সঙ্গে আমার শেষ দেখা তোমার মামা, সত্যদার মেয়ের বিয়ের আসরে। অতিথি আপ্যায়নের উদ্দেশ্যে রাখা সারি সারি চেয়ারে আমরা দুজন পাশাপাশি বসে, তখন জানতাম না সেটা ছিল শেষ বারের মতো। কথাবার্তা হচ্ছিল খুব স্বাভাবিক ছন্দে। উৎসবের আবহে, স্বপ্ন-মাখা সানাইয়ের সুরে ভেসে যেতে যেতে ভুলে গেছিলাম আমাদের মধ্যে ছিল ব্যবধানের উঁচু পাঁচিল। অথবা, তোমার বাবার অহংকারী ভঙ্গিতে সেইসব কথা বলা, যার অর্থ এটাই যে আমি তোমাদের সমকক্ষ ছিলাম না।
 
এমন সময়ে সেখানে যমদূতের মতন আবির্ভূত হলেন সত্যদার খুড়তুতো ভাই রাজেন। হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে এসে ততোধিক ব্যস্ত সমস্ত হয়ে রাজুদা বলল, "সত্যদা তোকে খুঁজছে। খুব জরুরি দরকার।" এরপর আর কি বসে থাকা যায়! আজ সত্যদার মেয়ের বিয়ে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাড়াতাড়ি উঠে গেলাম। এ পর্যন্ত তুমি জানতে। এবার তার পরের ঘটনা বলি। আমার কথা শুনে সত্যদা যেন আকাশ থেকে পড়ল। বলল, "আমি তো কিছু বলিনি!"
 
এ কথা শোনামাত্র এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে আমি ফিরে এলাম সেখানে, যেখানে আমরা বসেছিলাম। অবাক হয়ে দেখলাম সেখানে তুমি নেই। ভাবলাম, এদিক-ওদিক কোথাও নিশ্চয়ই থাকবে। অনেক খুঁজেও তোমাকে দেখতে পাইনি। এরপর রাজুদাকে খুঁজেছিলাম। কিন্তু তার টিকি অথবা টাক কিছুই দেখতে পেলাম না। রাস্তায় গিয়ে সিগারেট ধ্বংস করলাম অনেকগুলো। এরপর আর কাউকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করিনি। কারণ, বুঝে গেছিলাম সেদিন পরিকল্পনা করে আমাকে বোকা বানানো হয়েছিল।
 
এরপর আজ পর্যন্ত আমাদের আর দেখা হয়নি। শুনেছিলাম, খুব ভাল ছেলের সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির ঐশ্বর্য নাকি ঈর্ষা করার মতন। আমি তখন অনুভব করেছিলাম আমার ওপর সংসারের প্রত্যাশা বাড়ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারে সেটা স্বাভাবিক। মনে হচ্ছিল, দূরে কোথাও চলে গেলে আমি ভাল থাকব। সুযোগ এসে গেল। ভাল চাকরির অফার পেয়ে গেলাম। পোস্টিং বম্বেতে। মাইনে ভাল, তার চেয়েও বড় কথা ওরা ফার্নিস্ড কোয়ার্টার দেবে। আরব সাগরের তীরে, এই শহরে রোজগার করার রাস্তা একটা পেয়ে গেলেও বাসস্থান জোগাড় করা আমার মতন কবিতাপ্রেমী, ভবঘুরে টাইপের মানুষের পক্ষে অসম্ভব বললেও বোধহয় কম বলা হয়।
 
এরপর, পরিযায়ী হলাম। কেউ কেউ বলেছিল, তারা নাকি বুঝে গেছে কেন আমি কলকাতার বাইরে যেতে চাইছি। আমি তাদের বুঝিয়েছিলাম, 'পুরুষমানুষ যদি তার কর্তব্য পালন করব মনে করে তবে তাকে অর্থের প্রয়োজনে নিজের দেশ ছেড়ে বাইরে যেতে হয়। এমনকি পশুরাও খাদ্যের অভাব হলে জঙ্গলের এক এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যায়। এছাড়া কলকাতা যেন ক্রমশ একটা বৃহত্তর বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হচ্ছে দিনে দিনে...’ ইত্যাদি। তাছাড়া, ভাড়া বাড়ির অন্ধকার ঘরে আমাকে চিরকাল পচে মরতে হবে এমন মাথার দিব্যিই বা কে দিয়েছে! ভালভাবে বেঁচে থাকার অধিকার সবার আছে।
 
অতঃপর সব সংসারে যা হয় আমাদেরও তাই হলো। মা ক্রমাগত চাপ দিতে লাগল বিয়ের জন্যে। রাজি হয়ে গেলাম। এরপর যত দিন গেছে তত ভাল করে বুঝেছি, সম্পর্কের বন্ধন নিয়ে যতই কাব্য করা হোক, প্রকৃত বন্ধন বেঁচে থাকে পারস্পরিক নির্ভরতা আর অভ্যাসের মধ্যে। তার চেয়েও বড় সত্যি এটাই, মানুষকে জীবনের পথে একা চলতে হয়। সবাইকে হয়তো হয় না, আমাদের মতন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের হয়। এই পথ চলার অভ্যাস ধীরে ধীরে তাদের পরিণত করে তোলে।
 
যাক, অনেক ভারী ভারী কথা লিখে ফেলেছি, ইচ্ছা করে এসব লিখেছি এমন নয়। একেই বোধহয় বলে, আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। এখন মনে পড়ে যাচ্ছে রবীন্দ্রসংগীতের সেই লাইনটা,
"আর কি কখনো কবে         এমন সন্ধ্যা হবে—
              জনমের মতো হায় হয়ে গেল হারা।"
 
এরপরে আর কিছু বলার থাকে না, বেঁচে থাকে মানুষের অনুভব আর অভিজ্ঞতা। তাই শেষ করছি। চিঠির উত্তর চাই এমন দাবি করা মূর্খমির নামান্তর। তাই সে পথে যাব না। তবে তার পথ চেয়ে বসে থাকব আমৃত্যু, সে যতই বোকামি হোক না কেন এই করিতকর্মাদের সমাজে।
 
ইতি—
তোমার সুজিত
 
 

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)